বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম- চাকরির খোঁজে
সবে মাত্র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শেষ। কলেজে ভর্তিটা তার পক্ষে দিবাস্বপ্ন। নিরন্তর ছুটে চলা সৌভাগ্য ছায়ার পিছে। কিন্তু সাধ্য যেন উপায়হীন। ঘরে বিবাহ যোগ্য বোন ময়না আর বিছানায় শয্যাশায়ী মা। চাল-ডাল, ওষুধ পথ্য সব মিলে যেন মাথার উপর পাহাড় সমান বোঝা। শত কষ্টের মাঝেও বেলা শেষে অসুস্থ মা আর ছোট বোনের মুখের দিকে তাঁকালে সব ভুলে যায় মোহন।
মোহন ওষুধের দোকানের কর্মচারি, অবসরে খবরের কাগজের দিকে একটু আধটু চোখ বুলার সুযোগ হয়। সেদিন হঠাৎ করেই একটা নামজাদা কোম্পানির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তার চোখ জ্বল-জ্বল করে ওঠে। হোক সিকিউরিটি গার্ড তাতে কি? মোটা বেতনে একটা চাকুরির দরকার তার। হাকিয়ে দেয় একখানা দরখাস্ত। কয়েকদিন পর ইন্টারভিউ কার্ডও আসে।
যেতে হবে ঢাকা কিন্তু পকেটতো পুরোটাই ফাঁকা।
বাড়ি এসে ছোটবোন ময়নার সাথে পরামর্শ করে, ঢাকায় যাবে কি না। যাতায়াতের জন্য একটা মোটা অংকের খরচ তো আছে। সে টাকাই বা আসবে কোথা থেকে? কে দেবে তাকে ঢাকা যাওয়ার টাকা?
ময়না সাহস জোগায়, স্কুলে টিফিন না খেয়ে দু’এক টাকা করে জমিয়েছে মাটির ব্যাংকে। হয়তো তা দিয়ে গাড়ি ভাড়া হয়ে যাবে।
ময়নার কথা শোনে-মোহন হেসে ফেলে, আরে পাগলি ঢাকা এখানে সেখানে নাকি? সেতো অনেক দূর! যাতায়াতের জন্য কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার টাকাতো লাগবেই। তোর মাটির ব্যাংকে আর কতো টাকা ধরবে?
দেখ ভাইয়া, আমার বিশ্বাস ব্যাংকটা ভাঙলে তোর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
পাটগ্রাম থেকে কম ভাড়ায় ঢাকা যাওয়ার জন্য লক্কর ঝক্কর মফিজ গাড়িগুলো বিকেলেই ছেড়ে যায়। পকেটের দুর্বল অবস্থা যে ভাবেই হোক ঢাকা পৌছাতে পারলেই হলো। ভালো-মন্দের বাদ বিচার এখন না।
গোটা রাস্তায় চরম বিরক্তিকর অবস্থার মাঝেও রাতের কোন এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘন আবছায়া গাছপালার ফাঁকে ফিকে ভোরের সাদা আভা জানালার ভাঙা কাচের ভেতর দিয়ে উঁকি দেয়। ভোরের আলো এসে চোখে পড়তেই সে চমকে ওঠে, পকেট ঠিকঠাক আছে তো! যা দিনকাল পড়েছে।
মাথার উপর থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে, অনেক দূরে এক ঝাঁক ধান শালিক উড়ে বেড়াচ্ছে ক্ষণিকের জন্য হলেও একটা ফুরফুরে ভালো লাগা কাছ করছে তার। কিন্ত পরক্ষণেই বুকের ভেতরটা ক্যামন ধকধক করে ওঠে, ঢাকা শহরে তো এমন পাখির ঝাঁক দেখা যাওয়ার কথা নয়। তার মানে হলো যে, ঢাকা এখনো আসে নি! তার পরীক্ষার কি হবে? সময় মতো না পৌছাতে পারলে তো পরীক্ষ দিতে পারবে না। আদরের ছোট বোনটার টিফিন না খেয়ে বাঁচানো কষ্টের টাকাগুলো মাটি হয়ে যাবে। তার বুকের ভেতর ঝড় ওঠে, তুমুল ঝড়। কতো স্বপ্ন তার। মোটা বেতনে চাকরি হবে,
বিছানায় শয্যাশায়ী মায়ের চিকিৎসা হবে, হ্যাণ্ডসাম ছেলের সঙ্গে বোনের বিয়ে হবে। তারপর.. ... ..
হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো, বাসের ভেতরে সবাই চিৎকার দিয়ে উঠলো। মোহনের মুখটা বিমর্ষ-ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। দৃষ্টির চঞ্চলতা যেন শূন্যে মিশে গেলো। সে অস্থিও হয়ে উঠলো। সবাই একে অপরের দিকে তাঁকাচ্ছে, কি ঘটলো সেটা বুঝে ওঠার আগেই বাসের কণ্ডাক্টর ও হেলপার নিচে নেমে গেছে।
সে ভাঙা কাঁচের ভেতর দিয়ে বাহিরে তাঁকিয়ে দেখে একটা ধান শালিকের ঝাঁক আঁকা বাঁকা হয়ে অনেক দূরে উড়ে যাচ্ছে। একবার মনে হলো ধানশালিকের ঝাঁক বুঝি তার গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে, তার গ্রামে আছে দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত, সবুজ মাঠ, নানান রকমের গাছ গাছালি, এঁকে বেঁকে চলা স্যাঁকোয়া নদী কাশফুলে ভরা। গ্রাম ছেড়ে মন বাহিরে সায় দেয় না কিন্তু সে নিরুপায়। কারণ সে ছোট বোন ময়নাকে কথা দিয়েছে, যে করে হোক একটা চাকরি সে জোগার করবে তারপর মাকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটা ভালো ডাক্তার দেখাবে, সুচিকিৎসা করবে।
ছোট বেলায় পিতৃহারা মোহন মাকেই তার দুনিয়া মনে করে। অভাবের সংসারে লেখা পড়া করাটা ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। স্কুলের মাইনা দিয়ে পড়া তার সাধ্যেও বাইরে। তবে ক্লাসে বরাবর ফাস্ট হওয়ায় প্রধান শিক্ষকের নজর চলে আসে তার দিকে। তাই সৌভাগ্যক্রমে বিনা বেতনে, বিনা খরচে স্কুলের শেষ পরীক্ষাটা দিতে পেরেছে।
বাপের রেখে যাওয়া বাড়ির ভিটে বিঘাখানেক জমি। তারই এককোণে ছোট ছোট তিনটি খড়ের ঘর। ছাউনি দেওয়ার অভাবে বর্ষা এলে সেই ঘরের চাল দিয়ে দরদর করে বৃষ্টির পানি পড়ে। যেখানে পানি পড়ে সে যায়গায় হাড়ি-পাতিল থালা বাটি রেখে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা করে মোহনের মা মর্জিনা। বাড়ির ভিটেটা অন্যান্য জমিগুলো থেকে একটু উঁচু হওয়ায় সেখানে সে নিজেই মরিচ, কুমড়ো, ঢেঁড়স, পটোল ও বিভিন্ন রকম সব্জির দু’চারটা করে গাছ লাগায়। সেগুলো দিয়ে অন্তত খেয়ে না খেয়ে কষ্টে-শিষ্টে দিনগুলো চলে যায়।
স্কুল থেকে এসে বইগুলো বিছানার উপর রেখে ময়না দেখে ঘরে এক মুঠো খাবারও নেই, অসুস্থ মাকে সে খাবারের কথা বলতে দ্বিধা করছে। মনের উপলব্ধি যেন আজ তার বয়সকে ছাড়িয়ে গেছে, তাই সে হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায়। ময়নার মুখের দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই মর্জিনার দু‘চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লোনাজল। কিই বা করার আছে তার, অভাবের সংসার তার ওপর মোহনের বাবাও নেই। ছোট্ট একটা মাছুম ছেলে কি আর সংসারের হাল ধরতে পারে? তার পরও ছেলেটা লেখা পড়াব বাদ দিয়ে মানুষের দোকানে কাজ করে শুধু সংসারের জন্য।
