বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
বিকেলের হালকা রোদে মাঠের ঘাসগুলো যেন সোনালি আলোয় ঝলমল করছিল। স্কুলের ছেলেমেয়েরা দৌড়াচ্ছে, হাসছে, কেউ গান গাইছে, কেউ লাঠি ঘোরাচ্ছে, আর কেউ ছেঁড়া ব্যাট হাতে ক্রিকেট খেলছে। তিতাস সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের এই মাঠটাই যেন বইয়ের বাইরের এক পাঠশালা—যেখানে ক্লাসের ঘণ্টা বাজে না, কিন্তু শেখা থেমে থাকে না।
এই স্কুলের এক শিক্ষক, রফিক স্যার, ছিলেন অন্যরকম। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাঠ্যবই মানুষকে পাস করাতে পারে, কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় জয়ী হতে হলে দরকার সহশিক্ষার অভিজ্ঞতা। তার চোখে শিক্ষার মানে ছিল মানুষের ভিতরকে জাগানো। তিনি সবসময় বলতেন, “ক্লাসরুমে শেখা জ্ঞান তোমাকে চাকরির জন্য প্রস্তুত করবে, কিন্তু ক্লাসরুমের বাইরের শিক্ষা তোমাকে জীবনের জন্য তৈরি করবে।”
রফিক স্যার তাই শুরু করলেন একটি নতুন আয়োজন—‘জীবনের পাঠশালা’। বইয়ের বাইরে শেখার এই যাত্রায় অংশ নিল স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থী। শুরুতে অনেকেই দ্বিধায় ছিল, কেউ লজ্জা পেত, কেউ ভয় পেত মঞ্চে উঠতে, কেউ মনে করত এগুলো সময়ের অপচয়। তাদের মধ্যেই ছিল রাব্বি নামের এক ছাত্র। শান্ত, চুপচাপ, সব সময় বই নিয়ে ব্যস্ত। তার গলায় যেন শব্দ জমে থাকত, মঞ্চ মানেই ভয়। রফিক স্যার একদিন ক্লাসের শেষে তাকে ডেকে বললেন, “তুমি বিতর্কে অংশ নেবে।” রাব্বি হকচকিয়ে বলল, “স্যার, আমি তো কথা বলতে পারি না।” স্যার হেসে উত্তর দিলেন, “যারা ভয় পায়, তারাই সবচেয়ে ভালো বক্তা হতে পারে, যদি একবার মুখ খোলে।”
পরের সপ্তাহেই স্কুলে আয়োজন হলো সাংস্কৃতিক উৎসব। গাছের নিচে বাঁশের মঞ্চ, কাগজের ফুল আর হাতে লেখা ব্যানার—‘সহশিক্ষাই জীবনের শিক্ষা’। সেই মঞ্চে দাঁড়াল রাব্বি। তার কাঁপা গলায় শুরু হলো বিতর্ক—“সহশিক্ষা মূল শিক্ষার চেয়ে বেশি কার্যকর।” প্রথমে গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে রফিক স্যারের মৃদু হাসি তাকে সাহস দিল। কথা বলতে বলতে যেন নিজের ভিতর নতুন আলো খুঁজে পেল সে। বক্তৃতা শেষে করতালিতে ভরে গেল মাঠ। রাব্বির মনে হলো, সে যেন প্রথমবার নিজের কণ্ঠ শুনল—যে কণ্ঠ এতদিন শুধু চুপ করে থেকেছে।
একই সময় স্কুলের এক ছাত্রী সাবিহা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। সে পড়াশোনায় দুর্দান্ত, কিন্তু খেলাধুলা, গান বা নাটক মানেই তার কাছে সময় নষ্ট। “আমি ডাক্তার হতে চাই, এইসব খেলার সময় কোথায়?”—সবাইকে বলত সে। কিন্তু রফিক স্যার হাসিমুখে একদিন বললেন, “ডাক্তারি মানে শুধু শরীরের চিকিৎসা নয়, আগে নিজের মনকে সুস্থ রাখো।” তাকে মেয়েদের ফুটবল দলে নাম লেখালেন জোর করে। প্রথম কয়েকদিন অনিচ্ছায় মাঠে যেত সে, কিন্তু ধীরে ধীরে দৌড়ের মধ্যে, সহপাঠীদের চিৎকারে, দলগত খেলায় সে এক নতুন শক্তি আবিষ্কার করল। একদিন ম্যাচে গোল করার পর উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল সাবিহা—“স্যার, মনে হয় এই দৌড়টা আমার জীবনেও দরকার ছিল!”
