বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সোনারকান্দি নামের ছোট্ট গ্রামটা সবুজে ঘেরা, নদীর ধারে পাখিদের কোলাহলে ভরপুর। চারদিকে ধানক্ষেত, খোলা মাঠ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে সেজে উঠত বসন্তের সকাল। একসময় এখানে সন্ধ্যা নামলেই শিশুদের দৌড়ঝাঁপে মাঠ মুখর থাকত। এখন আর সেই দৃশ্য নেই। এখন গ্রামের প্রতিটি ঘরেই আলো ঝলমলে স্ক্রিন—কখনো টেলিভিশন, কখনো স্মার্টফোন, আবার ট্যাবলেট। শিশুরা আর কাদা মাটিতে খেলে না, বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলায় মগ্ন থাকে।
এই দৃশ্য প্রতিদিনই চোখে পড়ত সোনারকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ স্যারের। তিনি ছিলেন গ্রামের প্রিয় মানুষ। সবাই তাকে শুধু শিক্ষক নয়, অভিভাবক হিসেবেও মানত। শিশুদের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ভেতরে ভেতরে দুঃখ পেতেন। মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে, গাছের ডালে পাখি ডাকলেও শিশুদের আর সেদিকে কান নেই। তারা মগ্ন থাকে কার্টুন আর মোবাইল গেমের দুনিয়ায়।
এক সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন, রাস্তার পাশে বসে থাকা পাঁচ-ছয় বছরের এক বালক মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে গেম খেলছে। তার পাশেই মাটিতে ছিটকে পড়ে আছে পড়ার বই। ছেলেটির চোখে অদ্ভুত এক মুগ্ধতা—যেন তার চারপাশের পৃথিবী আর নেই, কেবল সেই পর্দার ভেতরেই সব আনন্দ। রাশেদ স্যার থেমে দাঁড়ালেন, বুকের ভেতর অস্বস্তি জমল। মনে মনে বললেন, “যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে এ প্রজন্ম কি তার স্বকীয়তা, কল্পনা শক্তি সব হারিয়ে ফেলবে? এই শিশুরা কি শুধুই ভোগবাদী হয়ে উঠবে?”
তবে তিনি হতাশ মানুষ ছিলেন না। তিনি জানতেন, প্রযুক্তি একেবারে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এটাই নতুন সময়ের বাস্তবতা। বাচ্চাদের বঞ্চিত না করে, তাদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হয়। সেদিন বিকেলেই তিনি একটি পরিকল্পনা করলেন।
পরের দিন ক্লাসে ঢুকে তিনি শিশুদের উদ্দেশে বললেন,
— “তোমরা কি জানো, তোমাদের হাতে থাকা এই মোবাইল কেবল গেম খেলার জিনিস নয়? এর ভেতরে পৃথিবীর জ্ঞান ভরা এক অবারিত ভান্ডার আছে।”
শিশুরা বিস্ময়ে তাকাল। একজন বলল,
— “স্যার, তাহলে মোবাইল দিয়ে কি বই পড়া যায়?”
