বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম----মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম-- বাঁশি
আজকের গোধুলির মুহূর্তটা অসম্ভব সুন্দও হয়ে সেজেছে। নীল আকাশের বুকে হলুদ রঙের বাহারি মেঘ হালকা বাতাসের বেগে ছুটোছুটি করছে। সোনালি রোদ মেঘের উপরে যেন সরষে ফুলের বাগান তৈরি করেছে। দিনের আলো ক্রমশ সরে গিয়ে গোধূলির সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। দূরের বাঁশ বাগানটি হাজারো পাখির কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠছে। ঝিঁঝি পোকাগুলো তাদের স্বভাবসুলভ গলা ছেড়ে ঝিঁঝিঁ করে ডাকছে। এসব দেখতে দেখতে কখন যে আঁধার নেমে আসে বুঝতে পারে না মোহন। হাতের কাছে তার বাঁশিটা পড়ে আছে, তুলে নিয়ে পরনের লুঙ্গি দিয়ে ভালো করে মুছে তাতে ফুঁদেয়। অনেক দিনের পুরোনো, ভুলে যাওয়া একটি গান অযাচিতভাবেই তার বাঁশির ভেতর সুর হয়ে আসে। বাঁশির সুরের সাথে তার দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ক’ফোটা কষ্টের অশ্রু।
ছোটবেলার খেলার সাথি অনুরাধা, একই সাথে বেড়ে ওঠা। ছিঃ বুড়ি, কানা মাছি, গোল্লাছুট, এক্কা দোক্কা আরো যে কতো খেলা খেলেছে বাল্যকালে। অনুরাধা ছিলো সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। কেমন করে যে সেই চঞ্চল বালিকাটি তার মোহনের মতো একটা সাদা-সিধে ধরনের ভিন্ন জাতের ছেলেকে তার মনের ভেতর জায়গা করে দিলো কে জানে? হয়তো এর জন্য দায়ী মোহনের মনকাড়া বাঁশির সুর। তার বাঁশি বেজে উঠলে অনুরাধা আর ঘরে থাকতে পারতো না, পাগলিনী হয়ে ছুটে যেতো তার কাছে। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি যেমন রাধাকে ঘর ছাড়া করে, ভরা কলস খালি করে পাগলিনী রাধা ছুটে যায় যমুনার ধারে। ঠিক তেমনি ভাবে মোহনের বাঁশির সুরে পাগলিনী হয়ে অনুরাধাও ছুটে যেতো স্যাঁকোয়া নদীর ধারে।
এমনি এক বসন্ত সন্ধ্যায় নদীর ধারে মোহনের বাঁশি করুণ সুরে বেজে উঠে, অনুরাধা স্থির থাকতে পারে না, ছুটে যায় চিরচেনা সেই বটগাছের তলে। সে বলে-মোহন, তোমার বাঁশি বেজে উঠলে আমার কোন কিছু ভালো লাগে না, শরীরটা ছটফট করে, আমি স্থির থাকতে পারি না, কি অসহ্য সময়। এভাবে সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় তাদের দিনগুলো কেটে যায়। গ্রামের মানুষ কানাকানি করে কিন্তু মোহন গায়ের মাতব্বরের ছেলে হওয়ায় ভয়ে কেউ প্রকাশ করার সাহস করে না। তবুও শেষ অবদি, কথাটা মাতব্বরের কান পর্যন্ত এসে গড়ায়। মোহনেরও বাঁশি বাজা বন্ধ হয়ে যায়।
বাপমরা মেয়ে অনুরাধা, যাই আবদার করতো তার মা তাই পূরণ করতো। একদিন হঠাৎ করে অনুরাধার মা মারা গেলে তার অশ্রয় হয় পাশের গ্রামের মাসির বাড়িতে। সেখান থেকেই ভাগ্যের বিড়ম্বনা তার পিছু ছাড়ে না। বছর খানেকের মাথায় তার মাসি, মাথার বোঝা সরিয়ে ফেলতে একই গ্রামের মধ্যবয়সী এক দোজবরের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে অনুরাধার। সংবাদ পেয়ে মোহন ছুটে যায় রাধার কাছে। মুসলমানের ছেলে হয়ে হিন্দু ঘরের মেয়ের দিকে হাত বাড়ায়! এ ধৃষ্ঠতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ। তারা রাত হওয়া পর্যন্ত মোহনকে বেঁধে রাখে। অনুরাধার বিয়ে হয়ে গেলে তারা মোহনের হাত-পা বেঁধে রাতের অন্ধকারে স্যাঁকোয়া নদীতে ফেলে দিয়ে আসে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে অনুরাধার জীবন বাঁচাতে ছুটে আসে মোহন, সে ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে পারলো না তার প্রাণপ্রিয় মোহন আজ তারই জন্য জীবন দিতে চলেছে।