স্কুলের পরিবেশ পাল্টে গেল। দুপুরে ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা ছুটে যেত গানের কক্ষে, কারও হাতে বাঁশি, কেউ নাচের রিহার্সাল করছে, কেউ বিতর্কের পয়েন্ট লিখছে, কেউ গাছ লাগাচ্ছে মাঠের কোণে। সহশিক্ষা যেন বইয়ের পাতার গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি হৃদয়ে। রফিক স্যার শুরু করলেন ‘তিতাস তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ক্লাব’। তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের সহায়তা করত, গাছ লাগাত, বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রে যেত, রক্তদান করত। একদিন রাব্বি এক বৃদ্ধকে নিজের টিফিন দিয়ে দিল, বৃদ্ধ কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুমি আমার নাতির মতো।” রাব্বির চোখে জল এসে গেল। সেদিন সে বুঝল, সহশিক্ষা শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি হৃদয়ের শিক্ষা।
বছর শেষে স্কুলে অনুষ্ঠিত হলো ‘সহশিক্ষা উৎসব’। মঞ্চে পুরস্কার নিচ্ছে রাব্বি বিতর্কে প্রথম হয়ে, সাবিহা ফুটবলে সেরা, অন্যরা গান, নাটক, আবৃত্তিতে জিতেছে। কিন্তু পুরস্কার বিতরণের সময় রফিক স্যার বললেন, “আজকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার তোমাদের আত্মবিশ্বাস। তোমরা শিখেছ কিভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, কিভাবে ব্যর্থতাকেও গ্রহণ করতে হয়, আর কিভাবে অন্যের জন্য কিছু করতে হয়। এটাই প্রকৃত শিক্ষা।”
সেই বছর স্কুলের ফলাফল আশ্চর্যজনকভাবে উন্নত হলো। অভিভাবকেরা অবাক—এত সময় খেলাধুলা, গান, নাটকে কাটিয়েও পড়াশোনায় এমন সাফল্য কেমন করে সম্ভব? রফিক স্যার মৃদু হেসে বললেন, “যখন মন হাসে, তখন মস্তিষ্কও শেখে। সহশিক্ষা তাদের শুধু ভালো ছাত্র নয়, ভালো মানুষ করেছে।”
বছর কেটে গেল। রাব্বি এখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, দেশের অন্যতম বিতর্ক ক্লাবের সভাপতি। একদিন সে পুরোনো স্কুলে ফিরে এলো। মাঠের মাটির গন্ধ, দেয়ালে রঙ মলিন হয়ে যাওয়া স্লোগান, আর স্যারের হাসিমাখা মুখ—সবই একই আছে। সে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আপনি ঠিকই বলেছিলেন, জীবনের শিক্ষা ক্লাসরুমে শেষ হয় না।” রফিক স্যার চুপচাপ তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আর আমি জানতাম, তুমি একদিন সেই ক্লাসরুমের বাইরেও আলো ছড়াবে।”
বিকেলের রোদ তখন মাঠে নেমে এসেছে। দূরে কেউ গান গাইছে, কেউ নাটকের সংলাপ বলছে, কেউ আবার ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে বলের অপেক্ষায়। বাতাসে ভাসছে শিশুদের হাসি আর শিক্ষার এক অদৃশ্য সুবাস—যে শিক্ষা কোনো বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়ে যায়। এটাই ক্লাসের বাইরের সহশিক্ষা, এটাই জীবনের সত্যিকারের পাঠশালা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now