বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম-- নেপথ্যের কথকতা
সাহিত্য আড্ডায় নানান গল্প-কাহিনী আর রঙ্গরসে রাত যে একটু একটু করে গভীরের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, সে বিষয়ে বোধয় কারো খেয়াল নেই। হয়তো নিজের এলাকা ছেড়ে অযাচিতভাবে বেখেয়ালে অন্য এলাকায় ঢুকে পড়ে খানিকটা বিপদেই পড়ে গেলো বেচারা কুকুরটি, করুণ চিৎকার কিংবা লেজগুটিয়ে আত্মসমর্পণ কোন কিছুই তাকে স্বজাতিদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পাচ্ছে না। সাধারণত লেজগুটিয়ে আত্মসমর্পণ করলে যতো বড়ই অপরাধ হোক না কেন সেটা সাধারণ ক্ষমার দৃষ্টিতে পড়ে যায়, কুকুরদের সমাজে। কিন্ত কুকুরদের এমন সুশৃঙ্খল বিধি-বিধান কেবল আজকেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বেশ মোটা তাজা আর নাদুস-নুদুস চেহারার কুকুরটাকে পাঁ-ছ’টা কুকুর মিলে একসাথে আক্রমণ করছে, কামড়ে-টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো মোটা তাজা হওয়াটাই বিপক্ষ দলের ঈর্ষার প্রধান কারণ। যা হোক সেই অসহায় কুকুরটার করুণ চিৎকারে আড্ডাবাজ কবি-সাহিত্যিকদের মনোযোগে ভাটা পড়ে। এবার মাজহার আনছারি সাহেব দরজা ভিড়িয়ে দেওয়ার লাঠিটা হাতে নিয়ে কুকুরগুলোকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ কাজে তার সফলতাও এলো শতভাগ। কিন্তু হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ে যায় আকাশের দিকে, গোলাকার চাঁদটা ঠিক মাথার উপরে। সর্বনাস! রাত যে বেশ গভীরের দিকে পা বাড়াচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কপালে আজ কি আছে সেটা একমাত্র উপর ওয়ালায় জানে। তিনি খুব দ্রæত ভেতরে গিয়ে বলেন, বন্ধুরা আজ আর নয়, অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে, রাত প্রায় দ্বিপ্রহরের দিকেই হাঁটছে। চলুন আজ ওঠা যাক।
এ্যাঃ বলেন কি ভাই! সবেমাত্র তো সন্ধ্যে হলো।
আজ্ঞে না সাহেব, এ আপনার মতিভ্রম। তাহলে রাত হওয়া অবদি এখানে বসে থাকুন। আমি কিন্তু ভাই চললাম। গিন্নির মাথার ব্যারামটাও বেড়েছে, তাকে সময়মত অষুধটা না দিলে ব্যারাম সারবে কিভাবে?
রফিক সাহেব হো হো করে হেসে বললেন- আরে সাহেব, রাততো দ্বিপ্রহর গড়িয়ে ভাটির দিকে চলে গেছে। এটা ওষুধ খাওয়ার সময় নাকি?
এ দায়ভারটাতো আপনার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে সাহেব, রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে আজ এতোটা নাড়া-চাড়া করার কি দরকার ছিলো বলুন দেখি?
ইমতিয়াজ সাহেব সবে মাত্র এটা পান গাল ভরে মুখে দিয়ে ধীরভাবে চিবাচ্ছিলেন কিন্তু তাদের কথপোকথনে
তিনি না হেসে পারলেন না, তাই হো হো হাসতে যেয়ে মুখের অর্ধভগ্ন পান মিশ্রিত সুপারীর গুড়ো সবার গায়ে ফুলের ফাপড়ির মতো ছিটিয়ে পড়লো। সবাই প্রায় একই সাথে সমস্বরে বলে উঠলো আরে সাহেব করেন কি? করেন কি? অযাচিতভাবে ঘটনাটা ঘটে যাওয়ায় তিনি একটু লজ্জিত হলেন। সবাই গা ঝাড়া ঝাড়ি করছে, এ সুযোগে তিনি বললেন- ইয়াশ সাহেব, রবীন্দ্র সাহিত্যের চেয়েও যে, ঘরোয়া সাহিত্যটা এতো বেশি প্রাণবন্ত ছিলো সেটা কি আর আমরা জানতাম? তবে যে কোন চিন্তার মধ্যে কিছুটা আবেগ, কিছুটা মননশীলতা থাকেই, যা আমাদের জন্য একান্তই প্রাসঙ্গিক সেটা হচ্ছে চিন্তার ধরন ও এর আশু পরিবর্তন। রবীন্দ্র সাহিত্যে শেষের দিকটায় বেশ জোর আছে। চলুন সবাই ঘরে যাই। তবে খুব শিগগির আমরা আবারও বসছিতো? তানাহলে যে সব ভাটা পড়ে যাবে।
ইমতিয়াজ সাহেব বললেন- শিগগির মানে কি সাহেব, কালই সন্ধ্যায় সবাই এখানে চলে আসুন। কালকের চা পানের সব ব্যবস্থা করে রেখেছি আমি।
আনছারি সাহেব বললেন- ইমতিয়াজ সাহেব আপনিতো ওদিকটায় যাবেন মনে হয়, চলুন আমরা একসাথে যাই।
মাজহার আনছারি বোউয়ের ভয়ে জড়সড় হয়ে, চোর যেমন ধরা পড়ার ভয়ে গুণে গুণে পা ফেলে ঠিক তেমন করে
গুণে গুণে পা ফেলে শোবার ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর খুব নরম সুরে, আদর ভরা কণ্ঠে ডাকলেন, ওগো শুনছ, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?
