বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তিলের ফাঁদ

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো প্রতিদিনের মতোই গমগম করছে। রিকশার ঘণ্টা, বাসের হর্ন, ভ্যানওয়ালার হাঁক—সব মিলে যেন এক অদৃশ্য জাল বুনে রেখেছে মানুষকে। এই জালের ভেতরেই বাস করে তৃষা। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, দুই সন্তানের মা। স্বামী রাশেদ একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে, ভোরে বের হয়, রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে। সংসারের খুঁটিনাটি কাজ, সন্তান সামলানো, নিজের একটু সময় রাখা—সব যেন এক অন্তহীন চক্রের ভেতরে আটকে গেছে তৃষা। তৃষা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি। বন্ধুরা তাকে “ফ্যাশন কুইন” বলত। আজ সে নিজেকে আয়নায় দেখলে ভাবে—চোখের নিচে হালকা কালি, চুল সবসময় খোঁপা করে বাঁধা, হাতভর্তি বাসনের দাগ। অথচ এই তৃষাই একসময় কফি শপে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত, বই পড়ত, সাজগোজে সবার মন কাড়ত। এই শহরের আরেক কোণে প্রবেশ করে জাহেদ। বয়স পঁইত্রিশ, শহুরে স্মার্ট, ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকে, তবে মানুষের মনের দরজা খোলার কৌশল জানে সে। কথায়, ভঙ্গিতে, অদৃশ্য প্রশংসায় সে মানুষকে নিজের দিকে টেনে আনে। তৃষার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে। প্রথম দেখা, তেমন কোনো কথা হয়নি। তবে জাহেদের চোখ তৃষার মুখের দিকে একটু বেশিই থেমেছিল। তৃষা সেটা বুঝেও এড়িয়ে গিয়েছিল। দিন কয়েক পর, এক আত্মীয়ার বাসায় দেখা। স্বাভাবিক কথোপকথন। হঠাৎ জাহেদ মৃদু হেসে বলে উঠল— “ম্যাডাম, একটা কথা বলবো? ... নাকের পাশের তিলটা আপনাকে একদম পরী বানিয়েছে। এত্ত সুন্দর। জাস্ট অসাধারণ লাগে!” তৃষা থমকে গেল। তার মনে হলো, এই কথাটা সে আগে কোনোদিন শোনেনি। সত্যিই তো, সেই ছোট্ট তিলটা তার মুখে কতদিন আছে, অথচ রাশেদ কোনোদিন বলেনি! সে তো শুধু বলে, “তুমি ক্লান্ত দেখাচ্ছো, একটু ঘুমাও।” বা, “এই যে রান্নাটা একটু কম নোনতা হয়েছে।” কথাটাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও মনের গভীরে কোথাও একটা দোলা দিয়ে গেল। অদ্ভুত এক অনুভূতি। যেন কেউ তাকে অনেক দিন পর নতুন চোখে দেখল। পরের কদিনে তৃষা বারবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সেই তিলটার দিকে তাকায়। মনে হয়—এটা কি সত্যিই এত সুন্দর? নাকি জাহেদ শুধু কথার ফুলঝুরি ছড়াল? কিন্তু হৃদয় ফিসফিস করে বলে—না, সে সত্যিই দেখেছে। গভীরভাবে দেখেছে। এই “গভীরভাবে দেখা”-র বিভ্রমই ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিতে থাকে এক অচেনা আবর্তে। তৃষা এখন আর নিজের মুখটাকে আগের মতো দেখে না। মনে হয়, এ মুখে এখনো সৌন্দর্য আছে, এখনো আকর্ষণ আছে। অথচ রাশেদ দিনরাত কেবল অফিস আর সংসারের চাপে ব্যস্ত। তার চোখে তৃষা শুধু দায়িত্ব, শুধু সন্তানদের