বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম-- বিলাসিতা
অফিস থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে তাই ব্যালকনিতে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে মোহন। ঢাকার বুকে গোধুলিকে কেবল অনুভব করতে হয়, উপভোগ করার উপায় নাই। তারপরেও গোধুলির আলো যে ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে আধারের বুকে বিলিন হয়ে যাচ্ছে সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে তাকালে অনুভব করা যায়। পাশের ফ্লাট থেকে একটা মিষ্টি সুরের গান ভেসে আসছে। গানের কথাগুলো স্পষ্ট শোনা না গেলেও মিউজিকটা যে বিরহী সুরের সেটা বেশ কানে আসছে। আপাতত মাথায় আর কোন চিন্তা না থাকায় সে মনে মনে ভাবছে এটা কোন গান হতে পারে, স্পষ্টভাবে শোনার জন্য কান খাড়া করে একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করে গানের দিকে। তার স্মৃতিশক্তি একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়, তাই মনে পড়ে যায় ইন্দ্রাণী সেনের কণ্ঠে সেই গান-
‘আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেলো,
কতো সুর কতো গান মনে পড়ে গেলো,
বলো ভালো আছ তো----
ভালো আছ তো।
শীলা এক কাপ চা নিয়ে এসে দেখে মোহন চোখ বন্ধ করে আছে, তাই কোন সাড়া শব্দ না করে চায়ের কাপটা রেখে জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ইন্দ্রাণী সেনের কণ্ঠে সেই গান, তারও কানে ভেসে আসে। গানটি তার মুখস্থ হওয়ায়, সে গুণ গুন করে গাইতে থাকে। শীলার গানের গলা যে ্এতোটা সুন্দর সে এর আগে কখনো শুনেনি। চোখ খুললে যদি শীলার গান বন্ধ হয়ে যায় এই ভেবে সে আবারও চোখ বন্ধ করলো। কিন্ত তাকে তো দেখতে পাচ্ছে না। তার গান গাওয়ার ভঙ্গিমাটা তো দেখা দরকার। যেই মাত্র সে চোখ খুলে সাথে সাথে শীলা গান বন্ধ করে তাকে চা দিতে এগিয়ে আসে।
মোহন কোন কথা না বলে শুধু শীলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
শীলা বলে-কি হলো তোমার, এমন করে হাবাগোবার মতো তাকিয়ে আছ কেন?
না মানে- নতুন কিছু একটা আবিষ্কার করলাম।
সেটা কি, জানতে পারি- জনাব?
আমার বোউয়ের কণ্ঠ যে কোকিলকেও হার মানাবে, সেটা বিয়ের এতোদিন পরেও আমি জানতাম না!
তুমিতো বেরসিক, অনাসক্ত হৃদয় তোমার। জানবে কেমন করে, বলো?
তুমি যা ভাবছ ততটা বেরসিক আমি ছিলাম না শীলা, এমন নির্মহ ছিলোনা বুকে। বাস্তবতা যে কি জিনিস, জীবন- আমাকে সেটা হাড়েহাড়ে বুঝিয়েছে।
শীলা মোহনের পাশে গিয়ে বসে, মোহন তুমি অফিসে চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে পড়ি। নিঃসঙ্গতা আমাকে কুঁড়েকুঁড়ে খায়। তুমি যদি একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনতে, তাহলে গান শুনে শুনে আমার অস্থির সময়টা বেশ যেতো।
শীলার কথাটা শুনে, আমার মন বিষাদে ভরে গেলো। সমস্ত মুগ্ধতা এক নিমেষে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। আমিতো নিজে স্বল্প আয়ের মানুষ, ঢাকা শহরে ফ্লাট ভাড়া দিয়ে পুরো মাসটাই টানাটানির মধ্য দিয়ে যায়। তার উপর বাড়তি কিছু করতে গেলে ঋণ-কর্য ছাড়া উপায় থাকেনা।
আজকাল শীলা প্রায় এর-ওর বিষয় নিয়ে খোটা দেয়। মাঝে মধ্যে বলে, তোমার একার রোজগারে সংসার ভালো যাচ্ছে না। আমি একটা কিছু করে তোমাকে সাহায্য করতে চাই। এভাবে ঘরে বসে থাকাটা নেহাত বোকামি। চরম অলসতার পর্যায়ে পড়ে।
আমার মনে হচ্ছে শীলা ধীরে ধীরে কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। কিংবা আমাকে একটা অপদার্থ ভাবছে। কারণ সে জানে আমি কতো টাকা বেতন পাই। তারপরেও মাসের শুরুতে তার এটা-ওটা বায়না তো থাকেই। আকার ইঙ্গিতে সে আমাকে বুঝিয়ে দেয় যে, তোমার বাড়তি আয়ের দরকার, তুমি একটা নির্বোধ কিছুই বোঝ না।
এইতো কয়েকদিন আগে একটা বিয়ে বাড়ি থেকে ফেরার পথে সে বলছিলো, তোমার কলিকের বোউকে দেখলে? হারের ডিজাইনটা কতো সুন্দর। বেশ মানিয়েছে ওকে, তাই না?
