বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৫

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৫ আলো আঁধারের বোঝাপড়া শেষ হয়ে এসেছে। পশু-পাখি ঘুম ভেঙে জেগেওঠে। তাদের কিচির-মিচির আর কল-কাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বাঁশবাগান। তাই আব্দুল্লাহর ঘুম ভেঙে য়ায়। কিন্তু রাতে যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা যায় ততক্ষণই শান্তি, জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের যত চিন্তা এসে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ভেবে ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়ে আব্দুল্লাহ। তাছাড়া অনাহারে থেকে তার শরীরের অবস্থাও দিনদিন কাহিল হয়ে পড়ছে। এসকল ভাবতে ভাবতে এক সময় তার চোখে একটু ঘুমের ভাব আসে, চোখের পাতাগুলো একহতে চলেছে, এমন সময় একটা কান্নার আওয়াজ তার কানে আসে। বালিশ থেকে মাথা তুলে কান খাড়া করে বুঝতে চেষ্টা করে কোন পাশ থেকে কান্নার শব্দটা আসছে। কিন্তু কোন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। বিছানায় বসে কুলসুমকে ডাক দেয়-আবিয়ার মাও, ও আবিয়ার মাও? দেখ্তো এ্যাকনা, এতো রাইতোত কায় কান্দিবার নাগচে? গভীর ঘম থেকে হঠাৎ কুলসুম ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে আব্দুল্লার বুকে হাত বুলাতে বুলাতে বলে-কি হইল তোমার আবিয়ার বাপ? প্যাটের বিষ আরো বাড়িল না কি? আরে না, মুই তোক সে জন্য ডাকাও নাই আবিয়ার মাও। কোন্ঠে থাকিভালা একটা কান্দোনের আওয়াজ শোনা যাবার নাগচে, মুই ঠিক বুঝবার পাছো না। ভাল্করি এ্যাকনা শুনেকতো এতো রাইতোত কায় কান্দে? ততক্ষণে সেই কান্নার সঙ্গে হয়তো আরও দু’চারজন যোগ দেওয়ায় শব্দটা বেশ জোড়াল হয়ে ওঠে। কুলসুম বিছানা থেকে নিচে নামে। ঠিক তাই পাশে রজব আলির বাড়ি থেকেই কান্নার আওয়াজ আসছে। কেরসিনের কুপিটা হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহকে বলে-আবিয়ার বাপ? হাঁটো এ্যাকনা বাইরোত য্যায়া দেখি? মোরতো মনে হয় রজব আলির বাড়িত কান্দিবার নাগচে। ক্যান আবিয়ার মাও, রজব আলির বাড়িত ফির কার কি হইল? মুই শুনছিনু রজব আলির নাকি তিন চার দিন থাকি খুব জ্বর আর বুকোত বিষ। শরীরটাও নাকি খুব কাহিল হয়া গেইছে। তার গায়োত হাঁটার মতো শক্তি নাই। সারাদিন বিছানাত শুতি থাকে। কইস কি আবিয়ার মা? এই কথাটা মোক আগে কবু না। পাড়া প্রতিবেশী মানুষ, একটা রোগে পড়ে কাহিল হয়া বিছানাত পড়ি আছে আর মুই তার কোন খবরই জানো না। আরে ধ্যাৎ, তোমার মুখোত খালি মরা ছাড়া আর কোন কথা নাই -আবিয়ার বাপ? তোমার মরার কথা শুনলে মোর কলিজাখান উড়ি যায়। গরিবের উপর আল্লাহ আছে আবিয়ার মাও, এতো কিছু ভাবিলে কি আর জীবন চলে? সবাকে একদিন মরির নাগবে। সেটা আজ হউক আর কাইল হউক। আচ্ছা চল্তো রজবের বাড়িত য্যায়া একনা দেখি কার কি হইল। নিস্তব্ধ রাতের গভীর অন্ধকারে নিভু নিভু কূপির আলোয় দু’জনে মিলে একপা দু’পা করে রজব আলির বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। রজব আলির বাড়িটা যতোই কাছে আসে কান্নার আওয়াজ যেন ততোই বেদনাদায়ক হয়ে কানে এসে আঘাত করে। তারা রজব আলির বাড়িতে যেয়ে দেখে তার বুকের