যে স্যাঁকোয়া নদী তাদের নিষ্পাপ প্রেমের স্বাক্ষী হয়ে এতোদিন তাদের কষ্টের অশ্রæ বহন করে চলেছিলো আর আজ সে কিভাবে তার কোলে ডুবিয়ে মারে? তাই নদীর উত্তাল ঢেউ মোহনের বস্তা বন্দি দেহটাকে খুব যতœ করে রেখে দেয় কিনারে।
ভাগ্য বিধাতা সুপ্রসন্ন হওয়ায় রমন গোষাই (বাউল) প্রভাত পূঁজোর অর্ঘ ভাসাতে নদীর পারে আসেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ে মুখবাঁধা বস্তাটি। কৌতুহল বসতঃ তিনি কাছে যেয়ে দেখেন বস্তার ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে। তাই আর এক মুহুর্ত দেরি না করে, খুব তাড়াতাড়ি বস্ত্ার বাঁধন খুলে ফেলেন। বস্তার মুখ খুলতে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক সুদর্শন যুবক। তার বাউল মন ডুকরে কেঁদে ওঠে- হায় বিধাতা! এই কি তোর লীলা খেলা? এতো সুন্দর পৃথিবী, এতো মায়াময় সৃষ্টির মাঝে এ কেমন নিষ্ঠুরতা, এ কেমন অবিচার?
নদী থেকে জল তুলে মোহনের মাথায় ও মুখে দিয়ে তাকে একটু স্বাভাবিক করে তুলেন। তারপর তাকে ধরে
আশ্রমে নিয়ে যান। নিজ হাতে সেবা-শুশ্রুষা করে তাকে সুস্থ করে তোলেন। সেখানে মোহন পেয়ে যায় এক নতুন জীবনের দিশা, নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা। বাউলদের আচার আচরণে মুগ্ধ হয়ে মোহন, রমন গোষাইয়ের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে বাউল সেজে যায়। মোহনের নাম দেওয়া হয় নয়া বাউল। তার পরনে ধূসর গেরুয়া রঙের সেলাইবিহীন আস্তরণ, গলায় কাঠির মালা, কাঁধে একটা লম্বা ঝোলা, হাতে বাঁশের বাঁশি, মুখভর্তি দাড়ি, মাথায় জঠাচুল, এখন আর চেনার কোনো উপায় নেই যে, সে মোহন।
এখন গভীর রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। শুধু জেগে আছে -সেই জমিন, সেই আলো-বাতাস, সেই রাতজাগা পাখিগুলো, সেই স্যাঁকো নদীর ধারে হেলেপড়া বটগাছটি। গভীর রাতে নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে মোহন বাউল পূর্ণিমার জোছনায় বট বৃক্ষের গোড়ায় হেলান দিয়ে বাঁশিতে সুর তোলে। বাঁশির সুরে ভুলে যায় জগতের মোহ। সে বলে- বাল্যকাল গত হয়েছে তার জন্য কাঁদিনি? যৌবন ছেড়ে চলে গেছে কোনো আফসোস করিনি, প্রাকৃতিক নিয়মে একদিন মৃত্যুও এসে যাবে তাতেও কোনো দুঃখ নেই, দুঃখ শুধু একটাই এ জনম গেল রঙে-ঢঙে অথচ পরজনমের জন্য কিছুই করা হলো না তার। গভীর অন্ধকারে নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে জোনাকির আলোয় আবছা আবছা দেখা যায়। মোহন বাউল বলে,-হে আমার সৃষ্টিকর্তা আমি তোমার কাছে স্বর্গ চাই না” তোমার বিশাল অনন্ত এ জগৎ তুমি পুণ্যাত্মা মহাপুরুষদের মধ্যে রেখে দিও। তুমি এ মাটির পৃথিবীতে-ফুল-ফল, বৃক্ষরাজি, নদীর ঢেউ, পাখির গান, এই মুগ্ধ মায়া জগতের মধ্যে এতটুকু স্থানে আমাকে সুবর্ণ করার শক্তি দিও। মোহন বয়াতি বাঁশিতে সুর তোলে-
ও তুই ভবের মায়ায় রইলি ডুবে
হেলায় ফেলে আপনারে,
যেজন তোরে করল আপন
তার খবর তো নিলিনা রে।
