বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১১
সাঁকোয়া নদীর ধারে বিশাল একটা বটগাছ, চারদিকে ছোট ছোট গাছপালা আর ঝাড়-জঙ্গলে ভরা। তার ভেতরে খরের ছাউনি ছাট-ছোট দু’টো কুঁড়েঘর। সেখানে দু’তিনজন বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী থাকে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে চাল, ডাল যা পায় নিয়ে এসে রান্না করে খায়। তার পরনে গেরুয়া রঙের শাড়ি, গলায় কাঠির মালা, হাতে একটা একতারা। রাত হলেই নিত্যদিন তারা সবাই মিলে গাছের নিচে বসে একতারা বাজিয়ে গান গায়। আর এভাবেই কেটে যায় তাদের জীবন।
নদীর পানি চোখের জলের মতো স্বচ্ছ। প্রকৃতির বুকে হাজারো পাখি গান গেয়ে মাতিয়ে তোলে তাদের আপন ভুবন। নদীর ধারে ভোরের শীতল বাতাস। এসব ভালো লাগার কারণে এ আশ্রম ছেড়ে যেতে চায় না বাউল মন। অনেকে পুরো জীবনটা এখানে কাটিয়ে দেন। বাউলদের কোনো সাজসজ্জা নেই। কোনো উৎসব নেই। কাকডাকা ভোরে স্নান সেরে ফুল তুলে মায়ের চরণে অর্ঘ্য দান, তারপর চুলোয় মাটির হাঁড়িতে ক’মুঠো চাল জ্বাল দিয়ে দু’চারটা আলু ভাতে সেদ্ধ করে খায়।
উঠানের দক্ষিণ-পূর্ব দিকটায় একটা ছোট্ট খড়ের ঘর অনেক দিন ধরে যে মেরামত হয় না, তা এর চালের ছাউনি দেখলে বুঝা যায়। এই ঘরে থাকেন কল্যাণী বৈষ্ণবী- এটাই তার শান্তির নীড়। দুটো বাঁশের খুঁটির মধ্যে একটা রশি দিয়ে আলনা তৈরি করা হয়েছে। যেখানে খান দুয়েক ময়লা ছেঁড়া থান কাপড়, ছেঁড়া জায়গাটার দু’প্রান্তে একসঙ্গে করে গিঁট বাঁধা। ঘরটার একপাশে বাঁশের তৈরি একটি মাচা। সেই মাচার উপর কতগুলো পোয়াল খড় তার উপর একটি ছেঁড়া কাঁথা বিছানো। এই হলো তাদের শোয়ার বিছানা। সেখানে একটি বালিশও নেই আর বালিশের কোন প্রয়োজনও তারা বোধ করে না। যখন একটু ঘুমের প্রয়োজন হয় তখন এমনিতেই ঘুম চলে আসে। সময় পেলে কল্যাণী এগুলো দিয়ে একটা কাঁথা তৈরি করতে বসে। তার বিছানার নিচে একটি মাটির হাঁড়ি ও একটি থালা। তার পাশে একটি পিতলের গ্লাস আছে। হয়তোবা সেটা তার কোনো পূর্বপুরুষের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
গভীর রাতে কল্যাণী বৈষ্ণবী বটগাছের তলে বসে ভাবে, এ জগৎ-সংসার বড় কঠিন জায়গা, চারদিকে কেবলই মায়ার জাল বিছানো। যে দিকে যাই না কেন সেই জালে আটকা পড়তে হয়। আর একবার আটকা পড়ে গেলে সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। কেবলই জালের ভেতরে ঘুরপাক খেতে খেতে বয়স বেড়ে যায়। চারিদিকে অম্লান জোৎস্না। সবুজ পাতার উপরে জোৎস্নার ঝলকানি প্রকৃতি যেন হাসছে। রাত খুব বেশি হয়নি তাই পাখিরাও এখনো জেগে আছে গাছের ডালে। মাঝে মাঝে সুখ দূখের আলাপচারিতায় তারও একসাথে কিচির মিচির করে সাড়া দিচ্ছে।
বেলাল একপা দু’পা করে এগিয়ে গিয়ে উপস্থিত হয় আশ্রমের ডান পার্শ্বের একটি ঘরে যেখানে বৈষ্ণবেরা থাকে। বেলাল ঘরের দরজায় যেয়ে ডাকে-ওস্তাদ? আরে ও ওস্তাদ? ঘরে আছো না কি?
