বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গুণের পথে আলোকযাত্রী

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। একটি ছোট্ট গ্রামীণ বিদ্যালয়ের সকাল। চারপাশে শিশিরভেজা ঘাস, মাঠের ধারে কাকের ডাক, আর কচি মুখগুলোর কোলাহলে যেন গ্রামটা নতুন করে জেগে উঠেছে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করেই রবিউল স্যার প্রতিদিনের মতো ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষে লিখলেন দিনের প্রথম পাঠ। কিন্তু তার ভেতরে তখন অন্য রকম আলোড়ন। কয়েকদিন আগে শুনেছেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সরকার “গুণী শিক্ষক” নির্বাচন করে। উপজেলা থেকে শুরু হয় সেই যাত্রা, ধাপে ধাপে পৌঁছায় জাতীয় মঞ্চে। এই খবর তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত স্বপ্ন বুনে দিয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে রবিউল স্যারের মনে হলো, প্রতিটি চোখ যেন প্রত্যাশার প্রদীপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই শিশুদের জীবন গড়ে তোলার জন্যই তো তিনি প্রতিদিন ছুটে আসেন। কিন্তু শুধু পাঠ্যপুস্তক পড়ানো কি যথেষ্ট? একজন গুণী শিক্ষক হওয়ার জন্য যে আরও অনেক গুণ, অনেক প্রচেষ্টা, অনেক সৃজনশীলতা প্রয়োজন, সেটা তিনি এখন বুঝতে পারছেন। সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফিরে তিনি বসে পড়েন। হাতে একটি কাগজ—“গুণী শিক্ষক বাছাই ছক–২০২৫।” সেখানে নয়টি সূচক। প্রতিটি সূচকের ভেতরে একাধিক মানদণ্ড। তিনি চোখ বুলিয়ে দেখেন। কিছু জায়গায় তিনি স্বস্তি পান—যেমন ছাত্রদের প্রতি মমতা, নিয়মিত উপস্থিতি, সময়ানুবর্তিতা। এগুলো তো তার রক্তের ভেতরেই মিশে আছে। আবার কিছু সূচক তাকে ভাবনায় ফেলে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশ, শিক্ষণ কৌশলের নতুনত্ব—এসব জায়গায় তার অর্জন অর্ধেকেরও কম। আর কিছু জায়গায় তো একেবারেই শূন্য। সেই শূন্যতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারেন, গুণী শিক্ষক হতে হলে তাকে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। তবে ভয় পান না তিনি। বরং এই আত্মসমালোচনা তাকে সাহসী করে তোলে। তার মনে পড়ে যায় কিছু গুণী শিক্ষকের গল্প। পাশের গ্রামের আব্দুল কাদের স্যার নিজের টাকায় শিশুদের জন্য ছোট্ট লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। মুক্তার স্যার ক্লাসে প্রতিদিন গল্প শোনাতেন, আর সেই গল্পের ভেতরেই ছাত্ররা জীবনবোধ খুঁজে পেত। এ ধরনের কর্মকাণ্ডই তো গুণী শিক্ষক হওয়ার আসল পরিচয়। রবিউল স্যার একদিন দেখলেন, তৃতীয় শ্রেণির রুবেল পড়াশোনায় খুব পিছিয়ে আছে। বই কেনার টাকাও নেই। স্যার নিজেই বই কিনে দিলেন, প্রতিদিন স্কুল শেষে রুবেলকে আলাদা করে পড়ালেন। কয়েক মাস পর সেই রুবেল পরীক্ষায় শ্রেণির সেরা হলো। অন্যদিকে নুসরাত নামে এক ছাত্রী ছিল, যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পেত। কিন্তু আঁকায় তার দারুণ দক্ষতা। স্যার তাকে বোর্ডে ছবি আঁকার সুযোগ দিলেন। ধীরে ধীরে নুসরাতের ভয় কেটে গেল, ক্লাসে উত্তর দেওয়ার সময় তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ঝলমল করতে লাগল। এসব ছোট ছোট পরিবর্তন যেন স্যারের মনকে ভরিয়ে দেয় গর্বে। তিনি ভাবেন, “গুণী শিক্ষক নির্বাচনের মঞ্চে উঠতে পারি কি না জানি না, কিন্তু এ শিশুর হাসিই তো আমার আসল সম্মান।” তবুও মনের কোণে এক স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে। যদি উপজেলা পর্যায়ে তার নাম আসে? যদি জেলা, বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তিনি দাঁড়াতে পারেন? যদি তার ছাত্ররা টেলিভিশনে তাকে দেখে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—“ওই আমাদের স্যার!”? সেই কল্পনায় তার চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু তিনি জানেন, এ স্বপ্ন পূরণ হোক বা না হোক, আসল সাফল্য হলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর পরিবর্তন, প্রতিটি অভিভাবকের মুখে ভরসার কথা, প্রতিটি প্রাক্তন ছাত্রের কৃতজ্ঞতা। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের দিন স্কুলে ছোট্ট আয়োজন হলো। মঞ্চে বসে আছেন কর্মকর্তা, অভিভাবক, অতিথিরা। প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থীও এসেছে। একজন এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, আপনি শুধু পড়াশোনা শেখাননি, আমাদের মানুষ হতে শিখিয়েছেন।” সেই মুহূর্তে রবিউল স্যারের বুক ভরে গেল। করতালির শব্দে চারদিক মুখরিত হলো। তিনি মনে মনে বললেন, “গুণী শিক্ষক হতে সার্টিফিকেটের দরকার নেই। ছাত্রদের হৃদয় জয় করাই আসল পুরস্কার।” এভাবেই রবিউল স্যারের প্রতিদিনের যাত্রা চলতে থাকে—একটা স্বপ্নের হাতছানি, একটুকরো আত্মসমালোচনা আর অসংখ্য শিশুর হাসি-খুশির ভিড়ে। গুণী শিক্ষক হওয়া আসলে কোনো প্রতিযোগিতার পুরস্কার নয়, বরং এটি এক অবিরাম সাধনার নাম, যেখানে প্রতিদিন শেখা, প্রতিদিন ভালোবাসা আর প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প লেখা হয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now