তার মধুমাখা করুণ সুরের ডাকে তমাশ্রীর মন নরম হয়ে গেলো। যত রাগই থাকনা কেন আপাতত তার প্রয়োগ হচ্ছে না এটা নিশ্চিত হলো আনছারি। একটা দীঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, যাক, এ যাত্রায় অন্তত রেহাই পাওয়া গেলো।
তমাশ্রী ঘোষের কড়া হুকুম জারি, রাত তো রাত, দিনের বেলাতেও বাড়ির বাহিরে যাওয়া বন্ধ। আর কেনই বা যাবে শুনি? কি দরক্র? যা করতে হবে, সব ঘরে বসেই করা যায়। লেখা-লেখি, বই পড়া, সাহিত্য চর্চা কিংবা সাহিত্য গবেষণা এইতো? বিশ্ব খ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘরে বসেই সব করেছেন, তাহলে তোমরা কে-হে?
তোমরা পারবে না কেন? আর হ্যাঁ, রাত যেগে যেগে সাহিত্য আড্ডার নামে নারী-পুরুষের ঢলাঢলি, ওসব চলবেনা। ¯্রফে বলে দিলাম। এভাবে রাত জেগে জেগে তুমি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলে, সামলাবেটা কে -শুনি? তখন কি তোমার আড্ডার সঙ্গিনীরা এসে মুখে চামুচ ধরবে? সব দায়তো আমারই বটে।
যথার্থ বলেছ গিন্নি। এই না হলে কি আর গিন্নি হওয়া যায় গো। তবে এতো দিনে আমার বোধগম্য হলো- তোমার ব্যারামটা আসলে কোথায়!
ও আচ্ছা, তাহলে তোমার ধারণা আমি মিছে-মিছি ব্যারামের ভান করে বিছানায় পড়ে থাকি? আমার সোনা রঙ দেহখানা তোমার সংসার সামলাতে কালো হয়ে গেলো, তোমার সংসারে এসে আমার জীবটা ফানা-ফানা হয়ে গেলো। তারপরেও তোমার মন ভরলো না। আমি ছাড়া তোমার চোখে পৃথিবীর সব নারী ভালো, অপরূপ সুন্দরী, বেহেস্তের হুর-পরী, তাই না? এই নাও তোমার সংসার, আমি চললাম।
এই বলে তমা চাবির তোড়াটা এতোটাই জোরে ছুঁড়ে দিলো যে, সেটা যেয়ে ঠাস করে লাগলো কাচের আলমারিতে। তোড়ার আঘাতে আলমারির কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। একদিকে আমার উপর অভিমান অন্যদিকে আলমারির কাচ ভাঙার শোক সব মিলিয়ে তার কান্নাটা অবধারিত হয়ে পড়লো। তমা এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। তার ভাবটা এমন যে আলমারির কাচ আমি ভেঙেছি।
আমি জানি এতো রাতে গেটের বাহিরে যাওয়ার সাধ্য তার কোন দিনই হবে না। বেচারির চোখের জলে বুক ভিজা কান্না, নেহাত আমাকে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়। সে মনে মনে এও ভাবছে যে, আমি এখনো কেন তার কাছে যাচ্ছিনা, একটু আদর করে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করছি না। আমি কি করে এতোটা পাষাণ হতে পারি ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন নারী চায় প্রতিটি মুহুর্তে স¦ামী নামক পুরুষটি তার পাশে থাক, তাকে সময় দিক, ভালোবাসুক, তার নারীত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোক, তাকে সম্মান দিক। সামান্য এ প্রাপ্তিতেই সে আনন্দে গদগদ হয়ে যায়। সে নারীর ভেতর থেকে যেন একটা ঝলমলে আলো বেরিয়ে আসে। সে হয়ে ওঠে সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সবচেয়ে হাসিখুশি, সবচেয়ে সুন্দর মনের একজন মানুষ। সে প্রস্ফুটতি হয় এক পরিপূর্ণ নারীরূপে।
যাহোক, এবার আমি তার কাছে যেয়ে একটু আদর করে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম, দেখ তমা, তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব, যার সক্রিয় বিবেক-বুদ্ধি আছে, ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আছে। আমি কেন তোমার সম্পর্কে এমন খারাপ ধারণা পোষন করব, বলো?