কে ? কে ডাকে এতো রাতে?
কেউ নয় গুরু, আমি বেলাল।
ধলা বয়াতি ঘরের দরজা খুলে পড়নের ধুতিটা গিঠ দিতে দিতে বলে-কিরে বেলাল এতো রাতে কেন? বউয়ের সাথে আবার বুঝি ঝগড়া হয়েছে?
হ্যাঁঃ গুরু, ঠিকই ধরেছ। তাই সারা জীবনের জন্য চলে এলাম। আমাকে একটু থাকার জায়গা দাও।
তাতো থাকবিরে। এটাই যে তোর আসল জায়গা, এতোদিন ভুলকরে ভুল মায়ায় ডুবে, ভুল যায়গায় পড়েছিলি, সেটা আমি জানি। কাল সারাদিন যে এখানে পড়ে রইলি, সেই জন্যই বুঝি বোউ তোকে বকা-ঝকা করেছে?
হ্যাঁ গুরু, অনেকটা তাই। তবে এর কারণ অন্যটা।
সেটা আবার নতুন কিরে?
সে অনেক কথা গুরু। বলতে গেলে গোটা রাত কেটে যাবে, তবুও শেষ হবে না।
ও আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। আয় ভেতরে এসে বস, তারপর তোর কথা শুনি। রাতে কি পেটের ভেতর কিছু ঢুকেছে? নাকি সেটিও তোর ভাগ্যে জোটেনি।
না গুরু, কিছু খাওয়া হয়নি, তবে ক্ষুধা নেই।
সে আমি জানি, ঘরছেড়ে পালালে কারোও ক্ষুধা থাকে নারে। নবাব সিরাজ উদ-দৌলা যখন ঘর ছাড়ে সেই সময় তাঁরও ক্ষুধা ছিলনা। আহারে ভবের খেলা, সকালবেলা বাদশারে তুই ফকির সন্ধ্যা বেলা। দেখতো ঐ হাড়িটার ভেতরে কিছু পাস কি না? পেলে একটু খেয়ে নে, তারপর কথা বলি।
না থাক, লাগবেনা গুরু। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
সে কিরে? এই টুকুতেই এতো ভেঙ্গে পড়লি? খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলি? সামনে তো এখনো গোটা পথ বাকি, তার কি হবেরে?
অনন্যোপায় হয়ে বেলাল হাড়ির ভেতরে থাকা একটু আলুর ভর্তা আর ড্যালাপাঁকা ভাত খেয়ে নিল।
নিতাই বাউল বলে-আজ আর ঘুম আসবে না রে। চল গাছের তলে গিয়ে বসি। বেলালের কণ্ঠ কানে আসা মাত্র কল্যাণী বৈষ্ণবীর মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। আহা! ছেলেটা বড় দুখি। তাই কল্যাণী বৈষ্ণবী বিছানা ছেড়ে এসে বেলাল কে দেখে বলে-কি গো নয়া গোসাই, মনটাকে আর আটকে রাখতে পারলে না?
হ্যাঁ তাই গো দিদি? মনটা ভালো না, কোন কিছুই ভালো লাগছে না তাই চলে এলাম তোমাদের দল ভারী করতে।
মানুষ এখানে কি আর এমনি এমনি আসে গো নয়া গোসাই? ভগবানের কৃপায় আসে। কোথায় ছিলে এ কয়েক দিন?