স্যাঁকোয়া নদীর ধারে বিশাল একটা বটগাছ, চারদিকে ছোট ছোট গাছপালা আর ঝাড়-জঙ্গলে ভরা। তার ভেতরে খড়ের ছাউনি দেয়া দুটি ছোট ঘর। এই কুঁড়েঘর যেন অনুরাধা বৈষ্ণবীর শান্তির নীড়। নদীর পানি চোখের জলের মতো স্বচ্ছ। প্রকৃতির বুকে হাজারো পাখি গান গেয়ে মাতিয়ে তোলে তাদের আপন ভুবন। নদীর ধারে ভোরের শীতল বাতাস। এসব ভালো লাগার কারণে এ আশ্রম ছেড়ে যেতে চায় না অনুরাধা বৈষ্ণবী। পুরো জীবনটাই এখানে কাটিয়ে দিলেন তিনি। তার কোনো সাজসজ্জা নেই, কোনো উৎসব নেই, পা ছড়িয়ে বিকেলে গল্পগাছা নেই। কাকডাকা ভোরে স্নান সেরে ফুল তুলে মায়ের চরণে অর্ঘ্য দান, অতঃপর মাটির হাঁড়িতে একমুঠো চাল জ্বাল দিয়ে তাতে দু’টো আলু সেদ্ধ করে নেয়, এই হলো তার নিত্যদিনের খাবার।
উঠানের দক্ষিণ-পূর্ব দিকটায় একটা ছোট্ট খড়ের ঘর অনেক দিন ধরে যে মেরামত হয় না, তা এর চালের ছাউনি দেখলে বুঝা যায়। এই ঘরে থাকেন অনুরাধা। দুটো বাঁশের খুঁটির সাথে একটা রশি দিয়ে বেঁধে কাপড় রাখা হয়েছে। যেখানে খান দুয়েক ময়লা ছেঁড়া থান কাপড়, ছেঁড়া জায়গাটার দু’প্রান্তে একসঙ্গে করে গিঁট বাঁধা। ঘরটার একপাশে বাঁশের তৈরি একটি মাচা। সেই মাচার উপর কতগুলো পোয়াল খড় তার উপর একটি ছেঁড়া কাঁথা বিছানো। বিছানার উপরে একপাশে একটা পুঁটলিতে অনেকগুলো ছেঁড়া কাপড় বেঁধে রাখা, সেটাই হয়তো অনুরাধার শোয়ার বালিশ হিসেবে কাজ করে। তার বিছানার নিচে একটি মাটির হাঁড়ি ও একটি মাটির সানকি। তার পাশে একটি পিতলের গ্লাসও আছে। হয়তোবা সেটা কোনো পূর্বপুরুষের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
শরৎকালে দূর-দূরান্তর থেকে বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরা এসে উপস্থিত হয় রাধার আশ্রমে। তারা সবাই অনুরাধাকে রাধা দিদি বলে ডাকে। পরনে গেরুয়া রঙের পোশাক, গলায় কাঠির মালা, কারো হাতে একতারা, কারো হাতে সারিন্দা, খঞ্জনী, তারা আশে পাশের গ্রামে গান গেয়ে ভিক্ষা করে। রাত হলে তারা সবাই মিলে গাছের নিচে গোল হয়ে বসে একতারা বাজিয়ে গান গায়, কেউ কেউ আবার গানের তালে তালে একতারাটি মাথার উপরে তুলে নাচে আর চারিদিকে ঘোরে। ছন্দহীন জীবনে আবেগের আধিক্যপ্রযুক্ত কষ্টে বেদনায় একরাশ ক্লান্তির পশরা সাজিয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রকৃতির খোঁজে। অসন্দিগ্ধচিত্তে জীবনের সর্বস্ব খোয়ে দৈব কোন অশরিরী আহব্বানে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। জীবনে পার্থিব কোনো চাওয়া পাওয়া থাকতে নেই। ক্ষণিকের এ জীবন কচু পাতার পানি, কখন যে টলে পড়ে কেউ জানে না।
মোহন বয়াতি, রমন গোষাইয়ের সাথে এসেছে এই আশ্রমে। এখানে কাউকে সে চেনে না। রাত ক্রমে গভীর হতে চলেছে বাউলেরা আসরে বসে পড়েছে। রমন গোষাই মোহনকে ডেকে বলে- নয়া গোষাই বাজাও তোমার বাঁশি। তার বাঁশির মধুর সুরে চারিদিকের বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে যায়, প্রকৃতি ঝিমিয়ে পড়ে, সবাই মাথা নিচু করে মুগ্ধ হয়ে শুনে। এক সময় তার বাঁশি থেমে য়ায়, সবাই নীরব হয়ে যায়, কার মুখে কোন কথা নেই। হরি গোসাই একতারা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় তারপর গান ধরে নেচে নেচে চর্তুদিকে ঘোরে আর গায়- তার সাথে সাথে সবাই যে যা পারে তাই বাজাতে শুরু করে-
জীবন নদীর ভাঙা তরী
বাইলিনা তুই সাবধানে,
যারে আপন করে বাঁধলি বুকে
দুঃখ দিল সেই জনে।
