বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পুণ্যভূমির খোঁজে

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X আরবের বুকে সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়ছে। ধুধু মরুভূমির বাতাসে উড়ছে বালুকণার নীরব সুর। গোধূলির আলোয় বালির পাহাড়গুলো যেন সোনালি আবরণে মোড়া। সেই মরুপ্রান্তরের এক কোণে, তারাবাতির আলোর নিচে বসে আছেন দুই সাধক—একজন গুরু, অন্যজন তাঁর শিষ্য। বয়োজ্যেষ্ঠ, মুখভরা সাদা দাড়ি, চেহারায় জ্যোতির্ময় দীপ্তি—তিনি হলেন সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)। তাঁর পাশে বসে থাকা যুবকটি গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছে দিগন্তের দিকে। তার মুখাবয়বে জিজ্ঞাসা, অথচ গভীরে যেন শান্ত সমুদ্র। তিনি শাহ মোবারক, যার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে শাহ জালাল (রহ.) নামে। একদম নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎ একটি প্রাণী এসে দাঁড়ায় দরবারের ঠিক মাঝখানে। একটি হরিণশাবক। চোখে আতঙ্ক, দেহে কাঁপুনি। তার নিঃশব্দ আর্তি যেন বাতাসেও গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে—"আমাকে রক্ষা করুন। বাঘ আমার পিছু ছাড়ছে না।" গুরু সৈয়দ আহমদ কবির মৃদু হাসলেন। মনের গভীরে সিদ্ধান্ত নিলেন, এই বন্য অত্যাচারী বাঘকে চপেটাঘাতে তাড়াবেন। ডান হাতে তিন আঙুল, বাঁ হাতে দুই আঙুলের চপেটাঘাত! কিন্তু হঠাৎ তাঁর ছাত্র, শাহ জালাল (রহ.), চোখ বন্ধ করলেন। কিছু বললেন না। শুধু মনোযোগ দিলেন মনোযোগের গভীরে—সেই স্থানে যেখানে আধ্যাত্মিক শক্তি জেগে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই বাঘের গর্জন থেমে যায়। হরিণশাবক হাঁপাতে হাঁপাতে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। চেয়ে দেখেন গুরু—শাহ জালাল (রহ.) ইতিমধ্যে সেই চপেটাঘাত সম্পন্ন করেছেন তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে। গুরু বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন ছাত্রের মুখে। তারপর হেসে বললেন, — “তুমি এখন পরিপূর্ণ। আমার শিক্ষা তোমার জন্য শেষ। এখন তোমার যাত্রা শুরু হোক।” তিনি একটি কাপড়ের থলি খুলে বের করলেন একমুঠো মাটি—মক্কার পবিত্র মাটি। — “এই মাটি তুমি সঙ্গে রাখবে। হিন্দুস্তানের পথে তুমি হাঁটবে। যে জায়গার মাটি এই মাটির রঙে, গন্ধে, স্বাদে মিলবে, সেখানেই তুমি থামবে, বসতি স্থাপন করবে। ইসলাম প্রচার করবে। আর সেই মাটিই হয়ে উঠবে তোমার আস্তানা।” শাহ জালাল (রহ.) মাথা নিচু করে সেই মাটি হাতে তুলে নিলেন। পবিত্রতা যেন ঝরে পড়ছে তাঁর দৃষ্টিতে। সেই মাটির গন্ধে তিনি অনুভব করলেন ভবিষ্যতের ইশারা। ________________________________________ এই মহান যাত্রায় তিনি একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী ও মুরিদ—সৈয়দ শেখ আলি (রহ.), যিনি পরবর্তীতে চাষনী পীর নামে খ্যাত হন। তাঁর উপর অর্পিত হয় পবিত্র দায়িত্ব—মাটির গন্ধ, রঙ ও স্বাদের মিল যাচাই করা। তাঁদের যাত্রা