বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রুম নাম্বার ৪০৭
লেখক: নীল
হোস্টেলের বারান্দায় পা রাখতেই অদ্ভুত একটা শীতলতা অনুভব করলাম। পুরোনো লাল ইটের দেয়াল, খসে পড়া চুনকাম আর স্যাঁতসেঁতে ভেজা গন্ধ—সবকিছু মিলে একটা চাপা রহস্য যেন চারিদিকে জড়িয়ে আছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে ধুলোমাখা আলোয় করিডোরটাকে আরও ভৌতিক দেখাচ্ছিল। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে একটা জিনিস আমার চোখ আটকে গেলো, করিডোরের শেষ মাথার রুমটা। কালো হরফে লেখা রুম নম্বর: ৪০৭। দিনের আলোয় এটা একটা সাধারণ বন্ধ দরজা মনে হলেও, রাতে ওই দরজার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হিমশীতল হয়ে আসত। সে রাতে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘন কালো অন্ধকার চারদিক গ্রাস করে আছে। হোস্টেলের করিডোর নিস্তব্ধ। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, হঠাৎ চোখে পড়লো করিডোরের শেষ প্রান্তে থাকা সেই রহস্যময় রুমটির দিকে। ৪০৭ নাম্বার রুমের দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। অথচ, আমি নিশ্চিত ছিলাম, রুমটা সবসময় তালা দেওয়া থাকে। দরজার ফাঁক দিয়ে এক অদ্ভুত আলো বেরিয়ে আসছে। কোনো সাধারণ হলুদ বা সাদা আলো নয়, বরং এক ধরনের ফ্যাকাশে আভা, যেন মৃত মানুষের চামড়ার মতো। আর সেই আলোয় ভেসে আসছিল এক করুণ শব্দ। কখনো মনে হচ্ছিল কিশোরী মেয়ের কান্না, আবার কখনো বয়স্ক কারো চাপা নিঃশ্বাস।
আমার শরীর অবশ হয়ে এলো। এক অজানা ভয়ে ধীরে ধীরে আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। আর ঠিক তখনই, দরজার ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার হৃৎপিণ্ড যেন থেমে গেল। ছাদের সাথে ঝুলে থাকা একটা মানব দেহ। পা দুটো ধীরে ধীরে দুলছে, খাটের লোহার ফ্রেমে ঠকঠক শব্দ করছে। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। হঠাৎ করেই ভেতরের আলোটা দপ করে নিভে গেল। সবকিছু আবার আগের মতো অন্ধকার। আমি দৌড়ে আমার রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। পরদিন সকালে আমার বন্ধু আরিফকে সবকিছু খুলে বললাম। আমার কথা শুনে সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফিসফিস করে বললো, “তুই ওই রুম নিয়ে আর কারো সাথে বলিস কথা না।”
তখন তার কথায় জানতে পারলাম এক ভয়ংকর অতীত। কয়েক বছর আগে এখানে এক ছাত্র থাকতো, যে গোপনে ব্ল্যাক ম্যাজিক চর্চা করত। এক রাতে তার লাশ ওই রুমের ছাদ থেকে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। কেউ বলে সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে, আবার কেউ বলে তার ব্ল্যাক ম্যাজিকই তার মৃত্যুর কারণ। এরপর থেকে রুমটা তালা মারা থাকলেও, মাঝেমধ্যে গভীর রাতে নাকি ভেতরের চাপা কান্না আর শব্দ শোনা যায়। আরিফের কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এর পর থেকে হোস্টেলে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। রাতে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম বইপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। কোনো কোনো রাতে শুনতে পেতাম করিডোরে কারো পা টেনে হাঁটার শব্দ। একবার আমার এক বন্ধু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো, গভীর রাতে তার বুকের ওপর কেউ যেন ভারি শরীর নিয়ে বসেছিল, যার কারণে তার শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল। আমার নিজের অবস্থাও খারাপ হতে লাগল। প্রতিদিন রাতে মনে হতো ৪০৭ নম্বর রুমের দিক থেকে কেউ যেন আমাকে দেখছে। এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম, গলায় দড়ি বাঁধা একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ কোটরের ভেতর জ্বলজ্বল করছে। সে ফিসফিস করে বলছে, “আমাকে মুক্তি দাও… আমি ভুল করেছি…”।