সকাল আটটার দিকে মোহনের সেই লক্কর-ঝক্কর গাড়ি শেষ পর্যন্ত গাবতলী বাস স্টাÐে গিয়ে পৌছে। একজন পথচারিকে সে জিজ্ঞাসা করে গুলশান কিভাবে যাওয়া যাবে। পথচারি তাকে বলে দেয় সে অনুযায়ী মোহন বাসে চড়ে ফার্মগেট যায় তারপর সেখান থেকে ঘুরে ঘুরে গুলশানে পৌছে যায়। ব্যাগ থেকে সার্কুলারের পেপাটা বের করে কোম্পানীর হেড অফিসের ঠিকানা দেখে তারপর হেঁটে হেঁটে সে অফিসের দিকে যায়।
অফিসের গেটে দেখে বিশাল দেহী একটা গোঁফ ওয়ালা লোক বন্দুক হাতে নিয়ে টুলের উপর বসে আছে। তাকে দেখতে দাড়োয়ানের মতো লাগলেও চেহারাটা অবিকল হিন্দি ‘সোলে’ সিনেমার গাব্বার সিংগের মতো ভয়ঙ্কর। মোহন তাকে জিজ্ঞাসা করে আংকেল এখানে আজ চাকরির ইন্টাভিউ হওয়ার কথা, আপনি কি কিছু জানেন?
রংপুরিয়া ভাষায় কথা বলতে শুনে দাড়োয়ান তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে, তারপর বলে-হ’ তোমার ইন্টারভিউ কাড-ডা দেহি?
জী আংকেল। এই বলে সে ব্যাগের চেইন খুলতে শুরু করে, কি মনে করে দাড়োয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, থাক লাগবো না। সোজায় গেইলে হাতের বামে লিফ্ট পাইবা, নয় নম্বও বাটন চাঁপ দিলে তুমি পেীছে যাইবা, এহন যাওগা।
মোহন পকেট থেকে রুমাল বের কার কপালের ঘাম মুছে। লিফটের নাম সে শুনেছে বড় বড় বিল্ডিংএ থাকে কিন্তু কোন দিন ওঠে নাই। ভেতরে ঢোকার পর যদি দরজা না খোলে? সে তো কোন দিন হাত দিয়েও দেখে নাই, কোন বাটনে চাঁপ দিলে কি হয়। তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে লিফটের কাছে যেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মনে মনে উপরে ওঠার সিঁড়ি খোঁজে, যতো উপরই হোক আর যতো কষ্টই হোক সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারবে।
মোহন হলরুমে এসে দেখে অন্যান্য চাকরি সন্ধানীরাও চলে এসেছে। যথা সময়ে তাদের পরীক্ষা শুরু হয়, এবং পরীক্ষা শেষে তাদের দুপুর দু’টায় ডাকা হয় ফলাফল দেখার জন্য।
