বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সকালটা যেন একটু বেশিই রোদেলা ছিল। গ্রামের স্কুলটার নাম—তিতাস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। চারদিকে পাখিদের কলতান, মাঠে হালচাষের দৃশ্য, আর স্কুল প্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীদের চেনা গলার আওয়াজ। কিন্তু আজ একটু ভিন্ন সুর—আজ স্কুলে আসছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জনাব আলাউদ্দিন সাহেব। নাম শুনলেই শিক্ষকরা যেমন একটু গম্ভীর হয়ে যান, ছাত্ররা তেমন সোজা হয়ে বসে।
ঘড়িতে তখন পৌনে দশটা। অফিস শুরু হবার কথা নয়টার সময়। স্কুলের মূল ফটকের পাশে দাড়িয়ে আছেন সহকারী শিক্ষক হুমায়ুন স্যার। চুলে একটু কম সাদা, মুখে একটু বেশি চিন্তার রেখা। হঠাৎই দেখা গেল, একটা কালো রঙের মোটরসাইকেল ধুলো উড়িয়ে এসে থামল স্কুলের সামনে। নামলেন নিজে আলাউদ্দিন সাহেব—হাতে একটা মোটা ফাইল, চোখে রোদচশমা, আর মুখে এমন এক ভঙ্গি যেন বলছেন—“শিক্ষা মানে শৃঙ্খলা, আর শৃঙ্খলা মানে আমিই!”
স্কুলে ঢুকেই তার প্রথম প্রশ্ন—
“প্রধান শিক্ষক কোথায়?”
একজন সহকারী শিক্ষক সাহস করে বললেন, “স্যার, উনি এখনো আসেননি।”
আলাউদ্দিন সাহেবের মুখটা এমন হলো যেন কোনো ছাত্র ক্লাসে মোবাইল বের করেছে। তিনি চুপ করে রইলেন, কিন্তু ভ্রু কুঁচকে গেলো এমনভাবে যে বোঝা গেল—আজ কেউ না কেউ চাকরি হারাবে।
তখনই হুমায়ুন স্যার ফোন করলেন প্রধান শিক্ষক সালাউদ্দিন সাহেবকে। ফোনের ওপাশ থেকে গলা ভেসে এলো—
“ওফ! অফিসার এসেছে? আমি তো রাস্তার মধ্যে, পাঁচ মিনিটে আসতেছি।”
পাঁচ মিনিটের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশে ঠিক ততটাই বাস্তব যতটা কোনো ছাত্রের কথা—“স্যার, আমি বইটা ঘরে ভুলে গেছি।”
দশ মিনিট পর প্রধান শিক্ষক এলেন। হাতে চকচকে ব্যাগ, গায়ে ইস্ত্রি করা শার্ট, মুখে হালকা হাসি—যে হাসি সাধারণত দেন তারা, যারা ঠিক জানেন কখন কোথায় কতটা হাসলে কাজ হাসিল হয়।
সমাবেশে মাইক হাতে নিলেন শিক্ষা অফিসার আলাউদ্দিন সাহেব। শুরু করলেন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বক্তৃতা—
“প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষা একটি মহৎ পেশা। শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড, কিন্তু কিছু শিক্ষক আছেন যারা নিজেরাই বেঁকে যান!”
সবাই চুপ। কেউ তাকাচ্ছে মাঠের দিকে, কেউ ছাত্রদের দিকে, আবার কেউ ফাইলের পাতায় এমনভাবে মনোযোগ দিয়েছে যেন সেখানে জীবনের অর্থ লেখা আছে।
মতবিনিময় সভায় গিয়ে আলাউদ্দিন সাহেব প্রথমেই জানতে চাইলেন—
“আজ কারা দেরি করেছেন?”
প্রধান শিক্ষক তালিকা ধরলেন। প্রথম নাম শুভ স্যার।
“স্যার, শুভ আগে নিয়মিত আসতেন, কিন্তু ইদানীং একটু দেরি করেন। বিষয়টা আমি গোপনে খুঁজে দেখব।”
শুভ স্যার তখন চুপচাপ বসে আছেন। মনে মনে ভাবছেন—“আমার দেরির কারণ যদি বলেন, তবে উনার লেট আসার কারণ কে বলবে?”
দ্বিতীয় নাম এলেন শারমিন ম্যাম। প্রধান শিক্ষক একটু হেসে বললেন,
“উনি একটু স্লো কোচে আসেন, স্যার। তবে এখন থেকে ঠিক হয়ে যাবে।”
সবাই মাথা নিচু করে হাসি চেপে রাখছে। “স্লো কোচে আসেন” কথাটা শুনে পাশের টিফিনরুমের দুলাল চা-ওয়ালারও মুখে চায়ের ফেনা উঠে এলো।
এবার আলাউদ্দিন সাহেবের দৃষ্টি গেলো প্রধান শিক্ষকের দিকে।
“আর আপনি স্যার, আপনি তো ঠিক সময়েই এসেছেন নিশ্চয়?”