এবার তমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলো। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবছে, তাতে বোঝা গেলো যে আমার কথাগুলো তার মনোগ্রাহীতা অর্জনে সামর্থ হয়েছে। তবুও অশ্রæ ভেজা চোখে সে চেয়ে রইলো আমার দিকে অনেকটা সহানুভুতিশীল দৃষ্টিতে। এরকম ঘটনাতো প্রথম নয়, বিনা কারণে সন্দেহের যে ছোট্ট মেঘটা ভেসে বেড়াচ্ছে তার চেতনার উপর হয়ত সেটা একটু একটু করে সরে যেতে শুরু করেছে। এবার সে সরাসরি চোখ তুলে তাকালো আমার দিকে অবশ্য রাগে নয়, সহানুভুতিতে।
সে বললো- আচ্ছা তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, জামা-কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে আস, খেতে হবে না। রাত কি আর তোমার জন্য বসে থাকবে?
সুপ্রিয় পাঠক, এই দিনটায় ফিরে যাই আজ থেকে ঠিক দু’যুগ আগের ঘটনায়। শান্তিপুর গ্রামটার মাঝখান দিয়ে নদী। গ্রামটাকে যেন মেপে মেপে সমান দু’ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। ভাগাভাগি সমান হলে কি হবে? নদীর দু’পারে দুটি ভিন্ন জাতির বসবাস। পশ্চিম পারে মুসলমান আর পূর্ব পারে হিন্দু। বাপ দাদার আমল থেকে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেনায় একত্রে মিলে মিশে বসবাস করে আসছে। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ও হিন্দুদের পূঁজো পার্বণে তারা অভিন্ন মতাদর্শে মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে যায়। কিন্তু সেই সম্প্রীতি যে একটা নতুন করে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে একদিন সেটা কি কেউ জানত?
মাজহার আনছারী কলেজের পরীক্ষা শেষ করে অনেক দিন পর গ্রামে আসে। পড়ন্ত বিকেলে নদীর পারের ঠাণ্ডা হাওয়া যে কারও কাছে একটা তৃপ্তিদায়ক অনুভুতির শিহরণ জাগায়। আলম তাই একাকী নিভৃতে নদীর পারে হাঁটতে শুরু করে। নদীর স্বচ্ছ পানিতে মাছেরা খেলা করে আপন মনে। আলম নূন্যতম সাড়া-শব্দ না করে খুব কাছে যেয়ে ছিপছিপে জলে নেমে মাছের খেলা দেখে। নদীর ওপারে একটি যুবতী মেয়ে তাকে দেখে খিলখিল করে হেসে ওঠে। যুবতী ধরেই নিয়েছিলো যে ছেলেটি একটা বদ্ধপাগল, নইলে মাথা নিচু করে ওভাবে কেউ জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। খিলখিল হাসির শব্দে আলমের নীরবতা ভেঙে যায়, সে মাথা তুলে নদীর ওপারে
তাকায়। নদীর এপার-ওপারের দূরত্বটা খুব বেশি না হওয়ায় সে স্পষ্ট দেখতে পায়, এক অপরূপ যুবতী মেয়ে নদীর কিণারে মৃদু পায়ে হাঁটছে। তার সঙ্গী সাথীরা একটু দূরে যাওয়ায় সে তাদের হাত ইশারা করে ডাকছে।
ইয়াশ তার রূপে মুগ্ধ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা সে বুঝতে পেরে চঞ্চলা হরিণীর মতো এক লাফ দিয়ে নদী থেকে উঠে পালিয়ে গেলো। কিন্তু পালিয়ে গেলেই কি সবকিছু নিয়ে যাওয়া যায়? সেই মুহুর্তের ছবিটাতো মনের পর্দায় স্মুতি হয়েই রয়ে গেলো।
