বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
ঢাকার শাহবাগের ব্যস্ত এক বিকেলে ড. আদনান রহমান হাঁটছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের পাশ দিয়ে। বিদেশের ঝলমলে গবেষণাগার, উন্নত মানের প্রযুক্তি আর আর্থিক প্রাচুর্য পেছনে ফেলে দেশে ফেরার পর আজই ছিল তাঁর প্রথম কর্মদিবস। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিজ্ঞান অনুষদে তিনি যোগ দিচ্ছেন অধ্যাপক হিসেবে। সহকর্মীদের চোখে তাঁর এই ফেরা একরকম বিস্ময়। সবাই জানত—কয়েক বছর আগেও তিনি বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কর্মরত ছিলেন, যেখানে তাঁর তৈরি এক বিশেষ বায়োসেন্সর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। সেই তরুণ গবেষক হঠাৎ সব ছেড়ে দেশে ফিরে এলেন—কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরতে হয় কয়েক বছর আগের লন্ডনে।
সেই সময় আদনান ছিলেন পিএইচডি ফেলো। রাত জেগে কাজ করতেন ল্যাবে, নতুন কিছু আবিষ্কারের তাড়নায়। তাঁর সহকর্মীরা নানা দেশ থেকে এসেছিল—ভারত, চীন, নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল। তাদের সবার একটাই লক্ষ্য: সেরা গবেষণা করে বিশ্বে নাম করা। কিন্তু আদনান লক্ষ্য করলেন, যেখানেই কোনো বড় আবিষ্কার হয়, সেটা তাদের নিজ দেশের নয়—বরং যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কাজ করছে, সেই দেশের নামেই কৃতিত্ব যায়। একদিন ভারতীয় এক গবেষক বন্ধু বলল, “দোস্ত, একদিন হয়তো আমরাই নিজের দেশের জন্য কিছু করব, কিন্তু এখন তো সুযোগ নেই।” কথাটা শুনে আদনানের মনে কেমন একটা খচখচানি লাগল। সত্যিই কি সুযোগ নেই, নাকি আমরা নিজেরাই স্বপ্নগুলোকে বিদেশি আকাশে বেঁধে ফেলেছি?
এক রাতে তাঁর মা ভিডিও কলে বললেন, “বাবা, তোমার ছোট ভাইটা তো এখন স্কুলে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী হয়েছে, তোমার মতো বিজ্ঞানী হতে চায়। কিন্তু স্কুলে পরীক্ষার জন্য একটা মাইক্রোস্কোপও নেই।” মায়ের সরল কথাগুলো যেন তাঁর বুকের ভেতর গেঁথে গেল। বিদেশে কোটি কোটি টাকার গবেষণা সরঞ্জাম, অথচ নিজের দেশের স্কুলে মাইক্রোস্কোপ নেই! সেই মুহূর্তেই তাঁর মধ্যে জন্ম নিল এক নতুন চিন্তা—নিজ দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ।
কয়েক মাস পরেই তাঁর গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হলো। সবাই তাঁকে বলল, এখনই সময়—আরও বড় পদে যাও, আরেকটি দেশে প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু আদনান তখন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, “না, এবার ফিরব। আমার মাটি আমাকে ডাকছে।”
দেশে ফেরার পর প্রথম কয়েক মাস সহজ ছিল না। যন্ত্রপাতির অভাব, গবেষণার তহবিল নেই, আর প্রশাসনিক জটিলতা তো আছেই। কখনও কখনও হতাশ হতেন। কিন্তু একদিন তাঁর ক্লাসে এক শিক্ষার্থী বলল, “স্যার, আপনি যদি বিদেশে থাকতেন, আমরা কখনো জানতাম না যে বাংলাদেশেও এমন গবেষণা হয়।” সেই একটিমাত্র বাক্য যেন তাঁর ভেতরের সব ক্লান্তি মুছে দিল।
এরপর শুরু হলো এক নতুন যাত্রা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ল্যাবটিকে আধুনিক করার উদ্যোগ নিলেন। স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝালেন—“আপনাদের বিনিয়োগ শুধু ব্যবসায় নয়, ভবিষ্যতের বুদ্ধিমত্তায় হোক।” ধীরে ধীরে গড়ে উঠল নতুন এক গবেষণা কেন্দ্র—“ইনোভেট বাংলাদেশ ল্যাবস।” এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরুণ শিক্ষার্থীরা একত্র হলো। কারও হাতে আধুনিক কম্পিউটার নেই, কেউ আবার গ্রাম থেকে উঠে এসেছে, কিন্তু তাদের চোখে একটাই দীপ্তি—“আমরাও পারব।”
একদিন তাঁর ল্যাবে এক ছাত্রী, মুনিয়া, বলল, “স্যার, আপনি যদি বিদেশে থেকে যেতেন, আমাদের কেউ পথ দেখাত না। এখন আমরা জানি, আমাদের মেধা এখানেও বিকশিত হতে পারে।” আদনান মৃদু হেসে বললেন, “দেশের প্রতি ভালোবাসাই তো সবচেয়ে বড় প্রেরণা, মুনিয়া। মেধা যদি শুধু নিজেকে নিয়ে গর্ব করে, তবে তা একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়; কিন্তু মেধা যদি মাটির টানে কাজ করে, সে মেধা চিরস্থায়ী।”
বছর ঘুরে গেল। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হলো স্বল্পমূল্যের এক মেডিকেল সেন্সর, যা রক্তে গ্লুকোজ মাপতে পারে খুব সহজে এবং কম খরচে। এই আবিষ্কারটি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এলো, তবে এবার খবরের শিরোনামে লেখা হলো—“বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সাফল্য।” সংবাদটি পড়ে তাঁর চোখে জল এসে গেল। মায়ের কথা মনে পড়ল—“বাবা, মাটির টান বড় টান।”
এক সন্ধ্যায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলেন। তাঁর এক সহকর্মী এসে বললেন, “আদনান ভাই, আপনি তো পারতেন বাইরে থেকেই অনেক কিছু করতে, দেশে ফিরে এত ঝামেলা কেন নিচ্ছেন?” তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “দেশ মানে শুধু ভূমি নয়, দেশ মানে মানুষ। আমি যদি আমার মেধা দিয়ে একটিও তরুণকে অনুপ্রাণিত করতে পারি, তবেই আমার গবেষণার সার্থকতা।”
কয়েক বছর পর তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ল্যাব থেকে বেরিয়ে এলো অনেক তরুণ গবেষক, যারা দেশেই নতুন নতুন উদ্ভাবন শুরু করল। কেউ তৈরি করল কৃষির জন্য সেন্সর, কেউ বানাল স্থানীয়ভাবে তৈরি সোলার ব্যাটারি। ধীরে ধীরে বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও দেশে ফেরার কথা ভাবতে শুরু করল। এক নতুন ধারা শুরু হলো—“ব্রেইন রিটার্ন” আন্দোলনের, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ড. আদনান রহমান।
একদিন সংবাদমাধ্যম তাঁকে সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করল, “আপনি তো দেশের জন্য অনেক কিছু করলেন, কিন্তু যদি বিদেশে থাকতেন, হয়তো আরও বড় নাম করতে পারতেন?” তিনি হেসে বললেন, “নাম নয়, কাজটাই বড়। বিদেশে আমি হয়তো নিজের জন্য বাঁচতাম, কিন্তু এখানে আমি দেশের জন্য বাঁচি। এটা অনেক বড় সম্মান।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now