বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কপালের ভেতরে আটকে থাকা জুলাই
জুলাই মাসের সেই দিনটিকে জান্নাতী আক্তার সাথী আজও ভুলতে পারে না।
১৯ জুলাই ২০২৪, সাভার বাসস্ট্যান্ডে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল মানুষের রাস্তাঘাটে। ঢাকার প্রান্তে সাভার যেন এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত হয়ে উঠেছিল। চারপাশে স্লোগান, মিছিল, পুলিশের গর্জন, হঠাৎ করেই টিয়ারশেল আর গুলির শব্দে ভরে যায় বাতাস। মানুষের চোখ ভিজে যায় পানি আর গ্যাসে, কানে বাজতে থাকে বুলেটের শব্দ।
সাথী তখন ছিলেন জামিয়া ইসলামিয়া আশরাফুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস শ্রেণির শিক্ষার্থী। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকি দিচ্ছিলেন তিনি, যেন এই সময়ের ইতিহাসকে নিজের চোখে একটুখানি ছুঁয়ে দেখা যায়। কিন্তু সেই উঁকি তাকে চিরজীবনের জন্য এক অদৃশ্য ভারে বেঁধে রাখল। পুলিশের ছোড়া একটি রাবার বুলেট তার কপালের ডানপাশে এসে আঘাত করল। মুহূর্তেই রক্তে ভিজে গেল মুখ, আর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
চারপাশে তখন তীব্র আতঙ্ক। কারও সাহস হয়নি তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। দুই দিন রক্তাক্ত অবস্থায় অপেক্ষা করতে হলো। পরে সাভারের সুপার হাসপাতালে এক্স-রে করলে বোঝা গেল, ক্ষতস্থানে এখনও বুলেট রয়ে গেছে। অপারেশন করা হলো, কিন্তু ডাক্তাররা খুঁজে পেল না। সিটি স্ক্যানের পর জানা গেল—বুলেটটি মাথার হাড়ের গহ্বরে আটকে আছে। চিকিৎসকরা বললেন, "যদি মাংসের সঙ্গে মিশে যায়, তবে বিপদ আছে। হাড়ের ভেতরে থাকলে হয়তো আপাতত কোনো সমস্যা হবে না।" সেই আপাতত-এর ভরসাতেই চলছে সাথীর জীবন।
এখন তিনি সদর থানার মাটিকাটা বরুন্ডি রাবিয়া রউফ মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষক। মাসে মাত্র সাত হাজার টাকা বেতন পান। কপালের গভীরে লুকিয়ে রাখা বুলেটের ভার নিয়ে প্রতিদিন ছাত্রীদের সামনে দাঁড়ান, তাদের পড়ান কোরআন-হাদিস। শ্রেণিকক্ষের চক ও কালির গন্ধ মিশে যায় তার মাথার ভেতরে ধুকপুক করা অদৃশ্য ব্যথার সঙ্গে।
সাথীর বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল ধাইরাপাড়া গ্রামে। বাবা আব্দুল করিম দিনমজুর, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দেন অন্যের জমিতে। নিজের কোনো জমিজমা নেই, কেবল ভিটাটুকু আছে। মা মাজেদা খাতুন সংসারের যাবতীয় দুঃখ বুকে চেপে ধরে রাখেন। পাঁচ মেয়ের সংসারে কীভাবে যে দিন চলে যায়, তা কেবল তাদেরই জানা।
মেজো মেয়ে সাথী বড় হয়েছে। বাবা-মা চেয়েছিলেন, পড়াশোনা শেষ করে তার বিয়ে দেবেন। কিন্তু জুলাইয়ের গুলিটি তাদের সব স্বপ্নকে ভেঙে টুকরো করে দিল। একের পর এক ছেলের পরিবার আসে, দেখে যায় সাথীকে। কিন্তু যখনই শুনে, তার মাথায় এখনও বুলেট রয়ে গেছে, আর সেটি বের হয়নি—তারা পিছিয়ে যায়। মাত্র ছয় মাসে অন্তত চারটি বিয়ের প্রস্তাব ভেস্তে গেছে। সাথীর চোখে তখন অদ্ভুত এক অব্যক্ত কষ্ট জমে থাকে। যেন সে অপরাধী, অথচ সে তো কেবল ইতিহাসের ক্রসফায়ারে আটকে পড়া এক মেয়ে।
মা মাজেদা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, "সেদিন ভয় এতটাই ছিল, কাউকে বলিনি। যদি জানাজানি হয়, পুলিশ আবার ধরে নিয়ে যাবে। তাই চুপ করে ছিলাম। পরে ভয় কাটলে অনেকের কাছে গিয়েছি সাহায্যের জন্য, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।"
