বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার নাম রাজ। ঢাকার ইট-কাঠের জঙ্গলে আমার বেড়ে ওঠা নয়, আমার শিকড় পোঁতা আছে বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রাম চরকাউয়াতে। শহরে জীবনযাপন করলেও সেই গ্রামের স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে একটি রাতের ঘটনা—যা আজও আমার কাছে অমীমাংসিত এক রহস্য। ভৌতিক, অলৌকিক, নাকি শুধুই মনের ভ্রম—তা আমি জানি না। তবে সেই রাতের শীতল ছায়া আমার জীবনের ওপর এমনভাবে পড়েছে যে তা থেকে মুক্তি নেই।
পনেরো বছর আগের কথা। আমাদের গ্রাম তখন সভ্য জগৎ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুতের আলো সেখানে পৌঁছালেও বর্ষাকালে তা হতো এক বিরল অতিথি। টানা বৃষ্টিতে গ্রামের লাল মাটির রাস্তা পিচ্ছিল কাদায় ডুবে যেত ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সরু পথ, আর তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা বাঁশঝাড়গুলো যেন বৃষ্টির শব্দে এক রহস্যময় ফিসফিসানি শুরু করত।
গ্রামের মাঝখানে ছিল একটা প্রাচীন মসজিদ, যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল শিরিষ গাছ, যেন শতাব্দীর সাক্ষী। নদীর ঘাটে সপ্তাহে একদিন হাট বসত, যেখানে গ্রামের সমস্ত প্রাণের স্পন্দন একত্রিত হতো। কিন্তু কবরস্থানটা? সেটা ছিল গ্রামের সীমানার একেবারে বাইরে, বহু দূরবর্তী এক নির্জন জায়গায়। ধানক্ষেত পেরিয়ে, ঘন বাঁশঝাড়ের কোল ঘেঁষে এক বিশাল এলাকা। দিনের আলোতেও সেখানে যেতে মানুষ ভয় পেত, আর রাতের কথা তো কল্পনারও বাইরে। গ্রামের সবাই ফিসফিস করে নানা গল্প বলত—অশরীরী কান্নার শব্দ, ছায়ামূর্তির আনাগোনা, কিংবা রাতের আঁধারে ভেসে আসা চাপা ফিসফিসানি।
আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন নাসির মিয়া। বয়স আশির কোঠা পেরিয়ে গেলেও তাঁর তেজ ও দয়া ছিল অফুরন্ত। নিজের খরচে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন, গ্রামের গরিব মানুষদের চিকিৎসার জন্য মাঝেমধ্যে দূর থেকে ডাক্তার নিয়ে আসতেন। এমন একজন মানুষকে সবাই খুবই শ্রদ্ধা করত।
এক বর্ষার ভোরে খবর এলো—নাসির মিয়া মারা গেছেন। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা, থেকে থেকে বিদ্যুতের ঝলক আর বজ্রপাতের বিকট গর্জন পুরো গ্রামকে যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। এই দুঃসংবাদ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল, আর পুরো গ্রাম গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সন্ধ্যার পর লাশ দাফনের জন্য সবাই কবরস্থানের দিকে রওনা হলো। লাশের খাটিয়া কাঁধে তুলে গ্রামের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন মানুষ যাচ্ছিল। মুরুব্বির প্রতি শ্রদ্ধায় আমিও তাদের সঙ্গী হলাম। কবরস্থানে পৌঁছাতে হলে কাদামাটির পথ ধরে ধানক্ষেত পেরোতে হয়। বৃষ্টিতে পথ এতটাই কর্দমাক্ত ছিল যে পা ফেলতেই জুতার অর্ধেক কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। সঙ্গে থাকা কয়েকটা লণ্ঠন আর মশাল নিবু নিবু হয়ে জ্বলছিল, ভেজা বাতাসে আলোর শিখা বারবার কাঁপছিল।
আমরা যখন কবরস্থানে পৌঁছালাম, তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। কবর খোঁড়ার কাজ শুরু হলো। চারপাশের নীরবতা এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল আমরা যেন অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছি। কেবল পোকামাকড়ের মৃদু গুঞ্জন আর দূর থেকে ভেসে আসা বজ্রপাতের শব্দ।
ঠিক যখন খাটিয়া নামিয়ে লাশ কবরে রাখার প্রস্তুতি চলছে, গ্রামের এক বৃদ্ধ আচমকা চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর গলায় ছিল এক হিমশীতল আতঙ্ক....
“ওই দ্যাখো! বাঁশঝাড়ের পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে!”
