বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিষবৃক্ষের ছায়ায়

"ভিন্ন খবর" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ । শরতের এক দুপুর। শহরের প্রান্তে নদীর ধারে একটি ছোট্ট শিল্প এলাকা। ধোঁয়ার ঘন কুয়াশা যেন আকাশটাকে মলিন করে রেখেছে। বাতাসে কেমন এক ধাতব গন্ধ, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। একসময় এই নদী ছিল নীলচে সবুজ, শিশুরা এতে গোসল করত, জেলে নৌকা বেঁধে রাখত, পাড়ে বসে মানুষ বিকেলের বাতাসে গল্প করত। এখন নদীর রঙ কালচে বাদামি, তার পাড়ে সাদা ফেনার স্তূপ জমে আছে—যেন নদীর মুখে লালা গড়িয়ে পড়ছে। এই নদীর পাশের একটি পুরনো লেড প্রক্রিয়াজাত কারখানায় কাজ করে রাশেদ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, কিন্তু মুখে ক্লান্তি আর চোখে নোনাজল জমে থাকে। তার ছেলেটি, নাবিল, গত এক বছর ধরে অসুস্থ। ডাক্তারের ভাষায়, “লেড পয়জনিং।” রাশেদ শুনে চুপ হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল, “তোমার আশেপাশে হয়তো লেড বা মার্কারি জাতীয় কিছু আছে।” কিন্তু সে জানত, সমস্যা তার নিজেরই কর্মস্থলে—যেখানে সীসা গলানো হয়, রঙ তৈরি হয়, আর শ্রমিকরা মুখে কাপড় বেঁধে বেঁচে থাকার ভান করে। রাশেদ প্রতিদিন সকালে কারখানায় যায়। ভেতরে ঢুকলে গরম বাতাসে শরীর কাঁপে। মেশিনের গর্জন, ধাতব গন্ধ, আর বাতাসে উড়তে থাকা অদৃশ্য বিষ কণাগুলো তার ফুসফুসে ঢুকে যায়, অথচ সে ভাবে—এটাই জীবন। বাঁচতে হলে বিষই শ্বাস নিতে হবে। কারখানার মালিক হাসান সাহেবের চকচকে গাড়ি দেখে সে ভাবে, “এই বিষই কারও প্রাসাদের ইন্ধন।” একদিন দুপুরে, রাশেদ গলানো সীসার ঢালাইয়ের সময় হাত ফসকে পাত্রের ধোঁয়া সরাসরি মুখে লাগে। চোখে জ্বালা, গলা শুকিয়ে যায়। পাশের সহকর্মী ছুটে আসে, “পানি খা ভাই!” কিন্তু পানি তার তৃষ্ণা মেটায় না। রাতে বাসায় ফিরলে মাথা ঘোরে, বুক ধকধক করে। তার স্ত্রী, লিজা, ভয়ে কাঁপে—“তুমি কি ডাক্তার দেখাবে না?” রাশেদ হেসে বলে, “ডাক্তার কী করবে, ওরা তো জানে না আমরা কী শ্বাস নিই।” পরের দিন কারখানায় এসে সে দেখে, নদীর পাড়ে কিছু মাছ ভেসে উঠেছে। কচুরিপানার ফাঁকে মৃত মাছের চোখে আঠালো জল। এক বৃদ্ধ জেলে বলল, “এই নদী মরতেছে বাবা, আর কিছুদিন পর মাছ পাওয়া যাবে না।” রাশেদ চুপ করে রইল। সে জানে, এই নদীতে প্রতিদিনই ফেলা হয় সীসা, মার্কারি আর নানা রঙের বর্জ্য। কারখানার পেছনের কালো পাইপগুলোই নদীর দিকে মুখ করে আছে, যেন বিষ ঢেলে দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে। একদিন কারখানায় আসে এক তরুণ সাংবাদিক—মাহিন। সে ছবি তুলতে চায়, মানুষের মুখ থেকে সত্য শুনতে চায়। রাশেদ তাকে চুপিচুপি জানাল, “দেখেন, এখানে মাসে একবার ডাক্তার আসে, কিন্তু তার রিপোর্ট কখনও বাইরে যায় না। আমাদের বলা হয়—সব ঠিক আছে। অথচ আমরাই জানি, কতজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে চলে গেছে।” মাহিন নোটবুকে কিছু লিখে নেয়, ছবিও তোলে। কিন্তু তার