বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ”
শামীমার বয়স তেত্রিশ পার হয়ে চৌত্রিশে পা দিয়েছে। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় তার ভরসা ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—নিজস্ব সংসার। তারুণ্যের শুরু থেকে অনন্ত অপেক্ষা, বারবার প্রত্যাশার ভাঙন, আর অপমানের দীর্ঘ ছায়া তাকে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। পরিবার-পরিজনের চোখে সে ছিলো সবসময় "বয়সী মেয়ে"। অথচ শামীমার মন আজও তরুণ, স্বপ্নে ভরা, আশার আলোয় দীপ্ত।
কতবার যে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, কতবার যে কথাবার্তা চলেছে, কিন্তু শেষমুহূর্তে সবকিছু ভেঙে গেছে বয়সের কারণে। কারও কারও সরল অভিযোগ—“বয়স তো বেশি হয়ে গেছে, সন্তান হবে তো?” কেউ সরাসরি কটু কথা শুনিয়েছে—“এ বয়সে মেয়েদের সংসার জমে না।” আর সমাজ তো আছেই, সমাজের চোখে সে যেন এক ব্যর্থতা।
অবশেষে যখন মনে হলো এবার সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে, তখনই ঘটল সবচেয়ে নির্মম ঘটনা। বিয়ের আগের দিন ছেলেটির আত্মীয়রা এসে বলল, সমবয়সী মেয়ে তারা বিয়ে মেনে নেবে না। ছেলেও, যাকে শামীমা ভরসা করেছিল, তার পূর্ণ সমর্থন দিল এই অমানবিক সিদ্ধান্তে। শামীমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। লজ্জা, অপমান, কষ্ট—সবকিছু একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
কিন্তু শামীমা ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। গভীর দুঃখের মাঝেও সে একদিন এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল—সে উমরাহ করতে যাবে। হয়তো এই ঘন দুঃখ, এই পরাজয়ের অনুভূতিই তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে আরও কাছে টেনে নিল।
মদীনার মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে, কিংবা মক্কার মসজিদুল হারামে সিজদায় পড়ে তার হৃদয় থেকে ঝরে পড়ত কেবল কান্না আর প্রার্থনা। সে পড়ত সেই আয়াত—
“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সুরাহ যুমার: ৫৩)
আয়াতের শব্দগুলো তার প্রাণে ঢেউ তুলত। সে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে বলত—“আল্লাহ, আমি হয়তো ব্যর্থ, আমি হয়তো ভাঙা, কিন্তু তোমার রহমত তো অসীম। আমায় নিরাশ কোরো না।”
উমরাহ শেষে দেশে ফেরার সময় এয়ারপোর্টে একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটল। শামীমা লাগেজ বেল্ট থেকে নিজের ভারী সুটকেস তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল। হঠাৎ পাশের এক সুদর্শন মানুষ এগিয়ে এসে সহজেই সুটকেসটা নামিয়ে দিল। শামীমা অবাক হয়ে শুধু “ধন্যবাদ” বলল, আর সেই মানুষটি হালকা হেসে চলে গেল।
বাইরে বের হয়ে শামীমা যখন তার বোন ও দুলাভাইকে পেল, তখনই আবার সেই লোকটির সঙ্গে দেখা। দুলাভাই তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন—“এ আমার বন্ধু, ইমরান।”
অচেনা পরিচয় অচিরেই অদ্ভুত এক নৈকট্যে রূপ নিল। ইমরান ভদ্র, শিক্ষিত এবং সবচেয়ে বড় কথা, সে একজন সহৃদয় মানুষ। সে কখনো শামীমাকে তার বয়স দিয়ে বিচার করেনি। বরং শামীমার চরিত্র, তার ধৈর্য, তার ভেতরের শক্তি তাকে মুগ্ধ করেছিল। অল্পদিনেই তাদের সম্পর্ক গভীর হলো, আর কিছুদিনের মধ্যেই তা বিয়েতে পরিণত হলো।
বিয়ের পর শামীমা যে সুখ পেল, তা যেন তার কল্পনার বাইরে। সংসার মানেই বোঝা বা আপোষ নয়, সংসার মানে একসাথে পথ চলা—এ সত্য সে নতুন করে শিখল।
কিছু মাস পর শামীমা জানতে পারল, সে মা হতে চলেছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার প্রথম সন্তান জন্ম নিল একসাথে তিনজন! একসাথে তিনটি সন্তানের কান্না যেন আল্লাহর রহমতের ঘোষণা হয়ে এলো তার জীবনে।
শামীমা বুঝল, মানুষের অপমান, সমাজের কটু কথা, মানুষের অযৌক্তিক দোষারোপ কিছুই আল্লাহর পরিকল্পনার কাছে টিকতে পারে না। যে মানুষ একদিন তাকে বয়সের কারণে তুচ্ছ করে, বিয়ের আগের দিন পরিত্যাগ করেছিল, সেই মানুষটিই পরে সন্তানের জন্য হাহাকার করছে। শামীমা তার দিকে ফিরে তাকালও না। কারণ তার জীবন এখন ভরে গেছে আল্লাহর রহমত আর সন্তানের মধুর কোলাহলে।
আজ শামীমা তার সন্তানদের কোলে নিয়ে সিজদায় পড়ে শুধু একটি আয়াতই বারবার তিলাওয়াত করে—
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরাহ যুমার: ৫৩)
তার জীবনই এখন জীবন্ত প্রমাণ—কোনো দুঃখই চিরস্থায়ী নয়, কোনো ব্যর্থতাই শেষ নয়। সিজদার কান্না একদিন সুখের হাসিতে রূপ নিতেই হবে, যদি মানুষ তার রবের উপর ভরসা রাখে।
________________________________________
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now