বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সূর্য ওঠার আগে ভোরের হালকা কুয়াশা ভেদ করে গ্রামের সরু মেঠোপথ ধরে হাঁটছেন মাষ্টার লুৎফর রহমান। হাতে পুরনো এক ব্যাগ, তাতে বই–খাতা, চক, ডাস্টার আর কয়েকটা চকলেট। গ্রামের মানুষ মজা করে বলে— “এই হলো পাঠশালার পাগল মাষ্টার!” কারণ, লুৎফর মাষ্টার এখনো বিশ্বাস করেন— গ্রামের প্রতিটি শিশুর চোখে লুকিয়ে আছে এক একটি আলোর প্রদীপ, যা জ্বালালে গ্রাম আলোকিত হবে, দেশ আলোকিত হবে।
চান্দপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর ছোট্ট স্কুল— “বাতাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।” নাম শুনলেই বোঝা যায়, গ্রামটা যেন বাতাসে ভাসে, বিদ্যুতের লাইন আসে যায়, কাঁচা রাস্তা বর্ষায় কাদা আর শুকনো মৌসুমে ধুলায় ভরে থাকে। এখানে স্কুলে নিয়মিত উপস্থিত থাকা যেন দুঃসাহসের কাজ। বাচ্চারা স্কুলের চেয়ে বেশি ভালোবাসে মাঠ, গাছ, নদী আর মোবাইলের স্ক্রিন। তবু লুৎফর মাষ্টার হাল ছাড়েন না। তিনি জানেন, আজ যারা স্কুলে আসে না, কাল তারাই হয়তো একটা বইয়ের পাতায় জীবন বদলে দিতে পারে।
একদিন সকালে তিনি স্কুলে গিয়ে দেখলেন— পুরো ক্লাসে পাঁচজন মাত্র ছাত্র! বাকিরা কোথায়? রাহাত নাকি মেলায় গেছে, শিপন নাকি ভিডিও বানাতে ব্যস্ত, সোনাই গরু চরাতে গেছে, রুবেল মাছ ধরতে গেছে। সহকারী শিক্ষক হাসতে হাসতে বললেন, “স্যার, আজ শুক্রবারের আগের দিন, ওরা ভাবে আজ আসলে কাল তো ছুটি!” লুৎফর মাষ্টার চুপচাপ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে ঝিরিঝিরি বাতাসে কাশফুল দোল খাচ্ছে। তিনি ভাবলেন—এই গ্রামের হাওয়ায় যদি একটু পড়াশোনার গন্ধ মিশে যেত!
পরের দিন থেকে তিনি এক অদ্ভুত পরিকল্পনা করলেন। যেদিন ক্লাসে ছাত্ররা আসে না, সেদিন তিনি নিজেই হাজির হন তাদের ঘরে। কেউ মাঠে কাজ করছে, কেউ নদীর ঘাটে বসে টিকটক বানাচ্ছে—মাষ্টারমশাই হেসে হেসে কাছে যান। “আরে বাবা রাহাত, আজ তো আমরা ভূগোলের দেশ ঘুরছিলাম! তুমি না থাকায় আমেরিকার নদীগুলা কাঁদছিল।” শিশুরা প্রথমে হা করে তাকায়, তারপর হাসিতে ফেটে পড়ে। পরদিন দেখা যায়, রাহাত সত্যিই এসেছে স্কুলে—জানতে চায়, আমেরিকার নদীগুলো কেন কাঁদে!
লুৎফর মাষ্টারের ক্লাসে কোনো দিন বোরিং হয় না। কখনো তিনি ফুলের পাপড়ি দিয়ে গণিত শেখান—“দেখো, এই পাপড়িগুলা যোগ করলে কয়টা হয়?” কখনো নদীর পাড়ে বসে বলেন, “এই নদীটা কেমন করে জন্মেছে, জানো? পৃথিবীও একদিন এরকম ছিল।” ছাত্ররা চোখ বড় বড় করে শোনে। গ্রামের বাবারা প্রথমে ভাবত—“এ মাষ্টারটা পাগল বোধহয়, পড়ার মধ্যে নদী–ফুলের গল্প?” কিন্তু পরে যখন দেখে, তাদের বাচ্চারা রাত জেগে বই পড়ে, তখন সেই পাগল মাষ্টারের জন্য চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়।
একদিন স্কুলে এক বড় ঘটনা ঘটল। উপজেলা অফিসার পরিদর্শনে এলেন। সবাই ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু ক্লাসে ঢুকতেই অফিসার অবাক! কোনো ছাত্রই চুপচাপ বসে নেই। কেউ ছবি আঁকছে, কেউ নাটক করছে, কেউ গান গাইছে—“আমার সোনার বাংলা…” লুৎফর মাষ্টার দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দিলেন, “স্যার, আজ আমরা ইতিহাস পড়ছি—স্বাধীনতার ইতিহাস। তাই ওরা গল্পের মধ্যে গান গেয়ে শিখছে।” অফিসার মুগ্ধ হয়ে বললেন, “আপনার স্কুলে শৃঙ্খলা মানে আনন্দ!”