ওপর পড়ে ছোট মেয়েটা কাঁদছে, পায়ের কাছে পড়ে মেজ ও বড় মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। পৃথিবীর সব জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে রজব আলি চিরদিনের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। যে ঘুম আর কোন নি ভাঙবে না। রজব আলির বউ কাঁদতে কাঁদতে বলে-‘আজ দু’তিন দিন থাকি লোকটার মুখোত একনা দানা পনিও পড়ে নাই, এক মুঠি চাউলও ঘরোত নাই যে সেদ্ধ করি তার মুখোত তুলি দিম। তিনকুড়ি মহাজনের বাড়িত গেনু ভিটা কোনা বন্ধক থুইয়া কয়টা টাকার জন্যে। মহাজন মোক কয়-‘তুই কি দিয়া টাকা শোধ দিবু সালেহা ? বাড়ির ভিটাত কি আবাদ করা যায়, ওখান বন্ধক নিয়া মুই কি করিম। এমন ম্যাল্লা কথা কয়া মোক খালি হাতে বিদায় করি দেইল। এমনিতে কয়দিন থাকি মরণ জ্বর কমে না, তার উপর অনাহারি দেহা আর কয়দিন বাঁচে। ডিমপারা মুরগীটা ব্যাচে ক’টা টাকা দিয়া বড় ছওয়াটাক ধাপড়ার হাটোত অষুধ আনির জন্য পাঠে দিনু কিন্তু ডেকুয়া মরার বাচ্চাগুলা মোর ছওয়াটাক যাবারে দেয় নাই, বর্ডার থাকি ফিরি দিছে। অনাহারে, বিনা অষুধে, বিনা চিকিৎসায় মানুষটা মরি গেইল। কুলসুম চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে-তোর এই দশা তো একবার মোক কইস নাই ক্যান সাহেরা? নাই তা নাই ঘরোত খাবার, নিজে না খ্যায়াতো তাক দিবার পানু হয়? সাহেরা কুলসুমের গলা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে-বুবু আইজ থাকি এই অবুঝ ছওয়া দুইটাক ধরি মুই কি করিম, মোর যে সব শ্যাষ হয়া গ্যালো বুবু। লোকটা মোক এমন করি ছাড়ি যাবে, আগত জানিবার পাইলে মুই গলাত ফাঁস টাঙ্গি মরিনু হয়। আল্লায় মোক যে ক্যান আগে নিয়া গেইল না? অভাগিনী সাহেরার হৃদয় বিদারক কান্নায় মধ্যরাতের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। আশে পাশের বাড়ি থেকে সবাই ছুটে আসে আর সাহেরা কে সান্তনা দেয়। নূরল মুন্সি সাহেরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে-কাঁদে না বোন, জীবন মরণের মালিক আল্লাহ। তার বান্দাকে সে নিয়ে গেছে এখানে আমাদের কারও কিছু করার নেই। একদিন আমরা কেউ থাকব না সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে শুধু দু’দিন আগে আর পিছে। তুমি যত কাঁদবে, কবরে তার আজাব ততবেশী হবে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তুমি তার জন্য দোয়া কর। আল্লাহ যেন তাকে মাফ করে দেয়, বেহেস্তবাসী করে। একাব্বর আলি, তার একেবাকে নিকটতম প্রতিবেশী, বলা চলে একই উঠোন তাদের। সে বলে উঠল- আহা! রজব আলির মতো সহজ সরল লোক এই গ্রামে আর একটাও নাই। ব্যাচারা একেবারে মাটির মানুষ ছিল। আল্লাহ যে ভালো লোকগুলাক ক্যান দুনিয়া থাকি তুলি নিবার নাগচে, তায় ভালো জানে। সারা জীবন এক সাথে থাকি কোন দিন তাক একনা রাগ হবার দেখি নাই। কাও কোনদিন কবার পাবে না যে, রজব আলির সাথে তার ঝগড়া হইচে। আব্দুল্লাহ কুলসুমকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সেখানে রাত পোহাবার জন্য অপেক্ষা করে। রাত আর বেশি বাকি নেই, পূর্বাকাশে শুকতারা দেখা যাচ্ছে হয়ত কিছুক্ষলের মধ্যে মসজিদে ফজরের আজান পড়ে যাবে। আব্দুল্লাহ উপস্থিত দু’চারজন মুরুব্বী গোছের মানুষকে