আমি সেদিন তার কথার কোন উত্তর দিতে পরিনি। মনে মনে খুব বিরক্ত বোধ করছিলাম। সবার আয় রোজগারের পথ যে এক হয় না, সেটা তাকে কোন দিনই বোঝাতে পারিনি।
শীলা এমটি ছিলো না কোন কালে, হঠাৎ এমন বদলে যাওয়া কি একাকিত্বেও কারণ? না কি অন্য কেউ তাকে এ বিষয়ে বিষিয়ে তুলছে। এ রকম নানা প্রশ্নের হিল্লোল বয়ে চলছে মনের ভেতর। বিয়ের পর যখন ছোট্ট একটি ভাড়া বাড়িতে সংসার পেতেছিলাম তখন শীলার চোখে মুখে আমি একটা উজ্জল অহংকার দেখতে পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো সে এতেই অনেক খুশি। এতো অভাব অনটনের মাঝেও সে আমাকে খুব সমীহ করত, ভালোবাসত আমাকে। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। অথচ এখন তো আমাদের সংসারে আগের মতো অভাব নেই, অনেক স্বচ্ছলতা এসেছে, ভালো ফ্লাট হয়েছে, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র হয়েছে। ইচ্ছে করলে মাস শেষে কিছু জমাতেও পারি। তাহলে তার এতো অভিযোগ কেন? নাকি সেটা আমাকে চাপে রাখতে তার এটা কৌশল, সংসারে অশান্তির সৃষ্টি করে সে আসলে কি করতে চাচ্ছে? কি পেতে চাচ্ছে।
বিয়ের পর কোন এক শুভক্ষণে আমি তাকে বলেছিলাম শীলা, তুমি আমাকে কখনোই কার সাথে তুলনা করনা। আমি আমার মতোই থাকতে চাই, আমি নিজেই নিজের ভবিষ্যত নিজেই গড়তে চাই। আমি নিজের কাছে খাঁটি থাকতে চাই। কারণ নিজের কাছে খাঁটি থাকার যে অহংকার, তার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছুই নেই।
আমি এও দেখেছি যে, আমার প্রসঙ্গে মানুষ যখন তাকে বলতো-লোকটা খুব সৎ, একেবারে খাঁটি সোনা, কোন খাঁত নেই তার ভেতর। তাকে টাকা দিয়ে কেনা যায়না। শীলার মুখখানা তখন পূণিমার চাঁদের মতো চকচক করে জ্বলে উঠতে দেখেছি।
আসলে আমার শীলার কোন সাধ অপূর্ণ রাখার ইচ্ছে হতো না, অসাধ্যের মধ্যে থাকলেও সেটা পূরণ করার চেষ্টা করতাম, সেটা সে বেশ ভালো করেই জানতো।
তাছাড়া সব ভালো জিনিসের উপর তার যে একটা লোভ আছে, সেটাও আমার মনে হতো না। এভাবে তাকে কখনো ভাবতে দেখিনি।
তবে একদিন পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকছে, ফিরে দেখি মনির, তার খালাতো ভাই ও সহপাঠি বন্ধু। সে বললো-চলো তোমাদের নামিয়ে দিয়ে আসি। আমি আপত্তি করলাম না কারণ সেতো সমন্ধে আমার শ্যালক। এটা সে করতেই পারে। মনির চলে যাওয়ার পর শীলা বললো- আমি ভাবতেও পারি না, মনির গাড়ি কিনেছে। তবে যাই বলো গাড়িটা কিন্তু বেশ দামি।
মনির ঢাকায় কি করে, সেটা আমি কোন দিনই তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, কারণ এতে তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগতে পারে। তবে এতোটুকু জানি সে কলেজের শেষ পরীক্ষাও দিতে পারে নি। বড়লোক মা-বাবার একমাত্র আদরের ছেলের যা হয় মনির তাই হয়েছে। আমি মনিরের মতো হতে পারিনি বলেই, শীলার কথায় এতো অসহায় বোধ করছি। একটা অক্ষম রাগে জ্বলে উঠতে ইচ্ছ করছে আমার, রাগটা আসলে আমার নিজের উপর। এক-একসময় আমার তাই মনে হয়- একটা মিথ্যা অহংকারের উপর ভীত গেঁথেছি আমি। চারপাশের সকলকে যে কোন দামে সবকিছু পেতে দেখছে শীলা, তাই হয়তো ভাকছে আমি একটা অপদার্থ। একটা মিথ্যা অহংকারের জন্যে আমি কিছুই পেতে শিখিনি, কিছুই করতে শিখিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগ-বিলাশ কোন কিছুই অধিকারে রাখার যোগ্যতা রাখিনি।
আমি অফিস থেকে বেড় হয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, এমন সময় একটা প্রাইভেট কার এসে সামনে দাঁড়ালো, কারের দরজা খুলে দিয়ে মনির ডাকলো মোহন ভাই আসেন. আমি আপনার ওদিকটাই যাচ্ছি। আপনাকে নামিয়ে দেব এখন। প্রচÐ অনিচ্ছার সত্বেও আমি মনিরকে না বলতে পারলাম না। পাছে না ধরে নেয় যে, আমি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছি। যাক মনির আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্ত নূন্যতম ভদ্রতা বশতঃ আমি তাকে বলতেই হয় যে, ভেতরে আস, এক কাপ চা খেয়ে যাও।