তবে সবচেয়ে বড় মোড় এলো এক শীতের সকালে। সেই দিন ছিল বার্ষিক পরীক্ষা। আগের বছর যেখানে অর্ধেক ছাত্র গায়েব ছিল, এবার ক্লাসরুম ভর্তি। সবাই আগেভাগে এসে বসেছে, হাতে কলম, চোখে প্রত্যয়ের আলো। পরীক্ষার পর রাহাত চুপচাপ এসে মাষ্টারের হাত ধরল—“স্যার, আমি পাস করতে পারব?” লুৎফর মাষ্টার হেসে বললেন, “তুই পারবি না, তুই উড়বি!” রাহাত হাসল, আর সেই হাসিতে যেন সারাটা গ্রাম আলোকিত হলো।
এক মাস পর ফলাফল প্রকাশিত হলো। আশ্চর্যের ব্যাপার—পুরো স্কুলে পাশের হার শতভাগ! শুধু তাই নয়, রাহাত ও সোনাই উপজেলা পর্যায়ে সেরা ফল করল। সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলো—“বাতাসপুরে শিক্ষার জোয়ার আনলেন লুৎফর মাষ্টার।” গ্রামে মিষ্টি বিতরণ হলো। যে বাবা একসময় বলত, “ও বড় হয়ে চাষ করবে, পড়াশোনা দিয়ে কী হবে”—সেই বাবা এখন গর্বে বলেন, “আমার ছেলে এখন টেলিভিশনে নাম উঠছে।”
লুৎফর মাষ্টার তখন চুপচাপ স্কুলের পেছনের মাঠে বসে ছিলেন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি। সহকারী শিক্ষক এসে বললেন, “স্যার, আজ তো আপনি জিতলেন।” তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “না রফিক, আমি না, জিতেছে এই গ্রামের শিশুরা। আমি তো শুধু বাতাসে একটু আগুন ছড়িয়ে দিয়েছি, ওরা নিজেরাই জ্বলে উঠেছে।”
ধীরে ধীরে বাতাসপুর বদলে গেল। এখন আর কেউ বলে না—“আজ না যাই, কাল যাই।” বরং কেউ যদি স্কুলে না আসে, বন্ধুরা যায় ডেকে আনে। মাঠের আড্ডা কমে গেছে, কিন্তু মাঠ এখনো আছে—ওখানে খেলা হয়, আবার সেখানে বসেই কবিতা লেখা হয়। রাহাতের লেখা কবিতা স্কুলের দেয়ালে টানানো আছে—
“চাষের মাটিতে বীজ যেমন বাড়ে,
তেমনি স্কুলে বড় হয় মন।
বই যদি হাতছাড়া হয় একদিন,
মরে যায় গ্রামের প্রাণ।”
এই কবিতার নিচে বড় অক্ষরে লেখা— ‘পাঠশালার পাগল মাষ্টার’–এর জন্য ভালোবাসা।
সেদিন বিকেলে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। হালকা হাওয়ায় দুলছিল স্কুলের পতাকা। লুৎফর মাষ্টার ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখো, এই আলোটা শুধু সূর্যের না—এটা তোমাদের চোখের আলো।”
তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল অদম্য বিশ্বাস—
যে বিশ্বাস বলে, গ্রামের শিশু যদি চায়, তবে আকাশও তার সীমা নয়। শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে; আর সেই নিঃশ্বাসই একদিন বদলে দেবে পুরো গ্রামের চেহারা।
বাতাসপুরের মানুষ এখনো তাঁকে “পাগল মাষ্টার” বলে ডাকে—কিন্তু এখন সেই নামেই গর্বের ছোঁয়া। কারণ, পাগল মাষ্টাররাই তো একদিন পৃথিবী বদলায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now