ঘুম ভাঙতেই ঘামে ভিজে গেলাম। আমার হাতের তালুতে পোড়ার মতো অদ্ভুত এক চিহ্ন দেখতে পেলাম। ঘটনা এতটাই বেড়ে গেল যে ইনচার্জ একজন আলেমকে ডাকলেন। আলেম করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ৪০৭ নাম্বার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখ বন্ধ করে তিনি বললেন, “এখানে ভারি উপস্থিতি আছে। এটা সাধারণ আত্মা নয়, অভিশপ্ত আত্মা। ব্ল্যাক ম্যাজিকের কারণে তার আত্মা এখানে আটকে আছে। মুক্তি না দিলে এই হোস্টেল শান্ত হবে না।”
তার কথা শুনে আমার গা শিউরে উঠলো। এই ঘটনাগুলো শুধুই কি দুঃস্বপ্ন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো রহস্য? আলেমের কথাগুলো আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।
"অভিশপ্ত আত্মা", "মুক্তি না দিলে হোস্টেল শান্ত হবে না"—এই কথাগুলো যেন বুকের ভেতর একটা হিমশীতল পাথর ফেলে দিলো। হোস্টেলের বাকি সবাই ভয় পেলেও, আমার মনে একটা অদ্ভুত কৌতূহল জেঁকে বসল। কেন কেবল আমিই সেই ছেলেটিকে স্বপ্নে দেখি? কেনই বা আমার হাতের তালুতে পোড়ার মতো সেই চিহ্ন? পরের কয়েকটা দিন আমি লাইব্রেরিতে পুরোনো কাগজপত্রের খোঁজে কাটাতাম। ইনচার্জকে বলে হোস্টেলের অতীত সম্পর্কে কিছু তথ্য পেলাম। অনেক বছর আগে এখানে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। এক ছাত্র, যার নাম শামীম, ৪০৭ নম্বর রুমে থাকত। সে নাকি মেধাবী হলেও একটু অন্তর্মুখী ছিল। তার ডায়েরি থেকে জানা যায়, সে ব্ল্যাক ম্যাজিক নয়, বরং প্রাচীন মিসরীয় আত্মার মুক্তির এক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছিল। তার বিশ্বাস ছিল, সে মৃত আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে এবং তাদের মুক্তি দিতে পারবে। এই তথ্যগুলো যখন আমার হাতে এলো, তখন মাথার ভেতরের সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করলো। শামীম আত্মহত্যার চেষ্টা করেনি, তাকে কেউ জোর করে ঝুলিয়ে দেয়নি। তাহলে কী হয়েছিল? কেন তার আত্মা মুক্তি পায়নি? আলেমের কাছে ফিরে গেলাম। তিনি আমার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুমি সেই ছেলের আত্মাটাকে স্বপ্ন দেখেছ, কারণ তার আত্মা তোমার সাথেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হাতের সেই চিহ্ন হলো তার বার্তা।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিন্তু কী বার্তা?”
আলেম বললেন, “তার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার বার্তা। সে মুক্তি চায়। কিন্তু তাকে মুক্তি দিতে হলে ওই রুমের ভেতর থেকে এমন কিছু খুঁজে বের করতে হবে, যা তার কাজ সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করবে।”
আলেমের কথায় আমার মনে জেদ চেপে বসল। আমাকেই এই রহস্যের সমাধান করতে হবে। রাতের বেলা, যখন পুরো হোস্টেল ঘুমিয়ে, আমি টর্চ হাতে করিডোরের দিকে এগোলাম। ৪০৭ নম্বর রুমের তালা ভাঙার সাহস আমার ছিল না। কিন্তু ভাগ্যক্রমে, আমি একটা পুরোনো তার খুঁজে পেলাম। অনেক কষ্টে আমি সেই তার দিয়ে তালাটা খুললাম। দরজাটা খোলার সাথে সাথেই একটা পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এলো। টর্চের আলো ফেলতেই দেখি, রুমটা যেমনটা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, তেমনই। দেয়ালজুড়ে অদ্ভুত সব চিত্র। একপাশে কিছু পুরোনো বইপত্র ছড়ানো। মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল, আর তার উপরে একটা খোলা ডায়েরি। আমার হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হতে লাগল। ডায়েরিটা হাতে নিয়েই দেখলাম, শেষ পাতায় কিছু অস্পষ্ট লেখা। মনে হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে।
লেখাগুলো এরকম:
"মুক্তি নেই… আমি ভুল করেছি… সে আমার ভেতরে আছে… দরজা বন্ধ… মুক্তি... মুক্ত... করো... আমাকে..."
