বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মওলানা ও তাঁর জেলখাটা স্যুটকেস

"ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। লাগেজ— এই শব্দটাই শুনলে এখনকার মানুষদের চোখে চকচকে ট্রলি ব্যাগ, কম্বিনেশন লক, চারচাকা স্লাইডিং ডিজাইন আর ইউএসবি চার্জার পোর্ট ভেসে ওঠে। কিন্তু মওলানা ভাসানীর যুগে লাগেজ মানে ছিল একটাই— একটা স্যুটকেস, তা-ও লোহার, ভারি, পুরোনো, আর কেবলই জেলখাটা। সেটাই ছিল তাঁর আজীবনের সঙ্গী, তাঁর সহযোদ্ধা, তাঁর বিশ্বাসী বন্ধু। সেই স্যুটকেসটার আয়তন মোটে ষোল ইঞ্চি, কিন্তু ইতিহাসে তার জায়গা বিশাল। স্যুটকেসের ভেতরে থাকত সামান্য কয়েকটি জিনিস— একটা গামছা, একটা লুঙ্গি, একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি, মাথার টুপি, একটু তামাক আর চুনের ডিব্বা। এইটুকুই। কারও কারও লাগেজে থাকে জীবনযাত্রার বিলাসিতা, কিন্তু মওলানার লাগেজে ছিল জীবনের সরলতা। স্যুটকেসটার একটা বিশেষত্ব ছিল— তার কোনো তালা ছিল না। সেই তালা বহু আগেই ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে, আর তার জায়গা নিয়েছে এক টুকরো দড়ি। কখনো সেটা ছিল বাসার শাড়ির পাড়, কখনো নড়বড়ে পুরোনো লুঙ্গির ছেঁড়া অংশ। সে দড়িই ছিল স্যুটকেসের নিরাপত্তারক্ষী। ঢাকা থেকে লন্ডন যাওয়ার সময়ও মওলানা সেই দড়িতেই বেঁধেছিলেন তাঁর স্যুটকেস। কিন্তু একদিন হোটেলে এসে দেখা গেল, দড়িটা উধাও! অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে পাওয়া গেল সেটি ডাস্টবিনে। কারণ হোটেলের ঝাড়ুদার ভেবেছিল, “এই পুরোনো ছেঁড়া কাপড়টা কেউ কেনো রেখেছে?” তাই সে মানবসেবার মানসে সেটাকে আবর্জনার স্থানে শোভা দিয়েছে। মওলানা কিছু না বলে দাড়ি চুলকিয়ে হাসলেন। “দড়িও বোধহয় বিশ্রাম নিতে চায়,” তিনি বললেন। “এত বছর তো সে বাঁধা পড়ে থেকেছে।” তাঁর ইউরোপ সফরসঙ্গিরা একটু বিরক্তই হল। একদিন তাঁরা বলল, “হুজুর, নতুন একটা স্যুটকেস কিনে ফেলুন না। এত পুরোনো ভাঙা বস্তা নিয়ে কষ্ট করে লাভ কী?” মওলানা মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, “জীবনের বহুদিনের সাথী আমার এই স্যুটকেসটা। ওকে ফেলে দিলে মনে হবে, পুরোনো বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম। বিদেশে ফেলে রেখে নতুন বান্ধবী জুটানোর মতো ব্যাপার হবে না তো?” সবাই হেসে উঠল। হুজুরের যুক্তিতে কেউ তর্ক করতে পারল না। লন্ডন থেকে স্টকহোম যাওয়ার সময় আবার দেখা গেল— দড়ি নেই। এবার ছেঁড়া লুঙ্গির একাংশ দিয়ে বাঁধা হলো স্যুটকেস। স্টকহোমের ঠান্ডায় লুঙ্গির কাপড় কিছুটা জমে বরফের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু স্যুটকেসকে ধরে রেখেছিল সযত্নে। পুনরায় লন্ডনে ফেরার পথে ঘটে গেল আসল নাটক। বিমানবন্দর পৌঁছে দেখা গেল— স্যুটকেস উধাও! সফরসঙ্গিরা যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কেউ কেউ মনে মনে বলল, “আল্লাহ! অবশেষে মুক্তি!” মওলানা অবশ্য কষ্ট পেলেন না। শুধু চোখ বন্ধ করে একটু বললেন, “ও বেচারা কতটা ঘুরলো আমার সাথে। হয়তো এখন বিশ্রাম নিতে গেছে।” তাঁর সঙ্গীরা ভাবল, এই সুযোগে নতুন একটা স্যুটকেস কেনা যাক। পরদিনই পরিকল্পনা হলো লন্ডনের দোকানে গিয়ে একটা চমৎকার লাগেজ কেনা হবে— চেইন লাগানো, চাকাযুক্ত, রঙিন। