বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩২

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩২ গোটা গ্রাম যেন খাঁ-খাঁ করছে, ডাহাগ্রামের সৈয়দ পাড়া এলাকায় অনেক ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছড়া পুড়ে ছাই হয়ে আছে। চারিদিকে নিদারুণ শূন্যতা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিন আগ পর্যন্ত গোটা গ্রামের জনপদে গৃহস্থরা মনের সুখে হেটে বেড়াত। চঞ্চল শিশু-কিশোরদের চপলতায় আনন্দ মুখরিত হয়ে উঠত ছায়াঘেরা এই গ্রামটি। গায়ের কৃষকেরা সারাদিন ক্ষেতে-খামারে কাজ করতো আর মনের সুখে গান গাইতো। সন্ধ্যা হলে গরু বাছুর গোয়ালে রেখে তারা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলতো। বাড়ির বাইরে সবাই মিলে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন রকম খোস গল্প-গুজবে মেতে উঠতো। বাড়ির বোউয়েরা রান্না-বান্না শেষ করে তাদের খেতে ডাকলে পরিবারের সবাই মিলে মাটিতে গোল হয়ে বসে এক সাথে খেতো। পৃথিবীর সব সুখ যেন এই কুঁড়ে ঘরে জড়ো হয়ে নাচা-নাচি করতো। আজ যেন কিছুই নেই, নেই তাদের আনন্দ প্রাণের স্পন্দন। ঘর নেই, বাড়ি নেই, বাগান নেই, গরু-ছাগল নেই, শুধু নেই আর নেই। গোটা পাড়া জুড়ে নির্জনতা, কেবলি শূন্যতা, চারিদিকে শুধু হাহাকার। পোড়া ভিটার দুর্গন্ধময় ছাইয়ের স্তুপে মাংসহীন প্রাণির অস্থি। আগুনে পুড়ে যাওয়া পত্র-পল্লবহীন উঁচু গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষি হয়ে। পাশের ক্ষেতগুলো কালো ছাইয়ে ঢেকে আছে, সেগুলোতে যে কোন কিছু রোপন করা হয়েছিল তার কোন চিহ্ন নেই। মানুষের কষ্টের হাহাকারে আর উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের চারিদিকের বাতাস কেমন ভারী হয়ে আছে। গভীর রাতে থেকে থেকে ভেসে আসে ঝিঝি পোকাদের করুণ সুরের ঐক্যতান, ব্যাঙের গোংড়ানী আর ভয়ার্ত শেয়ালের আর্তচিৎকার যেন সমস্ত দুঃখ কষ্টকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাতাসের উগ্র দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘœতার সৃষ্টি করে। পোড়া গাছের পাতাহীন ডাল-পালায় প্রাণহীন গলিত মাংস, লোসহীন ছিন্ন-ভিন্ন চামড়াগুলো ঝুলছে। ছাইয়ের ভেতর দকদকে পোড়া মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে জ্যান্ত শকুন, হার-হাড্ডি নিয়ে শেয়াল আর কুকুরের চলছে মহাউৎসব। সৃষ্টিসেরা জীবের এমন জঘন্য খেলা, যা পশুকেও বরাবরে হার মানিয়েছে। এমন অচিন্তনীয় দৃশ্য কেউ কোন দিন ভুলে থাকতে পারবে কিনা আমার জানা নেই। গতরাতের নির্লিপ্ত-নৃশংস ঘটনায় সবার মন ভেঙ্গে যায়, গোটা গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। কষ্টের সময় অতিদীর্ঘ হলেও একটু একটু করে সরে যাচ্ছে আঁধার, পূর্বের আকাশ ফরসা হয়ে এসেছে, টুকরো টুকরো মেঘের উপর লাল রক্তের ছাপ। দপদপ করে জ্বলছে শুকতারা, পশু-পাখির ঘুম ভেঙ্গেছে, জেগে উঠেছে কাজের মানুষেরা। নিত্যদিনের অভ্যাসগত অসুখ যেন সংসারে টানা-টানি, নুন আনতে পান্তা নাই। পেটের ক্ষুধা যখন আসমান ছুঁয়ে যায় তখন আর দিক-বেদিক মনে থাকে না। একটানা দু’মাস ধরে পাহারা দিতে দিতে সবার মনে একটা অবহেলা ও ক্লান্তির ভাব