বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
**পাতার রাজ্যে রঙিন সকাল**
*— মোহাম্মদ শাহজামান শুভ*
স্কুলের সকালটা আজ অন্য দিনের মতো ছিল না। প্রভাতের আলো জানালার ফাঁক গলে শ্রেণিকক্ষের টেবিলগুলোয় পড়ছিল, যেন রোদও আজ শিশুদের সঙ্গে খেলতে এসেছে। বাতাসে হালকা শিউলি ফুলের ঘ্রাণ, দূরে কাকের ডাকের সাথে মিশে আছে ছোট ছোট পায়ের দৌড়ঝাঁপের শব্দ। আজ “পাতার তৈরি সৃজনশীল সৃষ্টি” দিন।
সকালে আমি যখন স্কুলে ঢুকলাম, দেখলাম স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে আছে শিশুদের একটি দল। কারো হাতে আমপাতা, কারো হাতে সোনালু ফুলের হলুদ পাতার গুচ্ছ, কেউবা কাঁঠালপাতা বুকে জড়িয়ে হাসছে। ছোট্ট ফারিহা তার বন্ধুদের বলছে,
— “দেখো স্যার বলেছেন পাতা দিয়েই আজ আমরা ছবি আঁকব!”
আমি হাসলাম। এই হাসি ছিল আনন্দের, কৌতূহলের, আবার এক অদ্ভুত আশাবাদের। কারণ আমি জানতাম, আজকের দিনটি তাদের বইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা কোনো পাঠ নয়—আজ তারা শেখাবে প্রকৃতির পাঠ।
শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ঢুকতেই যেন এক রঙিন বাগান। টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে নানা রঙের পাতা—সবুজ, হলুদ, বাদামি, লালচে, এমনকি গাঢ় নীলচে একরকমও। কেউ পলিথিনে রেখে এনেছে, কেউ বইয়ের পাতার মধ্যে শুকিয়ে রেখেছিল। তারা আজ যেন প্রকৃতির সংগ্রাহক, বন থেকে আনা রঙের কারিগর।
আমি বললাম,
— “আজ তোমরা বই খুলবে না। আজ তোমরা খুলবে তোমাদের মন।”
শিশুরা হেসে উঠল, সেই হাসি ছড়িয়ে গেল পুরো কক্ষে।
তারপর শুরু হলো সৃজনশীলতার উৎসব। টেবিলের এক পাশে বসে ছোট্ট রাফসান কাঁঠালপাতা কেটে বানাচ্ছে প্রজাপতি। পাশেই সুমাইয়া আমপাতা আর পলাশপাতা দিয়ে তৈরি করছে মাছের পাখনা। কেউ কেউ পাতা দিয়ে সাজাচ্ছে সূর্যাস্তের দৃশ্য—লাল পাতা সূর্যের মতো, সবুজ পাতা মাঠের মতো। মেহেদী নামের এক ছেলেটা তুলসীপাতা দিয়ে বানিয়েছে ছোট্ট এক বন, তার মধ্যে আছে একটা ঘর আর ঘরের পাশে দুটি পাখি।
আমি অবাক হয়ে তাদের কাজ দেখছিলাম। বইয়ের পাঠে হয়তো তারা জানে না “ইকোলজি” শব্দের অর্থ, কিন্তু তাদের কাজের মধ্যে ফুটে উঠছে সেই দর্শন—প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান।
একসময় আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “এই পাতাগুলো কোথা থেকে এনেছো?”
ফারিহা বলল,
— “স্যার, আমি আমাদের উঠোন থেকে তুলেছি। আমি আমগাছকে বলেছি—‘গাছদাদা, একটা পাতা দাও না, আজ আমার স্কুলে কাজ আছে।’ তারপর হাওয়ায় উড়ে একটা পাতা পড়ল, আমি সেটা তুলে এনেছি।”
আমি হেসে উঠলাম। কতটা মায়া ও শ্রদ্ধা থাকলে এমনভাবে প্রকৃতিকে ডাকা যায়!
মুহূর্তে শ্রেণিকক্ষটা এক প্রদর্শনী হলে পরিণত হলো। কেউ পেস্ট করছে, কেউ রঙ দিচ্ছে, কেউ বন্ধুর বানানো দৃশ্যে নিজের ছোঁয়া যোগ করছে। একসাথে হাসি, গান আর পাতার গন্ধে ঘর ভরে গেল। আমি যেন ফিরে গেলাম নিজের শৈশবে—যখন বইয়ের বাইরেও শেখা মানে ছিল মাঠের মাটি, গাছের ছায়া, পাখির ডাক।
রাফসান তার প্রজাপতিটা হাতে নিয়ে আমার সামনে এল।
— “স্যার, এটা উড়বে?”