সংসার নামক নরকের আখড়ায় ছিলাম গো দিদি। তোমার মতো দিদিকে ছেড়ে কি আর বেশিদিন থাকা যায়? তাই চলে এলাম।
এবার কল্যাণী বৈষ্ণবী মনে মনে একটু লজ্জায় পেল। স্বাভাবিক হওয়ার জন্য বলল-থাক হয়েছে এবার শোনাও দিকি তোমার বাঁশি। অনেক দিন তোমার বাঁশি শুনি না, বাজাও গো নয়া গোসাই, বাজাও।
মধ্যবয়সী একজন মানুষ মাথায় জটবাঁধা চুল, পরনে গেরুয়া রঙের ধুতি, গায়ে আলখাল্লার মতো লম্বা একটা ময়লাযুক্ত আদি কাপড়ের দু’প্রান্তে গিঁট দেয়া জামা। চোখ দুটো ভীষণ টানা-টানা, মায়াবি চেহারা, মুখভর্তি দাড়ি, গলায় দু’তিনখানা কাঠের মালা, চেহারার মধ্যে কোথায় যেন একটা আভিজাত্যের ভাব লুকিয়ে আছে। সম্ভবত বেলালের কথা শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে আসে। কোনো কথা বলে না। একতারাটা বার বার নেড়ে চেড়ে দেখে ঠিক ঠাক আছে কি না।
নিতাই বাউল তার সাথে বেলালের পরিচয় করিয়ে দেয়। বেলাল ও হচ্ছে কিরণ বাউল, ভারতের মাথাভাঙ্গা থেকে আজ এসেছে। তুই এসে ভালোই করেছিস। দলটা আরো ভারি হলো।
কল্যাণী বৈষ্ণবী বলে- নয়া গোসাই তোমার বাঁশিতে একটা গান ধরতো। মনের দুখে বেলাল বাঁশি বাজায়, কল্যাণী বৈষ্ণবী সারিন্দা হাতে নিয়ে বেলালের পাশে বসে, কিরণ বাউল খঞ্জনী হাতে নিয়ে দুলতে থাকে। বেলাল আকাশের দিকে তাকায় আর বাঁশিতে সুর তোলে আর নিতাই বাউল বাঁশির সুরে গান ধরে-
ও আমার দয়ার মালিক শাঁই
কোথায় গেলে তোমায় খুঁজে পাই।
তুমি ছাড়া যে আপন কেহ
এই ভুবনে নাই।
নিতাই বাউল একতারাটা ডানহাত দিয়ে মাথার উপরে উঠিয়ে বাজায় আর চারিেিক ঘুরে ঘরে নাচে। এভাবে কতরাত হয় কেউ জানে না । এক সময় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে কেউ নরম ঘাসের উপর, আবার কেউ গাছের শিকড়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
অনেক রাত পর্যন্ত বাঁশি বাজায় বেলাল, তার বাঁিশর বিলাপ কল্যাণীর হৃদয় স্পর্শ করে, করুণ সুর তার শিরায় শিরায় দুঃখপ্রবাহের সঞ্চরণ করতে থাকে কিন্তু কোন সান্তনার বাণী শোনাতে আসার মতো শক্তি তার নেই শুধু বিছানায় পড়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। যখন আর বাঁশির শব্দ কানে আসে না তখন সে ভাবে পাগলটা এবার বুঝি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, অন্তত এই রাত্রির জন্য শান্ত হয়েছে। কল্যাণীর আবাহন সমাপ্ত হলো, দুঃখের তীব্রতা অনেকটা প্রশমিত হলো।
‘‘কল্যাণী এই আশ্রমে কবে প্রথম এসেছে ঠিক মনে নেই। এতোদিন সে ভালোই ছিল, মাঝে মধ্যে দু’একবার যে রহমান বয়াতির কথা তার মনে হয় নি তা নয়, তবে এমন ভাবে পিড়া দেয়নি কখনো। বেলালের বাঁশির সুর তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় সজল বয়াতির কাছে। সজল বয়াতি ঠিক এমনি ভাবে বাঁশি বাজাত। তার বাঁশির করুণ সুর যেন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে উর্ধলোকে চলে যেতো।