চলে এসেছিলো। তাদের মনে বলছে-ফুরিয়ে গেছে তাদের পাহারা দেয়ার দিন। শত্রæরা যে মার খেয়েছে তাতে করে আর কোন দিন ভুলেও ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় হামলা করার কথা মুখে আনবে না। আপাতত বিপদের কোন আশঙ্কা নেই ভেবে সবাই বউ-বাচ্চা নিয়ে নিজনিজ বাড়িতে ফিরে যায়। যাদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে তারা নদীর পারের কাশখড় কেটে এনে কোন রকমে একটা মাথা গোজার ঠাই করে নিচ্ছে। গ্রামের সবাই তাদেরকে সহযোগিতা করছে। পুরুষেরা ঘর বাঁধার কাজে সাহায্য করছে আর মেয়েরা ভাত রান্না করে তাদেরকে ডেকে ডেকে খাওয়াচ্ছে। আদিম যুগের মানুষদের যেমন কোন জাত নেই, ধর্ম-বর্ণ নেই, দেশ নেই, সরকার নেই। শুধু মানুষ হিসেবে-বন্য পশুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিতো। ক্ষুধার তারণায় নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করতো। পশুদের ভয়ে দিনের পর দিন গুহার ভেতর নীরবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতো। তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও ভালো মন্দ দেখার কেউ ছিলনা। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর মানুষেরাও সেই আদিম যুগের মানুষের মতো তাদের-কোন জাত নেই, ধর্ম নেই, দেশ নেই, সরকার নেই। এদেরর নিজের খাবার নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হয়। শুধু মানুষ হিসেবে-বহিঃশত্রæদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজেদের তৈরী অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করতে হয়। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে, তাদের বাঁচা-মরা নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নেই, কোন চিন্তা করার অবকাশ নেই। সভ্য যুগের, সভ্য সমাজে শিক্ষিত বিবেকের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অসভ্য-পাশবিক মনোবৃত্তির স্বীকার হয়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষেরা আদিম যুগের মানুষের মতো গুহার ভেতরে ধুঁকে-ধুঁকে মরছে। অবরুদ্ধ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অহসায় মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, হাহাকারের কথা সাংবাদিক মুনাজাত উদ্দিন ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকরা বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলোতে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার সংবাদ দিয়ে তোলপার করে তোলে। এভাবে গণমাধ্যমগুলোর বদৌলতে তৎকালিন সরকারের নজরে আসে। উপর মহলে বিষয়টি ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়, ফলে অবরুদ্ধ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা ব্যাপারে সরকার নড়ে-চড়ে বসতে বাদ্ধ হয়। সেখানকার অবরুদ্ধ ও অসহায় নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য তৎকালিন বাংলাদেশ সরকার তড়িৎ গতিতে দশটি একনল ও দশটি দু’নল বিশিষ্ট বন্দুক ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার এলাকা অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়। এ বন্দুকগুলো আসার ফলে এখানকার মানুষের