বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
— মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার শান্তিপ্রিয় এক গ্রাম, নাম শাহাবৃদ্ধি। গ্রামটা এমন শান্ত যে, এখানে মোরগ ডাকলেও পাশের বাড়ির লোক সালাম দিয়ে বলে, “ওহে ভাই, কেমন আছো?” সেই গ্রামে হঠাৎ একদিন এমন এক নাটক শুরু হলো, যার নামই রাখা যায় — “মিথ্যার মামলার মহড়া”।
ঘটনার নায়ক-নায়িকা দুইজন — হাশেম আলী আর তার চিরশত্রু কালা রফিক। শত্রু বললে একটু কম বলা হয়; এরা একে অপরের ছায়াও সহ্য করতে পারে না। কারণ? একবছর আগে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে হাশেম আলী প্রার্থী হয়েছিলেন, আর রফিক ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটে হাশেম হেরে যায়, কিন্তু তার ভেতরের রাজনীতিক মনটা হারে না। তিনি ঠিক করলেন, প্রতিশোধ নেবেন— আইনপথে, মানে মিথ্যার পথে।
এক সকালে হাশেম থানায় গিয়ে আবেদন করলেন,
“স্যার, কালা রফিক আমার দুইটা গরু চুরি করেছে। চোখে দেখেছি।”
ডিউটি অফিসার বললেন, “চোখে দেখেছেন?”
হাশেম গম্ভীর হয়ে বললেন, “চোখে দেখেছি মানে, আমার মনের চোখে দেখেছি।”
এমন “মনের চোখে” দেখার মামলা থানার লোকজনেরও প্রথম অভিজ্ঞতা। পুলিশ অফিসার খানিক থেমে বললেন, “ঠিক আছে, মামলা নিলাম, তবে একটু প্রমাণ আনেন।”
প্রমাণ হিসেবে হাশেম নিয়ে এলেন এক আশ্চর্য জিনিস— একখানা গরুর ঘণ্টা! বললেন, “স্যার, এই ঘণ্টা আমার গরুর গলায় ছিল, কালা রফিকের উঠোনে পেয়েছি।”
পুলিশ কনস্টেবল হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলল, “ঘণ্টাটা তো Made in China, ভাই!”
তারপরও মামলা হলো। কালা রফিক তখন বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লো, “আমি গরু চুরি করলাম! আমার নিজের ঘরেই তো তিনটা গরু, তার মধ্যে একটার নামই ‘হাশেমা’!”
গ্রামের মানুষ মজা পেয়ে গেল। হাটে-বাজারে সবাই বলাবলি শুরু করলো—
“এই মামলায় যদি হাশেম জেতে, তবে পরের বার আমরাও মনের চোখে যা দেখি, সেটাই বলবো।”
মামলা চলতে লাগল, ঠিক যেন নাটক চলছে। একদিন আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে হাশেমের মুখোমুখি হলো কালা রফিক। বিচারক ছিলেন খুবই শান্ত-স্বভাবের মানুষ, নাম বিচারপতি বেলায়েত হোসেন। তিনি নাকের চশমা নামিয়ে বললেন,
“হাশেম আলী, আপনি বলেছিলেন, চোখে দেখেছেন গরু চুরি হতে?”
“জ্বি স্যার, মনের চোখে।”
“আপনার এই ‘মনের চোখ’ কি কখনো ভুল করে?”
“না স্যার, খুব ধারালো চোখ।”
বিচারক একটু হেসে বললেন, “তাহলে ওই চোখটা একবার আমাকে ধার দেন তো, আমারও কিছু মিথ্যা মামলার সত্যি দেখতে হবে।”
আদালতজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। তবে হাশেমের মুখে কোন হাসি নেই। তিনি মনে মনে ভাবছেন— “এরা হাসছে, কিন্তু শেষে আমিই হাশেম হইব!”
তারপর এল সাক্ষীর পালা। প্রথম সাক্ষী হাজি করিম, যিনি গ্রামের জনপ্রিয় মানুষ এবং ‘গরু বিশেষজ্ঞ’ বলে পরিচিত। বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কি কিছু দেখেছেন?”