মাঝখানে অনেক দিন গড়িয়ে গেল, কত সুখ-দুঃখের নিশি পার হল। হায়! কি ছিল আর কি হল তখনকার প্রত্যেকটি দিন কি মাধুরী প্লুত, কি শোভাময়, কি মধুময় সহজ আনন্দে জীবন ভরিয়ে যেতো। এখন কি হচ্ছে এসব? সে পর্ব তো কবে শেষ হয়ে গেছে ! শেষ হয়ে গেছে কল্যাণী, শেষ হয়ে গেছে সজল বয়াতি। তবে এখনও কেন প্রাণ কাঁদে তার জন্য? আসলে এ জগতটা বড় মায়ার জগত, এখানে আকাশ ভরা মায়া, চারিদিকে মায়ার নদী কেবল কল-কল, খল-খল করে। জীব-জগৎ এসবের মধ্যে কী পরম শান্তি কি সুখময় অনুভূতি আর যেন মনে কোন আশা নেই, কোন তৃষ্ণা নেই, পাপ নেই, পুণ্যের স্পৃহাও নেই, স্বর্গ ভোগের আকাক্সক্ষা নেই, সজল বয়াতির প্রতি প্রেমও নেই, শুধু আছে এক বুক ভরা কষ্টের অনুভূতি আর কিছু অরক্ষিত ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ময়লা স্মৃতি। কল্যাণীর বুকের ভেতরে প্রচণ্ড ঝড় ওঠেÑকালবৈশাখী ঝড়ের মত তোলপাড় করে দেয় তার ইহ জগত, যে আর চুপ থাকতে পারে না। হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলে।
স্বামী বিয়োগের পর যুবতী কল্যাণী স্বামীর ভিটে মাটি কামড়ে ধরে বেঁছে থাকার চেষ্টা করেছে। মন খারাপ হলে মাঝে মধ্যে সে আশ্রমে চলে আসত, বৈষ্ণবীদের গান শুনতো তাদের জীবনের সুখ দুঃখের কথা শুনতো। তাদের জীবনের কথা শুনে নিজের দুঃখ ভারটা লাঘব হতো। এই নোংরা, কলুষিত, জঘন্য রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাকে সুস্থরূপে বাঁচতে দেয়নি, দেয়নি সজলের সাথে তাকে ঘর করতে। মুসলমান বলে সে অন্য জগতের মানুষ নামের এক নরকবাসী। তার সাথে হিন্দু নারী! এ যে জাতেরই আত্মহুতি। এ সমাজে একজন পুরুষ অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক হয়ে সারা জীবন বাঁচতে পারে কিন্তু একজন নারীর বেলায় তা হয় সমাজের চক্ষুশূল। একজন নারী একা থাকলে তার চলতে, ফিরতে, খেতে, ঘুমাতে-একই আপত্তি। চরিত্রহীন পুরুষদের লোভনীয় দৃষ্টি পড়ে থাকে তার বুকে, পেটের খালি জায়গায়, কোমরের নিছে এমনকি চলার সমস্ত পথে। রক্ষণশীল সমাজের ভণ্ডামী আর বস্তাপঁচা রীতি নীতি তাকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে। আশ্রয় হয় কল্যাণীর এ আশ্রমে।