বুকের বল যেন আকাশ স্পর্শ করে। তারা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। এখন ‘তিনবিঘা রক্ষা কমিটি ও বজরং বাহিনী’ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় আর হামলা করার সাহস পাবে না। অন্ততপক্ষে তাদের জীবন-যাপনের নিরাপত্তাটুকু আর বিঘ্নিত হবে না। বউ-বাচ্চা নিয়ে অনাহারে আর পালিয়ে থাকতে হবে না। তাদের বাড়ি-ঘর আর কেউ জ্বালিয়ে দিতে পারবে না। অবরুদ্ধ অবস্থায় অর্ধাহারে, অনাহারে শত কষ্টের মাঝে দিন কাটলেও নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র আসায়, তাদের শরীর যেন পালকের মতো হালকা হয়ে গেলো। সবার মেজাজ বেশ ফুরফুরে। মাথার মগজ থেকে জীবন নাসের ভয়টা চলে গিয়ে এখন মাথার ভেতরটা বেশ ফাঁকা। এখন তাদের মাথার মধ্যে কোন চিন্তা নেই, আহ! যুদ্ধ করে বাঁচার দিন শেষ। শত্রæরা যতো চেষ্টাই করুক, আর ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার ভেতরে প্রবেশ করার সাহস তাদের কোন দিনই হবে না। একদিকে জ্বালা-যন্ত্রণা আর অপর দিকে মৃত্যুর ভয়, এ সবের দ্বিমূখী টানে আমার স্নায়ু তন্ত্রগুলো বুঝি একটা একটা করে ছিড়ে যাচ্ছিল। আমার নিজের ভেতর, কখনো সর্ম্পূণ বিপরীদ দুটি অনুভব এমন মুখো-মুখি দাঁড়ায় নি। আগের সেই ভয়াবহ অবস্থা সেরে গেছে, এই মুহুর্তে এখানে হামলা করার সাহস কারও নেই। আমরা সবাই বেঁচে আছি, মৃত্যু আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। এই অসহ্য আনন্দ আমার দুশ্চিন্তা, দুর্ভোগ আর উদ্বেগে ভেঙ্গে পড়া শরীরটার মধ্যে ধরে রাখার নূন্যতম শক্তি অবশিষ্ট নেই। আর এদিকে আবার সেই দুঃস্বপ্ন! আবার সেই জঞ্জাল, হয়তো দু’এক দিনের মধ্যে এসে যাবে। সন্ধ্যার পর বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে শামসুল মাষ্টারসহ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অনেক মানুষ উপস্থিত হয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করছে। মাস্টার বলেন- বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বেশ জোরালো ভাবে আলাপ আলোচনা চলছে। প্রশাসন ও নির্বাচনের বিভিন্ন উপকরণ সমুহ তিনবিঘার উপর দিয়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় আসবে। ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ কোন ভাবে তা করতে দেবে না। এ নিয়ে হয়তো আবারও একটা গণ্ডগোল লাগার সম্ভাবনা আছে। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। যা হবার সে তো হয়ে গেছে, আর কোন দিন কারও কোন ক্ষতি হতে দেয়া যাবে না। আমরা আমাদের মতো করে তৈরী হয়ে থাবব, আর যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। আর যেন কোন ক্ষতি না হয়। পরদিন সকালে বেলা দশটা নাগাদ গোটা গ্রামজুড়ে হৈহৈ-রৈরৈ পড়ে গেল। বিশাল সৈন্যবাহিনীর একটি দল, তিনবিঘার উপর দিয়ে হেটে আসছে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার দিকে, সাধারণ মানুষজন ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারা মনে করেছিল ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বুঝি ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার উপর হামলা করতে আসছে, গ্রামকে দখল করার জন্য আসছে। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী জন্মের পর থেকেই বারবার এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছে, কাজেই তারা তো ভয় পাবেই। আর এটাই স্বাভাবিক। সশস্ত্র সৈন্যবাহিনীকে সোজা সুজি গ্রামের দিকে আসতে দেখে অনেকে বাড়ি ঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। কেউ আবার শুধু ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা তার খেলা ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। মা টানছে একদিকে আর তার বাচ্ছা টানছে অন্য দিকে। বিশেষ করে ডাহাগ্রামের পূর্বপাশে ভারতীয় বর্ডারের কাছে যাদের বাড়ি, জীবনের ভয়ে নারী ও শিশুরা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। শতশত নারী আর শিশুর কান্নাকাটিতে পুরো এলাকায় একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেনাবাহিনীর সাথে ব্যালট বাক্স ও প্রিজাইডিং ও পুলিং অফিসারও আছে। সিভিল পোশাকের মানুষগুলোকে দেখে অনেকে যখন জিজ্ঞাসা করে তারা কেন এখানে এসেছে। তারপর তারা জানতে পারে যে, তারা ভোট গ্রহন করার জন্য এসেছে। ভোট গহন শেষে তারা আবার চলে যাবে। গভীর রাত চারিদিকে অথৈ অন্ধকার, কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকারা ডেকে উঠছে। দূরের কোনো উঁচু গাছের ডালে বসে নিঃসঙ্গ পাখিটা তার স্বজাতি গলায় কষ্টের বিলাপ করে যাচ্ছে। আকাশে রুগ্ন ও মৃতপ্রায় একফালি চাঁদ তার চির প্রতিদ্ব›দ্বী আঁধারকে তাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ক্ষীণ চন্দ্রের ম্লান আলো পাশের বাঁশবাগানে এসে পড়েছে। শির-শির বাতাসে বাঁেশর লম্বা পাতাগুলো অপরূপ সাজে নাচা-নাচি করছে। চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় সানু সরকার। গোটা গ্রাম আজ প্রকৃতির মতো শান্ত হয়ে গেছে, অনেকদিন মানুষের চোখে ঘুম নেই, আজ যেন রাজ্যের ঘুম এসে তাদের চোখ ডুবিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক মাসে তাদের যে ধকল গেল তাতে ঘুম কেন মানুষের জীবনটা যে বেঁচে আছে সেটাইতো অনেক। শোয়ার ঘরের শূন্য ভিটায় আঁধাপোড়া বাঁশের একটি খুঁটি অতীতের সব স্মৃতি আঁকড়ে ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আঁধারের রূপে হৃদয়ের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস স্মৃতির দুয়ারে কল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরপাঁক খেতে থাকে। অতীতের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে জ্বল-জ্বল করে উঠে। সানু সরকারের দু’চোখ জলে ভরে যায়। অন্ধকারে ছাইয়ের স্তুপে খুঁজতে থাকে তার সারা জীবনের স্মৃতি সংগৃহীত কাঠের বাক্সটি। অন্ধকারে নরম ছাইয়ের ভেতরে কি যেন একটা খট করে হাতে লাগে। সানু সরকারের বুকের ভেতরটা ধক্ করে ওঠে, তার মনে হয় এটাই তার এতোদিনের বুকে আগলে রাখা সেই বাক্স। চোখের চশমাটা ভালোকরে পড়ে নিয়ে ছাইয়ের ভেতরে হাতটাকে আরো গভীরে ঢুকিয়ে দেয়, তারপর সেই শক্ত বস্তুটাকে কাঠের বাক্সেরে হাতল মনে করে টেনে তুলে। আবছা আবছা আলোর মঝে যতোটুকু দেখা যায় তাতে মনে হয় যে, এটা কোন বাক্সের হাতল নয় পুড়ে যাওয়া গরুর সামনের পায়ের হাড্ডি। মনটা তাঁর ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। তার প্রিয়তমা গত হওয়ার যুগেরও বেশী সময় পার হয়ে গেছে। এতোদিন তার স্মৃতিগুলো বুকে আগলে রেখে তিনি বেঁচে আছেন। এখন যদি সেটিও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাহলে তিনি বাঁচবেন কি নিয়ে? মনের আবেগকে সামলাতে না পেরে হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলেন সানু সরকার। গভীর রাতে নিঃসঙ্গ হৃদয়ের হাহাকার যেন আকাশে বাতাসে মিশে একাকার হয়ে যায়। সানু সরকার যৌবনে তিনি পাকিস্তান সরকারের কর্মচারি ছিলেন। কাজেই পরধীনতার যে ব্যথা সেটা তিনি নিজের জীবনে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। সেই তিক্ত ব্যথা আজও তাকে ক্ষণে ক্ষণে কষ্ট দেয়। অতি সাধারণ জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে মূল্যবান সময় গুলোকে অতিবাহিত করেছেন তিনি। নিজের চাওয়া পাওয়া কিংবা ভোগ-বিলাসিতা কখনো তাকে পরাস্ত করতে পারে নি। সকাল সকাল দেখা হয়ে গেলো সানু দাদুর সাথে। তার পরনে একটা গাঢ় লীল রঙের লুঙ্গি প্রায় হাটু পর্যন্ত তোলা, গায়ে একটা রঙ জ্বলে যাওয়া হাফহাতা ফতুয়া, পায়ে চটি স্যাণ্ডেল। মাথায় উসকো খুসকো চুল, চোখ দুটো ঘুমে যেন টুল-টুল করছে। দুর থেকে দেখে কোন ভাবেই তাকে চেনার উপায় নেই। নিজের জীবনের প্রায় সব কিছুকেই তুচ্ছ করেছিলেন, পুরোপুরি মুক্ত পুরুষ যাকে বলে। শুধু একটি ব্যাপারে সামান্য পছন্দ কাজ করত তার, সেটা হলো ধোপদুরস্ত পোশাক। পাকিস্তানিদের চাকরি করতেন বলে তার কথা বার্তা ও চাল চলনে অনেকটা আভিজাত্যের ভাব থাকতো। আজ বিকেলের আকাশটা বেশ পরিস্কার, গোটা আকাশে একফোটা মেঘেরও বালাই নেই। পñিম আকাশে সূর্য অনেকটা হেলে পড়েছে হয়তো কিছক্ষণের মধ্যেই দিনের অবসান ঘটিয়ে যবনিকা টানবে। রাস্তার ধারে একটা বিশাল শিমুল গাছ, সেখান থেকে দেখা যায় তিস্তা নদীর ধুধু বালুচর আর মাঝে মধ্যে কাশ ফুলের ঝোপ-ঝাড়। সেই শিমুল গাছের তলে বসে সানু সরকার দিগন্তের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, তার চোখের পাতাগুলো স্থির একটুকুও নড়াচড়া করছেনা। এমন সময় রাস্তায় মধ্য বয়সী এক মহিলা একটা ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে আর একটা বাচ্চার হাত ধরে কাাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছে। আমার বয়স কম হওয়ায় পাড়ার সবাইকে আমি চিন্তাম না। মহিলাকে কাঁদতে দেখে জানার আগ্রহটা খুব বেশী মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, ভেতরে ভেতরে উস-খুস করতে লাগলো। দাদুকে দেখলাম অন্যদিকে তাকিয়ে কেমন আনমনা হয়ে চোখের পানি মুছতেছে। আমি দাদুর বামপাশে গিয়ে বসে মহিলা কেন কাঁদছে সেটা জানতে চাইলাম। দাদু আমাকে বলল-ওটা আব্দার চকিদারের বোউ, ওদের বাড়িও জ্বালিয়ে দিয়েছে পাষণ্ডরা। এতাাদিনের তিলতিল করে গড়া কষ্টর সংসার, পুড়ে ছাই হয়ে গেলে কার না কষ্ট হয়? তাই বুকভাঙ্গা কষ্টে সে কেঁদে কেঁদে নিজেকে হালকা করে নিচ্ছে। সন্ধ্যার পর গোটা আকাশ জুড়ে থমথমে মেঘ, একটুকুও নড়াচড়া করছে না। বাতাস নেই একটি গাছের পাতাও নড়ছে না। ভ্যাবসা গরম চারিদিকে। ঘরপোড়া, গৃহ হারা এসকল অসহায় মানুষগুলো, পেটে