হঠাৎ, আমার মনে হলো কে যেন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি দ্রুত ডায়েরিটা বন্ধ করে পিছিয়ে গেলাম। টর্চের আলোয় দেখলাম, ডায়েরির কভারের উপর একফোঁটা তাজা রক্ত। আর তখনই, আমার হাতের তালুর সেই পোড়া চিহ্নটা জ্বলে উঠলো। মনে হলো হাজারটা পিন দিয়ে কেউ আমার হাতে খোঁচা দিচ্ছে। আমি তীব্র ব্যথায় ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিলাম। আলোটা নিভে গেল, আর আমি সেই অন্ধকার রুমে একা দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলাম। আমার হাত জ্বলছে। ডায়েরিটা ফেলে দিয়ে আমি অন্ধকারের মধ্যে ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল রুমের প্রতিটি কোনা থেকে অশুভ শক্তি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাতের তালুর সেই পোড়া চিহ্নটা তখনো দপদপ করছে। তীব্র ব্যথার সাথে সাথে মনে হলো, সেই চিহ্ন থেকে যেন কিছু একটা শক্তি আমার শরীরে প্রবেশ করছে। আমি দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। করিডোরে তখনো নীরবতা, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যেন পেছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। কোনো রকমে নিজের রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিলাম। হাতটা ধরে বসে রইলাম। জ্বলুনিটা ধীরে ধীরে কমলো। কিন্তু আমি দেখলাম, সেই চিহ্নটা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। মনে হলো, এই চিহ্নটা শুধু একটা দাগ নয়, এটা কোনো এক অদৃশ্য চুক্তির অংশ। পরের দিন আরিফকে সব বললাম। সে প্রথমে আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছিল না, যতক্ষণ না আমি তাকে হাতের পোড়া দাগটা দেখালাম। সে ভয়ে আঁতকে উঠল। আরিফ আমাকে বলল, "তুই ভুল করছিস। এই সব থেকে দূরে থাক। আলেম যখন বলেছেন, তখন এর গভীরে যাওয়াটা তোর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।"
কিন্তু আমি পিছিয়ে আসতে পারলাম না। আমার ভেতরটা তখন কৌতূহল আর জেদে ভরপুর। সেই রাতে, আমি আবার হোস্টেলের করিডোরের দিকে গেলাম। তবে এবার একা নয়, হাতে একটা পুরোনো টর্চলাইট আর একটা ছোট ক্যামেরা।
৪০৭ নম্বর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ভেতর থেকে কেউ আমাকে ডাকছে। খুব সাবধানে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। টর্চের আলো ফেলে খুঁজে বের করলাম সেই ডায়েরিটা। কভারের ওপর রক্তের দাগ তখনো শুকিয়ে আছে। আমি ডায়েরির পাতা উল্টাতে শুরু করলাম। প্রতিটি পাতায় শামীমের হাতের লেখা, তার সাধনার বর্ণনা। সে ব্ল্যাক ম্যাজিক নয়, বরং আত্মা মুক্তির এক পবিত্র পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছিল। তার ডায়েরিতে লেখা ছিল, "আর্কিভিস" নামের এক প্রাচীন মন্ত্র, যা শুধুমাত্র সঠিক দিনে এবং সঠিক সময়ে উচ্চারণ করলে অভিশপ্ত আত্মাকে মুক্তি দেওয়া যায়। ডায়েরির শেষ পাতায় গিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে শামীমের লেখা ছিল:
"আজ পূর্ণিমা রাত। আজ আমি আর্কিভিস মন্ত্র উচ্চারণ করব। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি সেই অভিশপ্ত আত্মাকে মুক্তি দেব।"
কিন্তু তার পরের পাতাতেই ছিল এক ভিন্ন ধরনের লেখা, যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে লিখেছে, অথবা রক্ত দিয়ে লিখেছে:
"মুক্তি নেই… শামীম, তুমি ভুল করেছ। এই আত্মা মুক্ত হবে না। আমি তোমার মধ্যেই বাস করব... তুমিই আমার মুক্তি... তুমিই আমার দেহ।"
লেখাটা পড়ে আমার গা শিউরে উঠলো। তাহলে কি সেই আত্মা শামীমের দেহেই প্রবেশ করে তাকে মেরে ফেলেছে? আর সেই আত্মা এখন আমাকেই তার লক্ষ্য বানিয়েছে? হঠাৎ আমার টর্চের আলো নিভে গেল। পুরো রুমটা আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। আর তখনই আমি একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস আমার কানের কাছে অনুভব করলাম।
"ভুল করেছিস... তুইও ভুল করেছিস"....