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার রসিকতা দেখুন! তাঁরা যেদিন বের হচ্ছিলেন, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক হাত তুলে সালাম করলেন। হাতে সেই হারানো স্যুটকেস! লোকটি বলল, “স্যার, terribly sorry! আপনার লাগেজ ভুলবশত ব্রাসেলসে চলে গিয়েছিলো। ওখান থেকে আমরা উদ্ধার করেছি। ভুলের জন্য দুঃখিত।” মওলানা হাসলেন, মুখে সেই চেনা শান্তি। বললেন, “বেলজিয়াম আমি দেখিনি, কিন্তু আমার স্যুটকেসটা দেখে এসেছে। সে এখন আমার চেয়েও বেশি আন্তর্জাতিক।” সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়। স্যুটকেসটিও যেন মৃদু শব্দে খিলখিলিয়ে উঠল— তার ভেতরে থাকা চুনের ডিব্বা ঠকঠক করে শব্দ করছে, যেন সে-ও আনন্দে যোগ দিচ্ছে। অবাক করা বিষয় হলো, স্যুটকেসটা ফিরে এসেছে মেরামত হয়ে। তার পুরোনো ভাঙা অংশে প্যাঁচ লাগানো, ওপর দিয়ে একটা নতুন তালা ঝুলছে। হুজুর তালাটা দেখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “দেখো ভাই, বিদেশিরা কত যত্নবান! আমার এই স্যুটকেসটা এতকাল তালা ছাড়া থেকেছে, আজ প্রথমবার নিজের নিরাপত্তা পেয়েছে।” তার এক সফরসঙ্গী মজা করে বলল, “স্যুটকেসটা এখন তো হুজুরের চেয়েও বেশি ভিআইপি— ব্রাসেলস ঘুরেছে, লন্ডনে সার্ভিস পেয়েছে, আর এখন নিরাপত্তা নিয়েও এসেছে!” সবাই আবার হেসে উঠল। মওলানা বললেন, “ঠিকই বলেছো। কিন্তু মনে রেখো, জীবনের ভিআইপি হওয়া তালা লাগিয়ে নয়— খোলা মনের দড়িতে বাঁধা থেকে।” তারপর স্যুটকেসটা পাশে রেখে তামাকের ডিব্বা থেকে এক চিমটি তুলে ঠোঁটে রাখলেন। চুনের ডিব্বা থেকে একটু চুনও যোগ করলেন, যেন সেই স্যুটকেসের মতোই পুরোনো অভ্যাসটিকেও ফেলে না দেন। তিনি বলেন, “আমার এই স্যুটকেসটা যেমন দরিদ্র, তেমনই সৎ। এর ভেতরে যতটুকু স্থান আছে, ততটুকু প্রয়োজনই থাকে। জীবনে সুখ আসে তখনই, যখন বোঝা ছোট হয়। আজকের মানুষ ব্যাগে জীবন ভরে, কিন্তু মন থাকে ফাঁকা।” এমন দর্শন শুনে লন্ডনের এক তরুণ সাংবাদিক, যিনি ওই সফরে প্রতিবেদন লিখছিলেন, মুগ্ধ হয়ে বললেন, “Sir, you and your suitcase— both are living legends.” মওলানা হেসে বললেন, “No, my friend! I’m living, but this suitcase— it’s surviving!” সেই হাসির সঙ্গে যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল। এরপর থেকেই যেখানেই যেতেন, স্যুটকেসটা সঙ্গে থাকত। মানুষ যখন তাঁকে দেখতে আসত, তারা প্রথমেই চোখ রাখত সেই স্যুটকেসে। কেউ বলত, “এইতো ভাসানীর ইতিহাস!” কেউ আবার হাসতে হাসতে বলত, “স্যুটকেসটা তো জেল খেটেছে, এখন ইউরোপ ঘুরছে!” মওলানা কখনো এসব শুনে কিছু বলতেন না। শুধু মৃদু হাসতেন। তাঁর মনে হতো, মানুষের চরিত্রও স্যুটকেসের মতো— যত পুরোনো হয়, তত অভিজ্ঞ হয়, তত গল্প জমে। একদিন এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, “হুজুর, আপনি এই স্যুটকেসটা বদলান না কেন?” তিনি শান্ত গলায় বললেন, “যে আমাকে জেলের ভেতরে সঙ্গ দিয়েছে, সেই সঙ্গীকে আমি উন্নত জীবনে ফেলে যেতে পারি না। বন্ধুত্বেরও একটা মর্যাদা আছে।” এই কথায় সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো, তাঁর স্যুটকেসটা আসলে এক প্রতীক— এক জীবন্ত সাক্ষী সরলতার, নৈতিকতার আর অটল বন্ধুত্বের। মওলানার জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই স্যুটকেসই ছিল তাঁর একমাত্র “লাগেজ”— যেমন তাঁর শরীরের পোশাকে ছিল মাটি, তেমনি হৃদয়ে ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। আজও যখন কেউ পুরোনো ছবি দেখে সেই স্যুটকেসটার দিকে তাকায়, তখন মনে হয়, ওটা শুধু ধাতব বাক্স নয়, এক ইতিহাসের সঙ্গী— এক নীরব চরিত্র, যে আমাদের বলে, “বিলাসিতার তালা নয়, সরলতার দড়িই মানুষকে মহান করে।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now