যাহোক, দু’টো বাজতে এখনো অনেক দেরি, পেটের ভেতর টান পড়েছে হালকা একটা কিছু খেতে হবে। নিচে নেমে সে রাস্তার পাশে একটা টি স্টলে দাঁড়িয়ে কলা রুটি খেয়ে পরপর দু’গøাস পানি খেয়ে নেয়। আপাতত রাত পর্যন্ত আর পেটের ঝামেলা নেই। মোহন ভাবে লোক নেবে মাত্র পাঁচ জন, আর তারা পরীক্ষা দিলো পাঁশ’ জনের কম নয়। তাহলে কি তার সেখানে খবর থাকার কথা? আর উপরে যেয়েই বা কি হবে! তারপরও এতোদূর থেকে সে এসেছে এর শেষটা তো দেখা উচিৎ।
দু’টো বাজার আগেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। সিঁড়ির ঠিক ডান পাশেই নোটিশ বোর্ড ঝোলানো। পায়ের পাতার উপর ভর করে, দু’চার জনের ঘাড়ের উপর দিয়ে মাথা তুলে একবার নোটিশ বোর্ডের দিকে দৃষ্টি পড়তেই তার চোখ জ্বল-জ্বল করে ওঠে। নিজেকে বিশ্বাস করতে না পেরে অন্য একজন মধ্য বয়সী লোককে বলে- ভাই আমি দেখতে পাচ্ছিনা, প্রিজ আমার রোলটা একটা দেখেন তো আছে কি না।
লোকটা বোর্ডে তার রোলটা দেখে সেখান থেকে একটু দূরে এসে মোহনের দিকে ভালো করে তাঁকিয়ে দেখে বলে হ্যাঁ ভাই বোর্ডে তোমার রোল আছে।
জীবনের প্রথম পরীক্ষা-তার ভাগ্যের উপর এতোটা প্রাপ্তি সে আশা করে নাই। আনন্দে তার চোখে জল চলে আসে। তার খুব ইচ্ছে করছে আনন্দে একটা লাফ দিতে কিন্তু এখানে এতাগুলো লোকের মাঝে তার লজ্জা লাগছে।
কতো স্বপ্ন তার। মোটা বেতনে চাকরি হবে, বিছানায় শয্যাশায়ী মায়ের চিকিৎসা হবে, হ্যাণ্ডসাম ছেলের সঙ্গে বোনের বিয়ে হবে। তার স্বপ্নগুলো আজ সত্যি চতে চলেছে এর চেয়ে ভালো খবর আর কি হতে পারে?
সবাই চলে গেলে সেখানকার ভীড় অনেকটা কমে যায় এবার সে আস্তে আস্তে আবারও নোটিশ বোর্ডেও কাছে যায়, সেখানে বিশেষ দুষ্টব্য দিয়ে লেখা- যারা রিটেন পরীক্ষায় পাস করেছেন তাদেরকে ৯০১ নম্বও রুমে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
মোহন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কোন একজনকে পেলে সে ৯০১ নম্বর রুমটা কোন দিকে সেটা জিজ্ঞাসা করে নেবে। এমন সময় তার সামন দিয়ে সটকাট জামা ও উঁচু হিল পড়ে খট খট শব্দ করে একজন সদ্যযুবতী মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মোহন তাকে জিজ্ঞাসা করার জন্য দু’পা এগিয়ে যেতেই মেয়েটা তার দিকে তাঁকালো আর অমনি তার পরনের কাপর নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে মাথা নিচু করে থাকলো কিন্তু আগন্তক খটখটে মেয়েটা বুঝতে পেরেছে যে নিরিহ ছেলেটা তাকে কিছু একটা বলতে চায়। তাই সে মোহনের কাছে এসে বলে, এক্সকিউজ মি, আমাকে কি কিছু বলতে চাচ্ছেন ভাই?
এতোক্ষণে মোহনের মুখে যতোটুকু থুথু জমেছিলো তা দিয়ে একটা ঢোক গিলে মাথা উঁচু করে বলে, জী ম্যাডাম ঐ ৯০১ নম্বর রুমটা কোন দিকে?