মা। কয়েক সপ্তাহ পর আবার এক আড্ডায় দেখা। তৃষা স্বাভাবিক ভদ্রতা বজায় রাখতে চায়। কিন্তু জাহেদ তার কথার জালে দক্ষ। “আপনার হাসিটা একেবারে অদ্ভুত, জানেন? মনে হয়—কেউ যদি এই হাসি দেখেও কষ্টে থাকে, সে কষ্ট ভুলে যাবে।” তৃষা মৃদু হেসে উত্তর দেয়, কিন্তু মনে মনে সে নিজের হাসির দাম খুঁজে বেড়ায়। সেই হাসি তো রাশেদের চোখে কখনো বিশেষ কিছু হয়ে ওঠেনি। ক্রমে তৃষার মনে অজান্তেই জন্ম নেয় অভিমান। রাশেদের প্রতি চাপা ক্ষোভ—কেন সে খেয়াল রাখে না, কেন বলে না? অথচ এই “অন্য” মানুষটা এত ছোটখাটো ব্যাপারও লক্ষ্য করে। প্রশংসার ফাঁদ আস্তে আস্তে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। জাহেদ বুঝে গেছে—সোজাসুজি কোনো প্রেমের কথা বলা দরকার নেই। বরং অল্প অল্প প্রশংসা, গভীর দৃষ্টি, সামান্য যত্ন—এগুলোই তৃষার ভেতরে খাদের মতো শূন্যতা পূরণ করছে। কিন্তু এ গল্প কেবল মধুর বিভ্রমের নয়, এ গল্প ধ্বংসের সুত্রপাতেরও। তৃষা অনুভব করতে শুরু করল—সে দ্বিধায় ভুগছে। মনে মনে সে বোঝে, এটা বিপদ। কিন্তু সেই বিপদই যেন তাকে টানে। একদিন রাতে রাশেদ অফিস থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত। ডাইনিং টেবিলে বসে চুপচাপ খাচ্ছে। তৃষা সাহস সঞ্চয় করে বলে ওঠে, “শোনো, আমার নাকের পাশের তিলটা নিয়ে কখনো কিছু খেয়াল করেছো?” রাশেদ চমকে তাকায়। তারপর হেসে বলে, “ওটা তো অনেক আগেই দেখেছি। তো? তিল মানে তিল, এতে আবার বিশেষ কী?” এই উত্তর শুনে তৃষার বুকের ভেতর ঝড় বইতে থাকে। চোখে জল চলে আসে। কিন্তু সে কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে—জাহেদ কতখানি আলাদা! এভাবেই শুরু হলো তৃষার ভেতরে অদৃশ্য লড়াই। একদিকে সংসার, সন্তান, দায়িত্ব। অন্যদিকে কিছু কথার মায়া, কিছু গভীর দৃষ্টি, কিছু অতিরিক্ত খেয়াল। শহরের ভিড়ের ভেতরেই তার ভেতরে জন্ম নিল এক নিঃশব্দ ঝড়। তৃষা জানে, এই পথে গেলে শেষ প্রান্তে কেবল অন্ধকার। কিন্তু মনের ভেতরের শূন্যতা তাকে বারবার ভুল পথে ডাকছে। আর সেই ডাকের উৎস—একটা ছোট্ট তিলকে ঘিরে সাজানো এক অসাধারণ ফাঁদ। তৃষার ভেতরে যে নিঃশব্দ ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, তা দিনকে দিন বেড়েই চলল। রাতের বেলায় ঘুমাতে গেলেও বুকের ভেতর অস্বস্তি কাজ করত। মনে হতো—সে কি ভুল করছে? নাকি নিজের জীবনের আনন্দ খুঁজে নিতে চাইছে? একদিন দুপুরে ছোট ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে, বড় মেয়ে স্কুলে। তৃষা একা বসে আয়নার সামনে। আয়নার ভেতরে তাকিয়ে দেখে সেই চেনা মুখ—নাকের পাশের ছোট্ট তিল। হঠাৎ যেন সে বুঝতে পারে, এই তিল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি তার জীবনের গল্পেরও প্রতীক। এই মুখই তার স্বামীকে প্রথমবার আকৃষ্ট করেছিল, এই মুখই তার সন্তানদের কাছে মমতার আশ্রয়। অথচ সে নিজেই আজ সেই মুখটাকে অন্যের চোখ দিয়ে বিচার করছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now