বিশ্বাসের ফাঁদ
X
বিশ্বাসের ফাঁদ
— মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। শহর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতার গভীরে ডুবে যাচ্ছে। দূরে কোথাও কোনো মোটরসাইকেলের ক্ষীণ শব্দ, অথবা বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো পাতার খসখস—এর বাইরে আর কোনো সাড়া নেই। এই সময়টুকুই আরিফের সবচেয়ে প্রিয়। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে এ যেন তার নিজের জন্য রেখে দেওয়া এক নিঃশব্দ পরিসর—যেখানে সে ভাবতে পারে, নিজের ভিতরটা গুছিয়ে নিতে পারে।
সে একটি বহুজাতিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। তার প্রতিদিনের জীবন কেটে যায় কোড, রিপোর্ট, সার্ভার আপডেট আর ডেটা বিশ্লেষণের ঘূর্ণিতে। মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে মেশিনের সঙ্গে তার কথোপকথন বেশি। ই-মেইল, মিটিং, নির্দেশ, প্রেজেন্টেশন—সব মিলিয়ে তার দিনগুলো যেন এক নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল গোলকধাঁধা।
সেদিনও সারাদিন ধরে চলেছে টানা মিটিং। সন্ধ্যা নাগাদ মাথা ভার হয়ে আসে, কিন্তু ফাইল জমা না দিয়ে সে ঘরে ফেরে না। অবশেষে রাত দশটার দিকে অফিস থেকে বের হয়। ট্রাফিক তখনও গুমোট। বাসায় ফিরে কফির কাপে চুমুক দিয়ে ভাবে—আজ অন্তত কিছুটা শান্তি পাবে।
কিন্তু শান্তি আসেনি। হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি ই-মেইল:
“Microsoft Security Alert: Your account will be suspended within 24 hours!”
আরিফের বুক ধক করে উঠল। প্রথমে ভাবল, হয়তো ভুল করে এসেছে। কিন্তু নিচের লেখাগুলো পড়তেই তার ভ্রূ কুঁচকে গেল—
“Due to suspicious activity, your account has been temporarily locked. Please verify to avoid permanent suspension.”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অফিসের প্রজেক্ট, ক্লায়েন্টের ফাইল, সার্ভারের অ্যাক্সেস—সবই তো ওই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত! এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সে ক্লিক করল লিংকে।
একটি ওয়েবসাইট খুলল—ঠিক যেন মাইক্রোসফটের আসল সাইট। নীল ব্যাকগ্রাউন্ড, পরিচিত লোগো, নিচে লেখা “© Microsoft Corporation 2025।” এত নিখুঁত কপি যে সন্দেহের বিন্দুমাত্র জায়গা নেই।
“অফিসিয়ালই তো মনে হচ্ছে,” মনে মনে বলে উঠল আরিফ।
তারপর টাইপ করল নিজের অফিস ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড। কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল বার্তা—
“Thank you for verifying your account.”
আরিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বিপদ কেটে গেছে ভেবে কফির শেষ চুমুকটা নিল। ল্যাপটপ বন্ধ করল, আর নরম বিছানায় শরীরটা গাঢ় ক্লান্তিতে মিশিয়ে দিল।
কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, কোনো অন্ধকার ঘরে, তার বিশ্বাসের অক্ষরে লেখা পাসওয়ার্ডটি তখন পৌঁছে গেছে এক অচেনা প্রতারকের হাতে।
________________________________________
সকালের আলো ফুটতেই অফিসে ঢোকার পর রুবায়েত বলল, “দোস্ত, সার্ভারটা আজ অদ্ভুত আচরণ করছে। লগ ফাইলটা চেক কর।”
আরিফ চেয়ারে বসে দ্রুত লগইন করল। মুহূর্তেই তার চোখ বড় হয়ে গেল—তার আইডি থেকে শতাধিক ফাইল ডাউনলোড হয়েছে রাতের বেলায়! কিছু ক্লায়েন্ট সার্ভারে, কিছু অজানা লোকেশনে আপলোড।
তার মাথা ঝিমঝিম করছে। ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল পুরো অফিসে। ম্যানেজার ডেকে পাঠালেন। মুখ কঠোর, গলায় তীক্ষ্ণ সুর—
“আরিফ, এই কাজটা কীভাবে ঘটল?”
