বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প – পর্ব ১০
লেখক: নাফিজ আহমেদ
পড়ন্ত বিকাল। চারিদিকটা নিস্তব্ধ, শুনশান নিরবতা বিরাজ করছে। উঠোনের এক কোনে সকলে একসাথে বসে গল্পের আসর জমিয়েছে। নেহা বয়সে একটু বড়, তাই কথা বলায়ও বেশ পাকা। সে নানা ইমন সাহেবের দিকে তাকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল,
— নানা, আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
তানভীরও নেহার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে উঠল,
— বলেন নানা, আপনি কোথায় ছিলেন?
ইমন সাহেব শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— তোমরা স্থির হও, সব বলছি।
নেহা ও তানভীরের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। তাদের চোখে কৌতূহলের দীপ্তি।
ইমন সাহেব কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। অতীতের অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো যেন এখনও তাকে কুরে কুরে খায়। প্রতিটি মুহূর্তে সেই স্মৃতিগুলো তাকে পীড়া দেয়। তাই এতদিন ধরে তিনি চেষ্টায় ছিলেন— পেছনের দিনগুলো ভুলে যাওয়ার। কিন্তু আজ, নাতি-নাতনিদের আবদারে তিনি আবারও স্মৃতির দুয়ার খুললেন।
নেহা মিষ্টি কণ্ঠে বলল,
— বলেন না নানা, কী হয়েছিল?
ইমন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আচ্ছা, শোনো তাহলে। তখন আমি একেবারে যুবক— তোমার আব্বুর বয়সের মতো। একদিন মাঠে ঘাস কাটতে গিয়েছিলাম। জানোই তো, আমাদের বাড়িটা একেবারে সীমান্তের পাশে। আমি আমার মতো ঘাস কাটছিলাম। হঠাৎ দেখি, কয়েকজন বিএসএফ সদস্য আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। তারপর থেকে আমি যেন হারিয়ে গেলাম পৃথিবী থেকে।
নেহা বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল,
— কিন্তু নানা, তারা আপনাকে কেন ধরল?
ইমন সাহেব হালকা হাসলেন,
— জানি না মা, হয়তো তাদের ইচ্ছা ছিল আমাকে গ্রেপ্তার করার, আর তারা তাই করেছে।
তানভীর ক্ষোভভরা মুখে বলল,
— লোকগুলো খুব খারাপ! শুধু শুধু আপনাকে এতদিন আটকে রেখেছিল!
ইমন সাহেব মৃদু হাসলেন। নেহা ও তানভীর এখনও তার সাথে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। সাধারণত নাতি-নাতনিরা নানা-নানিদের ‘তুমি’ করে বলে, কিন্তু ওরা এখনও ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করছে। হয়তো সময় লাগবে— সম্পর্কটা আরও গভীর হতে সময় চায়। জন্মের পর থেকে তারা কখনো আমাকে দেখেইনি।
এমন সময় ইমা বিকেলের নাস্তা নিয়ে এসে হাজির হলো। চা আর বিস্কুটের সুবাসে ঘর ভরে গেল। চায়ের সাথে বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে খেতে নেহা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
— জানো আম্মু! আজ নানার মুখে তার হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুনেছি!
কথাটা শুনেই ইমার চোখ টলমল করে উঠল। নেহা ধীর কণ্ঠে বলল,
— আম্মু তুমি তো শুনতে পাওনি, তাই না?
ইমা মৃদু হেসে বলল,
— আমি পরে তোমার মামার কাছ থেকে শুনে নেব, মা।
এই সময় সূর্যটা পশ্চিম দিগন্তে লাল রঙ ছড়িয়ে অস্ত যেতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, বেলা আর বেশিক্ষণ নেই। সবাই নাস্তা শেষ করে আসর থেকে উঠল। নেহা ও তানভীর খেলতে ছুটল উঠোনে। বিকেলবেলা খেলাধুলা না করলে কি আর বিকেল জমে?
ইমন সাহেব ও নাফিজ, দুই পুরনো বন্ধু, একটু বাইরে হাঁটতে বের হলেন। এদিকে ইমা রাতের রান্না বসাতে রান্নাঘরে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ইমন সাহেব নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— জানিস বন্ধু, কতদিন পর এই দিগন্তবিস্তৃত তেপান্তরের মাঠ চোখভরে দেখছি! আহ্, কী অপার সৌন্দর্য আল্লাহর সৃষ্টি! জেলখানায় তো এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি কখনও।
নাফিজ মৃদু হেসে বলল,
— তা ঠিক বলেছিস। জেলখানায় এমন দৃশ্য কোথায় পাবি? চার দেয়ালের ভেতর জীবনটা বন্দি হয়ে থাকে।
নাফিজ কিছুটা থেমে বললেন,
— বলতো বন্ধু, ঐ অন্ধ ভূগর্ভে একা একা থাকতে কেমন লাগতো? ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পোশাক— সবকিছুই আলাদা। কিভাবে মানিয়ে নিয়েছিলি?
ইমন সাহেবের মুখে স্মৃতির ছায়া নেমে এলো।
— প্রথম দিকে ভীষণ কষ্ট হতো। মনটা সবসময় বাড়িতে পড়ে থাকতো। চোখের জল থামাতে পারতাম না। স্ত্রী-সন্তানের মুখটা ভেসে উঠত প্রতিটি রাতে। কিন্তু চাইলেই তো আর ফিরে আসা যায় না। সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে ভিন্ন মানুষদের সাথে মিশতে শুরু করলাম। একসময় ওটাই আমার পৃথিবী হয়ে উঠল।
নাফিজ নিঃশব্দে বলল,
— আসলেই বন্ধু, তোর সাথে বড় অন্যায় হয়েছে।
ইমন হাসলেন,
— বাদ দে নাফিজ, পুরনো কথা মনে করতে চাই না আর। বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।
— ঠিক আছে বন্ধু, আর পুরনো স্মৃতি মনে করবি না।
এই সময় সন্ধ্যামালতির ঘ্রাণ বাতাসে মিশে গেল। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে, চারিদিক যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। ওরা বুঝে নিল— মাগরিবের আজান পড়তে আর বেশিক্ষণ নেই।
দুজন ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পথে তালহার সঙ্গে দেখা। এবার তিনজন একসাথে সালাতুল মাগরিব আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদমুখী হলো।
চলবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now