বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
________________________________________
বৃষ্টিভেজা এক দুপুর। শহরের প্রান্তে পুরোনো একটা ঘর, চারপাশে ধুলো, গাছপালার গায়ে জমে থাকা ছত্রাক আর ক্ষয়ে যাওয়া সীমানা প্রাচীর। সেই ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ—চোখে ঘুমহীন ক্লান্তি, মুখে একরাশ স্থিরতা, নাম শুভ।
তাকে নিয়ে শহরে অনেক গল্প। কেউ বলে, “সরকারি চাকরি ছেড়ে পাগল হয়ে গেছে!”
আর কেউ বলে, “বউ চলে গেছে—তাই সমাজসেবার নাটক করছে।”
কেউ গাল টেনে হাসে, “বই পই নিয়ে পাড়া-গ্রাম ঘোরে, ওর মাথার ঠিক নাই।”
কিন্তু শুভ এসব কানে নেয় না। সে জানে, পৃথিবী বদলানো মানুষদের প্রথম পরিচয় হয় পাগল বলেই।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই শুভ ছিল ব্যতিক্রমী। ফলাফলে উজ্জ্বল, বিতর্কে দক্ষ, ক্যাম্পাসের নানান সংগঠনের প্রাণ। সবাই ভেবেছিল, এই ছেলে প্রশাসনের শীর্ষপদে যাবে। কিন্তু একদিন সে হঠাৎ সব ছেড়ে দিল। একটা চাকরির ইন্টারভিউয়ের দিন সে হাজির হয়নি; বরং রওনা দিয়েছিল চর এলাকায়, যেখানে আজও মানুষ চিকিৎসা পায় না, শিশুরা খাতা চেনে না, আর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া স্বপ্ন বলেই মনে হয়।
প্রথমবার সে গিয়েছিল গরমের দুপুরে, একটা বইয়ের ব্যাগ কাঁধে, কিছু চক-ডাস্টার হাতে। সেখানে একটা তালগাছের ছায়ায় পাঁচজন বাচ্চাকে নিয়ে শুরু করেছিল ক্লাস। না, কেউ বলেনি ‘শুভ স্যার’, কেউ বাঁধাই খাতা আনেনি, কেউ জানত না A থেকে Apple পর্যন্ত।
কিন্তু সেই দিনই ছিল শুরু।
দেখতে দেখতে সেই চর এলাকায় গড়ে উঠল একটি খুপরি ঘর—মাটির দেয়াল, ছাউনি করা টিন, মাঝে মাঝে টপ টপ করে চুইয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি। শুভ নাম দিল “আলোকদ্বীপ পাঠশালা।” প্রতিদিন কাজ শেষে নিজ হাতে সে দেয়াল রঙ করত, লাল-নীল করে লিখত বাংলা অক্ষর, আবার মোছার সময় চোখে জল জমত।
শুভর স্বপ্ন ছিল, এই আলোকদ্বীপ একদিন আলো ছড়াবে আশপাশের দশ গ্রামের বুক জুড়ে।
কিন্তু সমাজ?
সমাজ কখনো এত সহজে কাউকে কবুল করে না।
গ্রামের এক মাতব্বর একদিন বলেছিল, “তোমার মত উচ্চশিক্ষিত ছেলে এইসব গরিবদের পড়িয়ে কী হবে? ওদের কপালে তো হেঁটে শহরে কাজ করা ছাড়া আর কিছু নাই!”