সবাই যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। আমরা সবাই একসঙ্গে সেদিকে তাকালাম। বজ্রপাতের ক্ষণিক আলোয় আমরা এক ঝলকের জন্য দেখলাম—একটা লম্বা, শীর্ণাকায় ছায়ামূর্তি। পরনে তার মলিন বস্ত্র, চুলগুলো এলোমেলো। সে মাথা নিচু করে মাটিতে কিছু খুঁড়ছিল। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমার মনে হলো, ওই ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে কবরের দিকেই এগিয়ে আসছে। কয়েকজন সাহসী মানুষ দৌড়ে গেল সেদিকে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা হতভম্ব হয়ে গেল—কেউ নেই। শুধু ভেজা কাদায় গভীর পায়ের ছাপ, আর মাটিতে কিছু টাটকা খোঁড়াখুঁড়ির দাগ। গ্রামের মানুষের মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেন একে অপরের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
বাতাস হঠাৎ আরও শীতল হয়ে উঠল, আর আমার সারা শরীর কেমন যেন হিম হয়ে আসছিল। কোনোমতে দাফনের কাজ শেষ হলো। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে সবাই ভিজে একাকার। লাশ মাটিতে চাপা দেওয়ার পর সবাই দ্রুত গ্রামের দিকে ফিরতে শুরু করল, যেন সেখানে এক মুহূর্তও আর থাকতে চায় না। রাত তখন প্রায় বারোটা। আমরা যখন নাসির মিয়ার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন হঠাৎ করেই এক নারীর করুণ কান্নার শব্দ আমাদের কানে এলো। সে কান্নায় ছিল এক হৃদয়বিদারক হাহাকার।
প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো নাসির মিয়ার পরিবারের কোনো সদস্য কাঁদছেন। কিন্তু বাড়ির আঙিনায় পা দিতেই অবাক হয়ে গেলাম। ভেতরে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে, কারোর চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। অথচ বাইরে সেই কান্নার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে! গ্রামের মানুষজন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সবার মুখে এক অদ্ভুত ভয়ের ছাপ। চারপাশে শুধু সেই অদৃশ্য কান্নার শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছিল, আর তার সাথে এক অদ্ভুত চাপা নিস্তব্ধতা। আমি যেন বুকের ভেতরে জমাট বাঁধা বরফ অনুভব করছিলাম। সেই কান্না কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে আসছিল না, মনে হচ্ছিল যেন বাতাসেই মিশে আছে।
পরেরদিন সকালে গ্রামে নতুন এক গুজব ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, রাতে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাবার সময় নাকি একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেছে, যা বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে আবার কবরের দিকেই ফিরে যাচ্ছিল। আর একজন তো আরও ভয়ানক কথা বলল—সে নাকি স্পষ্ট দেখেছে, নাসির মিয়ার কবরের মাটি যেন নড়ছিল, যেন ভেতর থেকে কেউ ঠেলে উঠছিল। এসব কথা হয়তো নিছকই গুজব, কিন্তু যারা সেই রাতে সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের চোখে আমি সেই গভীর আতঙ্কের ছাপ আজও স্পষ্ট দেখতে পাই। পুরো গ্রামজুড়ে এক থমথমে নীরবতা। রাতের ঘটনা নিয়ে কেউ আর সরাসরি কথা বলতে চায় না। যেন সবাই এক অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ—সেই রাতের আতঙ্ককে তারা নিজেদের মনের গভীরে চাপা দিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু নাসির মিয়ার বাড়ির সামনের সেই জায়গাটায় গেলে এখনও মনে হয়, বাতাসের ফিসফিসানিতে লুকিয়ে আছে এক অজানা হাহাকার।