কল্যাণীর জীবনের সুখ দুঃখের কথা শোনে ভগবানের কৃপা পাওয়ার সুযোগ ঘটে। জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই, উত্থান পতন, অনেক দুর্বিষহ ঘটনা প্রবাহে সজল বয়াতি একেবারে চাপা পড়ে যায় তার জীবনে। কিন্তু চাপা পড়ে যাওয়া আর ভুলে যাওয়া তো এক জিনিস নয়? মানুষের মনের ভেতরে যে কুটির থাকে আর সেই কুটিরে যে অথিতি একবার স্থান পায়, যে একবার সে কুটির দখল করে, যেন তারই চিরকাল থাকে। আর কেউ কোনদিন সে কুটিরে প্রবেশ করতে পারে না। সে যদি চিরদিনের জন্য চলে যায় তবুও ঘরের দরজা বন্ধ থাকে। আর সেখানে অতীতের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার স্মৃতিগুলো কেবলি নাচা-নাচি করতে থাকে।
বসন্ত কালেরÑপ্রকৃতি ধুলোমাখা গরম বাতাস তাই সাঁকোয়া নদীর মুখো-মুখি করে বসে বেলাল নদীর এ পরিবর্তন তার মনের দৃষ্টি খুলে দেয় আজ নদীর বুকজুড়ে হাহাকার। চারদিকে কেবলই শূন্যতা। অথচ এক সময় এর দু’ক‚ল জুড়ে থই থই পানি, কি শক্তি তার, সবকিছুই ভেসে নিয়ে যায়। মানুষের এ ক্ষণস্থায়ী জীবনটাকে বেলাল স্যাঁকোয়া নদীর জীবনের সাথে মিল খুঁজে পায়। এক সময় তার নদীর মতো উত্থাল যৌবন ছিল, মনেও তেমনি জোর ছিল। কিন্তু আজ জীবনের মাঝপথে এসে সবকিছু কেমন ঘোরপাক খায়। গভীর অন্ধকারে নিস্তব্ধ প্রকৃতি জোনাকির মিটিমিটি আলোয় আলোকিত চারিদিক, হুক্কাটা হাতে নিয়ে পরপর দু’তিনটা টান দেয় বেলাল তাতেও নেশা লাগে না। হুক্কার গা নিজের ঘারের গামছা দিয়ে ভালো করে মুছে আবার টানা শুরু করে বেশ কয়েকটা টান দেয়ার পর মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে ওঠে। এবার বাঁশিটা হাতে নিয়ে পরনের লুঙ্গি দিয়ে মুছে তাতে ফু দেয় আর অমনি সুর চলে আসে-
জীবন নদীর ভাঙা তরী
ও মন বাইলি না তুই সাবধানে
যারে আপন করে বাঁধলি বুকে
দুঃখ দিল সেই জনে।
বেলাল মনে মনে ভাবে-হে আমার সৃষ্টিকর্তা আমি তোমার কাছে স্বর্গ চাইনা, স্বর্গের কোন সুখও চাইনা, তোমার বিশাল অনন্ত এ জগতের সকল পুণ্যতা তুমি মহাপুরুষদের মধ্যে রেখে দিও। তুমি এ মাটির পৃথিবীতে আমাকে নিয়ে এসে এই ফুল ফল, বৃক্ষরাজি, নদীর ঢেউ, পাখির গান এই মুগ্ধ মায়া জগতের মধ্যে এতটুকু স্থানে সুবর্ণ করার শক্তি দাও। আমি যেন এহ জগতের কামনা বাসনা মায়া মমতা ভুলে কেবল তোমার প্রকৃতি আর তোমাকে বুকের মধ্যে রাখতে পারি।
বাউলেরা প্রচলিত সব আনুষ্ঠানিক ধর্ম মানে না। প্রচলিত ধর্মের তাত্তি¡ক বা দার্শনিক ধারণাকে অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করলেও তার আচরণিক দিক কখনোই আগ্রহ পোষণ করে না। কুরআন, পুরাণ, বেদ, বাইবেল কোনো ধর্মই তাদের আকর্ষণ করে না। এসব শাস্ত্র আচার ও প্রচলিত সমাজ ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। সাম্প্রদায়িক ধর্মের প্রাচীর ভেঙে তারা উদার মিলনের ময়দানকে সন্ধান করে। আল্লাহ্, ঈশ্বর সেই পরম পুরুষ হলো মনের মানুষ। মনের মধ্যেই তাকে অন্বেষণ করতে হয়। পঞ্চইন্দ্রিয়ের অশুভ তারণায় বাউলেরা কখনো পরাজিত হয় না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now