বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প (পর্ব-০১)
লেখকঃ নাফিজ আহমেদ
আমার বয়স এখন ষাটের কোঠায়—জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কখনো কখনো নিজেকেই চিনতে কষ্ট হয়। এক সময় যেসব চুলে কালো আঁধার নেমে থাকত, আজ সেখানে ছড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা রূপের ছোঁয়া। সময় তার রঙ দিয়ে আমাকে আঁকিয়ে নিয়েছে নতুনভাবে।
এক সময় ছিল, পায়ের নিচে ছিল গতি, চোখে ছিল স্বপ্ন, বুক ভরা সাহস আর প্রাণচঞ্চলতা। তখন বাইসাইকেল চালিয়ে দূর দূরান্তে চলে যেতাম—গন্তব্যের তোয়াক্কা ছিল না, ছিল কেবল চলার আনন্দ। আজ আর সেসব নেই। বাইসাইকেলটা এখন ভাঙা বারান্দার কোণায় কাঁদে, আর আমি ভরসা করি একখণ্ড লাঠির উপর। লাঠিটা যেন আমার ছায়া হয়ে গেছে—নির্ভরতার একমাত্র প্রতীক।
শরীর আর মন দুটোই আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত, নিঃসঙ্গ। হৃদয়ের গভীর থেকে ওঠে দীর্ঘশ্বাস—সময় বড়ই নিষ্ঠুর। কে জানত, যে শরীর একদিন পাখির মতো উড়ত, সে শরীরই একদিন ধীরে ধীরে হেঁটে চলবে লাঠির জোরে?
আজ বিকেলে একা বসে আছি গ্রামের পুরনো স্কুল মাঠের পাশে, সেই পুরনো জামগাছটার নিচে। এক সময় এখানে ছুটোছুটি করতাম, হৈ-চৈ করতাম বন্ধুদের সঙ্গে। আজ সবই স্মৃতি। সামনে দেখি, ক’জন কিশোর এক জায়গায় গোল হয়ে বসে আছে। কি যেন করছে ওরা—চুপিচুপি হাসছে। আমি আগ্রহ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।
আমার কাছাকাছি যেতেই ওদের মুখে একরাশ বিরক্তি।
— “গায়ে একটা গন্ধও আসে না?”
— “এই জামাটার কি রঙ ছিল একসময়?”
— “চোখের কোণ দেখে মনে হয় মাসের পর মাস পরিষ্কার হয়নি!”
তাদের কথাগুলো আমার কানে গিয়ে না থেমে হৃদয়ের গভীরে বিঁধল। শিশুদের এমন সরল অথচ নির্মম বাক্যবাণে বুকের ভেতরটা ধ্বসে পড়ল। আমার দিকে তাকিয়ে তারা হাসছে—হাসি নয় যেন বিদ্রুপ। মনে হল, আমি এখন আর তাদের জগতের কেউ নই। একটিবারও আর দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। পেছনে ফিরে আসতেই স্মৃতির দরজা খুলে গেল।
সেদিনের কথা মনে পড়ল তখন আমার বয়স সতেরো। বয়সটা এমন— মাত্র যৌবনের দরজা খুলেছে, শরীরে যেন রক্ত নয়, আগুন বইছে। নিজেকে মনে হতো অমিত শক্তির অধিকারী। কারো উপদেশ ভালো লাগত না, কারো কষ্ট দেখতেও মন সায় দিত না। শুধু নিজের আনন্দ, নিজের গর্বটাই ছিল মুখ্য।
সেই দিনটার কথা আজও চোখের সামনে স্পষ্ট।
গ্রামের স্কুল মাঠে খেলার আয়োজন করেছি আমরা। আগেভাগেই বন্ধুদের নিয়ে চলে এসেছি। মাঠটা যেন আমাদের রাজ্য, আর আমরা তার রাজপুত্র। হঠাৎ দেখি, শহিদ দাদা—এক বৃদ্ধ, আমাদের মাঠজুড়ে ছাগলের পাল নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে।
তিনি আমার দাদা হলেও, সম্পর্কের সে সম্মান সেদিন আমার মধ্যে ছিল না। কারণ, আমার বয়স তখন আত্মমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন। আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে গিয়ে বললাম—
— “এই বুড়ো, এত সাহস কোথা থেকে পাও? মাঠটা দেখছো না? আজ খেলা হবে এখানে। তুই এখন ছাগল চড়াতে এসেছিস?”
শহিদ দাদা থমকে গেলেন। কাঁপা গলায় বললেন,
— “বাবা, জানতাম না তো... ভেবেছিলাম সকাল বেলা, কেউ আসবে না।”
আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললাম,
— “শোন, আর যদি দেখি ছাগল নিয়ে মাঠে আসিস, একটাও খুঁজে পাবি না। সব হাওয়া করে দেব!”
বন্ধুরা হেসে উঠল—তাদের হাসির সাথে আমি মিশে গেলাম। দাদার মুখে লজ্জা, কষ্ট আর অপমানের ছাপ। চোখ দুটি যেন ভিজে উঠল, কিন্তু একটাও কথা বললেন না। ধীরে ধীরে চলে গেলেন, মাথা নিচু করে, ছাগলগুলোর দড়ি হাতে।
আমরা খেলা শুরু করলাম। সবাই খুশি, আমি গর্বিত।
কিন্তু সেই দিনটাই আজ বারবার ফিরে আসে—অস্থির করে তোলে।
আজ বুঝি, আমি তার হৃদয় ভেঙেছিলাম। একজন দরিদ্র, অসহায় বৃদ্ধের আত্মসম্মানে আমি আঘাত করেছিলাম—শুধু নিজে খেলতে পারার অধিকার ফলাতে গিয়ে।
আজ, যখন আমি নিজেই বৃদ্ধ হয়েছি, তখন শহিদ দাদার চোখের সেই দৃষ্টি, সেই নীরব দীর্ঘশ্বাস আমার চোখে-মনে কাঁপন তোলে। হয়তো আজকের শিশুরাও আমার মধ্যে দেখে সেই “শহিদ বুড়োকে”, যার শরীর থেকে ঘাম আর বয়সের গন্ধ আসে।
আজ একা বসে ভাবছি—সময় কাকে ছেড়ে দেয়? কাকে দিয়ে কথা রাখে?
সে না মানুষ চেনে, না সম্পর্ক বুঝে। শুধু চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসে—আমাদের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে।
আজকের সেই বাচ্চাগুলো খেলছে না, তারা ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে আছে। হয়তো আরেকটি গল্প বুনছে তারা—আমার মতোই কোনো একজন বৃদ্ধকে ঘিরে। চলবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now