যুবক বয়সে যুবতীব স্মৃতি, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আর ছোঁয়াছে জিনিস। মুহুর্তের মধ্যে যেন সবকিছুকে ওলট পালট করে দেয়। বুকের ভেতর রাজ্যের সব ভাবনারা এসে জাল বুনে। কে সেই যুবতী? কোথায় তার বাড়ি? কি তার পরিচয়? আলমের মনে পড়ে গেলো উইলিয়াম ওয়ার্ডওয়ার্থেও ‘দা সোলিচারি রিপার’ কবিতার সেই নিঃসঙ্গ বালিকার মতো, চঞ্চল দেহ-মন নিয়ে যেন বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে।
আলমের ধারণা, যুবতী যেহেতু তাকে দেখে খিলখিল করে হেসে ওঠে, তাহলে অবশ্যই তার মনের ভেতর একটা কৌতুহল জেগেছে। আর সে কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে আগামী কাল ঠিক একই সময়ে সে অবশ্যই নদীর পারে আসবে। তার ভবিষ্যত বাণী যেন দৈবমন্ত্রের ন্যায় কাজ করলো। পরদিন ঠিক একই সময়ে যুবতী নদীর পারে এসে ছিপছিপ পানিতে পা ভিজিয়ে আপন মনে হাঁটতে শুরু করলো। তার সঙ্গী সাথীরা খেলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও তার দৃষ্টি ছিলো নদীর ওপারে, ঠিক একই জায়গায় যেখানে যুবকটি দাঁড়িয়েছিলো। যুবতী জানে না যে, যুবকটি কাল যেখানে দাঁড়িয়েছিলো আজ সেখানে নাও থাকতে পারে।
আলম গাছের আড়ালে বসে অনেক্ষণ ধরে তার চলা ফেরা আর বারবার ওপারে তাকানোর বিষয়টি উপভোগ করছে। শেষ বিকেলের সূর্যটা যখন একটু একটু করে দিগন্তের দিকে তলিয়ে যেতে শুরু করলো ঠিক তখনই আলম যুবতীর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। অপরিচিত একজন যুবক কোন যুবতীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে সভাবতই সে যুবতী অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে, বিব্রত বোধ করবে, এটাই স্বাভাবিক। আলমকে দেখে সে যুবতীয় ভূত দেখার মতো আঁৎকে ওঠে, অযাচিত ভাবেই তার মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে, হায় ভগবান! হরিণ সাবক বাঘের মুখে ধরা পড়লে যেমন প্রাণপণে ছাড়া পেতে চেষ্টা করে, আলমের সামনে পড়ে যুবতীও হরিণ সাবকের মতো ছাড়া পেতে প্রাণপণে চেষ্টা করছে। একটু সুযোগ পেলেই যেন দৌড় দেবে। এখন সে মাথা নিচু করে ভাবছে কি ভাবে কি করা যায়।
মাজহার বলে- কালকে আমাকে দেখে কি তুমি হেসেছিলে?
সে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোন কথা মুখ থেকে বেরোনোর অবস্থায় সে নেই।
আলম আবার বলে, এই মেয়ে, ভয় পাচ্ছ কেন? আমি কি ভাঘ, যে তোমায় খেয়ে ফেলব?
যুবতী এবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, সে সত্যি খুব ভয় পেয়েছে।
এই মেয়ে, তোমার নাম কি বলা যাবে?
তমাশ্রী ঘোষ। সবাই তমা করেই ডাকে।
তোমার বাবার নাম কি?
তরুণ চন্দ্র ঘোষ।
ও আচ্ছা, তুমি তরুণ কাকার মেয়ে। আচ্ছা, বরুণ কাকা এখন কোথায়? কি করেন?
কাকার পুলিশে চাকরি হয়েছে। ওই যে মেয়েটা-লাল জামা গায়, ওটা বরুণ কাকার মেয়ে।
বরুণ কাকা আমার বন্ধু ছিলো, আমরা একই সাথে পড়া লেখা করেছি। কিন্তু আমার বাবাকে তারা দাদা বলে ডাকে, সে জন্য আমরাও তাদের তাদেও দু’ভাইকে কাকা বলি।
আপনাকে তো কোন দিন দেখিনি। আপনি কি আমাদের বাড়িতে কখনো গেছেন?