আমি পরদিন সকালে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে চুপিচুপি কবরস্থানে গেলাম। দিনের আলোয় জায়গাটা যতটা শান্ত আর সাধারণ মনে হয়, রাতের অভিজ্ঞতা সেই দৃশ্যকে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে। নাসির মিয়ার কবরটি তখনও টাটকা। তার পাশে, যেখানে সেই ছায়ামূর্তিটি মাটি খুঁড়ছিল, সেখানে কাদায় মানুষের পায়ের ছাপ এখনও স্পষ্ট। কিন্তু আমরা যা দেখলাম, তাতে আমাদের বুক কেঁপে উঠল। মাটির ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল কিছু পুরনো মুদ্রা, তার মধ্যে একটাও আমাদের সময়ে প্রচলিত নয়। আর ছিল কিছু শুকিয়ে যাওয়া হাড়ের টুকরো। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো কিছু মাটি থেকে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল কবরের ঠিক ওপরে একদল কালো কাকের বসে থাকা। একটিও কাক ডাকছিল না। তারা সবাই কবরের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল, যেন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের নীরব উপস্থিতি আমাদের মধ্যে এক অশুভ অনুভূতির জন্ম দিল। কয়েক দিন পর আমরা জানতে পারলাম, নাসির মিয়ার পরিবার তার বাড়িতে কিছু পুরনো দলিলপত্র খুঁজে পেয়েছে। তাতে লেখা ছিল, বহু বছর আগে গ্রামের এই কবরস্থানে একটি মন্দির ছিল। মন্দিরটি ছিল এক প্রাচীন সাধকের, যিনি অদ্ভুত সব আচার-অনুষ্ঠান করতেন। তার মৃত্যুর পর স্থানীয়রা মন্দিরটি ভেঙে সেখানে কবরস্থান তৈরি করে।
এই তথ্য জানার পর আমার মনে এক নতুন প্রশ্ন জন্মাল। সেই ছায়ামূর্তি কি তবে সেই প্রাচীন সাধকের আত্মা? সে কি তার সমাধি থেকে কিছু খুঁজে বের করতে এসেছিল? গ্রামের বয়স্করা বলতে লাগলেন, ওই সাধক নাকি মৃত্যু নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা পুরোপুরি শরীর ছেড়ে যায় না, কিছু সময়ের জন্য সে শরীরেই থাকে। তিনি নাকি এমন কোনো উপায় খুঁজছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি সেই আত্মাকে নিজেদের কাজে লাগাতে পারবেন।
আজ আমি অনেক দূরে, শহরের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি আজও আমার পিছু ছাড়ে না। যখনই রাস্তায় কোনো লম্বা, রোগা লোককে দেখি, অবচেতন মনেই আমার বুক কেঁপে ওঠে। রাতের নিস্তব্ধতায় কোনো দূর থেকে ভেসে আসা কান্নার শব্দ শুনলে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে যায়। হয়তো সেই ছায়ামূর্তি কেবল একটি দুঃস্বপ্ন ছিল, সেই কান্না কেবলই বাতাসের শব্দ। কিন্তু আমার মন বলে, সেদিন রাতে আমরা যা দেখেছিলাম, তা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। কোনো এক অজানা শক্তি সেদিন কবরস্থানে উপস্থিত ছিল, যা নাসির মিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের মনে এক গভীর ভয় আর রহস্যের জন্ম দিয়েছিল।
আজও আমি ভাবি, সেই রাতে কবর থেকে কী বেরিয়ে এসেছিল? সেই ছায়ামূর্তি কি নিজের কোনো হারানো গুপ্তধন খুঁজছিল? নাকি নাসির মিয়ার দেহ ছিল তার লক্ষ্য? সেই রহস্য আজও অমীমাংসিত। আমি সেই রাতের ঘটনা থেকে দূরে সরে এসেছি, কিন্তু সেই রাতটি আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে, এক শীতল ছায়ার মতো। অনেক বছর কেটে গেছে। আমি শহরে থাকি, ব্যস্ততার মাঝে জীবন কাটে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই রাতে ঘুম ভেঙে সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে—বাঁশঝাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময় ছায়ামূর্তি। আজও আমি ভাবি,
* কে ছিল সেই ছায়ামূর্তি?
* কেন সে কবরের পাশে মাটি খুঁড়ছিল?
* আর সেই অলৌকিক কান্না, যা কেউ দেখেনি?
তবুও সবাই শুনেছিল, তার উৎস কোথায় ছিল?
শহরের আলো ঝলমলে পরিবেশে বসেও আমি সেই রাতের শীতল বাতাস অনুভব করি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সবটাই হয়তো ছিল বৃষ্টির রাতের আতঙ্ক থেকে সৃষ্ট এক ভ্রম। কিন্তু আমার মনের এক কোণে লুকিয়ে থাকা এক অজানা কণ্ঠস্বর আজও ফিসফিস করে বলে—না, ওটা ভ্রম ছিল না। সেই অদ্ভুত রাতের রহস্য আজও আমার কাছে অমীমাংসিত। হয়তো মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তা রহস্যই থেকে যাবে।
প্রিয় পাঠক, আমি কলম হাতে নিই আপনাদের মুগ্ধ করার আশায়, প্রতিটি শব্দে বোনার চেষ্টা করি এক একটি গল্প। জানি না আপনাদের মন কতটা ছুঁতে পারি, কিন্তু আপনারা আমার কাছে শুধু পাঠক নন, আপনারাই আমার প্রেরণার উৎস। আমার লেখার প্রতিটি অক্ষরে মিশে আছে আপনাদের ভালোবাসা। তাই আমি আপনাদের কাছে এইটুকুই চাই, যেন আপনাদের অনুপ্রেরণাটুকু আমাকে পথ দেখায়। কারণ, আপনাদের সমর্থন না থাকলে হয়তো একদিন আমার সৃষ্টিগুলো হারিয়ে যাবে সময়ের স্রোতে....
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now