বাসার গেটে কলিং বেল বাজাতেই শীলা এসে দরজা খুলে দিলো। মনিরকে দেখে সে বেশ খুশি হলো। হয়তো মনে মনে সে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসেবে মনিরকে দেখছে। চা খেতে অনেক কথাই হলো, তবে আমি এখনো বাড়ি করতে পারিনি শুনে সে আকাশ থেকে পড়ে গেলো। সে এও বললো যে, আমার হাউজিং করপোরেশনের ব্যবসায় আছে, আপনি চাইলে সহজ কিস্তিতে একটা ফ্লাট বুকিং করে দিতে পারি। সাধ্যমত কিস্তি পরিশোধ করলেই চলবে।
আমি কোন কিছু বলার আগেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শীলা বলে দিলো, আমাদের এক সাথে টাকা জমিয়ে বাড়ি কেনা সম্ভব নয়, তবে সংসারের খরচ বাচিয়ে কিস্তি পরিশোধ করাটা খুব কঠিন হবে না। শীলার ধারণা আমি যদি না বলে দেই তাহলে এমন সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
আমি হা না কিছুই বলতে পারলাম না, কারণ প্রতিমাসে লাক্ষ-লক্ষ টাকার কিস্তি আমি দেবো কোথা থেকে? আমার মাসিক বেতন যা, তাই আমার আয়। তা দিয়েই সংসার চলে।
মনির যাবার সময় অনেকটা শীলার প্রতি ইঙ্গিত করে বলে গেলো, আমার কার্ডটা রাখ এই ঠিকানায় তুই কাল সন্ধ্যায় ভাইকে নিয়ে অফিসে চলে আয়।
তারপর দেখি কি করা যেতে পারে।
অফিসে টি.এ.বিল বাবদ বেশ কিছু টাকা আটকে ছিলো অনেক দিন, হঠাৎ সেটা চলে আসায় আজ মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে। আজ অফিস শেষ করে শীলাকে নিয়ে মার্কেটে যাব। অনেক দিন সে সুযোগ হয় না। অসম্ভব ইচ্ছে থাকার সত্বেও সংসারের টানাটানিতে সেটা হয়ে ওঠে না। আমি তাড়াহুড়া সব কাজ শেষ করে সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরলাম। নিত্য দিনের মতো চায়ের কাপ হাতে দিতে দিয়ে শীলা বললো-
ড্রেস চেঞ্জ করো না, আজকে না তোমার মনিরের অফিসে যাওয়ার কথা।
ও হ্যাঁ, আমি তো একেবারেই ভুলে গিয়েছি। আচ্ছা তুমিও ঝটপট রেডি হয়ে নাও, একটু ঘুরে আসি।
প্রচÐ অনিচ্ছার সত্বেও আমি শীলাকে নিয়ে মনিরের অফিসে গেলাম, অফিসে লোকজন তেমন নাই বললেও চলে। একটা ছেলে কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে গান শুনছে। মনিরকে দেখে সে তাড়াতাড়ি গানটা বন্ধ করে দিলো। আর একটা ছেলে আমাদের আশেপশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে হয়তো পিয়ন-টিয়ন হবে। মনির আমাদের বসতে বললো। তারপর জিজ্ঞাসা করলো-
মোহন ভাই চা খাবেন না কফি?
আমি বললাম আমার জন্য চিনি ছাড়া চা।
চিনি ছাড়া কেন? ডায়াবেটিস ধরে ফেলেছে নাকি?
না, তবে না যেন ধরে সে জন্য পূর্ব সতর্কতা।
ও আচ্ছা। শীলা তুই কি খাবি?
আমার ডায়াবেটিসের অতো ভয় নেই। তুই আমার জন্য কফি দিতে বল।
পিয়ন ছেলেটি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আপ্যায়ন শেষে, মনির শিলাকে বললো- ঐ যে পাশের বিল্ডিংটায় কাজ চলছে, সেখানকার উপরে দশটা ফ্লাট বুকিং হয়ে গেয়ে গেছে, সিগগির উপরের কাজ শুরু হবে। দোতালার দক্ষিণ দিকটায় আমি নিজের জন্য রেখে দিয়েছি। তুই ইচ্ছে করলে সেটাই নিতে পারিস। কারণ আমার তো বাসা আছে এটা নিয়ে আমি কি করবো?
আমি কিছু বললাম না। নীরবতা যে সম্মতির লক্ষণ হয়তো সেটা মনে মনে সে ধরেই নিলো।
আমাকে রেখে শীলাও যেয়ে একটু ঘোরা ঘুড়ি করে এলো, জায়গাটা যে তার পছন্দ হয়েছে, সেটা মুখের উৎফুল্ল ভাব দেখেই বোঝা গেলো।
মনির শীলাকে জিজ্ঞাসা করলো, ফ্লাট কি তোর পছন্দ হয়েছে?
