বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ঝরে পড়া সূর্যের গল্প

"শিক্ষা উপকরন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। তিতাসের অজপাড়াগাঁয়ে বসবাস আমার। শান্ত-স্নিগ্ধ গ্রাম, চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, খালের ধারে তাল-খেজুর গাছের সারি। এই গ্রামেই আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরু। সময়টা খুব বেশি দিনের নয়, তবে অল্প সময়েই পেশাটির প্রেমে পড়ে গেছি। শিশুর হাসিমুখ, তাদের টুকটাক প্রশ্ন, মাঝে মাঝে খেয়ালি দুষ্টুমি—এসব যেন আমার প্রতিদিনের প্রাণশক্তি। মনে হয়, এ শুধু চাকরি নয়, এ যেন আমার জীবনের নেশা। কিন্তু যতই পেশাটিকে উপভোগ করি না কেন, মাঝে মাঝেই বুকের ভেতর এক অজানা ব্যথা জমাট বেঁধে ওঠে। কারণ একটাই—শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। প্রথমে আমি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, হয়তো দু-একজন স্কুলে না এলেই এ রকম মনে হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলাম, এ তো এক গভীর ক্ষতের মতো বিস্তার লাভ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় শতকরা ৯৫ ভাগ শিশু, অথচ কয়েক বছরের মধ্যে অনেকেই অদৃশ্য হয়ে যায় শ্রেণিকক্ষ থেকে। কোথায় যায় তারা? কেনই বা আর স্কুলের পথ ধরে না? এই প্রশ্নগুলো প্রতিদিনই আমার বুকের ভেতরে ঢেউ তোলে। আমার ক্লাসে একসময় পড়ত আসাদ। বয়সে কচি, চোখে সবসময় একরাশ কৌতূহল। লেখাপড়ায় খুব ভালো না হলেও মন দিয়ে চেষ্টা করত। কিন্তু একদিন দেখলাম, আসাদ অনুপস্থিত। প্রথমে ভেবেছিলাম অসুস্থ হবে। পরে জানতে পারলাম, আসাদকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ইটের ভাটায় যেতে হয়েছে। সংসারে অভাব—আট ভাইয়ের সংসারে পেট ভরানোর দায় সবাইকে ভাগ করে নিতে হয়। বছর বছর শীত আসতেই আসাদ স্কুল ছাড়ত, চলে যেত ভাটায়। কয়েক মাস পর আবার ফিরত। কিন্তু একসময় সে আর ফেরেনি। ক্লাসের বেঞ্চে ওর ফাঁকা জায়গা যেন প্রতিদিন আমার চোখে কাঁটা হয়ে বিঁধত। ভাবতাম, যদি আসাদ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত, হয়তো সে একদিন অন্যরকম কিছু হতো। আমার বাড়ির পাশেই থাকে জয়। ওর বাবা পেশায় জুতা সেলাই করেন। ছোটবেলায় জয়ও নিয়মিত স্কুলে যেত। চঞ্চল আর পরিশ্রমী ছেলে ছিল। কিন্তু প্রতিদিন দুপুরে দেখতাম ও বাবার দোকানে বসে সেলাইয়ের কাজ শিখছে। ধীরে ধীরে ওর হাতে ভরসা করতে শিখলেন বাবা। দিনে পঞ্চাশ-ষাট টাকা আয় করতে শুরু করল জয়। তখন থেকেই বাবা ভাবলেন, ছেলে যেহেতু রোজগার করছে, তাহলে স্কুলে সময় নষ্ট করে কী লাভ! জয়ও একসময় স্কুলকে ভুলে গেল। তার শৈশবের খাতা-কলম ধুলোয় ঢাকা পড়ল। আমি মাঝে মাঝে জয়ের চোখের দিকে তাকাতাম। ওর চোখে মিশে থাকত অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব। মনে হতো, খেলাধুলার মাঠে দৌড়ানোর আনন্দ আর দোকানে টাকা গোনার দায়িত্ব একসাথে ওকে টানছে দুই ভিন্ন প্রান্তে। শুধু আসাদ আর জয় নয়, আরও কত শিশু প্রতিদিন অদৃশ্য হয়ে যায় আমাদের স্কুল থেকে। কিছু শিশু আসে স্কুলে, কিন্তু তাদের চোখে-মুখে অনীহা। শিক্ষকের পড়ানো, স্কুলের পরিবেশ, সহপাঠীদের আচরণ—কিছুই তাদের ভালো লাগে না। তারা আনন্দ খুঁজে পায় না শ্রেণিকক্ষে। বইয়ের পাতা যেন তাদের কাছে