স্যার মৃদু হাসলেন,
— “শুধু বই নয়, তোমরা চাইলে জানতে পারবে আকাশে তারা কেন জ্বলে, সাগরের তলদেশে কেমন প্রাণী থাকে, কিংবা রোবট কীভাবে তৈরি হয়।”
শিশুদের চোখে বিস্ময় জ্বলে উঠল। তাদের কৌতূহল দেখে রাশেদ স্যার আনন্দ পেলেন।
কয়েকদিন পর তিনি স্কুলে একটি নতুন উদ্যোগ নিলেন—“ডিজিটাল ক্লাস”। পুরনো কম্পিউটারগুলো ঝেড়ে মুছে চালু করলেন। প্রোজেক্টর এনে শিশুদের দেখালেন কেমন করে একটি বীজ থেকে গাছ জন্মায়, কিংবা সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ কীভাবে সূর্যের চারপাশে ঘোরে। আবার ইউটিউব থেকে শিক্ষামূলক ভিডিও ডাউনলোড করে দেখালেন। শিশুরা অবাক হয়ে গেল—যে ডিভাইসকে তারা কেবল খেলনা ভেবেছিল, সেটি আসলে এক জাদুর জানালা।
ধীরে ধীরে বাচ্চারা নিজেরাই খুঁজে নিতে শুরু করল নতুন কিছু। কেউ বিজ্ঞান শেখার ভিডিও দেখল, কেউ আঁকার কৌশল শিখল, কেউ আবার অনলাইন কুইজে অংশ নিল। গেমের পাশাপাশি তারা মজা পেতে লাগল নতুন কিছু শেখায়।
এদিকে গ্রামেও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে লাগল। একদিন গ্রামে বার্ষিক মেলা বসলো। আগের মতো নাগরদোলা, মিষ্টি, খেলনা তো ছিলই। কিন্তু এবার সোনারকান্দি স্কুলের শিশুরা রাশেদ স্যারের নেতৃত্বে একটি আলাদা স্টল দিল। সেখানে তারা প্রদর্শন করল নিজের হাতে বানানো ছোট ছোট প্রজেক্ট। কেউ কাগজ দিয়ে বানানো সৌরজগত, কেউ সহজ মোটরে চালানো ছোট রোবট, কেউ আবার ডিজিটাল পোস্টার।
গ্রামের মানুষ হতবাক হয়ে গেল। যাদের তারা ভাবত শুধু মোবাইল নিয়ে সময় নষ্ট করছে, সেই শিশুরাই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করছে!
মেলায় দাঁড়িয়ে এক কৃষক এগিয়ে এসে বলল,
— “স্যার, আমি তো মোবাইল শুধু ফোন করার জন্য ব্যবহার করি। আমার ধান রোগে ধরলে শহরে গিয়ে খোঁজ নিতে হয়। এখন কি আমিও মোবাইল দিয়ে কিছু জানতে পারি?”
স্যার তার চোখে চোখ রেখে বললেন,
— “অবশ্যই পারেন। কৃষি বিষয়ক অ্যাপ আছে। ফসলের ছবি তুলে দিলে সঙ্গে সঙ্গে পরামর্শ পাওয়া যায়।”
কৃষক আনন্দে মাথা নেড়ে বলল,
— “তাহলে তো মোবাইল শুধু খেলনা নয়, জীবিকা বাঁচানোর হাতিয়ারও।”
সেদিন থেকে শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও প্রযুক্তির প্রতি নতুনভাবে আগ্রহী হয়ে উঠল।
কয়েক মাসের মধ্যেই পরিবর্তন স্পষ্ট হলো। সোনারকান্দি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পেল। সংবাদপত্রে বড় হেডলাইন হলো— “ছোট্ট সোনারকান্দি গ্রামের শিশুরা প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে জয় করছে নতুন দিগন্ত।”
গ্রামবাসীর চোখে প্রযুক্তির নতুন পরিচয় মিলল। মোবাইল আর ট্যাব তাদের কাছে শুধু সময় নষ্টের বস্তু নয়, বরং স্বপ্নের জানালা।
একদিন ক্লাস শেষে রাশেদ স্যার দাঁড়িয়ে বললেন,
— “মনে রেখো বাচ্চারা, প্রযুক্তি হলো ছুরি। এ ছুরি দিয়ে যেমন ফল কাটা যায়, তেমনি কারও ক্ষতিও করা যায়। তোমাদের দায়িত্ব হলো এই ছুরি দিয়ে জীবনকে সুন্দর করে তোলা।”
শিশুরা একসাথে গলা মিলিয়ে বলল,
— “আমরা শিখব, স্যার!”
সেদিন সূর্যাস্তের আলোয় ভেসে যাওয়া সোনারকান্দি গ্রামের আকাশে অদ্ভুত এক দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। যেন গ্রামটা বলছে— “প্রযুক্তি শত্রু নয়, যদি আমরা তাকে সঠিকভাবে বন্ধু বানাতে পারি।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now