আমার কানের কাছে সেই ফিসফিসানি, "ভুল করেছিস... তুইও ভুল করেছিস।" শুনে আমার শরীরের সব রক্ত যেন জমাট বেঁধে গেল। টর্চের আলো নিভে গেলেও, ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা সেই রক্তের মতো গাঢ় লেখাটা আমার চোখের সামনে ভাসছে। আমি তীব্র ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। আমার গলা দিয়ে শুধু একটা গোঙানির শব্দ বের হলো। হঠাৎ করেই দরজাটা ধড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। কোনো বাতাস ছিল না, অথচ দরজাটা যেন নিজেই বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকারে আমার মনে হলো, কেউ যেন আমার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। আমি অনুভব করতে পারলাম তার উপস্থিতি। শীতল, ভারী একটা নিঃশ্বাস আমার মাথার উপর দিয়ে বইছে।
"আমাকে খুঁজতে এসেছিস? আমাকে মুক্ত করতে এসেছিস?" সেই ফিসফিসানি এবার আরও স্পষ্ট, আরও কাছে। মনে হচ্ছিল সেই আত্মা আমার মাথার ভেতরে কথা বলছে। আমি হাতড়ে হাতড়ে দেয়াল খুঁজতে লাগলাম। এক হাতে ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে রেখেছি, অন্য হাতে দেয়াল ধরে কোনো রকমে দরজার দিকে এগোচ্ছি। অন্ধকারের মধ্যে সবকিছু এলোমেলো মনে হচ্ছিল। পায়ের নিচে পুরোনো কাঠের ঘষা লাগার শব্দ। হঠাৎই পায়ের নিচে নরম কিছু অনুভব করলাম। টর্চটা নিভে গেলেও তারার ক্ষীণ আলোতে দেখতে পেলাম, শামীমের লাশটা যেন আমার পায়ের নিচে। আমি চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলাম, আর তখনই আমার হাত থেকে ডায়েরিটা মেঝেতে পড়ে গেল।
"ভয় পাচ্ছিস কেন, রাজ? তোর হাত তো আমাকে চিনে ফেলেছে।"
আমার হাতের তালুর সেই পোড়া দাগটা তখন আবার জ্বলে উঠলো। সেই জ্বলুনিটা আমাকে যেন ৪০৭ নম্বর রুমের মেঝেতে আটকে ফেলছে। আর তখনই দরজার দিকে তাকাতেই দেখি, দরজার ফাঁক দিয়ে সেই ফ্যাকাশে আলো আবার বের হচ্ছে। এবার আলোতে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম—ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে একটা অস্পষ্ট ছায়া। ছায়াটা ধীরে ধীরে নড়ছে। যেন ঝুলে থাকা লাশটার পা দুটো দুলছে। আমি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম। হাত দিয়ে তালাটা খুলতে পারছিলাম না। কাঁপছিলাম। কোনো রকমে তালা খুলে বাইরে এসে দেখি, করিডোরটা অন্ধকার। আমার পায়ের নিচে জমে থাকা ভেজা পানি। কোথা থেকে এসেছে জানি না। কিন্তু এই পানি দিয়েই শামীমের ডায়েরিতে রক্তের দাগ তৈরি হয়েছে। আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে আমার রুমে ফিরে এলাম। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে রইলাম। হাতে তখনো সেই পোড়া দাগটা জ্বলছে। এই দাগটা আমার আর ওই অভিশপ্ত আত্মার মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে। শামীমের মতোই। আমি বুঝতে পারলাম, শামীম সেই আত্মাকে মুক্তি দিতে গিয়ে নিজেই তার শিকার হয়েছে। এবং এখন সেই আত্মা আমাকেই ব্যবহার করবে। আমাকে এখন এই অভিশপ্ত আত্মা থেকে মুক্তি পেতে হলে সেই 'আর্কিভিস' মন্ত্র খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু আমি কি পারব?