হ্যাঁ, ছোট বেলায় অনেকবার গিয়েছি। হয়তো তোমরা তখন খুব ছোট ছিলে, তাই মনে নেই। তবে পড়া লেখার কারণে বাইরে থাকায় এলাকায় তেমন আসা হয়নি।
তোমার নাম যেন কি বললে? ভুলে গেলাম।
তমা, তমাশ্রী ঘোষ।
হ্যাঁ মনে পড়েছে।
আচ্ছা তমা, অনেক দিন আগের কথা। তরুণ কাকার একটা ছোট্ট মেয়ে এই নদীতে ডুবে গিয়েছিলো। সে কি কান্না কাটি, পাড়ার সব লোক চলে এসেছিলো নদীর পারে। সবাই পানিতে নেমে কতো খোঁজা খুঁজি কিন্তু বাচ্চাটাকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে মধ্য নদীতে আমার পায়ে কি যেন একটা লাগে, আমি নিশ্বাস বন্ধ করে ডুব দিয়ে দেখি সেই বাচ্চাটা। তাড়াতাড়ি করে তুলে এনে দু’হাতে পেটে চাপ দিতেই পেটের পানিগুলো সব বেড় হয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটা নড়ে উঠলো। কিন্তু তখনো চোখ খুলে নাই, তাতে কি? সে বেঁচে আছে তো। এ আনন্দে সবাই নাচা নাচি শুরু করে দিলো। অনেকে আনন্দে কেঁদে ফেলে। তরুণ কাকা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেয়। একটা মজার ব্যাপার কি জান তমা? তরুণ কাকা হিন্দুম আর আমরা মুসলমান, কিন্তু সেদিন কেউ হিন্দু-মুসলমান আলাদা ছিলো না। সবাই ছিলো মানুষ, বাচ্চাটা যেন সবারই।
মাজহার আপন মনে কথাগুলো বলেই যাচ্ছে আর তমা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। সে তমার থুঁতনিতে হাত দিয়ে মুখখানা তুলে বলে তুমি কাঁদছ কেন তমা? বাচ্চাটা কে ছিলো?
মা-বাবার মুখে তার নবজীবনের গল্প শুনে তমা সে থেকেই মনে মনে খোঁজে, কে সেই দেবতা? যে তার জীবন বাঁচিয়েছেন।
মাজহারের মুখে সে একই কাহিনী শুনে তমার কোমল হৃদয়ের উচ্ছ¡াসিত আবেগের ঢেউ যেন একূল-ওকূল দু’কূল ছাঁপিয়ে উছলে ওঠে, উত্তাল প্লাবনে ভেসে যায় লাজ, লজ্জা, সমাজ, ধর্ম। খুব কাছে এসে ছলছল চোখে মাজহারের হাতটা চেপে ধরে বলে আমিই সেই বাচ্চাটা ছিলাম। আমার নবজীবনের দেবতাকে আজ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমি সমাজ-ধর্ম বুঝিনা, আমি হিন্দু-মুসলিম বুঝিনা, আমি বুঝি যে নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যের জীবন বাঁচায়, মনুষ্য অবয়বে সৃষ্টি হয়ে মর্ত্যজেীবনে আসলেও সে স্বর্গীয় দেবতা। ভাগ্যিস আপনার সাথে স্বাক্ষাত হলো- ভগবান, সে কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ করে দিলো। আমি কতদিন পূজোর থালা হাতে নিয়ে দেবতার চরণে নিবেদন করেছি, কত প্রার্থনা করেছি, এ দিনটির প্রতিক্ষায়।
তাই নাকি? তোমার প্রার্থনা যে ভগবান দিব্যজ্ঞানে শ্রবণ করেছেন, সেটাতো প্রতীয়মাণ হলো।
ভগবানের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমার জীবনের সবকিছু তারই চরণে নিবেদন করব।
তমার কোমল হৃদয়ের উচ্ছ্বাসিত আবেগে লাজ, লজ্জা, সমাজ, ধর্ম সব ভুলে, কুমারী জীবনের সব জড়তাকে পিছনে ফেলে সে সম্পূর্ণরূপে নারী হয়ে ওঠে। তার নবজীবনের দেবতাকে সত্যের প্রতিকরূপে আলিঙ্গন করে।
মাজহার তমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে স্যাঁকোয়া নদীর সমস্ত জল যেন টইটুম্বুর হয়ে আছে তার চোখের কোণে। অশ্রæ সজল চোখে তার দু’টো নীল শালুক ফুটে আছে। দেহের গড়নে সোনা রঙ ঘণকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশের চ’র্ণকুন্তলগুলি মুখের উপর পড়ে স্যাঁকোয়া নদীর অগভীর শুভ্র স্রোত চকচকে রূপোলি বালুর উপর বয়ে যেতে যেতে ঘূর্ণি সৃষ্টি করছে। সিক্ত বসনের নিচে গুরুনিতম্ব, ঘনবক্ষ ও জঘনযুগলের সুপুষ্ট বর্তুলতা আলমের প্রত্যেক শিরায়-উপশিরায়-ধমনিতে অগ্নি স্রোত তীব্রবেগে ছুটতে লাগলো। যে রূপের ঝলকে অদূরে পুড়ছে কৃষ্ণচূঁড়া-পলাশবন সেরূপে পুড়ছে তার বুকের ভেতরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সে ইতিহাসে রূপবতী ক্লিওপেট্রা, পদ্মাবতী কিংবা খইরুন সুন্দরীর নাম শুনেছে কিন্তু এমন রূপবতী ললনার স্বাক্ষাত তার এই প্রথম হলো।