পাশে ডেকে বলে যে, বেচারা তো জন্মের গরিব ছিল, একরকম না খ্যায়া মরি গ্যালো। এটেকোনা তার ভাই-বোন, আত্মিীয় স্বজন কাঁও নাই। লাস দাফনের ব্যবস্থা হামাকে করা নাগবে। সকাল হতে না হতেই রজব আলির মৃত্যুর সংবাদ শুনে শামছুল মাস্টার, মুনাজাত উদ্দিন সাংবাদিক ও আরো কয়েকজন মিলে তার বাড়িতে আসে। আব্দুল্লাহ, শামছুল মাস্টারকে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে সবার বসার ব্যবস্থা করে দেয়। শামছুল মাস্টার চেয়ারে বসে বলে- আব্দুল্লাহ রজব আলি কি ভাবে মারা গেল? কি হয়েছিল তার? আব্দুল্লাহ বলে-স্যার রজব আলির বউ কয় যে, কয়দিন থাকি ওর নাকি বুকোত বিষ আর জ্বরও সারে নাই। নগেন কবিরাজ, গাছ-গাছরা দিয়া ওষুধ বানে তার চিকিৎসা করছিল। তাছাড়া অভাবের সংসার দুই-তিন দিন থাকি তার ঘরে খাবারও ছিল না। না খ্যায়া আর বিনা চিকিৎসা লোকটা মরি গেইল। রজব আলির অকাল মৃত্যুটা শামছুল মাস্টারকে খুব কষ্ট দিল। তার মতো জোয়ান মানুষ যদি অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, তাহলে অবোধ শিশু আর বৃদ্ধ মানুষগুলোর কি হবে? এটা রীতিমত দুর্যোগের লক্ষণ। আব্দুল্লাহ বলে স্যার- মুর্দাটাকে কেমন করে দাফন করি? দাফনের কাপড় কোন্টেকোনা পাই । কাপড় ছাড়া কেমন করি কবর দেই? ধাপড়া-মেখলীগঞ্জে তো একটা দুধের ছওয়াকেও যাবার দেয় না। চুপ-চাপ করি কাঁও গেইলে তাক ধরি মার-ধর করে, কান ধরি উঠ-বইস করায়। তায় যেন আর ভারতে পা না দেয়। মাস্টার সাহেব সবার উদ্দেশ্যে বলেন- ভাই আপনারা শোনেন, আমরা সবাই এখন একটা চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। এখন যে অবস্থা চলছে আগামী দু’চার মাসেও এর চেয়ে ভালো কিছু আশা কারা যায় না, বরং দিন-দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। কাজেই রজব আলি গরির বলে নয়, এ মূহুর্তে আমি যদি মারা যাই, আমাকেও পুরাতন কাপড়ে দাফন করতে হবে। শুধু পুরাতন কাঁপড় কেন প্রয়োজনে কলাপাতা দিয়ে হলেও প্রিয়জনদের লাস দাফন করার মন মানষিকতা আমাদের তৈরি করতে হবে। সামনের আরও ভয়াবহ দিন আসছে। শুধু রজব আলি কেন, আরও যে কতো রজব আলিকে এভাবে অর্ধাহারে, অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করতে হবে সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের লোকেরা, ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীকে এখন তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ও প্রধান শত্রæ বলে মনে করে। কাজেই খুব সহজে এটার কোন মিমাংসা হবে বলে মনে হয় না। আমাদের খুব সাবধানে চলতে হবে তারা যেখানে, যেভাবে, যে অবস্থায় আমাদের পাক না কেন হেনাস্তা করতে ছাড়বে না। কারণ তাদের কোন চক্ষু লজ্জা নেই। শামসুল মাস্টারের কথা শুনে রহমত আলি হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলে- হামরাগুলা এমন হতভাগা হয়া জন্মেছি যে, মরার পর একটুকড়া নয়া কাপড়ও হামার কপালোত জোটে না। কুত্তা বিড়ালের চেয়েও অধম হামরা। হামারগুলাক ক্যানে যে আল্লাহ মানুষ বানে দুনিয়ায় পাঠাইল। একাব্বর আলি বলে- আহারে! কি হতভাগা রজব আলি। মরার পরে একনা নয়া কাপড়ও তার ভাগ্যে জুটিল না। জোহরের নামাজের পর রজব আলির লাস দাফন কার্য সম্পন্ন হলে