বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দানবের ছায়া
ঢাকার কলাবাগানের সরু গলিতে এক ঘরে থাকে রাফি। বয়স কেবল বিশ, অথচ চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁটে অস্থিরতার রেখা। একসময় বই হাতে বসে রাত জেগে পড়াশোনা করত, কলেজে সবার কাছে ভালো ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর যেন ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ে সে। সেই ভাঙনের ফাঁকেই তার জীবনে আসে লালচে এক ট্যাবলেট—ইয়াবা।
সেই ট্যাবলেটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল পাড়ার বন্ধু সোহাগ। হাসতে হাসতে বলেছিল, “দেখবি, একদম হাল্কের মতো শক্তি পাবি।” রাফি প্রথমে দ্বিধায় ছিল, কিন্তু চাপে পড়ে চেষ্টা করেছিল। গিলে ফেলার কিছুক্ষণ পরই মনে হলো, সব দুঃখ-অভিমান উবে গেছে। পড়াশোনার ব্যর্থতা, বাবার বকুনি, মায়ের অশ্রু—কিছুই যেন আর তার মাথায় নেই। সেদিনের সেই ভোলা আর লঘুত্বের অনুভূতিই হয়ে দাঁড়ালো অন্ধকার এক যাত্রার শুরু।
রাফির মা রোকেয়া বেগম প্রতিদিন ভোরে নামাজ শেষে ছেলের ঘরে উঁকি দিতেন। একসময় ভোর মানেই ছিল টেবিল ল্যাম্পের আলো, রাফির হাতে খোলা খাতা। এখন দুপুর না হলে তার চোখই মেলে না। লালচে চোখ, ঘামে ভেজা শরীর, বারবার অকারণে টাকা দাবি—সবকিছুই যেন মায়ের বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছিল।
“তুই কিছু খাস না তো, রাফি?” মা ধরা গলায় জিজ্ঞেস করতেন।
“না মা, শুধু ঘুম আসছে না।”
মা বোঝেন, কিন্তু বুঝেও নীরব থাকেন। তার নীরবতা যেন একটা দীর্ঘশ্বাস, যা প্রতিদিনের ভোরের বাতাসে মিলিয়ে যেত।
সোহাগের গল্প অন্যরকম। তার বাড়িতে টাকার অভাব ছিল না। বাবা ব্যবসায়ী, মা স্কুলশিক্ষিকা। তবু পাড়ার আড্ডা আর বন্ধুত্বের টানে সেও সেই একই পথে পা বাড়ায়। প্রথমে নেশা, পরে টাকা জোগাড়ের জন্য বাবার ড্রয়ারে হাত। ধরা পড়ার পর বাবা থাপ্পড় মারতেই সোহাগ রাগে ধাক্কা দেয়, মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন বাবা। সেই দিন সোহাগ আর ফিরে যায়নি।
কিছুদিন পর থেকেই মাদক চক্রের সাথে তার ওঠা-বসা শুরু হয়। টেকনাফ থেকে চালান আসে, রাতের আঁধারে সোহাগ তা পৌঁছে দেয় শহরের ভেতরে। বয়স তখনও বাইশ পেরোয়নি, অথচ হাতে বন্দুক ধরতে শিখে গেছে। শেষমেশ পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে, গলায় দাগ পড়ে কয়েদির নম্বর।
অন্যদিকে লিপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, প্রেমের টানাপোড়েন—সব মিলে তার ভেতরটা ধীরে ধীরে বিষিয়ে যাচ্ছিল। একদিন রুমমেট বললো, “একটু নিলে সব টেনশন উধাও হয়ে যাবে।” লিপি রাজি হয়ে গিয়েছিল, ভেবেছিল এও হয়তো এক ধরনের মুক্তি।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে বুঝলো, সেই মুক্তি আসলে শেকল। শরীর ভেঙে যাচ্ছে, চুল ঝরে পড়ছে, মাথা ঘোরে। একদিন বাথরুমে অচেতন হয়ে পড়ে যায় সে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তার জানালেন—তার কিডনির অবস্থা ভয়াবহ।
হাসপাতালের সেই বিছানায় হঠাৎই একসাথে হয়ে গেল তিনটি গল্পের ছেদ। নিউরো সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে পাশাপাশি শুয়ে ছিল রাফি আর লিপি। দুজনের চোখে একই ভয়—জীবনের অচল অন্ধকার। ডাক্তার বদরুল আলম এসে গম্ভীর গলায় বললেন,
“তোমরা যদি এখনই থামতে না পারো, হয়তো হাঁটতেই পারবে না। তোমাদের নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে।”
রাফি চোখ নামিয়ে রাখলো, যেন কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। লিপির চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু, ভাঙা গলায় বললো—
“আমি আবার বাঁচতে চাই।”
এদিকে রাফির বাবা আবদুল কাদের আর সহ্য করতে পারছিলেন না। একদিন থানায় গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বললেন,
“স্যার, আমার ছেলেকে বাঁচান। আমি চাই না ও কোনো অপরাধে জড়িয়ে যাক।”
পুলিশ কর্মকর্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিয়েছিলেন,
“চাচা, শুধু পুলিশ দিয়ে হবে না। পরিবার, সমাজ, সবাইকে একসাথে এগোতে হবে।”
কিন্তু সমাজ তখনও ঘুমাচ্ছিল।
জেলে থাকা সোহাগের কাছে খবর এলো—তার মা অসুস্থ। ছুটে গেলেও দেখলো হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মা নিঃশেষ হয়ে আসছেন। শেষ শক্তি দিয়ে তিনি শুধু বললেন,
“সোহাগ, আমি তোকে মানুষ করতে পারলাম না।”
সেই রাতেই সোহাগ বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে ভাবলো, যদি একটু আগেই থামতে পারতো! কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে।
লিপি তবে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলো। চিকিৎসা, মায়ের ভালোবাসা, বাবার ধৈর্য—সব মিলিয়ে তার মধ্যে জেগে উঠলো আবার বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। একদিন ফিসফিস করে বললো,
“মা, আমি আবার পড়তে চাই। আমি আবার স্বাভাবিক হতে চাই।”
কিন্তু রাফির জীবনে আলো ফিরলো না। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে করতে এক ভোরে নিঃশব্দে চলে গেল সে। পাশে বসা মা শুধু কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বললেন—
“আমার ছেলেটাকে মাদক কেড়ে নিল।”
গলির ভেতর ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ঢুকছিল। তবু সেই আলো কোনো রাফিকে ফিরিয়ে আনতে পারলো না। সোহাগ, লিপি আর রাফি—তাদের গল্প একসাথে দাঁড় করিয়ে দিলো একটা সত্যের সামনে—মাদক শুধু শরীরকে নয়, পরিবারকেও, সমাজকেও গ্রাস করে নেয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now