মোহন আবার বাঁশি বাজাতে শুরু করে। এভাবে যে কখন রাত বেড়ে যায় কেউ টের পায়না। স্যাঁকোয়া নদীর মুখো-মুখি করে বসে মোহন বয়াতি। আজ নদীর বুকজুড়ে থই থই পানি, কি শক্তি তার, সবকিছুই ভেসে নিয়ে যায়। মানুষের এ ক্ষণস্থায়ী জীবনটাকে সে স্যাঁকোয়া নদীর সাথে মিল খুঁজে পায়। এক সময় তার নদীর মতো উত্থাল যৌবন ছিলো, গতরে প্রচণ্ড শক্তি ছিলো মনেও তেমনি জোর ছিলো। কিন্তু আজ জীবনের মাঝপথে এসে সবকিছু কেমন ঘোরপাক খায়। মোহন অনেক রাত পর্যন্ত বাঁশি বাজায়, তার বাঁশির বিলাপ রাধার হৃদয় স্পর্শ করে, বাঁশির করুণ সুর তার শিরায় শিরায় দুঃখ প্রবাহের সঞ্চারণ করতে থাকে কিন্তু কোন শান্তনার বাণী শোনাতে আসার মতো শক্তি তার নেই। শুধু বিছানায় পড়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়। যখন আর বাঁশির শব্দ কানে আসে না তখন সে ভাবে পাগলটা এবার বুঝি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, অন্তত সে রাত্রির জন্য শান্ত হয়ে গেছে। রাধার আবাহন সমাপ্ত হয়, দুঃখের তীব্রতা অনেকটা প্রশমিত হতে থাকে। রাধা ভাবে এই আশ্রমে তার যাতায়াত একদিনের নয়, সেই ছোটবেলা থেকেই। প্রতিবারই বিজয়া দশমির রাতে মোহনের সাথে দেখা হতো, প্রতিমা বিসর্জনের পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত তারা একসঙ্গেই থাকতো।
মোহনের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতনটা কেমন ধক্ধক্ করে ওঠে, এটা কার বাঁশির সুর? কে বাঁশি বাজালো এমন করে? কিঠ যেন মোহনের বাঁশি, সেই গান, সেই সুর তা কি করে সম্ভব? গায়ের মাতব্বরের ছেলে সে, কবে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। হয়তো এতাদিনে তার বাপ বুড়ো হয়েছে, তার বাপের জায়গায় সে গায়ের মাতব্বর হয়েছে। কতো মানুষ তার পিছে ঘুর ঘুর করছে। আর সে কোথাকার রাধা, ক্ষণিকের মোহে কবে এসেছিলো তার জীবনে, তাকে কি আর মনে রাখতে আছে? তবুও তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে কে বাজালো এই বাঁশি। কিন্তু না রাত অনেক হয়ে গেছে, বাউলেরা হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
অনুরাধা ভাবে, বিয়ের পর কতো খুঁজেছি তাকে একটি বারের জন্যও তার দেখা মেলেনি। মাঝখানে অনেক দিন গড়িয়ে গেলো, কতো সুখ-দুঃখের নিশি পার হলো। হায়! কি ছিলো আর কি হলো, তখনকার প্রত্যেকটি দিন কি মাধুরী প্লুত, কি শোভাময়, কি মধুময় সহজ আনন্দে সবার জীবন ভরিয়ে যেতো। এখন কি হচ্ছে এসব? সে পর্বতো কবে শেষ হয়ে গেছে! কবে শেষ হয়ে গেছি আমি, কবে শেষ হয়ে গেছে মোহন। এখনো কেন এ প্রাণ কাঁদে তার জন্য? আসলে এ জগতটা বড় মায়ার জগত, আকাশ ভরা মায়া, চারিদিকে মায়ার নদী কেবল কল-কল, খল-খল করে। তাই জীবনের এ ভাটি বেলায় এসেও আজ কেন এমন আগুন জ্বলে বুকের ভেতর? এখনতো আর মনে কোনো আশা নেই, কোনো তৃষ্ণা নেই, পাপ নেই, পুণ্যের স্পৃহাও নেই, স্বর্গ সুখ নেই, স্বর্গ ভোগের আকাক্সক্ষাও নেই। মোহনের প্রতি প্রেমও নেই, শুধু আছে এক বুক ভরা কষ্টের অনুভূতি আর কিছু অরক্ষিত ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ময়লা স্মৃতি। রাধার বুকের ভেতরে প্রচণ্ড ঝড় ওঠে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তোলপাড় করে দেয় তার ইহ জগত, সে আর চুপ থাকতে পারে না। হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলে।