আব্দুল্লাহ বাড়িতে আসে। সকালেও কিছু মুখে দেয়া হয় নাই ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেট চোঁ-চোঁ করছে। আব্দুল্লাহ কুলসুমকে বলে- বউ, তাড়াতাড়ি একটা কিছু খাইতে দে, প্যাটের ভোকে আর বাঁচি না। গাও দিয়া খালি গরম পানি বের হবার নাগছে। আবিয়ার বাপ? তোমরা টপ করি গাও খানোত দুই বালতি পানি ঢালি দিয়া আইস, ভাত বাড়ানো আছে। রজব আলির বাড়িতে উপস্থি হয়ে তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে মুনাজাত উদ্দিন সাংবাদিক যেন আর এ জগতে নেই। তার দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রæ গড়িয়ে পড়ছে। মানুষের চলমান জীবন যাপনে তারা যে কতোটা অসহায় ও নিরুপায় সেটা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীকে না দেখলে কেউ জানতে পারবে না, বুঝতে পারবে না। শামসুল মাস্টার বলে -ভারতের অমিমাংশিত তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে বেশ তোড়জোড় আলোচনা চলছে। ঘুরে-ফিরে এর প্রভাব পড়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের উপর। এখানকার মানুষ ধাপড়া-মেখলীগঞ্জবাসীর চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। তারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার সাথে সব ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে ফেলেছে। তবে সবাই এমন নয় ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের মর্যাদায় যারা কৃতজ্ঞ, যারা পূর্ব হতেই পরস্পরের বন্ধনে সিক্ত, প্রেম-প্রিতি, ¯েœহ-মমতা, ভালোবাসায় যাদের হৃদয় পরিপূর্ণ, যারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতারবাসীর কষ্টে বিচলিত কেবল তারাই তাদেরকে সহায়তা করে। দুঃখের দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। চুপি চুপি তাদেরকে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রি এনে দেয়। প্রয়োজনে দু’একজনকে ভারতে যাতায়াতের সুযোগ করে দেয়। “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার একটি ছোট বাচ্চাকেও আর ভারতের মাটিতে পা রাখতে দিচ্ছে না। যে কোন দিন তারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার উপর হামলা করবে। তারা বলেছে- যে কোন কিছুর বিনিময়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতাকে দখল করে নেবে। তাড়িয়ে দেবে এখানকার মুসলমানদের। তারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার মাটি চয়, মানুষ নয়। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো, এখানকার হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে। মুসলমাদেরকে ধাপড়া-মেখলীগঞ্জে উঠতে না দিলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানে অবাধে যাতায়াত করছে। তাদের ভারতে যেতে কোন বাধা নেই। ছাবের আলীর কাছে এসব ঘটনা শোনার পর সবকিছু যেন স্থবির হয়ে যায় মোনাজাত সাংবাদিক। তিনি ছাবের আলিকে জিজ্ঞাসা করেন যে- তুমি কার কাছে এসব কথা শুনলে? গতকাল ছিলো শনিবার, ধাপড়ারহাটে প্রতি শনিবার ও বুধবার সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, ধান, চাল, পাটসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য