শীলা বলে-খুব, খুব পছন্দ হয়েছে। জায়গাটা বেশ খোলামেলা। চারিদিক থেকে ভালো বাতাস পাওয়া যাবে।
মনির বললো- আজ একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ার আজমল সাহেব আসতে পারলেন না। আমি সব ঠিকঠাক করে কাল পরশু তোকে ডাকবো, মোহন ভাইকে নিয়ে চলে আসিস।
মনিরের অফিস থেকে ফেরার পর, আমি শীলাকে বললাম যে, আমার টি.এ বাবদ কিছু টাকা হাতে এসেছে, অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এসেছিলাম কারণ তোমাকে নিয়ে মার্কেটে যাব। চলো তোমার যা যা লাগে কিনে নাও।
শীলা সাথে সাথে বলে- না, এখন আমার কিছু লাগবে না। তুমি আগে বাসার ডিডটা করে ফেলো, দেখ সেখানে একটা হয়তো একটা মোটা অংকের টাকা লেগে যাবে।
পরের দিন রাতের খাওয়া সেরে আমি বিছানায় গেলাম, শীলা আমার পাশে শুয়ে বলে, হ্যাঁ-গো আজ বিকেলে খালামণি আর তুণা এসেছিলো।
ও আচ্ছা, তৃণা এবার না এস.এস,সি পরীক্ষা দিয়েছিলো, কি রেজাল্ড ওর?
জি.পি.এ ফাইফ পেয়েছে। ওরা নাকি এদিক দিয়েই যাচ্ছিলো। তৃণা আমাদের বাসাটা দেখে বলেছিলো, মা চলো একটু আপুর দেখা করে আসি।
কি খাওয়ালে ওদের?
এমনিতে একটু নুডুল্স করে তার সাথে ফলমূল দিয়েছি। খালামণিতো চিনি ছাড়া চা খায়। আর তৃণা অবশ্য চা খেলো না।
শীলা অনেকটা অনুযোগের স্বরেই জানালো- জানো, খালা মণি আমাকে বলে-কিরে শীলা তোমরা বাড়ি-টাড়ি করছ না কেন? আর কতোদিন ভাড়াটে বাড়িতে থাকবি? জামাইকে বল, একটু চিন্তা ভাবনা করুক।
শীলার এ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাবে বলার ভঙ্গিটা আমার কানে বিষ ঢেলে দিলো, আমার মাথায় আগুন ধরে গেলো। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো তৃণাদের আলিসান বাড়িটা। যার প্রতিটি ইটের সাথে জড়িয়ে আছে গরিব-দুখী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হাহাকার। কারণ, তৃণার বাবা ছিলেন ভূমি অফিসের ‘তহসিলদার’। তার বাড়ির জায়গাটিও সরকারি খাঁস সম্পত্তি। সেটা নিজের নামে দলিল করে সেখানে বসবাসকারী ভ’মিহীন মানুষদের উচ্ছেদ করে পথের ভিখারী বানায়। একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি হয়ে কয়টাকাই বা বেতন পায়। সারাজীবনের বেতন দিয়েও এই ঢাকার বুকে এক কাঠা জমি কেনা সম্ভব নয় আর আলিসান বাড়ি বানানোতো দূরের কথা।
আমি রুক্ষ গলায় চিৎকার দিয়ে উঠলাম, চুপ করো শীলা, চুপ করো। দোহাই তোমার আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দাও। নিজের সুখের জন্য আমি মানুষকে ঠকিয়ে অমানুষ হতে পারবো না। আমি মানুষের চোখের জলের ঋণী হয়ে থাকতে চাই না। কারো হাহাকার নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমি দিনরাত পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সৎ উপাজর্নের মাধ্যমে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। আমি জানি তুমি আমাকে দিনে দিনে ঘৃণা করতে শুরু করেছ, তোমার কথা শুনে আজকাল মাঝে মাঝে আমারও নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি তা করতে পারি না।
শীলা অবাক হয়ে গিয়েছিলো। সে আমাকে কখনো এমন রাগান্বিত হতে দেখেনি। এমন উচ্ছ স্বরে কথা বলতে শুনেনি। হয়তো তাই কোন কথা না বলে সে চুপচাপ বসে রইলো।
মোহন অফিসে চলে গেলে, মনির গাড়ি পাঠিয়ে দেয় শীলাকে তার অফিসে নিয়ে আসার জন্য। শীলা আসবে বলে আজ সে তার অফিসটাকে একেবারে ঝকঝকা করে সাজিয়ে রাখে। কারণ এই দিনটার অপেক্ষায় সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজেকে গড়ে তুলেছে। মনির শীলাকে খুব পছন্দ করতো কিন্তু সহপাঠি এবং খালাতো ভাই হওয়ায় শীলা সেটা বুঝতে পারে নি। আর শীলার যখন বিয়ে হয় মনির তখন ইতালিতে।
শীলা মনিরের অফিসে যেয়ে দেখে, পিয়ন ছাড়া অফিসের ভেতরে একটা প্রাণিও নেই। মনির শীলাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
শীলা বলে, আমি কি তোর অফিসের বস? যে তুই ফুল নিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস।
হুম, তার চেয়েও অনেক বেশি।
তাহলে আমার চেয়ে ভাগ্যবান আর কে আছে?
শীলা, কেন তুই নিজেকে অভাগী মনে করছিস? তোর কিশের অভাব? তোর বুকে কিশের এতো দীর্ঘশ্বাস?
ওরে বাপরে! একমাথে এতোগুলো প্রশ্ন?