এই নিভৃত লতা বিতানে এই গভীর রাতে নীলাকাশের নিচে বসে সে অনুভব করল যে, জগতে কতো নর-নারী, কত তরুণ-তরুণী, কত নবযৌবনা বালক-বালিকা প্রেমের টানে দেউলিয়া হয়ে এ মুহূর্তে কতো যন্ত্রণা সহ্য করছে কে জানে! পৃথিবীর এসব দুঃখীজনের সাথে সে যেন একটা অদৃশ্য যোগ অনুভব করল নিজের ব্যথার মধ্য দিয়ে। সময় তার ক্ষতস্থানে অনেকখানি প্রলেপ বুলিয়ে জ্বালা জুড়িয়ে এনেছে। কিন্তু কখনো কখনো এমন রাত আসে যখন স্মৃতির দংশন অসহ্য হয়ে ওঠে। তবুও নীরবে সহ্য করতে হয়, তাছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এ কয় বছরে মানসিক যন্ত্রণায় শরীর গেছে, মন গেছে, সব রকম উৎসাহ-আগ্রহ গেছে, মান অপমানের বোধ গেছে। যে, যা বলে বলুক কিসে- কি এসে যায় তার। এখন সে নিজের দুঃখে উদাসীন হয়ে থাকতে শিখেছে। জীবনের বহু অনাবশ্যক উপকরণ ও আবর্জনাকে বাদ দিয়ে, অতি সহজে অনাড়ম্বর সত্যকে গ্রহণ করতে শিখেছে। তবুও মাঝে মধ্যে কাঙ্গাল মন ব্যাকুল হয়ে যায়, ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙ্গে উছলে ওঠে পানি প্রবল বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু।
স্বামী বিয়োগের পর যুবতী অনুরাধা স্বামীর ভিটে মাটি কামড়ে ধরে বেঁছে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু উগ্র রক্ষণশীল সমাজের ভÐামী আর বস্তাপঁচা রীতি নীতি তাকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে। তারপর আশ্রয় হয় তার এই বাউলের আশ্রমে। তার জীবনের সুখ দুঃখের কথা শোনে ভগবানের কৃপা পাওয়ার সুযোগ ঘটে। জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই, উত্থান পতন, অনেক দুর্বিষহ ঘটনা প্রবাহে মোহন একেবারে চাপা পড়ে যায় তার জীবনে। কিন্তু চাপা পড়ে যাওয়া আর ভুলে যাওয়া তো এক জিনিস নয়? মানুষের মনের মন্দিরে যে কক্ষ থাকে, তা কেবল একজন প্রিয় মানুষের জন্য, সেই মানুষটির সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার সৌরভে ভরা। আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারে না। প্রেমের এ রীতি-নীতি বড় অদ্ভুত। প্রিয় মানুষটি যদি কখনো হারিয়ে যায় আর কোন দিন ফিরে নাও আসে, তবুও সে ঘরের দরজা বন্ধ থাকে, কেবল তারই নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে দরজার বাহিরে।
পরের দিন সকালে একটু দেরিতে ঘুম ভাঙে রাধার, তাই আর বাউলদের সাথে দেখা হলো না। তারা সবাই চলে গেছে যে যার মতো। রাধার বুকে অনন্ত তৃষ্ণা-একটি সত্যের মুখোমুখি হওয়া। রমন গোষাই আর মোহন কয়েকদিনের জন্য অন্য একটি আশ্রমে চলে যায়। কিন্তু রাধার মন কোন ভাবে সায় দেয় না, সেই গান, সেই সুর, কি ভাবে অন্য কেউ বাজাতে পারে। রাধা চলে যায় মোহনের কিন্তু সময় অনেক গড়িয়ে গেছে, তাছাড়া সে কাউকে চেনেও না, মোহনের বাড়ি সে কোন দিন দেখেও নি। তবুও সে মাতব্বরের ছেলে, যে কেউ তাকে চিনতে পারে। এক বৃদ্ধগোছের মানুষ গরুর দড়ি ধরে গাছের ছায়ায় বসে আছে আর যতো দূর লম্বা দড়ি তার মাথায় যেয়ে গরুটি ঘাস খাচ্ছে। বৃদ্ধ মানুষটি মাঝে মাঝে দড়ি টেনে গরুটিকে কাছে আনার চেষ্টা করছে। রাধা বৃদ্ধ মানুষটির কাছে যেয়ে জিজ্ঞাসা করে- দাদু, তোমাক একটা কথা কবার চাও, কওয়া যাবে কি?
হ্যাঁ মা, কি কবার চান কও।
দাদু, মাতব্বরের ব্যাটা মোহন আছে না, তায় কি বাড়িত আছে?