তবুও গ্রামের মানুষ একেবারে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। মিঠু চেয়ারম্যান দিয়েছেন বিশ হাজার, সাইদুর মেম্বার দিয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা। সেই টাকায় চিকিৎসার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তাতে কি কাজ হয়? বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকরা বলেছেন, বুলেট বের করতে অপারেশন করতে হবে। তাতে খরচ লাগবে সত্তর হাজার টাকা। যাবতীয় আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রায় এক লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করা করিম পরিবারের পক্ষে দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
প্যানেল চেয়ারম্যান খলিল মেম্বার দুঃখ করে বলেন, "ওরা একেবারে গরিব। আমি মানিকগঞ্জের সমন্বয়ক থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় গেছি, সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সনদে নাম লিখেছে, সরকারি সাহায্য পাবে বলে শোনা গেছে, কিন্তু বাস্তবে এখনও কিছু মেলেনি।"
অথচ এই মেয়ে সাথী এখনও দৃঢ়চেতা। মাথায় লুকিয়ে রাখা মৃত্যুর ছায়া নিয়েও প্রতিদিন মাদ্রাসায় যান। কোরআন খতম করেন, ছাত্রীরা যখন তার চারপাশে জড়ো হয়ে পাঠ করে, তিনি মৃদু হাসেন। কিন্তু সেই হাসি ভেতরে এক দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখে।
রাতে যখন নিজের বিছানায় শুয়ে থাকেন, তখন কপালের ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে। আঙুল দিয়ে তিনি বারবার ছুঁয়ে দেখেন ক্ষতচিহ্ন। চোখ বুজলেই মনে হয়, অন্ধকার থেকে আবার ছুটে আসছে সেই রাবার বুলেট, আবারও আঘাত করছে তাকে।
গ্রামের অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে এই গল্প। মেয়েটি এখন মানুষের কাছে শুধু একজন শিক্ষক নয়, বরং এক সংগ্রামের প্রতীক। কেউ কেউ বলেন, "সাথীর মাথায় বুলেট আছে—এটা তো আল্লাহর পরীক্ষা।" আবার কেউ কেউ ফিসফিস করে, "ওর বিয়ে হবে কীভাবে?"
কিন্তু সাথী জানেন, তার জীবন কেবল বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার গল্প নয়। তার জীবন হলো ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা এক সাক্ষ্য, যে সাক্ষ্য বলে দেয়—কোনো আন্দোলনের আগুন কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেই আগুন গিয়ে জ্বলে ওঠে অজস্র ঘরবাড়িতে, মায়ের চোখের কোণে, মেয়েদের কপালে।
তার বাবা করিম দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে বসে থাকেন উঠোনে। কানে বাজতে থাকে মেয়ের অস্পষ্ট কণ্ঠ—"আব্বা, যদি আমি একদিন হঠাৎ মারা যাই, তুমি কোরআন খতম করে দোয়া করো আমার জন্য।" করিম তখন চোখ মুছেন, যেন তার শ্রমজীবী হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবীটা ফসকে যাচ্ছে।
জুলাইয়ের গুলিটি এখন শুধু সাথীর কপালে আটকে নেই। সেটি আটকে আছে তার বাবার হৃদয়ে, তার মায়ের চোখের জলে, তার বোনদের ভবিষ্যতের আঁধারে। প্রতিটি বিয়ের ভাঙা প্রস্তাব সেই গুলির শব্দকে আবারও প্রতিধ্বনিত করে।
তবু সাথী হাল ছাড়েননি। তিনি প্রতিদিন ছাত্রীদের বলেন—"জ্ঞান অর্জন হলো মানুষের আসল সম্পদ। যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।" যেন নিজের অস্থির মনের সঙ্গেই তিনি এই কথাগুলো বারবার বলেন।
গ্রামের আকাশে ভোরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন সাথী মাথায় ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েন মাদ্রাসার দিকে। তার কপালের ভেতরে লুকানো বুলেট প্রতিদিনই তাকে মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যুর সঙ্গে কতটা কাছে হাঁটছেন তিনি। অথচ সেই মৃত্যু নয়, বরং জীবনের প্রতি অনড় এক দায়বদ্ধতা নিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now