না, তোতে যে বলতেই হবে, কিশে তোর অপূর্ণতা। কেন তুই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিস? তুই তো এমন ছিলি না কোনকালে।
মনিরের এসব আবেক প্রবণ কথায়, শীলার চোখের কোণে অশ্রæ এসে যায়। সে কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে বসে থাকে।
এর মধ্যে কফি চলে আসে, কফি খেতে খেতে মনির বলে, একটা মস্তবড় কোম্পানীর সাথে আমাদের কণ্ট্রাক্ট হলো প্রায় একশ’ কোটি টাকার বিজনেস। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না গুলশানের মতো জায়গায় সম্পূর্ণ নিজেস্ব প্রোপারটিতে তাদের কি আলিশান অফিস। একবার দেখলে না প্রাণ ভরে যায়। এ কাজে যদি আমরা সাকসেসফুল হতে পারি তাহলে আমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না।
পরনে বাসন্তি রঙের বেনারসিতে শিলাকে যেন অপরূপ লাগছে। হাস্যোজ্জল ভঙ্গিতে তাকে নব বঁধুর মতো মনে হচ্ছে। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা ঠোঁটের লিপস্টিক যেন কৃষ্ণচূঁড়ার লালে লাল হয়ে আছে। মনির অনেক্ষণ ধরে চেয়ে থাকে শীলার দিকে, শীলা যে একেবারেই টেড় পায়নি তা নয়, ইচ্ছে করেই সেটা না দেখার ভান করে।
মনির বলে শীলা আয় আগে লাঞ্চ করি, খেতে খেতে কথা বলা যাবে। খাওয়ার ফাঁকে মনির বলে, তুইতো বাসায় সারাদিন বসেই থাকিস তাই না?
হ্যাঁ, অনেকটা তাই। রান্না-বান্না, ঘর গোছানো ছাড়া তেমন কোন কাজ নেই।
তাহলে তুই আমার অফিসটা দেখ, আমার অফিস মানে তো তোরই অফিস। এখানে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়েই কাজ করতে পারবি, আর সমস্যা হলে আমি তো আছি। আমিতো অফিসে থাকতে পারিনা, সারাদিন এখানে সেখানে দৌড়া-দৌড়ি করতে হয়। তুই অফিসে থাকলে আমি নিশ্চিন্তে বাইরে কাজ করতে পারবো। কাল খেকে নিয়মিত অফিসে আয়।
শীলা, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
বিদয়ের সময় একটা পাঁচশত টাকার বাÐিল শীলার হতে দিয়ে বলে, এটা তোর যাতায়াত খরচ। কাল সকাল দশটার মধ্যে অফিসে চলে আসবি। মনির ড্রাইভারকে বলে, ম্যাডাম আমাদের অফিস প্রধান। ওনাকে পৌছে দিয়ে আস।
অফিস থেকে ফিরে শীলা মনে মনে ভাবে, মোহনের একার আয়ে সংসার চলে কিন্ত বাড়তি কোন কিছু করা যাচ্ছে না। মনিরের অফিসে যদি মাসিক একটা আয় আসে, সেটা দিয়ে অন্তত কিছু একটা করা যাবে। তাদের ফ্লাটের কিস্তিটা যদি সে নিজেই উপার্জন করতে পারে তাহলে আর ক্ষতি কি? তবে সে মনে মনে সিদ্ধন্ত নিল যে, মোহনকে আগে ভাগে কিছু জানাবে না। এমনকি ফ্লাটের বিষয়ও না।
পরের দিন সে সকাল দশটার আগেই অফিসে চলে যায়। অফিসে যেয়ে দেখে টেবিলের চারদিকে বেশ কয়েকজন লোক। মনির উঠে এসে তাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। উনি শীলা ম্যাডাম, আমাদেন নতুন অফিস প্রধান। শীলাকে এম.ডি, মহোদয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এম.ডি বলেন, ম্যাডাম কোম্পানির নিয়োম অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে আপনাকে মাসিক বেতন দেয়া হবে। এতে কোন হেড়ফেড় হবে না। আপনি নিয়োমিত অফিস করুন। আজ আমরা উঠি। মনির সাহেব ওনাকে কাজগুলো বুঝিয়ে দেবেন এবং গুলশানের নতুন কন্সট্রাকশনের ফাইলটা আজ কালের মধ্যে রেডি করে ফেলেন।
সবাই চলে গেলে, দু’হাতে দুটো কফি নিয়ে মনির শীলার পাশে বসে। তারপর বলে তোকে যে কাল বলেছিলাম একটা কোম্পানীর সাথে আমাদের কণ্ট্রাক্ট প্রায় একশ’ কোটি টাকা সেটা সাইন হলো।
শীলা আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেললো।
মনির হেসে বলে, ্এই না হলে কি আর অফিস প্রধান হওয়া যায়। যাক স্যার বলে গেলেন ফাইলটা তাড়াতাড়ি রেডি করতে হবে।
আয় তোকে কাজগুলো সব দেখিয়ে দিই। মনির একরকম হাত ধরে ধরে শীলাকে অফিসের সব কাগজ পত্র বুঝিয়ে দিলো। স্টোর রুমে প্রবেশকালে ছোট দরজার মাঝে তাদের দু’জনার দেহ একটা হয়ে যায়, শীলার কোমল স্পর্শে মনির তার চোখের দিকে তাকায়, শীলা হেসে ওঠে। মনির তার হাত ধরে অন্য রুমে নিয়ে যায়, সেটা কিন্ত কোন অফিসের রুম নয়, মনিরের বেডরুম।
মনির বলে, ক্লান্ত হয়ে পড়লে এখানে শুয়ে রেস্ট নিবি। পারটাইমের একজন কম্পিউটার অপারেটর আছে, তাকে ফো দিলেই সে চলে আসবে।
এবার বলতো তোর বুকে দীর্ঘশ্বাস কেন?
