বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

দোষের কাঁধে সমাজের ছায়া

"শিক্ষা উপকরন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। কেশবপুর গ্রামে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতেই চারদিকে হাহাকার পড়ে গেল। স্কুল থেকে পরীক্ষায় বসেছিল মোট আটাশজন। ফল বেরোল—একুশজন ফেল। গ্রাম যেন উত্তপ্ত চুল্লি, সবাই একসাথে দোষ খুঁজে বেড়াতে লাগল। আর তাদের চোখ গিয়ে পড়ল এক জায়গায়—প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের। বিকেলের দিকে কিছু যুবক আর অভিভাবক একসাথে স্কুলে ছুটে এল। আব্দুল কাদের তখন অফিসে বসে কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন। হঠাৎ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন কয়েকজন। —“স্যার, আপনিই দায়ী! সবাই ফেল করছে আর আপনি আরামে বেতন খাচ্ছেন?” —“এটা যদি শিক্ষা হয়, তবে দরকার নাই!” কথা বাড়ল, গালমন্দ হলো, শেষে কাদেরকে টেনে বের করে দিল স্কুলের বারান্দায়। প্রধান শিক্ষক অপমানিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে মনে প্রশ্ন করলেন—সত্যিই কি সব দোষ তার? ________________________________________ স্মৃতির ভেতর ফিরে যেতে লাগলেন তিনি। জানেন তো, এই আটাশজনের ভেতর ষোলো জন ছাত্রী। তাদের বারোজনই বিবাহিতা। অনেকে তো পরীক্ষায় বসতেই চাইনি। শ্বশুরবাড়ি অনুমতি দেয়নি। শিক্ষকেরা বুঝিয়ে, অনুরোধ করে, প্রায় জোর করেই পরীক্ষার হলে পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে এগারোজন একেবারেই ফেল করল। আরেকজনের তো পরীক্ষার আগের দিনই বিয়ে হয়ে গেল। বিদেশ ফেরত স্বামীর ছুটি কম—বিয়ের আয়োজন তড়িঘড়ি। মেয়ে সব বিষয়ে বসতেই পারেনি। খাতায় ফাঁকা জায়গা রেখে কী আর পাশের আশা করা যায়! অন্যদিকে একজন ছেলে পরীক্ষা দিয়ে বিদেশ চলে গেল। ভাই আগেই টিকিট কেটে রেখেছিল। প্র্যাক্টিক্যালে বসতে পারেনি। ফলাফল অবধারিত। কাদের মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানেন, এই ছাত্রছাত্রীরা রাতে পড়ার টেবিলে বসে না। হাতে থাকে মোবাইল, চোখ থাকে ফেসবুক-টিকটকে। অভিভাবকদের জানালেও তারা অসহায়ত্ব দেখায়। অথচ যখন অভিভাবক সভা করা হয়, ডাকাডাকি করে ডাকা হয়, তখনও হাজির হয় পাঁচ-ছয়জনের বেশি নয়। শীতের রাতে শিক্ষকেরা হোম ভিজিটে গিয়ে দেখেছে, ছেলে বাইরে ব্যাডমিন্টন খেলছে, মেয়ে মায়ের সাথে টিভি নাটক দেখছে। পড়াশোনা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। ছাত্ররা প্রকাশ্যে বলে দেয়—“স্যার, পড়ে লাভ কী? বিদেশ চলে যাব।” এমন অবস্থায় কীভাবে ভালো ফল আসবে? ________________________________________ তবু গ্রামের মানুষ এ সব শোনে না। তারা শুধু ফলাফল দেখে। ফল খারাপ মানেই শিক্ষকরা দায়ী। আর সেই দায় এসে গড়ায় এক জায়গায়—প্রধান শিক্ষকের কাঁধে। কাদের জানেন, স্কুলে বারোজন শিক্ষক। কিন্তু তাদের তিনজন সকালে বাজারে ব্যবসা করে, বিকেলে আবার দোকান সামলায়। সরকারী বেতন দিয়ে মাসের বিশ তারিখের পর সংসার চলে না, তাই তারা স্কুলকে করে দ্বিতীয় কাজ। আরও দুইজন সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার মানে নিজের চেয়ার ভেঙে ফেলা। বাকি শিক্ষকরা সেই দুইজনের পেছনে “জ্বী স্যার, জ্বী স্যার” বলে ঘুরে বেড়ায়। তিনি চেষ্টা করেছেন মিটিং ডাকতে, বারবার অভিভাবকদের বোঝাতে। কিন্তু তিনি জানেন, এই সমাজে শিক্ষার চেয়ে বিয়ে, বিদেশ, টাকার লোভই বড়। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাবা-মায়েরা মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অর্ধেক মেয়ে ঝরে পড়ে। বাকি যারা থাকে, তারাও আশায় আশায় দিন গোনে—কখন বিয়ে হবে, কখন বিদেশের টিকিট মিলবে। এই পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক যদি কড়া শাসন করেন, তবে তার শত্রু তৈরি হবে। তিনি চাননি চেয়ার হারাতে, তাই মুখ বুজে থেকেছেন। এই দোষ তার নিজেরও। ________________________________________ কিন্তু আজ যখন তাকে বারান্দা থেকে ঠেলে বের করা হলো, গ্রামের মানুষ যখন তাকে অপরাধীর আসনে বসাল, তখন কাদেরের বুকটা হাহাকার করে উঠল। তিনি জানেন, একার দোষ তার নয়। এটা সবার দোষ। ছাত্রের দোষ আছে, অভিভাবকের দোষ আছে, শিক্ষকের দোষ আছে, এমনকি সমাজেরও। কিন্তু মানুষ চায় একজনকে দায়ী করতে। আর সেই দায়ভার চাপানো সবচেয়ে সহজ যাকে করা যায়—প্রধান শিক্ষক। রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরে তিনি স্ত্রীর সামনে চুপচাপ বসে রইলেন। মেয়ে এসে প্রশ্ন করল— “আব্বা, তুমি কি সত্যিই দোষী?” কাদের মৃদু হেসে মাথা নুইয়ে বললেন— “দোষ শুধু আমার নয় মা। আসলে এই সমাজটাই দোষী।” জানালার বাইরে তাকাতেই দূরে মাঠে আলো জ্বলছে। কিশোররা ব্যাডমিন্টন খেলছে, হাসছে, উল্লাস করছে। অথচ তাদের খাতায় অঙ্কের সূত্র ফাঁকা পড়ে আছে, ইতিহাসের অধ্যায় পড়া হয়নি, ইংরেজি ব্যাকরণের বাক্য বানানো হয়নি। প্রধান শিক্ষকের বুকের ভেতর ঢেউ খেলে গেল। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন— “আমার কাঁধে এত ভার চাপালেও কি আগামী বছর সব পাশ করবে? নাকি আবারও কেউ না কেউ বলির পাঁঠা হবে?” সেই প্রশ্নের উত্তর চারদিকে নিস্তব্ধ রাতও দিতে পারল না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now