ক্ষুধা, মাথায় সংসারের বোঝা নিয়ে অভাবের তাড়ণায় ছটফট করে বেড়াচ্ছে। নানারকম ব্যস্ততার মাঝে দিনটা কেটে গেলেও রাতে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা। পেটের জোগান নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, ভিটেবাড়িতে আঁধাপোড়া বাঁশের খুঁটি আর বিশাল ছাইয়ের স্তুপ, বাতাসে পোড়ামাংসের গন্ধ এসব দেখার পরেও কি মানুয়ের মাঝে কোন স্বাভাবিকতা থাকে? তাদের ঘর-বাড়ি, সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিল, ছাগল-গরু, হাঁস-মুরগীও রেহাই পেল না। সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল, বেঁচে থাকার নূন্যতম অবলম্বন এখন আর তাদের মাঝে নেই, যাকে আঁকড়ে ধরে তারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারে। এতাাগুলো বাড়ি-ঘর পুড়ে গেলো, এতগুলো পরিবার নিঃশ্ব হয়ে অর্ধাহারে, অনাহারে খোলা আকাশের নিছে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, নূন্যতম সাহায্য করার কেউ নেই। তাদের কোন দেশ নেই, সরকার নেই, জাত-বেজাতের বালাই নেই। তারা যে এ সভ্য সমাজের মানুষ, এটা তারা কবেই ভুলে গেছে! কারণ এখানে না খেয়ে মরলে দেখার কেউ নেই, রোগে-শোকে শজ্জাশায়ী হয়ে থাকলেও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। কেউ মারা গেলে তার ভাগ্যে শেষকৃতির জন্য নতুন কাপড় কেনার ব্যবস্থা নেই, পুরোনো শাড়ি-ধুতি, ভাগ্যে সেটাও না জুটলে কলাপাতা দিয়ে ভালোকরে মোড়ানো অবস্থায় দাফন করতে হচ্ছে। রাস্তার ধারে কৃষ্ণচুড়ার আধপোড়া গাছটি সেদিনের জ্বলন্ত অগ্নির সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছের তলে সানু দাদু নিজহাতে বাঁশের একটি মাচা তৈরী করে সেখানে বসে সকাল সন্ধ্যার অলস সময় গুলোকে পার করে দেন। কোবাদ আলি সরকার, মফি উদ্দিন (ঢোড়া) ও আশেপাশের মুরুব্বিরা নিত্যদিন এখানে এসে গল্পগুজব করে সুখ-দুঃখকে নিজেদেও মধ্যে ভাগাভাগি কওে নেন। অতিতের কোন রূপকথার পর্ব নয়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোন তৈল চিত্র নয়, এইসব পশ্চাৎপদ গল্প-কাহিনী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা বাস্তব প্রতিচ্ছবি, একটি খণ্ডচিত্র। পাড়ার গরিব মানুষেরা সারাদিন ক্ষেতে-খামারে কাজ করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বেলা শেষে এই গাছের তলে বসে সবাই একে অপরের সুখ-দুঃখের কথা শুনে, কষ্টগুলোকে ভাগাভাগি করে নেয়। মাঝেমধ্যে তারা খোস গল্প করে মনটাকে হালকা করে। সানুদাদু এদের মধ্যে অন্যতম। গোটা পাড়ায় আজকাল যে ভগ্ন ও অর্ধভগ্ন খড়ের কতগুলো চিলেকোঠার সমষ্টিরূপে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম দেখা যায়, তা হলো একে অপরের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধন। এই নগণ্য গ্রামে আর কিছু থাক বা না থাক, এখানকার মানুষরে একে অপরের প্রতি সহানুভ’তি ও ভালোবাসার অভাব নেই। সানু দাদুর দৃঢ় বিশ্বাস-আমাদের মাথার উপরে মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন, মজলুমদের আহাজারিতে কোন একদিন তার আরশ কেঁপে উঠবে, আর আমরা সেদিন মুক্ত হবোই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now