সে অনেক কথা, আমাদের বিয়ের প্রায় সাত-আট বছর হয়ে গেলো কিন্ত এখনো আমার কোল খালি। অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছি তারা বলেছে সমস্যা মোহনের, হয়তো কোন দিনই আমি মা হতে পারবো না। তোর মোহন ভাই সৎ মানুষ, সে একটাকাও বাড়তি ইনকামের চিন্তা করে না। আর আমি চাকরি করি এটাও তার পছন্দ না। কাজেই ওর বেতনের টাকাতো সংসারেই চলে যায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত কি? এ জন্যই আমার সাথে মাঝে মধ্যেই কথা কাটাকাটি হয়। সংসারে অশান্তি আসে। মোহন তুই বল, আমি সারাদিন একা একা কি ভাবে ঐ বাড়িটাতে বন্দি হয়ে থাকি। আমাদের একটা বেবি থাকত, তাকে নিয়েও না হয় সময়টা কেটে যেতো। সেটিও নেই। আমিতো মানুষ, আমারও তো জীবন আছে, সুখ-স্বাচ্ছন্দে ভারোভাবে বেঁচে থাকতে কার না মন চায়। কিন্তু এ কথাটা আমি কোন দিনই মোহনকে বোঝাতে পারিনি।
একাকিত্ব আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বুকের ওপর ভারী পাথরের মতো চেপে বসে। মন খুলে কিছুই করতে পারি না। রক্ত এবং আত্মার সম্পর্কের মানুষগুলোকে ছেড়ে থাকা যে কতটা কষ্ট আর বেদনার, আমার জায়গায় না এলে কেউ বুঝবে না। কত ইচ্ছে ছিলো, আকাঙ্খা ছিলো সবাই মিলে একসাথে, অন্তত পাশাপাশি থাকি। কিন্তু নিয়তি হয়তো ভেবে রেখেছে অন্যকিছু। বাস্তবতা আর পরিস্থিতি আমাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। চাইলেই ছুটে যেয়ে ছুঁতে পারি না, পাশে বসতে পারি না, জড়িয়ে ধরতে পারি না। বিষন্ন বিকেল বা ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় প্রিয় কোনো হাত মাথায় রেখে চমকে দেওয়ার মতো, বুকে জড়িয়ে আদর করার মতো কেউ নেই পাশে। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ভালো-মন্দ সব মিলে হাতে হাত রেখে সমান্তরাল বয়ে চলা রেললাইনের মতো। কখনো বিষাদে ঢেকে যায় জীবনের সবটুকু আকাঙ্ক্ষা আবার আনন্দময় কোনো ঘটনা বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে সুদীর্ঘ করে। এভাবে দুঃস্বপ্ন এবং স্বপ্নের মাঝেই বয়ে চলে গতিহীন অথবা গতিময় জীবন। তাই বিপন্ন সময়ে হালটা ধরতে হয় শক্ত করেই। মনের স্থিরতা আনতে বিরতি দিয়ে শুরু করতে হয় পুনরায়। নিজের সাথেই নিজেকে থাকতে হয় নির্ভয়ে নির্মলপ্রাণে।
ও আমাকে খুব বেশি ভালোবাসে। আমি অসুস্থ হয়ে গেলে সে পাগল হয়ে যায়। একটা মুহূর্ত আমাকে দেখতে না পেলে সে থাকতে পারে না। আমি ভেবে দেখেছি যে, আমার কপালটাই খারাপ, নইলে ভাগ্য বিধাতা কেবল আমরই উপর এমন নিষ্ঠুর হবেন কেন?
কথাগুলো বলতে বলতে শীলার 'চোখে জলের ধারা প্রায় শুকিয়ে গেছে। তখনও মনির তন্ময় হয়ে আনমনে বসে আছে শীলার পাশে। শীলার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রচÐ এক ঘোরলাগা এক মায়া তৈরি হলো। মনির মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সামান্যতম সুযোগ থাকলেও কাজে লাগিয়ে সে শীলাকে করে তুলবে। এই কয়েকটা দিন তাকে বেশ বুঝিয়ে দিয়েছে শীলা তার পর নয়। তার ভালোবাসার মানুষটাকে সে হারিয়ে যেতে দিতে পারে না।
ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। ভাদ্র মাসের বৃষ্টি বুঝি এমনই হয়। বাতাসের ঝাপটায় জালা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে পড়ে শীলার মাথার চুল ও মুখ ভিজে ঠিক শিশুর মতো নিষ্পাপ প্রতিকৃতির সৃষ্টি হয়। মনির ভুলে যায় যে, শীলা তার বান্ধবী-ভালোবাসার মানুষ নয়। হৃদয়ের আবেক সে দুঃসম্পর্কের দেয়ালটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে। সে শীলার মাথাটা তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। এভাবে কতক্ষণ তারা বসে থাকে কেউ জানে না। আকাশে বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দ হয়, সে শব্দে শীলা চমকে ওঠে। তারপর দেখে মনিরের বুকে তার মাথা, মনে মনে তার খুব হাসি পায়, সে ধরে নিয়েছে যে, বজ্রপাতের শব্দে সে ভয়ে মনিরকে জড়িয়ে ধরেছে।
শীলা দেখে মনিরও চোখ বন্ধ করে আছে, মাথাটা না সরিয়ে সে মনিরের থুঁতনিতে স্পর্শ করে বলে, তুই কী রে, এভাবে যদি কেউ আমাদের দেখে ফেলে, তাহলে কি হবে একবার ভেবে দেখেছিস?