অনুরাধার কথা শুনে বৃদ্ধ তার গোটা শরীরটা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে অনুরাধার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে- ক্যানে মা তোমা কোন শোনেন নাই। অনেক দিন আগোতে না তায় মারি গেইছে।
মোহনের মারা যাওয়ার সংবাদ শুনে অনুরাধার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে, সে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে। বুকের ভেতরটা ডুকরে ওঠে, চোখের অশ্রæ কোন ভাবে বাধা মানছে না। তারপরেও কোনভাবে নিজেকে সংবরন করে বলে- ক্যামন করি মারা গেলো দাদু?
সেগুলা ম্যালা কথা মা, মাতব্বর যেমন তার বেটাও তেমন। অনেকদিন আগের কথা, তায় নাকি কোন হেন্দু চেংড়ির সাথে ভালোবাসা করছিলো। সেই চেংড়ির বোলে অন্যটে বিয়া হবার নাগচে। সে কথা শুনিয়া মোহন তার বন্ধু-বান্ধব সেই চেংড়িক পালে আনির যায়। সেই যে গেইল চেংড়াটা আর ফিরি আসিল না। সবায়গুলায় কয় যে, চেংড়ির বাপ-ভাই তাক মারি ফ্যালে নদীত ভাসে দিচে।
অনুরাধা আর নিজেকে সামলে রাখতে পাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি বৃদ্ধেও কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে যায় তার মাসীর গ্রামে। কিন্তু সময়তো গড়িয়ে গেছে, সেই বাড়ি ঘর এখন আর নেই, শূন্য ভিটা পড়ে আছে। তার মাসীর বাড়ির পাশে এক ঠাকুরমা থাকতো। অনুরাধা সেই ঠাকুরমার কাছে যায়। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হলেও বৃদ্ধা ঠাকুর মা এখনো বেঁচে আছে। যদিও তার দৃষ্টি শক্তি নেই কিন্তু স্মরণ শক্তি বেশ আগের মতোই আছে। অনুরাধা ঠাকুরমার পাশে বসে তার পরিচয় দেয়। তারপর বলে-ঠাকুরমা মোর বিয়ার দিন কি হইছিলো, কোন চ্যাংড়া নাকি মোক পালে নিগির আচ্চিলো। তোমা কোন জানেন কি?
ক্যানে তুই সেগিলা শুনিস নাই।
না ঠাকুরমা, মোক কাও কোন কয় নাই।
একটা মুসলমান জাতির চ্যাংড়া আসি কইছিলো তোর সাথে নাকি তার ভালোবাসা। তোক বিয়া করির চাইছিলো। তার সাথে বিয়া না দিলে, রাইতোত না কি তোক পালে ধরি যাবে। এই শুনিয়া হামার পাড়ার চ্যাংড়াগুলা তাক ধরি বান্দি থুচে।
তারপর কি হইল ঠাকুরমা, দুই-তিনদিন পর মুই তোর মাসীর মুখোত শুনিছিনু যে, চ্যাংড়াটাক নাকি হাত-পাও বান্দি নদীত ফ্যালে দিচে। তার কয়েকদিন পর তোর মাসীর বাড়িত ডাকাতি পড়িল, ডাকাইতগুলা তোর মাসীর বাড়ির সবাকে মারি ফ্যালাইচে আর যায় যায় আগের গেইচে কায়তো ফিরি আইসে নাই, চ্যাংড়া বুড়া সগায় মিলি একেবারে দশ-বারোটা মরা পড়ি আছিলো। গোটায় গ্রাম হৈ হৈ উঠি গেইছিলো।
বিয়ের পরই অনুরাধাকে তার স্বামী নিয়ে যায় পাহাড়ে। তার স্বামী সেখানে চা বাগানে কাজ করতো। অনেকদিন পর তার স্বামী মারা গেলে সে ফিরে আসে স্বামীর ভিটায়। কিন্ত না, তার ফিরে আসাটাকে খুব ভালো চোখে দেখতে পারলেন না স্বামী পক্ষের স্বজনেরা। বিশেষ করে নিঃসন্তান বিধবা স্ত্রীকে তার স্বামীর ভাই-বোনেরা কোন ভাবেই সম্পত্তির অংশভাগ দিতে রাজি নন। অনুরাধা তার স্বামীর স্মৃতিকে বুকে আগলে রেখে বাকি জীবনটুকু পারি দেয়ার সিদ্ধন্তে অটল ছিলেন। কিন্তু যুবতী নারীর একাকী ঘর, বড়ই অন্ধকার থাকে। সে অন্ধকার খুব কমই আলোর মুখ দেখে।