শুরু হয় মক্কা থেকে, এরপর ইয়েমেন, সোমালিয়া, গুজরাট, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম। প্রতিটি স্থানে তাঁরা থামেন, মাটি খুঁটে নেন, চাষনী পীর হাতে নিয়ে পরীক্ষা করেন—চোখে দেখেন, নাকে গন্ধ শোঁকেন, জিহ্বায় স্পর্শ করেন। কিন্তু কোথাও মেলে না সেই নিখুঁত মিল। সময় পেরিয়ে যায়, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। হিন্দুস্থানের পথে এই দু’জন আধ্যাত্মিক অভিযাত্রী হাঁটতে থাকেন নিরন্তর। ________________________________________ অবশেষে তাঁরা পৌঁছেন এক বিস্ময়কর উপত্যকায়—নদী, পাহাড়, বন আর ছায়াঘেরা সবুজে মোড়া এক ভূখণ্ড। এর নাম—সিলহট, যা পরবর্তীকালে পরিচিত হয় সিলেট নামে। কিন্তু এই ভূমি ছিল রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসনে। হিন্দু রাজা, প্রাচীন রাজ্য, কট্টর ধর্মাচার। মুসলমানদের অবস্থান সেখানে নাজুক, অত্যাচার, নিষেধাজ্ঞা আর ভয়ের মধ্যে। শাহ জালাল (রহ.) তাঁর ৩৬০ জন দরবেশসহ এই ভূমিতে প্রবেশ করেন। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিক যুদ্ধ—অস্ত্রের নয়, সত্য ও আলোর বিরুদ্ধে অন্ধকারের। শেষ পর্যন্ত গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হন, আর ইসলাম লাভ করে এক নতুন কেন্দ্র। এই বিজয়ের পর একদিন চাষনী পীর মাটির থলি খুলে পরীক্ষা করেন বর্তমান সিলেটের মাটি। তাঁর মুখে বিস্ময়। কয়েকবার খুঁটে খুঁটে মাটি নেন, চোখ বন্ধ করে গন্ধ নেন, স্বাদ নেন। তারপর ছুটে যান শাহ জালাল (রহ.)-এর কাছে। — “হুজুর! আমি এই মাটির মধ্যে সেই মিল খুঁজে পেয়েছি। বর্ণে, গন্ধে, স্বাদে—এটি সেই মক্কার মাটির সঠিক প্রতিচ্ছবি। এটাই সেই ভূমি!” শাহ জালাল (রহ.) চুপচাপ সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাঁর চোখে জল। হৃদয়ে বয়ে যায় ধন্যবাদ আর প্রশান্তির ঢেউ। তিনি বলেন, — “এই ভূমি শুধু ভূমি নয়। এই ভূমি হচ্ছে নূরের ধারক। এখান থেকেই ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়বে পাহাড়, নদী আর হৃদয়ে।” তিনি দরগা মহল্লার এক ছোট্ট টিলায় গড়ে তোলেন তাঁর আস্তানা। সেই একমুঠো মক্কার মাটি ছড়িয়ে দেন চারপাশে। যেন আরবের পবিত্র ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সিলেটের বাতাসে। ________________________________________ এরপর শুরু হয় নতুন ইতিহাস। সিলেট আর শুধু এক স্থান নয়, হয়ে ওঠে এক আধ্যাত্মিক রাজধানী। শাহ জালাল (রহ.) রেখে যান তাঁর ৩৬০ দরবেশদের। তারা ছড়িয়ে পড়েন পাহাড়ে, নদীতীরে, বন-জঙ্গলে—প্রতিটি স্থানে গড়ে তোলেন খানকাহ, মসজিদ ও মাদ্রাসা। প্রজন্ম পেরোয়, কালের স্রোত বয়ে চলে। কিন্তু সিলেটের মাটিতে এখনো টের পাওয়া যায় সেই মাটি ছড়ানোর অলৌকিক মুহূর্তের সৌরভ। আজও সেই দরগা মহল্লার বাতাসে, সেই পুরনো টিলার নীরবতায়, কেউ যদি কান পেতে শোনে, শুনতে পাবে সেই পবিত্র নীরব কণ্ঠস্বর— “এই ভূমিই পুণ্যভূমি। এই ভূমিই সেই বেছে নেওয়া জায়গা।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now