বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভালোবাসার ধৈর্যের পাঠশালা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X “ লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ” ________________________________________ রায়হানের বয়স ছাব্বিশ পেরিয়েছে। ডাক্তারি পেশায় তিনি এখনো একেবারে নতুন, তবে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ডিউটির চাপ, বইপত্রের পাহাড়, সার্জারির ক্লাস, গবেষণার নোট—সবকিছু মিলিয়ে তার প্রতিদিনের জীবন একরকম যান্ত্রিক ছন্দে বাঁধা। এই ছন্দের বাইরে সামান্য কিছু ঘটলেই তার মনে অস্থিরতা আসে। স্ত্রী নীলা তার জীবনে এসেছে মাত্র তিন বছর হলো। বয়স বাইশের কোঠায়। শ্যামবর্ণ মুখে চিরকালীন হাসি, চোখে কিশোরী উচ্ছ্বাস। সে বড় হয়েছে এক স্বচ্ছল পরিবারে। রান্নাঘরে ঢোকার সুযোগ হয়নি, কাপড় কাচা বা গৃহস্থালির কাজের প্রয়োজনও পড়েনি। সংসার চালানো বা নিয়ম মেনে চলা তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। বিয়ের প্রথম বছর নীলা বাবার বাড়িতেই ছিল। রায়হানের পড়াশোনা তখনো অসমাপ্ত। সপ্তাহে দু’একদিন ছুটি পেলে তিনি ছুটে যেতেন স্ত্রীর কাছে। তাদের ভালোবাসা তখন অনেকটা টেলিফোনের লাইনের মতো—শব্দ পৌঁছাত, কিন্তু মাঝে মাঝে শূন্যতার শিসও বাজত। দূরত্ব ছিল, তবু সেই দূরত্বেই লুকিয়ে ছিল মিষ্টি আকুলতা। দুই বছর পর তারা আলাদা থাকতে শুরু করল। তখনই দু’জনের স্বভাবের ভিন্নতা প্রকট হলো। ________________________________________ সকালে ডিউটির তাড়া নিয়ে বের হওয়ার সময় নীলার রান্না প্রায়ই দেরিতে আসত। কখনও অর্ধসিদ্ধ ডাল, কখনও অতিরিক্ত ঘি দেওয়া তরকারি, কখনও আবার একেবারে পুড়ে যাওয়া রুটি। রায়হান বিরক্ত হয়ে বলতেন, —“তুমি কি একবারও চেষ্টা করো না ঠিকমতো বানাতে? আমি কি হাসপাতালের ক্যান্টিনে খেয়ে যাব?” নীলা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকত। তারপর আস্তে বলত, —“আমি তো শিখছি, আমায় সময় দাও।” কিন্তু রায়হানের কাছে সেই কথা ছিল নিছক অজুহাত। তিনি ভেবেছিলেন, নীলা তার প্রতি উদাসীন, ইচ্ছে করেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। রাতের ডিউটি শেষে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে তিনি চাইতেন নিস্তব্ধতা, চাইতেন বই হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ একা বসতে। অথচ নীলা শিশুর মতো বকবক করত, গল্প করতে চাইত, অহেতুক প্রশ্ন করত। রায়হান রেগে যেতেন, —“আমাকে একটু একা থাকতে দাও, বুঝতে পারো না?” নীলা মুখ কালো করে বসে থাকত, ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেত। তার মনে হতো, স্বামী তাকে ভালোবাসেন না, সবসময় শুধু অভিযোগ খোঁজেন। এভাবে তাদের মধ্যে দূরত্ব জমে উঠল, যেন অনাবিল আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ জমে যায়। ________________________________________ এক ভোরের ঘটনা রায়হানের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিল। সেদিন ভোরে হাসপাতাল থেকে ফিরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে তিনি দেখলেন, নীলা রান্নাঘরে। চোখ লাল, বোঝা যায় রাতভর জেগেছে। চুল এলোমেলো, শাড়ির আঁচল ভিজে আছে ঘামে। অথচ সে প্যারাটা বানাতে ব্যস্ত। একেকটা বেঁকে যাচ্ছে, কখনও বেশি ভাজা হয়ে যাচ্ছে, তবু সে চেষ্টা করছে। রায়হান দরজার ফাঁক দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তার মনে পড়ল—এই মেয়েটি তো কোনোদিন