বোঝা। ফলে তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। আবার এমনও দেখেছি, কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষককে ভয় পায়। পড়া না পারলে বকাঝকা বা শাস্তির ভয় তাদের বুকের ভেতরে এমনভাবে গেঁথে বসে যে, তারা আর স্কুলমুখো হতে চায় না। অনেক সময় দেখেছি, কিছু শিক্ষক শিশুদের সঙ্গে অকারণ খারাপ ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, অভিভাবকদের সঙ্গেও অমার্জিত আচরণ করেন। এতে করে শিক্ষার্থীদের মনে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। তারা ভাবে, এ বিদ্যালয় তাদের জায়গা নয়। একদিন দুপুরবেলা স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমি স্কুলের বারান্দায় বসে ছিলাম। হঠাৎ আমার সামনে দিয়ে এক মা ছুটে গেলেন, কাঁধে বইখাতা নিয়ে। পেছনে ছোটে তার ছেলে, কান্নায় ভিজে যাচ্ছে গাল। মা বলছেন, “মাস্টার সাহেব, আমার ছেলেটারে আর মারবেন না। ওর মাথা ভারি, সবকিছু শিখতে সময় লাগে।” আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তখনই মনে হলো, আমরা যারা শিক্ষক, তাদের ভেতরে যদি ধৈর্যের অভাব থাকে, তবে একটি শিশুর ভেতরের মেধা ধীরে ধীরে নিভে যাবে। আমার বিশ্বাস, প্রতিটি শিশুই মেধাবী। শুধু প্রয়োজন একটু সঠিক দিকনির্দেশনা আর ভালোবাসা। কিন্তু আমাদের সমাজে শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসে। কারও ঘরে আলো-আঁধারির খেলা, কারও ঘরে অভাবের হাহাকার, আবার কারও ঘরে শিক্ষার পরিবেশ একেবারেই নেই। সব শিশুকে একই মাপে মাপতে গেলে অনেকেই পিছিয়ে পড়ে। ঝরে পড়া মানে আসলে একটি মেধার মৃত্যু। একটি আলোকবর্তিকার নিভে যাওয়া। একটি ভবিষ্যতের থেমে যাওয়া। তাই আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন আমাদের বিদ্যালয়ে এমন এক পরিবেশ হবে যেখানে শিশুরা আনন্দ খুঁজে পাবে। বইয়ের পাতার গন্ধে তারা আবিষ্কার করবে নতুন পৃথিবী। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। কেউ কাউকে ভয় পাবে না। আমি চাই, আর যেন কোনো আসাদ ইটভাটায় হারিয়ে না যায়, কোনো জয় যেন টাকার ঝলকে শৈশব হারিয়ে না ফেলে। আমি চাই, আমাদের প্রতিটি শিশু পড়াশোনায় আনন্দ খুঁজে পাক। তারা যেন মনে করে, স্কুল মানেই এক স্বপ্নের জায়গা—যেখানে তারা হাসবে, শিখবে, বড় হবে। তবু মাঝে মাঝে ভয় হয়, আমি কি পারব এই পরিবর্তন আনতে? একজন শিক্ষক কি একার পক্ষে এত বড় লড়াই লড়তে পারে? তারপরও মনে জোর পাই, কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি শিশুর চোখের আলো বদলে দিতে পারলে, সে আলো একদিন পুরো সমাজকে আলোকিত করবে। আর সেই বিশ্বাসই আমাকে প্রতিদিন নতুন করে শ্রেণিকক্ষে দাঁড় করায়। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার পথে যখন দেখি, পুকুরপাড়ে কিছু শিশু খেলা করছে, তখন মনে হয়—এই শিশুরাই আগামী দিনের সূর্য। তাদের হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাই আমি প্রতিজ্ঞা করি, যতদিন শিক্ষকতার পথে আছি, ততদিন চেষ্টা করব প্রতিটি শিশুকে আঁকড়ে রাখতে, অনুপ্রাণিত করতে, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে। কারণ আমি জানি—একটি শিশুর ঝরে পড়া মানে একটি স্বপ্নের ঝরে পড়া, একটি জাতির স্বপ্নভঙ্গ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now