বেশ কয়েকদিন পর মোহন আবার নদীতে হেলে পড়া বটবৃক্ষের শিকড়ে হেলান দিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাঁশি বাজায়। বাঁশিতে ফু দিতে দিতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন চোখে বন্ধ করে চলে যায় এই জগৎ ছেড়ে পরমাত্মার জগতে। মানব জনমে এত স্বল্প সময়, এই ক্ষণস্থায়ী জীবন এই বুঝি ফুরিয়ে যায়। এই নীলাকাশ, এই বসন্তের আবেশ, বাঁশের ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি, ফুলের বনে ভোর যেন গুঞ্জন নদীর বুকে, কল-কলে ঢেউ, ফলন্ত গাছে গাছে পাখির গান, বড়ই মধুর প্রাণজুড়ে যায়, এসব মায়া-মমতার বন্ধন ছেড়ে যেতে চায় না মন-আবার বাঁশিতে সুর তুলে-
“কেনরে মন আইলি ভবে;
কেউ নারে তোর সঙ্গী হবে
পথের ধুলোয় রইলি পড়ে
ডাকলো না কেউ আপন করে”
সেই বাঁশি, সেই সুর। অনুরাধার বুকে প্রচণ্ড ঝড় ওঠে, তোলপাড় করে তোলে তার দেহ মন। সে স্থির থাকতে পারে না। ছটফট করতে করতে এগিয়ে আসে নদীর পারে। চারিদিকে পূর্ণিমার থই থই জোছনা। কিন্তু গাছের নিচে অন্ধকার তাই কে বাঁশি বাজাচ্ছে তা দেখার কোন উপায় নেই। অপরিচিত একজন পুরুষ মানুষ সে কিভাবে তার কাছে যায়। তবুও যে তাকে যেতেই হবে, অন্য কোন উপায় নেই। জানতেই হবে সে আসলে কে, কি তার পরিচয়, মোহন না কি অন্য কেউ। সাহস করে বুকে বল নিয়ে অনুরাধা সেই বাঁশি ওয়ালার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়।
মোহন ভ’ত দেখার মতো চমকে উঠে, ধড়ফড় করে দাঁড়ায়। তার বাঁশি থেমে যায়। নির্বাক হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে।
অনুরাধা বলে কে গো তুমি বাঁশিওয়ালা। কোথায় থাক তুমি?
অনুরাধার কণ্ঠস্বর মোহনের কানে যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুর হয়ে ধ্বনিত হতে থাকে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়, তার মুখ থেকে কোন কথা বেড় হয় না। সে চেষ্টা করছে কথা বলতে কিন্তু ভাষা নেই।
অনুরাধা বলে কে গো তুমি? কথা বলছো না কেন?
এবার মোহন খুব কষ্ট করে মুখ দিয়ে শুধু উচ্চারণ করতে পারলো, অনুরাধা!
বক্ষমুক্ত আবেগী উচ্ছ্বাসে পৃথিবীর সকল বাঁধা বিঘ্নতার শৃঙ্খল ছিড়ে তৃষিত চোখ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অনুরাধার দিকে। অশ্রুর প্লাবনে ভেসে যায় তারা। হঠাত মগ্নতা ভেঙ্গে গেলে মোহন বলে-অনুরাধা, এ জগৎ-সংসার বড় নিষ্ঠুর, বড় আজব, বড় কঠিন জায়গা। যেখানে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কাউকেও বিশ্বাস করা করাটা খুব কঠিন।
মোহন, জগৎ-সংসার সব পড়ে থাক, সব চুলোয় যাক, তুমি আছো এর চেয়ে বড় কোন সত্য নেই আমার কাছে।
অনুরাধা, এতো রাতে তুমি এখানে কেন?