সে নির্বাক। কিছুই বলতে পারে না। কেবল নীরবে বসে থাকে—যেন অপরাধী নয়, এক ভুল বিশ্বাসের শিকার। আইটি টিম এসে তার কম্পিউটার জব্দ করল, লগ ট্রেসিং শুরু হলো।
দুপুরে ভারী মন নিয়ে বাড়ি ফিরল সে। দরজা খুলতেই মা উদ্বিগ্ন চোখে তাকালেন,
“বাবা, কেউ ফোন করে বলল তোমার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে! কী হয়েছে বলো তো?”
আরিফ কিছু বলল না। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, আলো-অন্ধকারে ঝিকমিক করছে পানির ফোঁটা। মনে হলো, এই নিস্তব্ধতার ভেতর কোথাও তার বিশ্বাসের ভাঙা টুকরোগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সে বুঝল—ভুলটা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি ছিল বিশ্বাসের ভুল। “Microsoft” নামটা দেখেই সে বিশ্বাস করেছিল। অথচ আধুনিক দুনিয়ায় বিশ্বাসই এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁদ—যেখানে প্রতারণা ঢুকে পড়ে পরিচিত লোগোর ছায়ায়।
তদন্ত শেষে অফিস জানতে পারল, এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত “ফিশিং ক্যাম্পেইন।” শতাধিক কর্মীর ইনবক্সে একই মেইল গিয়েছিল। সবাই উপেক্ষা করেছিল, কেবল সে-ই ফাঁদে পা দিয়েছিল। কোম্পানি কিছু ক্ষতির মুখে পড়ে, তবে ব্যাকআপ থাকায় বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়।
তবু কিছু একটা ভেঙে যায় আরিফের ভেতরে। রাতে ঘুম আসে না। ফোনের নোটিফিকেশন বাজলেই বুক ধক করে ওঠে। কোনো নতুন ই-মেইল এলেই হাত কেঁপে যায়। বিশ্বাস যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কে রূপ নিয়েছে।
সে ভাবতে থাকে—প্রযুক্তি মানুষকে কতটা একাকী করে দিয়েছে! আগে অপরিচিত চিঠি আসত হাতে, এখন আসে স্ক্রিনে; আগে প্রতারণা হতো কথায়, এখন হয় ক্লিকে। আর সেই ক্লিকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আস্থার ফাঁদ।
এক সন্ধ্যায়, দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি শেষে নদীর ধারে গিয়ে বসে সে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, বাতাসে পাতার গন্ধ মিশে এক বিষণ্নতা ছড়িয়েছে। ঠিক তখনই ফোনে নোটিফিকেশন এল—
“Your password has been changed successfully.”
আরিফের বুক ধক করে উঠল। আঙুল কাঁপছে, চোখ স্থির স্ক্রিনে। আবারও কি ফাঁদ? আবারও কি ভুল?
কিন্তু এবার সে তাড়াহুড়ো করল না। ধীরে ধীরে শ্বাস নিল, তারপর ফোন করে অফিসের আইটি ডিপার্টমেন্টে জানাল। ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—
“চিন্তা করবেন না, মি. আরিফ। এটি আমাদের নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট। সব ঠিক আছে।”
আরিফ কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর নিঃশব্দে বলল,
“ধন্যবাদ... এবার যাচাই করেই বিশ্বাস করলাম।”
________________________________________
সে জানে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, প্রতারণার মূল থাকে মানুষের ভেতরে—বিশ্বাসের দুর্বলতায়। ফিশিং আসলে কোনো সফটওয়্যার নয়, এটি এক মনস্তাত্ত্বিক জাল, যেখানে লোভ বা ভয়কে ব্যবহার করে মানুষকে নিজের হাতে ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়।
আরিফ এখন বুঝতে শিখেছে—ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তা শুধু ফায়ারওয়াল বা অ্যান্টিভাইরাসে নয়, বরং সচেতনতায়।
বিশ্বাস করতে হয়, কিন্তু যাচাই করে।
কারণ প্রতিটি ই-মেইল, প্রতিটি নোটিফিকেশন—হয়তো হতে পারে এক নতুন “বিশ্বাসের ফাঁদ।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now