সময় তার নির্মম হাতে নিয়ন্ত্রণ করছে পৃথিবীকে তাই পশ্চিমের হলুদ আভা সরে গিয়ে গোধুলির অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। মাজহার দেখলো যে, তমা প্রচণ্ড আবেগে আপ্লুত হয়ে সব ভুলে গেছে। এখন বাঘের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার ভয়নেই, নেই কোন উদ্বিগ্ন ভাব তার চোখে মুখে।
তমা, সন্ধ্যা ঘণিয়ে আসছে, তুমি বাড়ি যাও। তোমার এ স্মৃতি মরনের পরেও থেকে যাবে।
বিদয়ের প্রাক্কালে তমা অপাঙ্গ দৃষ্টিতে একটি বারের জন্য মাজহারের দিকে তাকায়, তার উদাস চাহনি, নির্মল স্বচ্ছ দুটি আখি, খুব সাদা সিধে চেহারা যেন ঠিক দেবতার অবয়বে তৈরি হয়েছে। সে কয়েক পা হাটছে আর পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে।
মাজহার বলে, তমা কালকে এসো।
সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, আসবে।
যতোক্ষণ চোখের দৃষ্টিতে শেষ ছায়াটুকু বিলিন হয়ে নাযায় ততোক্ষণ সে শুধু ফিরে ফিরে দেখছে আর হাঁটছে।
তমার প্রস্থানের দৃশ্য দেখে আলমের মনে হলো শ্রীমতি রাধা যেন যমুনায় স্নান সেরে শ্যামকে দেখে ফেলার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ত্রস্তভাবে ঘরে ফিরে যাচ্ছে।
তমা চলে যাওয়ার পর একরাশ নিঃসঙ্গতা ডুবে একাকী সে নদীর ধারে খানিক্ষণ বসে থাকে। হঠাত এক অজানা আতঙ্কে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে, সেই সাথে ঈশান কোণে কয়েকগুচ্ছ কালো মেঘের আনাগোনা দেখতে পায়। তার মনে হতে লাগলো প্রজন্মেও পর প্রজন্ম ধরে এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিম সব ভেদাভেদ ভুলে একসাথে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তাদের এ সম্পর্কের কারণে হিন্দু-মুসলিম সমাজে ভ্রাত্বিত্বেও বন্ধনে ফাটল ধরবে না তো? মুখে মুখে যাই হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে তো একটা জাতিগত বৈরীভাব থেকেই যায়। তাদের এ ঘনিষ্টতা সেই জাতিগত বৈরীভাবকে আবার শত্রুতে পরিণত করবে না তো? একদিকে তমা আর অন্যদিকে ভয়াবহ এসকল অযাচিত আসঙ্কা, সবমিলে তার বুকের ভেতরটা কোনভাবেই স্থির হচ্ছে না। সে নিজেকে বোঝাতে শুরু করলো তমা সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পর্দাপণ করেছে। তার তার দেহ-মনে উচ্ছ্বাসিত আবেগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে? সেতো কলেজ পাশ করা একজন গ্রাজুয়েড ছেলে। তার পক্ষে কি এতোটা আবেক মানায়? না না না, এসব ভুল, সবই ভুল। মানুষ যাকে প্রেম বলে, তার সত্যিটাতো বেশ ভয়ঙ্ক, কুৎসিত। সত্যি যে একেবারে নেই তা বলা ঠিক হবে না, তবে এ কয়েক মুহুর্ত আমি যা উপলব্ধি করতে পেলাম তা আসলে ভয়ঙ্কর। কারণ তমার মনের চেয়ে তার অপরূপ দেহটাই আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে। আমি তার দেহের গন্ধ, নবযৌবনের উন্মাদনায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমি যাকে প্রেম বলেছি সেটা আসল প্রেম নয়, সেটা ছিলো শুধু দেহ প্রাপ্তির লালসা। যৌবনবতী তমার দেহটাই আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। রিপুর তাড়ণায় মত্ত হয়ে এই দেহ লালসার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কি আমার শোভা পায়। থাম মাজহার- থাম, ওখানেই থেমে যা-এ যে ধংসের খেলা, এ যে হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের খেলা।