“জ্বি না, কিন্তু শুনেছি।”
“কাদের কাছ থেকে শুনেছেন?”
“যাদের কাছ থেকে শুনেছি, তারাও শুনেছে।”
বিচারক মাথায় হাত দিলেন। এমন ‘শ্রুতিমধুর’ সাক্ষ্য জীবনে শুনেননি। কিন্তু এখানেই থামলেন না। দ্বিতীয় সাক্ষী এলেন এক বালক, নাম রমজান, বয়স ১২ বছর। সে আদালতে এসে গম্ভীর মুখে বলল,
“স্যার, আমি দেখেছি কালা রফিক গরু নিয়ে যাচ্ছিল।”
বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, “কখন?”
“রাত বারোটায়।”
“তুমি তখন কোথায় ছিলে?”
“আমি তখনও জেগে ছিলাম, টিকটক দেখছিলাম।”
আদালত আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। বিচারক এবার বললেন, “তুমি কি জানো, মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে সাত বছর জেল হতে পারে?”
রমজান তৎক্ষণাৎ বলল, “স্যার, তাহলে আমি ঘুমাইতেছিলাম।”
এবার বিচারক বললেন, “মামলাটা মনে হচ্ছে মনের চোখে বেশি আর বাস্তব চোখে কম।” তারপর তিনি নিজের রায় ঘোষণা করলেন —
“এই মামলাটি ভিত্তিহীন, হয়রানিমূলক এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টিকারী। সুতরাং দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বাদী হাশেম আলীকে দুই মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হলো।”
পুরো আদালত স্তব্ধ। তারপর পেছন থেকে কালা রফিকের দুষ্টুমি ভরা হাসি—
“স্যার, জরিমানার রসিদ আমি কপি করে রাখবো, ভবিষ্যতে যদি মনের চোখ আবার খোলে।”
হাশেম জেলে গেল, কিন্তু গ্রামজুড়ে সে এখন এক রকমের সেলিব্রিটি। সবাই বলে, “হাশেম ভাই, আপনি তো ইতিহাস গড়ছেন— মনের চোখে মামলা!”
জেলে বসেই হাশেম বুঝল, মিথ্যা মামলার পরিণাম সত্যিই ভয়াবহ। কিন্তু তার ভেতরে থাকা হাস্যরসিক মনটা মরে নাই। জেলের ভেতরে সে লিখে ফেলল এক কবিতা—
“মনের চোখে গরু দেখিলাম,
বিচারকের চোখে শাস্তি পেলাম।
মিথ্যা সাক্ষীর টিকটক হইল ধরা,
সত্যের পথে ফিরিলাম সারা।”
কবিতাটা জেলে পড়ে সবাই হাসল, কেউ কেউ আবার বলল, “এই মানুষটার জেলে নয়, থিয়েটারে থাকা উচিত।”
কয়েক মাস পর হাশেম মুক্তি পেল। জেল থেকে বের হয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল— এখন থেকে সে সত্য বলবে, আর মিথ্যা মামলার বদলে সত্য গল্প লিখবে। নাম রাখবে “মনের চোখের সত্য”।
একদিন কালা রফিকের সঙ্গে দেখা হলো হাটে। দুইজন মুখোমুখি। সবাই ভাবল, এখন হয়তো যুদ্ধ লেগে যাবে। কিন্তু না— হাশেম গম্ভীর মুখে বলল,
“রফিক ভাই, আপনার জন্য দোয়া করি। আমার মনের চোখ এখন চিকিৎসাধীন।”
রফিক হেসে বলল, “আমার বাস্তব চোখও তাই, চোখের ডাক্তার বলছে— মনের চোখে যা দেখো, সেটা না বলাই ভালো!”
গ্রামজুড়ে হাসির ঝড় বয়ে গেল। তারপর থেকে গ্রামের মানুষদের মধ্যে একটা নতুন প্রবাদ চালু হলো—
“যে মনের চোখে মামলা করে, সে জেলের ঘরেই চা খায়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now