সেই বাঁশির সুর, সেই গান আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, রক্তের শিরায় উপশিরায় ধ্বনিত হতে থাকে। হৃদয়ের স্পন্দনের তালে বাঁশির সুর খেলা করে। মোহন তুমি কি করে ভাবতে পারো তারপরেও আমি স্থির থাকি।
তুমি আশ্রমে ফিরে যাও। কেউ দেখে ফেললে বড় দুর্নাম হয়ে যাবে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় আর সইতে পারবে না। তুমি যাও।
মোহন, কি হবে আর এসব সমাজ, সংসার, লোক চক্ষুর কথা ভেবে? শূন্য জীবনে প্রাপ্তির ঝোলাই যেখানে শূন্য সেখানে হারাবার ভয় কিসের? আমি আর কোন কিছুতেই ভয় পাইনে। যে ভয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জীবনে অনেক হারিয়েছি, সে আমাকে কিছুই দিতে পারে নাই।
অনুরাধা, যে জীবন মূল্যহীন, তার কোন আশা থাকতে নেই। নিরাশার গ্লানিতে কেবল হতাশার জন্ম হয়। বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলোকে খুঁটে খুঁটে খায়।
মোহন আমার দিন-মাস, বেলা-অবেলার তৃষিত প্রহর, জোনাক জ্বলা রাত, বিজয়া দশমীর আরতিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা। জীবনের সেই স্বণালি দিনগুলো কি করে এমন অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। আমরা কোন পাপ করিনি তবে কেন বিধাতা আমাদের এমন শাস্তি দিলেন? কোন অপরাধে আমাদের এ দণ্ড? হে আমার পালন কর্তা, আর সইতে পারিনা।
জীবনের নরম সন্ধ্যাগুলো যখন কেড়ে নিয়েছে কালবৈশাখী ঝড়, তখন শেষ প্রহরের শুকতারা দর্শনও সম্ভাবনাহীন। তুমি ফিরে যাও অনুরাধা।
তুমিও ফিরে চলো, আজকে রাতটা না হয় আশ্রমের গাছের নিচে গল্প করে কাটিয়ে দেই। সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় তোমার দেখা পেয়েছি। আমার সকাল সন্ধ্যার আরাধনা, পূঁজোর থালার অশ্রু সিক্ত পুষ্পার্ঘ, আমার অন্তরদেবতার আশীর্বাদ পুষ্ট হয়েছে। মোহন তুমি ফিরে চলো।
আচ্ছা, তুমি যাও, আমি আসছি।
মোহন, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে চাঁদটা ক্রমে ঢলে পড়ছে দিগন্তের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই ছিল চোখ ঝলসে যাওয়া আলো, এখন তার কিছুই নেই সামান্য একটু অন্ধকারও দূর করার ক্ষমতা নেই। কি ভয়ানক এ ভবের খেলা। যার সময় যখন আসে সে তার বড়াই করে, সময় চলে গেলে কেঁদে মরে। জীবনের মধ্যবর্তী স্থানে এসে নিজেকে চিরকালের মতো ধিক্কার দেয় মোহন বাউল। মহাগুরুর দীক্ষাপ্রাপ্ত এক সাধক সে, পরম সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করার জন্য দীক্ষাপ্রাপ্ত হয় সে। আর এ দুনিয়ার মোহে ফিরতে চায়না মন।
মোহন, বাউল তার দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে আধশোওয়া অবস্থায় চোখ বন্ধ করে। তার বুকের ভেতর হাজারো প্রশ্নের হিল্লোল বয়ে যায়, কোন প্রশ্নেরও উত্তর সে খুঁজে পায় না। কোনো ভাবেই সে রাধাকে ভুলে যেতে পাচ্ছে না। যতোবার সে ভুলে যেতে চায় তার চেয়েও বেশি মনে পড়ে। তাহলে তার দীক্ষা! সে যে মহাগুরুর দীক্ষাপ্রাপ্ত সাধক! পঞ্চইন্দ্রিয়ের অশুভ তারণায় কখনো সে পরাজিত হবে না-এমন হাজারো প্রতিজ্ঞা ছিলো মনে। তাহলে এসব কি হচ্ছে? মিথ্যে, সব মিথ্যে। সব ভুল, প্রেম-প্রিতি ভালোবাসা সব দু’দিনের মোহ, সব ক্ষণিকের জন্য। মানুষের লোভী মন- মগজ কামনা-বাসনার অথৈ জলে হাবুডুবু খায়। শত রঙিন কল্পনা তাতে আপোষ করে প্রেমাস্পদ ও মনের আবেগকে মোহনীয় করে তোলে। যখন মোহ ছুটে যায় অপন্দ্রিমান ভাটার জল তাকে শুষ্ক বালুর চড়ায় একা ফেলে রেখে কোন দিক দিয়ে অন্তর্হিত হয় তার খোঁজ কেউ পায় না।
বাউলেরা প্রচলিত সব আনুষ্ঠানিক ধর্ম মানে না। প্রচলিত ধর্মের তাত্তি¡ক বা দার্শনিক ধারণাকে অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করলেও তার আচরণিক দিক কখনোই আগ্রহ পোষণ করে না। কুরআন, পুরাণ, বেদ, বাইবেল কোনো ধর্মই তাদের আকর্ষণ করে না। এসব শাস্ত্র আচার ও প্রচলিত সমাজ ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। সাম্প্রদায়িক ধর্মের প্রাচীর ভেঙে তারা উদার মিলনের ময়দানকে সন্ধান করে। আল্লাহ্, ঈশ্বর সেই পরম পুরুষ হলো মনের মানুষ। মনের মধ্যেই তাকে অন্বেষণ করতে হয়। পরমত্বের রহস্য ভেদাকাঙ্খী লালন তাই আফসোস করে বলেন-
”কারবা আমি কে বা আমার
আসল বস্তু ঠিক নাহি তার
বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার
উদয় হয় না দিনমনি”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now