এই ‘হিন্দু-মুসলিম সংঘাত’ এ যুক্তিতে‘ বিবেকের’ সাথে আমার মতপার্থক্য হলো। হিন্দু-মুসলিম মানুষের যৌক্তিক পরিচয় নয়। কারণ একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই সাত দিনের মধ্যে সমস্ত ধর্ম গ্রহণ করে আলাদা আলাদাভাবে পরিচয় বদল করতে পারে। কাজেই ধর্ম কোন পরিচয় নয়, পরিচয় হলো সে ‘মানুষ’। মানুষের মধ্যে যৌক্তিক পরিচয় হলো স্ত্রী এবং পুরুষ, যা চিরস্থায়ী। মানুষ ইচ্ছে করলেই এ পরিচয় মুছে ফেলতে পারবে না।
এতক্ষণ ধরে যে প্রশ্নগুলোর গোলক ধাধায় আমি ঘোরপাক খাচ্ছিলাম, তা একটি প্রশ্ন সব যুক্তিকে নীরব করে দিলো। তাহলো তুমি এর বিরুদ্ধে এতো গভীর চিন্তা করছ সে কি ইঙ্গিত দিচ্ছে নাযে, ওটা কেবল যৌবনের আবেগ নয়, এর সঙ্গে আদিম ও মৌলিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার উত্তাল জোয়ার এসে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রেম স্বাশ্বত-সুন্দর, প্রেম পবিত্রতার প্রতিক। প্রেম আছে বলেই আজ পৃথিবীটা এতো সুন্দর। তান্হলে হিং¯্রতায় ডুবে যেতো পৃথিবী।
গোটা রাত পেরিয়ে গেলো চোখের পাতা দু’টোকে কোনভাবে এক করতে পারলনা আলম। একটার পর একটা অশুভ চিন্তা এসে উলট-পালট করে দেয় তার সাজানো পৃথিবীটাকে। হঠাত তার মনে পড়ে গেলো, কালকে সে তমাকে নদীর পারে আসতে বলেছে। কিন্ত কখন আসবে সেটা তো বলেনি। সে যদি গোসলের সময় এসে ফিরে যায়। কোন কৈফিয়ত ছাড়া নদীর পারে আসার এটাই উপযুক্ত সময়। সে এক পা দু’পা করে নদীর পারে যেয়ে উপস্থিত হয়।
কি আশ্চর্য! কিভাবে যে সব মনের কথাগুলো ফটাফট বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে, কে জানে? তমা আগে থেকেই সেখানে বসে আছে।
কারো মুখে কোন কথা নেই, কোন প্রসঙ্গ দিয়ে কথা শুরু করবে, কেউ হয়তো সেটা খুঁজে পাচ্ছেনা। এটাই প্রেমের নিয়ম। প্রেয়সীর অবর্তমানে কতো কথাই না মনে পড়ে, এটা বলবো-সেটা বলবো, এটা করবো -সেটা করবো। আরও কতো কি? কিন্তু চোখের সামনে এলে সব ভুলে যায়, সব এলোমেলো হয়ে যায়। শেষে দেখা যায় কিছুই বলা হয়নি।
মাজহার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তমার দিকে, যেন পলক পড়ছে না।
তমা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়, গলার একটা আওয়াজ তুলে আলমের ধ্যান ভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কি দেখছেন অমন করে?
দেখছি তোমার মুখের রেখা অবিচল, বাঁওড়ের স্রোতের মতো স্থির। সৃষ্টিকর্তার কি অপরূপ সৃষ্টি তুমি।
মানুষের বাহিরের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়াটা সবচেয়ে বড় বোকামি। কারণ বাহিরের সৌন্দর্যটা চিরস্থায়ী নয়। কিন্ত ভেতরেরটাই আসল। সেটাই সকল সুখ-শান্তির মূল।
আরে বাহ! তোমার জ্ঞানের গভীরতা যে বয়সকে ছাড়িয়ে, হিমালয় পৌছে গেছে, দেখছি।
না মাজহার ভাই, একটু পাকামোর মতো বলে ফেললাম। কাল রাতে একফোটা ঘুমও আসেনি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো, জেনে শুনেই আমি বোধয় আপনাকে বিপদে ফেলে দিলাম।
হুট করে আমাকে বিপদে ফেলার বিষয়টা মাথায় আসলো কেন?