প্রধান শিক্ষক একদম গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন—
“স্যার, গুরুর ভুল ধরতে নেই। আমি যতটুকু পারি চেষ্টা করি।”
এই উত্তর এমন নিপুণভাবে দেওয়া হলো যেন “গুরু” শব্দটির পরে সবাইকে ভাবতে হলো—“হাঁ, ঠিকই তো, গুরুজনকে কে দোষ দেয়!”
এরপর আলোচনা চললো ন্যায়, নীতি, সততা, দায়িত্ববোধ—সবকিছুর ওপর। অফিসার বললেন,
“শিক্ষকরা যদি সময়নিষ্ঠ না হন, তবে ছাত্ররা কীভাবে শিখবে?”
তাঁর এই কথায় সবাই সম্মতি জানালেন, কিন্তু মনে মনে সবাই জানেন—এ দেশে সময় আসে সময়মতো না, অফিসার এলে সময় মনে পড়ে।
মতবিনিময় শেষে অফিসার সাহেব উঠলেন। তখনই প্রধান শিক্ষক হাসিমুখে তাঁর সামনে এগিয়ে গেলেন। হাতে একটা হলুদ খাম—চকচকে, একেবারে ফ্রেশ, যেন কাগজের গায়ে আলো পড়ে হাসছে।
“স্যার, এটা কিছু কাগজপত্র—স্কুলের উন্নয়ন সংক্রান্ত।”
অফিসার সাহেব কাগজের ওজন না মেপেই বললেন,
“খুব ভালো, প্রধান শিক্ষক মশাই! এই রকম সক্রিয়তা দেখলে আনন্দ লাগে।”
খামটা ব্যাগে রাখলেন এমনভাবে, যেন এটা রাষ্ট্রীয় গোপন নথি। তারপর স্কুল প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখলেন—ক্লাসে ঢুকলেন, দুই-তিনটা প্রশ্ন করলেন, কিছু ছাত্র উত্তর দিলো, কিছু না দিলো। শেষে তিনি বললেন,
“তোমাদের স্কুল ভালো চলছে, শুধু একটু সময়ের ব্যাপারটা ঠিক করো।”
সবাই বলল, “জী, স্যার।”
বের হবার সময় প্রধান শিক্ষক আবার এগিয়ে এসে বললেন,
“স্যার, মাঝে মাঝে আপনার মতো মানুষ না এলে তো আমরা শৃঙ্খলা শেখাই কাকে?”
অফিসার হাসলেন—
“আমরা আছি তো! শিক্ষক সমাজের পাশে সবসময়।”
তারপর মোটরসাইকেল স্টার্ট দিলেন, ধুলো উড়িয়ে চলে গেলেন।
গাড়ি চলে যেতেই শিক্ষকরা আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। কেউ গেলেন টিফিন রুমে, কেউ স্টাফরুমে। শুভ স্যার এককোণায় দাঁড়িয়ে সহকারী শিক্ষক রুবেলকে বললেন—
“দেখলে রে? কত ন্যায়-নীতির কথা বলল, কিন্তু হলুদ খাম দেখেই মন ভালো হয়ে গেল।”
রুবেল হেসে বলল,
“এটাই তো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বাস্তব শিক্ষা—খামে যা লেখা থাকে না, সেটাই সবচেয়ে কার্যকর!”
অন্য পাশে শারমিন ম্যাম বললেন,
“আজ থেকে আমি স্লো কোচ বাদ দিয়ে নরমাল কোচে আসব।”
সবাই হেসে উঠল।
পরদিন সকালেই স্কুলে একটা নতুন খবর ছড়িয়ে পড়লো—শিক্ষা অফিসার নাকি সদর অফিসে গিয়ে বলছেন,
“তিতাস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় খুবই ভালো স্কুল। শিক্ষকরা পরিশ্রমী, প্রধান শিক্ষক সৎ, পরিবেশ চমৎকার!”
এই খবর শুনে শুভ স্যার মুচকি হেসে বললেন,
“মনে হয় হলুদ খামের ভেতরে সোনালি প্রশংসা ছিল!”
সেদিন বিকেলে ছাত্ররা যখন মাঠে খেলা করছিল, শুভ স্যার তাদের দেখছিলেন। মনে মনে ভাবলেন—এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সত্যিকার নায়কেরা হলো সেই শিক্ষকরা, যারা খাম ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু তাদের গল্প কেউ লেখে না, কারণ তাদের কাগজের রঙ সাদা, হলুদ নয়।
বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। আকাশে ঘন কালো মেঘ, স্কুলের দেয়ালে এখনো ঝুলে আছে ব্যানার—“শিক্ষা মানে আলো।”
শুভ স্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন,
“আলো তো আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে হলুদ রঙে একটু বেশি ঝলমল করে যায়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now