বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভাটিপাড়ার চাঁদের ঘাট

"রূপকথা " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ । হাওরের দেশে সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন আকাশ যেন রুপালি জলে গলে পড়ে। বাতাসে শাপলার গন্ধ, দূরে কোথাও বাউলের কণ্ঠে এক বিষণ্ণ সুর ভেসে আসে— “লোকে বলে বলরে ঘরবাড়ি ভালা না আমার…” সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে ভাটিপাড়ার জমিদার বাড়ির ইতিহাস—অর্ধেক সত্য, অর্ধেক কল্পনা, আর বাকিটা কেবল নদী জানে, যে শত বছর ধরে তার পাশে গেয়ে চলেছে নীরব গান। কখনো একসময় এই ভাটিপাড়া ছিল নিঃজীব এক গ্রাম, চারপাশে জল, কাদা, আর দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হাওর। সেই সময় পিয়াইন নদীর তীরে এসে ভিড়লেন দুই ভাই—শেখ করম মোহাম্মদ আর শেখ ফতেহ মোহাম্মদ। তাঁদের চোখে ছিল দূরের মরুভূমির রোদ, আর মনে ছিল নতুন ভূমিতে এক আলোকিত স্বপ্ন। তারা ভেবেছিলেন—এই ভাটিপাড়া একদিন হবে এমন এক জায়গা, যেখানে নদীর ঢেউ আর মানুষের হৃদয় এক সুরে গাইবে। কিন্তু কাহিনির শুরুটা ততটা সহজ ছিল না। শেখ করম মোহাম্মদের পুত্র শেখ ইয়াকুব মোহাম্মদ তখন বিপদের মুখে। এক খুনের মামলায় অভিযুক্ত, তাঁর পেছনে ফৌজদারের লোক। এক রাতেই পালিয়ে এলেন তিনি সুনামগঞ্জের দিকে, যেখানে নদী তখনো গর্জন করে, অথচ রাতের শেষে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেখানেই শরীফ খাঁ চৌধুরীর আশ্রয়ে এলেন ইয়াকুব। শরীফ খাঁ ছিলেন ভাটিপাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি—চোখে রাজকীয় দীপ্তি, কণ্ঠে গম্ভীর আদেশ, কিন্তু হৃদয়ে এক অজানা দয়া। “তুমি বেঁচে থাকো,” তিনি বলেছিলেন ইয়াকুবকে, “ভাটিপাড়ার এই মাটিতে কেউ আশ্রয় চেয়ে ফিরে যায় না।” সময়ের সাথে ভাগ্যের রঙ বদলালো। ইয়াকুব মোহাম্মদ শরীফ খাঁর কন্যাকে বিয়ে করলেন। সেই বিয়ের রাতেই ভাটিপাড়ার আকাশে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য—চাঁদ যেন নদীতে নেমে এসে দীঘির পাড়ে বসে আছে। গ্রামের বৃদ্ধরা বলল, “এই আলো শুভ। এই বংশে রাজত্ব আসবে।” বছর ঘুরে একদিন ফতেহ মোহাম্মদ বিশাল দিঘী খনন শুরু করলেন। মানুষের মুখে মুখে গল্প ছড়িয়ে পড়ল—“এই দিঘীর পানি নাকি চাঁদের আলোয় তৈরি হবে।” কারণ প্রতিদিন রাতের শেষ প্রহরে দেখা যেত, দিঘীর পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব এমন উজ্জ্বল যে মনে হতো, কেউ আকাশ থেকে এসে তাতে সোনার ধুলা ছিটিয়ে গেছে। দিঘীর পাকা ঘাট নির্মিত হলো লাল ইটের সৌন্দর্যে। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নামলে মনে হতো, কোনো রাজবধূ এখনই এসে বসবে সেখানে, আর তার পায়ের ছোঁয়ায় জলে ফুল ফুটবে। ভাটিপাড়ার জমিদার বাড়ি উঠল সেই দীঘির তীরে। বিশাল দরজা, ঘড়ির টাওয়ার, নকশা করা জানালা, আর তার বারান্দায় প্রতিদিনই বাজত নাচগানের আসর। সেই সময় হাসন রাজা এসে ছিলেন একবার অতিথি হয়ে। তাঁর চোখে ভাটিপাড়ার ঐশ্বর্য দেখে যেমন বিস্ময়, তেমনি কোথাও যেন একটা বিষাদও। রাতের দিঘী দেখে তিনি চুপ করে গেলেন। পরে ঘাটে বসেই তাঁর কলমে জন্ম নিল গান— “লোকে বলে বলরে ঘরবাড়ি ভালা না আমার…” সেই গান তখনই যেন ভাটিপাড়ার ভাগ্যলিপি হয়ে গেল। কারণ জৌলুশের আড়ালে জমিদার বাড়িতে শুরু হয়েছিল অহংকারের লড়াই। ফতেহ মোহাম্মদের বংশধরেরা একে একে রাজপাটের লোভে বিভক্ত হতে লাগল। কেউ জমি নিয়ে মামলা করল, কেউ নদীর পাড়ে অভিশাপ ছুঁড়ে দিল। আর এক রাতের ঝড় সেই সব স্বপ্নকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। লোকমুখে আছে, ঝড়ের রাতে দিঘীর পানি হঠাৎ ঘূর্ণাবর্তে পরিণত হয়েছিল। চাঁদের প্রতিবিম্ব ভেঙে গিয়েছিল এক ফোঁটা আগুনে। সকালে দেখা গেল, ঘাটের নিচে লুকিয়ে থাকা কালো পাথরগুলো যেন কেঁদে উঠেছে। তবে সেই দিঘী আজও শুকায়নি। পানিতে আজো চাঁদ পড়ে, আজো পাড়ের শিশুরা খেলে, আর যখন গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়ে, তখন শোনা যায় মৃদু গানের সুর। “লোকে বলে বলরে…” কেউ জানে না, সে গানে হাসন রাজার কণ্ঠ মিশে আছে নাকি ভাটিপাড়ার মাটির প্রতিধ্বনি। এক বৃদ্ধা বলেন, “রাতে দীঘীর জল নড়লে বোঝা যায়, পুরোনো রাজবাড়ির আত্মারা এখনো ঘাটে বসে আছে।” আরেক তরুণ বলে, “না দাদি, ওটা নদীর ঢেউ নয়—ওটা ইতিহাসের নিঃশ্বাস।” যে হাওরের জল একসময় জমিদারদের স্নান দেখেছিল, আজ সেই জলেই কৃষকের সন্তান মাছ ধরে, শিশু ডুবসাঁতার খেলে, আর পূর্ণিমার রাতে গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই পুরোনো কল্পগন্ধ। মানুষ ভুলে যায়, রাজত্ব মরে গেছে বহু আগেই; কিন্তু দিঘী এখনো বেঁচে আছে, যেন নিজের ভেতর সময়কে বয়ে নিয়ে চলেছে। ভাটিপাড়ার রাত আজও নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে এক মায়াময় প্রতিধ্বনি বাজে— চাঁদের আলোয় ঝলমল ঘাট, ভেজা পাথরের ওপর হেলে পড়ে ইতিহাসের ছায়া, আর বাতাসে ভেসে আসে সেই চিরকালীন সুর— “লোকে বলে বলরে ঘরবাড়ি ভালা না আমার…” কখনো মনে হয়, ভাটিপাড়ার দিঘী কেবল জলাশয় নয়—এ যেন স্মৃতির আয়না, যেখানে ইতিহাস নিজের মুখ দেখে আর নদী চুপচাপ হাসে। ভাটিপাড়ার মানুষ এখনো বলে, “চাঁদ যখন ঘাটে নামে, ফতেহ মোহাম্মদের আত্মা তখন দিঘীর পানিতে হাঁটে।” এইভাবে সময় থেমে গেছে “ভাটিপাড়ার চাঁদের ঘাটে”— যেখানে আলো, জল, ইতিহাস আর কল্পনা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অমর রূপকথা। ✨


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now