বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার প্রিয় বাবা
✍️ নাফিজ আহমেদ
আজকের এই জোছনামাখা রাতে চোখ দুটি যেন এক হয়ে আসে না। বারবার মনে পড়ছে আমার সেই প্রিয় মানুষটির কথা—আমার বাবা, আমার আব্বু।
লেখক মানুষ তো, আব্বুকে কিছু দেবার মতো কিছুই নেই আমার ঝুলিতে। তাই এই মানিক বলে ডাকা মানুষটার গল্প লিখে তাকে উপহার দিচ্ছি একফালি ভালোবাসা।
সবুজ-শ্যামলে ঘেরা ছোট্ট এক গ্রামে আমার শৈশবের শুরু। যখন চেতনা জাগতে শিখল, বুঝলাম, আমার আশেপাশে একজন মানুষ আছেন যিনি আমাকে পেয়ে যেন প্রাণখুলে আনন্দিত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম—এ মানুষটি আর কেউ নন, তিনি আমার বাবা।
'বাবা' শব্দটি যতই পরিচিত হোক না কেন, আমার কাছে 'আব্বু' বলতেই তার অস্তিত্বের ঘনত্ব টের পাই। তখন বয়স খুব বেশি নয়, বড়জোর চার-পাঁচ। আব্বু আমাকে কাঁধে নিয়ে ঘোরাতেন—হয়তো কষ্ট হতো, তবু মুখে লেগে থাকত প্রশান্তির হাসি।
আব্বুর কণ্ঠে শোনা গল্পগুলো আমার শৈশবের রূপকথা হয়ে আছে আজও। যদিও মা-ই বেশি গল্প শোনাতেন, তবু আব্বুর বলা প্রতিটি কথা যেন হৃদয়ে গেঁথে যেত।
মাঝেমধ্যে আব্বু বাইসাইকেলের সামনে বসিয়ে আমাকে নিয়ে যেতেন মাঠে—কাজের জন্য নয়, আদর করে নিজেদের জমি চেনাতে। আমি নিরিবিলি বসে থাকতাম, আর আব্বু কাজ করতেন। একদিন মাঠে গিয়ে খুব ক্ষুধা পেয়েছিল আমার। আব্বু পাশের বাড়ি থেকে এনে দিয়েছিলেন ভাত, চিনি আর পাকা কলা—আজও মনে পড়ে সেই খাবারের স্বাদ।
আব্বু ছোটবেলায় আমাকে ‘মানিক’ বলে ডাকতেন। কত বায়না যে করতাম! কখনো কাঁধে, কখনো পিঠে উঠে যেতাম। একবার দাদির সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আব্বু আমাকে না পেয়ে সাইকেলে করে গ্রামের পর গ্রাম খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পরে যখন ফিরে আসি, কিছু বলেননি, কারণ সঙ্গে ছিল দাদি। তবে যদি একা থাকতাম, শাসন যে আসত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আব্বু নিয়ম করে প্রতিদিন বিকালে আমাকে নিয়ে যেতেন সাইফুল কাকার দোকানে। রসগোল্লা, আরসি, আর নানা মিষ্টি খেতাম। জীবনে প্রথম চা খাওয়া—তাও আব্বুর হাত ধরেই। একদিন চায়ের কাপ ঠোঁটে নিয়েই মুখের ভেতর জিহ্বা পুড়ে গিয়েছিল। আব্বু আদর করে শিখিয়ে দিলেন—চা এক ঢোকে খেতে হয় না, ফু দিয়ে ঠান্ডা করে খেতে হয়।
আমার ছোটবেলায় এক অজানা ব্যথা ছিল পায়ে—যখন তখন ব্যথা উঠত। আব্বু নিজের হাতে আমার পা টিপে দিতেন। একবার রান্নাঘরের সিঁড়িতে ব্যথায় পড়ে গিয়েছিলাম। আব্বু তৎক্ষণাৎ এসে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। তার মমতায় ব্যথা মিলিয়ে যেত ধীরে ধীরে।
আমার আরেকটি গর্ব—আব্বুই আমাকে সাঁতার শিখিয়েছেন। আমাদের বাড়ির পাশে কপোতাক্ষ নদ, সেখানেই আব্বুর ঘাড় জড়িয়ে ধরে পানিতে নামতাম। ধীরে ধীরে পানির ভেতর হাত-পা নাড়াতে নাড়াতে একসময় আমি সাঁতার কেটে ফেললাম।
চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি তখন। আব্বু মোটরসাইকেল কিনলেন। আম্মুকে বললেন—"ছেলেকে যেন গাড়ির ধারে-কাছে না যেতে দিস।” কিন্তু এই নিষেধের আড়ালেই যে ছিল অপার ভালোবাসা। কয়েকদিন যেতে না যেতেই আব্বুই আমাকে হাতে ধরে মোটরসাইকেল চালানো শিখিয়ে দিলেন। আজও আমি স্লো রেসে সবার আগে থাকি, কিন্তু আব্বু আমার পেছনে বসে সব ভুল ঠিক করে দেন—কারণ তিনি আমার প্রথম শিক্ষক।
আমি হয়তো বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না, কপালে চুম্বন এঁকে দিতে পারি না। কিন্তু আমি জানি, অনুভব করি—আমি আমার বাবা-মাকে খুবই ভালোবাসি। এই ভালোবাসার গভীরতা আমি ঠিক করে বুঝতে পারি বাড়ি ছেড়ে এলেই। দূরে গেলে টের পাই, কী অসম্ভব ভালোবাসা তারা আমার জন্য ছড়িয়ে রেখেছেন জীবনের প্রতিটি কোণে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now