চোখে ভয়—এ সত্য প্রকাশ করলে হয়তো নিজের জীবনটাই ঝুঁকিতে পড়বে। রাশেদের মনে এক ভয়ানক লড়াই শুরু হয়। সে ভাবে, “আমি তো বিষের কারখানায় কাজ করি, কিন্তু এ বিষ শুধু আমাকেই নয়, নদী, গাছ, পশুপাখি—সবকিছুকে মেরে ফেলছে।” সে ভাবে চাকরি ছেড়ে দেবে, কিন্তু ছেলের চিকিৎসার খরচ কীভাবে চলবে? সেদিন রাতে প্রবল বৃষ্টি। কারখানার বর্জ্যরঙ বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদী হয়ে বয়ে যায় গ্রামমুখী জমির দিকে। সকালে রাশেদ দেখে ধানক্ষেতের পাশে শুকনো পাতাগুলো কালো হয়ে গেছে। কিছু পাখি পড়ে আছে মৃত অবস্থায়। এই দৃশ্য দেখে তার বুক ভার হয়ে ওঠে। সে বলে ওঠে, “আমরা নিজের হাতে গাছ মেরে ফেলছি, নদী মেরে ফেলছি, শেষে নিজেদেরও।” পরের সপ্তাহে মাহিনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়— “লেডের ছোবলে বিষাক্ত নদী, শ্রমিকদের মৃত্যু নিশ্চিত” সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে শহরে। প্রশাসন আসে, কিছু ছবি তোলে, তারপর চলে যায়। মালিক হাসান সাহেব মুচকি হেসে বলে, “সব ঠিক হয়ে যাবে, এগুলো মিডিয়ার নাটক।” কিন্তু রাতের বেলা কারখানার ভেতরে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। একটি রাসায়নিক ড্রামে আগুন ধরে যায়। আগুনে চারজন শ্রমিক পুড়ে যায়, রাশেদ গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে শুয়ে সে দেখে, দেয়ালের ফাঁকে সাদা লাইটের নিচে নিজের হাতে দাগ পড়ে গেছে—সীসার দাগ, কাজের স্মৃতি। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ভাবে, “এই পৃথিবীটা যদি একটু সচেতন হতো, একটু সতর্ক হতো, হয়তো এই নদী, এই পাখিগুলো বাঁচত।” তার মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে ছেলের মুখ। নাবিল হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে সে কোন বাতাসে নিঃশ্বাস নেবে, কোন পানিতে গোসল করবে? হাসপাতালের বারান্দায় মাহিন দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতে ক্যামেরা, কিন্তু আজ সে ছবি তোলে না। কেবল ফিসফিস করে বলে, “একটা জাতি যখন নিজের বাতাসে বিষ মেশায়, তখন তাদের সংবাদ আর সংবাদ থাকে না—হয়ে যায় মৃত্যুর ইতিহাস।” রাশেদের চোখে তখন একফোঁটা জল জমে। সে বলে, “সত্য লিখো ভাই, যাতে পরের প্রজন্ম অন্তত বুঝতে পারে, এই পৃথিবী একদিন গাছের ছায়া হারিয়েছিল মানুষের লোভে।” বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটা মিশে যাচ্ছে সেই নদীর সঙ্গে, যাকে মানুষ নিজের হাতে বিষাক্ত করেছে। দূরে কোনো শিশুর কণ্ঠ ভেসে আসে—“আব্বু, নদীটা কালো কেন?” রাশেদের কানে যেন সেই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে— নদী কালো, কারণ মানুষের বিবেক ধূসর। এভাবেই একটি ছোট কারখানার অজানা গল্প হয়ে ওঠে সমগ্র মানবজাতির সতর্কবার্তা— প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, সে শুধু ফিরিয়ে দেয় আমাদেরই তৈরি করা বিষ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now