আমার হাতের পোড়া দাগটা জ্বলছে। এই জ্বলুনিটা আমাকে শামীমের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম, শামীম ব্ল্যাক ম্যাজিক নয়, বরং আত্মাদের মুক্তির জন্য এই মন্ত্রের সন্ধান করেছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে সফল হতে পারেনি, উল্টো সেই আত্মা তার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে মেরে ফেলেছে। এখন সেই আত্মা আমাকে ব্যবহার করে মুক্তি পেতে চাইছে। আমি কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে ভয় পেলাম না, কারণ আমি জানতাম, আমাকেই এই রহস্যের সমাধান করতে হবে। আমি এবার আর কোনো দ্বিধা না করে আবার ৪০৭ নম্বর রুমের দিকে গেলাম। হাতে নিলাম শামীমের ডায়েরিটা। এবার আর কোনো ভয় নেই, কেবল একটা গভীর সংকল্প। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই রুমের ভেতরটা আগের মতোই ঠান্ডা আর স্যাঁতসেঁতে। ডায়েরিটা খুলে আমি আর্কিভিস মন্ত্রটা জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম। প্রথমেই কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু যখন আমি মন্ত্রের শেষ অংশটা উচ্চারণ করলাম, তখন হঠাৎই রুমের ভেতর এক ধরনের নীলচে আলোয় ঝলসে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম, শামীমের লাশটা যেখানে ঝুলছিল, ঠিক তার নিচেই একটা অস্পষ্ট অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। অবয়বটা প্রথমে স্থির ছিল, তারপর ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমার শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। কিন্তু আমি মন্ত্র পড়া বন্ধ করলাম না। তখনই আমার হাতের পোড়া দাগটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেন কোনো একটা শক্তির উৎস.. "আমি তোমাকে মুক্তি দেবো।" আমি চিৎকার করে বললাম। সেই আত্মাটা আমার দিকে তাকিয়েছিল। তার চোখে ভয় ছিল, কিন্তু ঘৃণা ছিল না। সে যেন আমার কাছে ভিক্ষা চাইছিল। মন্ত্রটা সম্পূর্ণ করার সাথে সাথেই সেই আত্মাটা থেকে এক ধরনের ফিসফিসানি শব্দ বের হলো। মনে হলো সে বলছে, "ধন্যবাদ... ধন্যবাদ..."।
হঠাৎ করেই রুমের ভেতর থেকে সেই অশুভ উপস্থিতিটা চলে গেল। রুমের ভেতরকার বাতাসটা স্বাভাবিক হয়ে গেল। আর আমার হাতের পোড়া দাগটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করলো। আমি ডায়েরিটা হাতে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। পুরো শরীর দুর্বল হয়ে গেল। মনে হলো, হাজার বছরের পুরোনো বোঝা আমার কাঁধ থেকে নেমে গেল। আমি বুঝলাম, সেই আত্মা কোনো অভিশপ্ত আত্মা ছিল না, বরং শামীমের ভুলের কারণে একটি অসহায় আত্মা এখানে আটকে গিয়েছিল। এরপর থেকে হোস্টেলে আর কোনো ভৌতিক ঘটনা ঘটেনি। রাতের বেলায় করিডোর থেকে আর কোনো শব্দ আসে না। ৪০৭ নম্বর রুমের দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকে। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই রুমের ভেতর থেকে যেন কোনো এক নীরব শান্তি প্রবাহিত হচ্ছে। আমি সেই রাতে সেই রুমে শামীমের ডায়েরিটা রেখে দিয়েছিলাম। কারণ, সেই ডায়েরি আর সেই রুম শামীমের মুক্তির একমাত্র সাক্ষী হয়ে থাকবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now