মনির শীলার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। তারপর বলে, শীলা কী হয়েছে তোর? সেই ছোট চুল, টানা টানা চোখ মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তুই কী করে এমন হয়ে গেলি? তোর বুকের ভেতর আমার জন্যে কি এতোটুকু জায়গা ছিলো না? আসলে সেটা ছিলো তোর ইচ্ছের অভাব।
শীলা কিছু বলতে পারি না, কান্নায় ভেঙে পড়ে। বিমর্ষ মুখে মনিরের হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, 'চল আমাকে রেখে আয়।
রাতে খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে শীলা মোহনের চুলে আঙ্গুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বলে, মোহন তোমাকে না জানিয়ে আমি মনিরের অফিসে জয়েন্ট করবো বলে পরিচালককে কথা দিয়ে এসেছি। প্লিজ তুমি অমত করনা। তাহলে মনিরের মানসম্মান যাবে।
তুমি এতোটা শ্রম দিতে পাবে? প্রাইভেট ফার্মে চাকরি মানে দিনরাতের হিসেব নেই। তুমি সামলাতে পারবেতো?
আমাকে যে পারতেই হবে মোহন। কারণ আমি জানি, মান সম্মান নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে আমাকে সেটা মেনে নিতেই হবে।
চাকরি করতে চাচ্ছ করো, আমি তোমায় বাধা দেবো না। তুমি যদি তাতে ভালো থাকতে পার তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। তবে সরকারি চাকরি আর বেসরকারি চাকরির মধ্যে আসমান জমিন তফাত। ক’দিন করতে পারো সেটাই দেখা বিষয়।
সন্ধ্যার পর খুব দ্রæত অফিসের কাজ শেষ করে মোহন বেড় হয় তবুও এটা সেটা করতে মিলতে মিনিট দশেক দেরি হয়ে যায়, নিচে যেয়ে দেখে শীলা গাড়ির ভেতর বসে আছে।
এরপর দিনের পর দিন-মাসের পর মাস গড়িয়ে যায়, শীলাও চাকরিতে বেশ মানিয়ে নেয়। মোহনকে না জানিয়ে ফ্লাট বুকিং দেয়। মনির তার পারসোনাল গাড়িটি শীলাকে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেয়।
এর কয়েক মাস পরে ‘রূপালি হাউজিং এস্টেট’ এর প্রতিষ্টা বাষিকী পালন উপলক্ষ্যে হোটেল সেরাটনে এক বিশাল পার্টি দেন তারা। সেখানে আমত্রিত অতিথি মোহন। তাই শীলা গাড়ি নিয়ে মোহনের অফিসে যায়। তাকে নিয়ে সে হোটেল সেরাটনে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়। কিছুদুর যেতে না যেতেই শুরু হলো রাস্তার জ্যাম, কোন ভাবেই গাড়ি সামনের দিকে আগাতে পাচ্ছে না। স্পিড তোলার জন্য ড্রাইভারের হাত পা নিসপিস করছে কিন্তু কোন উপায নেই। একেতো রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম তার উপর আবার নতুন একটি দামি গাড়ি। কিছু একটা হয়ে গেলে তার চাকরি ধরে টানাটানি পড়ে যাবে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাসের দিকে তাকিয়ে শীলা মনে মনে ভাবে আগেকার কল্পনাতিত বাস্তব অনুভুতির কথা, বাসের হাতল ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই গরমে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে বাদুর ঝোলা হয়ে থাকা। উহ! কি বিরক্তিকর অবস্থা।
আমরা একটু জ্যামে উসখুস করছি। তবে যাই বল সবই স¤ভব হয়েছে ঐ মনিরের জন্য তাই না?
মোহন বলে হ্যাঁ তাই।
ও যদি আমাকে চাকরিটা না দিতো তাহলে আমাদের ভাগ্যের এ পরিবর্তন হতো না। তোমার একার পক্ষে সংসার মেইনটেইন করে টাকা জমিয়ে গাড়ি কেনা একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল।
সেটাই শীলা, আমি যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার, নানাবিধ পারিবারিক দায়িত পালন সব মিলে মাসের শেষেতো এমনিতেই দুরাবস্থা হয়ে যায়, টাকা পয়সা একেবারেই হাতে থাকেনা আর জমিয়ে গাড়ি কিনতাম কিভাবে?
না মোহন, বড় হওয়ার জন্য টাকা রোজগার করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা তোমার যে একেবারেই ছিলনা তা নয় তবে সে সাহস টুকু তোমার ছিলনা। তাই পিছন থেকে খোঁচা দিয়ে দিয়ে তোমাকে এতোদুর সামনে এগিয়ে দিলাম।
এ জন্য আমাকে নয় মনিরকে থ্যাংকস জানাবা, ভাগ্যিস ও আমাকে তার ব্যবসায়ে রেখেছেন। তা নাহলে কি আর আমি এসব করতে পারতাম।
এই মোহন? ঐ যে ওটা মনিরের গাড়ি না?