রান্না শেখেনি। তবুও প্রতিদিন চেষ্টা করছে, ভুল করছে, আবার চেষ্টা করছে। অথচ তিনি কেবল রাগ করেছেন, তিরস্কার করেছেন, কখনোই তার প্রচেষ্টাকে মূল্য দেননি। চোখের ভেতর অদ্ভুত কোমলতা জমে উঠল। তিনি এগিয়ে গিয়ে পুড়ে যাওয়া প্যারাটার এক টুকরো মুখে দিলেন, তারপর হেসে বললেন, —“আজ অনেক ভালো হয়েছে। তুমি শিখছো, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।” নীলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এতদিনের ভর্ৎসনার জায়গায় হঠাৎ প্রশংসা। সে ফিসফিস করে বলল, —“সত্যি? আমি তো ভাবতাম তুমি আর কোনোদিন আমার রান্না খুশি মনে খাবে না।” সেদিনের ছোট্ট মুহূর্তে তাদের মধ্যে এক নতুন সূর্যোদয় হলো। ________________________________________ এরপর ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল সবকিছু। রায়হান শিখলেন ধৈর্য। তিনি আর ভুলে রাগ করতেন না। বরং অপেক্ষা করতেন, তাকে সময় দিতেন। রাতের ডিউটি শেষে ফিরে বলতেন, —“আজ তোমার হাতের এক কাপ চা হলেই আমি নতুন শক্তি পাব।” চা আসতে দেরি হলেও তিনি রাগ করতেন না, বরং অপেক্ষার ভেতর এক মধুর প্রত্যাশা খুঁজে পেতেন। অন্যদিকে নীলা বুঝল স্বামীর মনের ভাষা। আগে যেখানে অকারণ বকবক করে সময় নষ্ট করত, এখন গল্প শুরু করার আগে প্রশ্ন করত, —“আজ কি তুমি খুব ক্লান্ত? নাকি আমার সাথে কিছুক্ষণ বসবে?” রায়হান বিস্মিত হতেন। যে মেয়েটিকে এতদিন উদাসীন ভেবেছিলেন, সে আসলে শিখছিল—ধীরে ধীরে, ভুল করে করে। ________________________________________ এক বিকেলের ঘটনা। ছুটি পেয়ে বাসায় ফিরেছেন রায়হান। নীলা টেবিলে নানারকম খাবার সাজিয়েছে—ভাত, ডাল, সবজি, মুরগি। খেতে বসে রায়হান হঠাৎ বললেন, —“তুমি জানো, আমি ছোটবেলায় দেখেছি মা সবসময় বাবাকে খুশি করতে নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করেছেন। তাই ভেবেছিলাম, স্ত্রী মানেই স্বামীর সব কথা শুনবে, নিজের মতো কিছু করবে না। কিন্তু এখন বুঝি, সংসার মানে দু’জনের মিলিত যাত্রা। তুমি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছো, আমিও বদলাচ্ছি।” নীলা থেমে গেল, তারপর আস্তে বলল, —“আমি ভেবেছিলাম, ভালোবাসা মানেই শুধু জেদ করা। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে ধৈর্য। তুমি ধৈর্য না ধরলে আমি কোনোদিন শিখতে পারতাম না।” তাদের চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি। যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর ভোরের প্রথম আলোয় মুখোমুখি হয়েছে তারা। ________________________________________ সময়ের সাথে সাথে নীলা রান্নাঘরে দক্ষ হলো। তার হাতের রান্না শুধু স্বামীর পছন্দই নয়, অতিথিরাও প্রশংসা করতে লাগল। আবার রায়হানও বইয়ের ফাঁকে নীলার গল্প শুনে হাসতে শিখলেন। পুড়ে যাওয়া রুটি হয়ে উঠল মজার খোরাক, দেরিতে আসা চা হয়ে গেল প্রতীক্ষার আনন্দ। অভিযোগের জায়গা নিল বোঝাপড়া, বিরক্তির জায়গা নিল ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসার মুহূর্ত। তাদের সংসার নিখুঁত হয়নি—কারণ নিখুঁত সংসার পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সুন্দর হয়েছে—কারণ তারা শিখেছে, ভালোবাসা মানে একে অপরকে বদলে দেওয়া নয়, বরং একে অপরকে সময় দিয়ে একসাথে বদলে যাওয়া। এভাবেই রায়হান আর নীলার জীবন পরিণত হলো ভালোবাসার ধৈর্যের পাঠশালায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৭১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now