ঘুম আসছিলোনা তাই যতোসব আবোল তাবোল চিন্তা এসে মাথায় ভিড় করছিলো। একবার মনে হলো আপনি হলেন মুসলমান আর আমি হলাম হিন্দু। আমাদের মাঝে জাতিগত বিভেদের দেয়ালটা এতাটাই বড়, এতোটাই উঁচু যে, সেটা টপকানো খুব কঠিন হবে। আমার খুব ভয় হয়, এতোটা বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে আমরা কি শেষ পর্যন্ত করতে পারব?
হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্যটা নিতান্তই ধর্মীয় মতভেদ, মানবিকতায় নয়। দেখ, একটা শিশু জন্মের পর কিন্তু হিন্দু না মুসলমান সেটা বলা মুশকিল। তাকে যে ঘরে মানুষ করা হবে, সে সেই ঘরের ধর্মীয় আদর্শকে বুকে লালন করবে। সেটা হোক হিন্দু অথবা মুসলিম। সব ধর্মেরই মূলভিত্তি হলো সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করা, তাকে স্মরণ করা, সত্য পথে চলা। যুগে যুগে যে সকল মহামানব পৃথিবীতে এসে ধর্মের বাণী প্রচার করেছেন, তারা সকলই মানুষকে সৃষ্টিকর্তার বিধি-বিধান মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন, সৎপথে পরিচালিত করেছেন, সকল প্রকার অনৈতিক ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার আহব্বান জানিয়েছেন। তারা শুধু এহজনম নয়, পরজনমেও মানুষ তার কৃতকর্মেও ফল ভোগ করবে সেটিও হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে গেছেন।
কাজেই আল্লহ-ভগবান-ঈশ্বর সবারই, যে যে নামে ডাকে ডাকুক-শুধু ডাকলেই হলো। যে তার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে, আর যে ডাকে না- নিশচয়ই তার চেয়ে সে ভালো মানুষ।
পৃথিবীর সব ধর্মীয় উপসনালয় পবিত্র, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা। যারা উপসনা করেন পূত-পবিত্র হয়ে মনের কালিমা দূরিকরণের নিমিত্তে এখানে আসেন।
পৃথিবীর কোন ইতিহাসই ঘৃণা-ভয়-জাত হত্যার ইতিহাস নয়, প্রেম থেকে জাত ঐক্যের ইতিহাস। বুদ্ধ, যিশু, চৈতন্য, জরাথুস্ট্র ও মুহম্মদ (স) এর মতো মহামানব প্রেমিকেরা ভয় দেখিয়ে, বল প্রযোগে নয়, প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, শান্তির বণী দিয়ে জয় করেছেন মানুষের মন।
মাজহারের কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়েই শুনছিলো তমাশ্রী। তারপর একটা দীঘশ্বাস ফেলে বলে- প্রেম সত্যি মহান। এ মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে দুনিয়ার সবাই ভালো। আমার অন্তওে যদি ভয় বা হিংসা না থাকত তাহলে মানুষের মধ্যে নানা রকমের ভিন্নতা দেখে মজাই লাগত্। মানুষ ভালোই-এই সত্যিটা না থাকলে মানুষ জাতি কবেই নাস হয়ে যেত।
ভরদুপুরে গরুকে জল খাওয়ানোর নদীর পারে নিয়ে আসে তমাশ্রীর বাবা তরুণ ঘোষ। মেয়েকে মাজহার সাথে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। একটি মাত্র সন্তান তার সেও মুসলমানের সাথে মিশে গেছে। না এটা কোন ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। মুসলমানের সাথে বিয়ে হলে যে তাকে চিরতরে হারাতে হবে! এটা সে সহ্য করবে কিভাবে। হঠাত তার মনে পরে গেলো আজ থেকে একযুগ আগের কথা। এই নদীতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছিলো। ভগবানের কৃপায় এই মাজহারই তাকে বাঁচিয়েছে। আজ যদি তার মনে কষ্ট দেয়, সইতে না পেরে সে যদি বলেই বসে যে, তমা যখন পানিতে ডুবে মরছিলো তখন আপনার ধর্ম কোথায় ছিলো? এর কি কোন জবাব আছে? উত্তর তার জানা নাই। এভাবে তারা যদি সুখি হয় তো আমাদের কি?
তরুণ একপা-দু’পা করে তাদের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। তমা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে যাবার অবস্থা। মাজহারের দেহে যেন মরুর উত্তপ্ত বাতাস এসে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাদের দু’জনের এ অবস্থা দেখে তরুণ হেসে ফেলে। তারপর দু’জনাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমরা যদি সুখি হও ভগবানের দিব্বি করে বলছি আমার চেয়ে বড় সুখি কেউ হবে না। তোমাদের কষ্টে রেখে, আমার সুখের চিন্তা-বৃথা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now