আমি তার গাড়িটা তো সেভাবে দেখিনি কোন দিন, চিনব কি করে?
ড্রাইভার একটু জোরে চালাও তো? সামনের গাড়িটার কাছে যেয়ে দাঁড়াও।
মনির সাহেবের গাড়িটার পাশদিয়ে একটু সামনে এগিয়ে নিয়ে ড্রাইভার তাদের গাড়িটা দাঁড় করালো। যেই মাত্র গাড়িটা এসে দাঁড়ালো অমনি শিলা এক লাফে নিচে নেমে ডান হাতটা নেড়ে বলল-
হাই মনির?
আরে শিলা তুমি এখনো এখানে? এতোক্ষণ না তোমার পার্টিতে থাকার কথা ।
ওর অফিসে একটু দেরি হয়ে গেলো তাছাড়া রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম কোন ভাবেই গাড়িটা সামনে এগোচ্ছিল না।
বারিধারায় আমাদের আমাদের নতুন কন্ট্রাক্টটা আজকে যে সাইন হওয়ার কথা সেটা কি হলো?
ওরা দলিল পত্রাদি রেডি করে পার্টিতে আসবে। এখানে সাইন করা হবে। ওরা একটু দেখেও যাক আর আমাদের সম্পর্কে একটু ধারণা হোক। মানুষের বিশ্বস্তার একটা জায়গা দরকার।
হোটেল সেরাটনে তাদের পাটি চলছে। নামি-দামি লোকজন এসেছেন, বিশেষ করে প্রপার্র্টিজের সদস্যগণ। শীলা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের সামলাতে। মোহনকে খুব একা একা লাগছে তাই নিচে এসে নিরিবিলি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
মনির সাহেবের তিক্ষè দৃষ্টি ছিলো শীলার মুখে, বুকে, সিনথেটিক শাড়ির পাতলা আবরণে ঢাকা অস্পষ্ট নাভীর নিচে। যাই হোক না কেন ড্রাইভারের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি মনির সাহেব।
অল্প কয়েক মাস হলেও ড্রাইভার বাদশা মিয়া তার মালিকের ব্যবহারে খুবই সন্তুষ্ট। এমনকি তাকে খুব আপন করে ভাবতে শুরু করেছে।
ড্রাইভার দেখে মোহন সাহেব বাহিরে একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। সে তার কাছেস যায়। তারপর বলে- স্যার, আপনি কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতে চাচ্ছি?
হ্যাঁ বাদশা মিয়া বলো, এতে মনে করার কি আছে।
স্যার, আপার বস, লোকটাকে আমার সুবিধা মনে হয় না। কেমন কেমন যেন লাগে। তার চাল চলন সুবিধার না।
হাঃ হাঃ হাঃ কেমন কেমন মানে কি, বাদশা মিয়া?
না মানে আপনি যেমন কতো সুন্দর করে কথা বলেন, আপনার চাল চলন আচার ব্যবহার সবকিছু মিলে একটা ভদ্র ভদ্র ভাব আছে। ওনাকে ঠিক তেমন মনে হয় না, এই আর কি।
ও আচ্ছা এই কথা, শোনো বাদশা মিয়া, আমাদের এ পৃথিবীটাতে প্রায় ছয়শো কোটি মানুষ বসবাস করে কিন্তু তুমি কারো সাথে কারো কোন দিক থেকে মিল খুঁজে পাবে না। জমজ সন্তানদের দেখলে মনে হয়, আহ! কি অভিন্ন মিল একেবারে মানিকজোর। কিন্তু তাদেরও কোন না কোন পার্থক্য আছে।
আর এটাই হলো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য, একটা কঠিন প্যাঁচ।
কি জানি স্যার, আমরা অশিক্ষিত, গরীব মানুষ, অতশত বুঝি না। আপনাদের বড়লোকদের ব্যাপার স্যাপার। তবে মানুষটা আমার ভাল ঠ্যাকে না।
বাদশা মিয়া, তোমার আমার মতো করে সবকিছু ভাবার সময় ওদের কম। ওরা শুধু অর্থ, নাম-যশ, ভোগ-বিলাস ইত্যাদি নিয়েই মগ্ন থাকে। কে খেলো না খেলো, কার কি হলো, কে বাঁচলো না মরলো এগুলো ওদের ভাবনার মধ্যে পড়ে না। কাজেই তোমার ভালো-মন্দে তাদের কিছু যায় আসে না, বুঝলে?
জি স্যার।
অন্ধ বিশ্বাসের ভারে চাপা পড়া বুকের কষ্টগুলো আস্তে আস্তে তুষের আগুনের মতো ফুসে ওঠে, তলে তলে বাড়তে থাকে। স্ত্রির সঙ্গে যখন কেউ কোথাও যায় বিনা আহŸানে এভাবে ঘারে চেপে বসে না, অন্তত সাধারণ ভদ্রতা টুকু বজায় রাখার জন্য কিছু একটা করে। বারবার এ কথাটাই মোহনের মনে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তোলপার করছে। অন্য কেউ হলে হয়তো তার সাথে এমন করার কথা ভাবতেও পারত না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now