শুভ বলেছিল, “আমার বিশ্বাস, একদিন এই গরিব বাচ্চারাই আপনাদের সন্তানদের শিক্ষক হবে।”
তারা হেসে উঠেছিল।
তবু শুভ পিছিয়ে যায়নি।
তার পাশে দাঁড়িয়েছিল কিছু সাহসী তরুণ—রিনা, যার স্কুল বন্ধ হয়েছিল বিয়ের চাপেই, এখন সে ছাত্রীদের নিয়ে গোপনে স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাস নেয়; ইয়াসিন, যে একসময় মাদকাসক্ত ছিল, এখন রাতের স্কুলে ক্লাস নেয়। তারা শুভর মতোই সমাজের চোখে ‘পথভ্রষ্ট’। অথচ, তারাই সমাজের ভিত পাল্টে দিচ্ছে।
শুভ বিশ্বাস করে, পরিবর্তন আসে নিচু জায়গা থেকেই—উঁচু চেয়ার থেকে নয়। একবার এক শিশুকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?” সে বলেছিল, “আমি শুভ স্যারের মতো হতে চাই।”
শুনে শুভ চুপ করে ছিল। তার চোখে তখন একসাথে ধরা পড়েছিল কষ্ট আর আনন্দের জল।
একদিন শহরের নামকরা এক শিক্ষানীতি সম্মেলনে শুভকে ডাকা হলো। আয়োজকেরা ভেবেছিল, শুভ হয়তো পুরোনো পাঞ্জাবি পরে আসবে, অগোছালো ভাষায় কিছু আবেগের কথা বলবে—দর্শকদের একটু মুগ্ধ করবে, ব্যস!
কিন্তু শুভ সেদিন মঞ্চে উঠে যেভাবে বলেছিল, “একটি শিশুকে শিক্ষিত করা মানে কেবল বই শেখানো নয়—তার ভেতরের ঘুমন্ত সম্ভাবনাকে জাগানো, তার ভিতরকার মানুষটিকে বিশ্বাস করা”—তাতে গোটা অডিটোরিয়াম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তারপর সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছিল:
"যে ‘পাগল’ আজ সমাজের শিক্ষক হয়ে উঠেছে"
শুভ তবুও ফিরে যায় তার সেই চর এলাকায়। প্রতিদিন স্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের অভ্যর্থনা জানায়। নিজের জন্য কিছু চায় না, নিজের ছবি দিতে চায় না কোনো প্রচারণায়। শুধু একটাই কথা বলে, “আমরা যতদিন না সমাজের প্রতিটি কোণে আলো পৌঁছাতে পারি, ততদিন আমাদের ঘুমানো ঠিক নয়।”
________________________________________
সময়ের সাথে সাথে 'আলোকদ্বীপ' শুধু একটা স্কুল নয়—একটা আন্দোলন হয়ে ওঠে। শহরের তরুণেরা এসে যোগ দেয়। কেউ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চালায়, কেউ গার্লস ক্লাব গড়ে তোলে, কেউ আবার গল্পের বই পড়ে শোনায় সন্ধ্যার পাঠশালায়।
শুভ এখনো টিনের ঘরের সেই স্কুলে থাকে। সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় পাঠ পরিকল্পনা করে, বৃষ্টির রাতে নিজের গায়ে চাদর না পেঁচিয়ে ক্লাসরুমের বেঞ্চ ঢেকে রাখে।
তাকে এখনও কেউ কেউ পাগলই বলে।
কিন্তু শুভ জানে, ইতিহাসে যারা সত্যিকারের পরিবর্তন এনেছে—সন্ত-দরবেশ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সমাজকর্মী—তাদের সবাইকে একসময় সমাজ পাগলই বলেছিল।
কারণ, সত্যিকারের সাহসীরা সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করে, ধাক্কা দেয়, আর শোনায় এমন কথা, যা শুনতে মানুষ অভ্যস্ত নয়।
________________________________________
গল্প শেষ হয় না এখানেই।
আজকের শিশুদের কেউ কেউ ডাক্তার হয়েছে, কেউ সাংবাদিক, কেউ শিক্ষক। সবাই শুভ স্যারের কথা বলে। কিন্তু শুভ তাদের কোনোদিন নিজের কৃতিত্ব মনে করে না।
সে শুধু একদিন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমার নাম কেউ মনে রাখুক বা না রাখুক, আমি চাই—এই সমাজ আর কাউকে যেন ‘পাগল’ বলে থামিয়ে না দেয়।”
________________________________________
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now