আমি বললাম,
— “তোমার কল্পনায় এটা এখনই উড়ে গেছে।”
তার চোখে তখন সত্যিকারের আলো, কারণ শিশুরা বিশ্বাস করতে জানে যা বড়রা কেবল অনুমান করে।
দুপুরের দিকে কাজ শেষ হলো। আমি প্রতিটি কাজ টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখলাম। শ্রেণিকক্ষ যেন এক ক্ষুদ্র আর্ট গ্যালারি। দেয়ালের পাশে রোদ এসে পড়েছে, সেই আলোয় পাতার রঙ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমি বললাম,
— “তোমরা জানো, আজ তোমরা শুধু পাতা দিয়ে ছবি বানাওনি; তোমরা প্রকৃতিকে সম্মান করতে শিখেছো।”
শিশুরা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাদের চোখে আমি দেখলাম এক অদ্ভুত উপলব্ধি—তারা আজ বুঝতে পেরেছে গাছ শুধু ছায়া বা অক্সিজেন দেয় না, সে আমাদের রঙও দেয়, জীবনও দেয়।
বিরতির পর যখন অন্য শিক্ষকরা এসে দেখলেন শ্রেণিকক্ষের রূপ, তাঁরা অবাক হয়ে গেলেন। কেউ বললেন, “এ যেন ক্ষুদে শিল্পীদের প্রদর্শনী।” আবার কেউ বললেন, “এইভাবে শেখানোই আসল শিক্ষা।”
আমি জানালার বাইরে তাকালাম—বাতাসে হালকা দোল খাচ্ছে স্কুলের পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা। মনে হলো, তার পাতারাও আজ অংশ নিতে চায় এই সৃজনশীল উৎসবে।
বিকেলে যখন শিশুরা বাড়ি ফিরল, অনেকের হাতে এখনো লেগে ছিল আঠা, রঙ, আর পাতার ঘ্রাণ। আমি জানতাম, এই ঘ্রাণ তারা শুধু হাতে নয়, মনে নিয়ে গেছে। হয়তো তারা বাড়ি গিয়ে বলবে—“মা, আজ আমরা বই ছাড়াও শিখেছি!”
এটাই তো চেয়েছিলাম আমি—শিশুরা যেন শেখে জীবন থেকে, প্রকৃতি থেকে, রঙ থেকে, আলো থেকে।
সন্ধ্যায় স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম সূর্য ডুবে যাচ্ছে। তার শেষ আলোয় গাছের পাতা ঝলমল করছে। মনে হলো, সেই পাতাগুলো যেন বলছে—
“ধন্যবাদ মানুষ, আজ তোমরা আমাদের কথা শুনলে।”
তখন বুঝলাম, প্রকৃতি কখনো কথা বলতে ভয় পায় না; আমরা শুধু শুনতে ভুলে যাই।
আজকের দিনটি সেই ভুল ভাঙার দিন। আজ শিশুরা শিখেছে কেবল আঁকতে নয়, অনুভব করতে। তারা শিখেছে, প্রকৃতির প্রতিটি পাতা একেকটি গল্প—যে গল্প শেখায় ভালোবাসা, যত্ন, সহযোগিতা, আর সৃষ্টির আনন্দ।
স্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি হাওয়ায় একটুখানি শুকনো পাতা ধরলাম। পাতাটা আমার হাতের ওপর হালকা কাঁপল, তারপর উড়ে গেল আকাশের দিকে। মনে হলো, সে উড়ছে ঠিক সেই প্রজাপতির মতো, যেটা আজ রাফসান বানিয়েছিল।
এ যেন এক প্রতীক—সৃজনশীলতার, স্বাধীনতার, এবং জীবনের চিরন্তন সৌন্দর্যের।
সেদিনের শ্রেণিকক্ষ আর পাতা-শিশুদের হাসি আমার মনে আজও বাজে। সেই ছোট্ট সকালটি প্রমাণ করে দিয়েছিল, শিক্ষা তখনই পূর্ণ হয় যখন তা আনন্দে রঙিন হয়, যখন তা প্রকৃতির বুক থেকে উঠে আসে, আর যখন শিশুরা বইয়ের বাইরেও পৃথিবীর সাথে বন্ধুত্ব করতে শেখে।
পাতার রাজ্যে সেই সকাল তাই শুধু একটি শ্রেণিকক্ষের দিন নয়—এটি হয়ে আছে আমার জীবনের এক সবুজ কবিতা, যেখানে প্রতিটি শিশুর মুখে লেখা আছে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now