এ হাটবারে বেঁচা কেনা হয়। তাই ডাহাগ্রামের অধিকাংশ মানুষ ধাপড়ারহাটে এ সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য বিক্রি করার জন্য নিয়ে যায়। কিন্তু গতকাল কাউকেও হাটে যেতে দেয়া হয় নি। শামসুল মাস্টার বলে-ছাবের আলি, ভালো করে সংবাদটা নাওতো? ভারতের বি,এস,এফ যেতে দেয়নি, নাকি সাধারণ জনগণ? স্যার, আমি নারায়ণের কাছে শুনেছি- সকাল বেলা মাছ বিক্রি করার জন্য কয়েকজন গরিব মানুষ ধাপড়ার হাটে যায়। এদের মধ্যে পূর্বপাড়ার রহমানও ছিল। হঠাৎ করে কয়েকজন উশৃঙ্খল যুবক এসে নাকি তার মাছগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে মার-ধোর করে। বি.এস.এফ এসে তাকে সেখান থেকে নিয়ে যায় তারপর গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্য়ন্ত বি.এস.এফ ডাহাগ্রামবাসীকে হাটে যেতে নিষেধ করে। ছাবের আলি, তুমি গ্রামের সবাইকে খবর দাও তারা যেন বিকেলে স্কুল মাঠে আসে, জরুরি কথা বলতে হবে তাদের সাথে। দিনের আলো ক্রমশঃ কমিয়ে আসছে সেই সাথে সূর্যটাও পñিম দিকে হেলে পড়েছে। এখন ভয়! শুধু অন্ধধকার রাতের ভয়। গোটা গ্রাম জুড়ে ভয়, একটা অজানা আতঙ্ক গ্রামবাসীর মনে, রাত হলেই বুঝি আক্রমন করবে শত্রæরা। নিরিহ গ্রামবাসী পা বাঁধা মুরগীর মতো ছটফট করছে। তাদের পালানোর জায়গা নেই, আশ্রয় নেয়ার মতো কোন নিরাপদ স্থান নেই। ঘরে ঘরে অসহায় নারী শিশুদের কান্নার রোল ওঠে।পেটের তাগিদে, জীবন বাঁচার জন্য ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অনেক গরিব মানুষ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ-কর্ম করে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাসীকে অবরুদ্ধ করে, আটকে রেখে তাদের উপর যে অমানসিক অত্যাচার, নির্যাতন চালানো হচ্ছে সেটা অনেক দুরে থেকে কেউ জানেনা। তাই দু’চার হাজার টাকা রোজগার করে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় মজিদ-জরিনা দম্পতি। অনেক দুরের পথ, তাই সন্ধ্যা গড়িয়ে একটু রাতের আঁধার নেমে আসে। বাস থেকে নেমে তারা সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। রাস্তায় কোন পরিচিত গ্রামবাসীকে না দেখে মজিদের একটু সন্দেহ হয়। মজিদ মনে মনে ভাবে তাহলে গ্রামে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি তো? মজিদ, জরিনাকে বলে- তুমি গ্রামে কোন দুর্ঘটনা, কিংবা অন্যকোন দুঃসংবাদ কি পেয়েছ? কই, নাতো? হঠাৎ তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন? আরে না, তেমন কিছু না তবে গোটা রাস্তা জুড়ে একটিও গ্রামের লোকের দেখা পেলাম না, কেমন নীরবতা চারিদিকে তাই মনে হলো। সেটা আমি সঙ্গে আছি জন্যই তোমার মনে হলো, আর হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, যা দিনকাল পড়েছে। যাক আমরা কাছা-কাছি এসে পড়েছি একটু জোরে পা বাড়াও, এই ফাঁকা জায়গাটা পারহলেই আমাদের গ্রাম। আর অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে আমরা বাড়ি পৌছে ...... কথাটা বলাই শেষ হয়নি মজিদের, এমন সময় তিন- চারজন যুবক এসে পিছন থেকে মজিদের পথ রোধকরে তাকে ধরে ফেলে। কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। তাদের দু’জন জরিনাকে ধরে টানা হ্যঁচড়া শুরু করে। জরিনার শরীর বেশ তাগড়া, যেমন উচা-লম্বা, তেমনি নাদুস-নুদুস দেহের গঠন। দু’জন ছেলেকে সে ধাক্কামেরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু সামনের দু’জন ছেলে তাকে আজগুবি ধরে ফেলে তার পরনের শাড়ি ধরে টানাটনি শুরু করে। ঘোর অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও তারার আলোয় মজিদের চোখ গুলো যেন জ্বল-জ্বল করে ওঠে। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে কেউ নির্যাতন করবে আর স্বামী হয়ে সে অপদার্থের মতো চুপকরে বসে থাকবে এমন মানুষ বোধয় পৃথিবীতে একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মজিদ তার শরীরের যত শক্তি আছে সবটুকু দিয়ে তাদের সাথে লড়াই করে। মানুষের ভিতরের অন্তর্নিহিত শক্তি যখন জাগ্রত হয়, তখন মৃত্যুর ভয়ও আর তাকে কাবু করতে পারে না। মজিদও যেন রোস্তম পালোয়ান হয়ে ওঠে। শত্রæদের একনকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার হাত থেকে একটা লাঠি কেড়ে নিয়ে একহাতে লাঠিটা চারিদিকে ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে যায় আর জরিনাকে ডাকে। হঠাত একটা কান্নার শব্দ তার কানে আসে, বাঘের মত একটা হুঙ্কার দিয়ে সে এগিয়ে যায় সামনেরদিকে। তার হুঙ্কারে শব্দে যেন বনের বৃক্ষ, লতাপাতা কেঁপে ওঠে। লম্পট ছেলেরা জরিনাকে ছেড়ে দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে আর অমনি সে পিছে ধাওয়া করে বেধক পেটাতে থাকে। সঙ্গী সাথিরা নিজের জীবন নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেও একজন জমির আইলে পা লেগে মাটিতে পড়ে যায়। অমনি মজিত মনের জ্বালা মেটাতে সেই লম্পটকে মারতে থাকে, মজিদের মারে সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে আর এক মুহুর্ত সেখানে দেরি না করে মজিদ জরিনাকে নিয়ে সোজা দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। জরিনার মুখে সবাই শুনতে চায়, আসলে সেখানে কি ঘটেছিল। জরিনা বলে, ‘বুঝতে পারিনি, কি থেকে কি হয়ে গেল’। কার কাছে সে নিজের সত্য কথাটা বলতে পারে না। এটা জানা-জানি হয়ে গেলে লোকজন সুযোগ পেলে নানা রকম খারাপ কথা বলবে। সারা জীবন তাকে সমাজের কাছে মাথা নিচু করে থাকতে হবে। সেখানে কি ঘটেছে তার স্বামীও জানে না। একমাত্র সে আর তার আল্লাহ জানে। অপ্রীতিকর ঘটনাটি গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সবাই চলে আসে বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে। সেখানে সমবেত হয়ে সবাই ভাবে বিষয়টি আরও জঠিলতার দিকে নিয়ে যাবে। কোন ভাবে ই এর সমাধান তড়িঘড়ি করে চাওয়া সম্ভব নয়। আব্দার চৌকিদার বলে-গতকাল তারা আব্দুল্লাহ ও সহিরকে মেরেছে, আজ মারল মজিদকে নির্যাতন করল তার বউকে। এভাবে প্রতিদিন কেউ না কেউ মার খাচ্ছে তাদের হাতে। কবে এর সুরাহা হবে তার কোন হদিশ নেই। মাস্টার সাহেব বলেন- আব্দুল্লাহ, মজিদ ও সহিরকে এখানে খুব দরকার। তাদের নিজেদের মুখ থেকে শুনতে হবে আসল ঘটনাটা কি, কি কারণে কোন দোষে তাদেরকে মারা হলো। ছাবের আলি ও মোকছেদকে তাদেরকে ডেকে আনার জন্য। ভালো, তবে এভাবে আর কতদিন চলবে? একমাত্র আল্লাহই জানেন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now