বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
মধুপুরের মাটির গন্ধে ভেজা সেই গ্রামটিতে এখনও ভোর হলে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি। আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়লে নদীর পাড়ের কাশবনের ফাঁক দিয়ে বয়ে যায় শীতল বাতাস। সেই গ্রামেরই এক কিশোরী – নাম তার বিনতা। বয়স সতেরো, কিন্তু চোখেমুখে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।
বিনতার মা ছিলেন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের একজন। সারা জীবন শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে চলেছেন। বিনতাকে প্রায়ই তিনি বলতেন—
—“মা, ঘোমটা শুধু কাপড় নয়, এটা নারীর মর্যাদা, তার আভিজাত্য। শাড়ির আঁচলে যখন ঘোমটা টেনে নিই, তখন মনে হয় আমি আমার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেছি।”
বিনতা মায়ের কাছে ঘোমটার গল্প শুনতে ভালোবাসত। মা বলতেন, তার দাদী, প্রপিতামহী— সবাই শাড়ি পরে, মাথায় ঘোমটা টেনে চলতেন। হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদাভেদ ছিল না। উৎসব হোক কিংবা শোক, মাঠে ধান কাটতে যাওয়া কিংবা পুকুরঘাটে পানি আনতে যাওয়া— ঘোমটা নারীর সঙ্গী।
একদিন বিনতা স্কুল থেকে ফিরছিল। শহরে থাকা এক সহপাঠিনী— নীলা— তাকে বলল,
—“তুই কেন এমন গ্রামীণ সাজে থাকিস? শহরে সবাই আধুনিক জামাকাপড় পরে, কেমন স্মার্ট লাগে। এই ঘোমটা-টোমটা তো একেবারে পুরনো ধ্যানধারণা।”
বিনতা চুপ করে ছিল। কিন্তু তার মনে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব শুরু হলো। আসলেই কি ঘোমটা পুরনো ধ্যানধারণা? নাকি এটিই তার শেকড়?
রাতে সে দাদীর কাছে গিয়ে জানতে চাইলো,
—“দাদী, ঘোমটা কি শুধু লজ্জার প্রতীক? নাকি এর ভেতরে আরও কিছু আছে?”
দাদী মৃদু হেসে বললেন,
—“আহা মা, লজ্জা বাঙালী নারীর ভূষণ। ঘোমটা সেই লজ্জাকে রক্ষা করার ঢাল। এটা কেবল মুখ ঢাকার কাপড় নয়, এটা নারীর আত্মসম্মান, শালীনতা আর পরিবারের সংস্কৃতির প্রতীক। আমরা ঘোমটা দিয়ে কেবল পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুখ লুকাতাম না, বরং নিজের ভেতরে এক ধরণের নিরাপত্তাও পেতাম।”
দাদীর চোখ ভিজে উঠেছিল স্মৃতিতে। তিনি বললেন,
—“তোর ঠাকুরমা যখন ছোট ছিলেন, তখন গ্রামে কোনো মেয়ে ঘোমটা ছাড়া চলতো না। হিন্দু ঘরে কিংবা মুসলিম ঘরে— পার্থক্য করা যেত না। শাড়ি, পেটিকোট, ব্লাউজ— এ ছিল সবার পরিচয়। শহর থেকে একেবারে নতুন ফ্যাশন আসতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে মেয়েরা ঘোমটা ছেড়ে দিল।”
বিনতা শুনে ভাবলো— তবে কি আধুনিকতার নামে সে নিজেকে হারাচ্ছে?
একদিন গ্রামের মাঠে নাটকের আয়োজন হলো। নাটকের নাম ছিল “নারীর মর্যাদা”। নাটকে দেখানো হলো— একসময় গ্রামে সব নারী ঘোমটা দিয়ে চলতো, সবাই একে অপরকে সম্মান করতো। কিন্তু আধুনিক পোশাকের নামে যখন অশালীনতা বাড়লো, তখন সমাজে অশান্তি, নারী নির্যাতন আর অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেল। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখলো নাটক। অনেকেই বলল, “আমাদের ঐতিহ্য সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে।”
সেই রাতেই বিনতার মনে হলো— ঘোমটা কেবল কাপড় নয়, এটি এক ধরণের প্রতীক। প্রতীকটি হলো আত্মমর্যাদা, শালীনতা আর ঐক্য।
কিছুদিন পর বিনতা শহরে কলেজে ভর্তি হলো। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকতেই কয়েকজন সহপাঠী তাকে ঠাট্টা করে বলল—
—“আরে, গ্রাম থেকে এসেছে মাটির ঘ্রাণ নিয়ে! এই আঁচল টেনে চলা নাকি আবার ফ্যাশন?”
কিন্তু বিনতা দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলো—
—“হ্যাঁ, এটা ফ্যাশন নয়, ঐতিহ্য। আমি গর্ব করি আমার বাঙালী সংস্কৃতিতে। ঘোমটা আমার শেকড়ের অংশ।”
ক্লাসে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কারও কিছু বলার ছিল না।
দিন যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে শহরের মেয়েরাও খেয়াল করতে শুরু করলো, বিনতার পরিমিত পোশাক আর ঘোমটা তাকে অন্যভাবে আলাদা করে তুলছে। তার ভেতরে এক ধরণের আত্মবিশ্বাস আছে, যা আধুনিক পোশাকের চকচকে বাহুল্যে নেই।
একদিন নীলা এসে বলল—
—“তুই ঠিকই বলেছিলি বিনতা। ফ্যাশন আসে যায়, কিন্তু সংস্কৃতি স্থায়ী। তোর শাড়ি আর ঘোমটা দেখে আমারও মনে হয়, আমিও যদি আমাদের শেকড়ের সাথে আবার জুড়ে যাই।”
বিনতা হাসলো। মনে মনে সে মায়ের কথা মনে করল—
—“ঘোমটা মানে মর্যাদা।”
বছর কয়েক পরে, বিনতা গ্রামে ফিরে গেল। তখন সে কলেজ থেকে পাশ করে শিক্ষিকা হয়েছে। গ্রামের মেয়েদের ডেকে বললো—
—“আমরা আধুনিক হবো, কিন্তু শিকড় ভুলে নয়। আমাদের ঐতিহ্যের প্রতিটি রূপ আমাদের পরিচয় বহন করে। ঘোমটা আমাদের শালীনতার প্রতীক। কেউ চাপিয়ে দিলে ঘোমটা নয়, বরং আমরা নিজেরা বেছে নেবো— আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার ঢাল হিসেবে।”
গ্রামের মেয়েরা হাততালি দিলো। নদীর ধারে শঙ্খধ্বনির মতো ধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো— “ঐতিহ্য হারালে জাতি হারায়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now