মেয়েটা তার দিকে তাঁকিয়ে একটা মুচকি হেসে বলে- আচ্ছা আমার সাথে আসেন।
মোহন ৯০১ নম্বর রুমে যেয়ে দেখে, অনেকে সেখানে বসে আছে। তার মানে এরা সবাই পরীক্ষায় পাস করে পরবর্তী নির্দেশের অপক্ষোয় বসে আছে। ঘন্টাখানেক পর তার ডাক পড়লো। ভেতরে যেয়ে দেখে সেই উঁচু হিল ওয়ালা খটখটে মেয়েটি একটা মস্তবড় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।
মেয়েটি তার সম্পর্কে সবকিছু জানার পর বলে-আপনার মতো প্রতিভাবান ও নিরিহ ছেলে আমাদের খুব দরকার এ জন্য আমরা আপনাকে নিয়োগ পত্র দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আগামী দশ দিনের মধ্যে অর্থাৎ আমগামী ১লা আগস্ট, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। কোম্পানির নিয়োম অনুযায়ী আপনাকে একলক্ষ টাকা জমা দিয়ে কাজে যোগদান করতে হবে।
ওরে বাপরে! এক লক্ষ টাকা!- এক লক্ষ টাকা!- এক লক্ষ টাকা!
মোহনের মাথার ভেতর শুধু এটাই কালের ঘন্টার মতো ঢং-ঢং করে বাজতে থাকে। তার পায়ের তলা থেকে মাটিগুলো একটু একটু সরে যেতে থাকে।
তার চোখ দু’টো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে দৃস্টি শক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসে। অফিস থেকে বের হয়ে সে কমলাপুর রেইল স্টেশনের দিকে রওয়ানা হয়। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ছাড়বে রাত ন’টায় এখনো অনেক দেরি। তাই কমলাপুর বস্তির সামনে একটা ফাঁকা জায়গায় সে বসে পড়ে। তার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পাচ্ছে। সে মাটির দিকে তাঁকিয়ে দেখে একটা মস্তবড় লম্বা পিঁপড়ার সারি। তাদেরই কয়েকটা পিঁপড়া তার পায়ের উপর ওঠে আনন্দে নাচানাচি করছে। পেটের ক্ষুধায় তাদের কেউ কেউ আবার পায়ে কামড়ও দিচ্ছে বেশ জোরে সোরে। মোহন তাদের কিছুই বলে না, কারণ পিঁপড়ে হলেও তারা প্রাণী, তাদেরও কষ্ট আছে, সুখ-দুঃখ আছে, আনন্দ-বেদনা আছে। তার পায়ের উপর উঠে নাচা-নাচি করে তারা যে আনন্দ পাচ্ছে সেটা থেকে বঞ্চিত করার কি দরকার আছে?
এমন সময় পিছন থেকে একটা গাড়ির শব্দ তার কানে আসে সে পিছন ফিরে তাঁকিয়ে দেখে ওটা একটা পুলিশভ্যান। আর না, সে কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশগুলো তার চোখ বেঁধে ফেলে, পাঁজা কোলা করে গাড়িতে তুলে নেয়। তারপর সে অনুভব করে তার পাগুলো উপরে কিছু একটার সাথে আটকিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে আর মাথাটা নিচের দিকে। তারা কোন কথা না বলে শুধু বেধপ পেটাচ্ছে। আঃ উঃ শব্দ করার সময়ও দিচ্ছে না। যতক্ষণ তার জ্ঞান ছিলো সে শুধু তাদের বলতে শুনেছে, এরা কাল সাপ, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। একে জ্যান্ত ছেড়ে দিলে আবার কালকে একহাজার ছেলেকে জোটাবে, আবার মিছিল নিয়ে আন্দোলন করবে। সাপ মেরে লেজে বিষ রাখতে নেই, একে মেরে ফেলে দিয়ে এসো।
তারপর থেকে দিন কিংবা রাত, বাঁচা কিংবা মরা এসবের মধ্যে কোন তফাত নেই আমার। আমার শরীর অচেতন থাকলেও সৃস্টিকর্তা দিব্যকর্ণ সক্রিয় করে তুলেছিলো। তাই পিঁপড়েদের কথা স্পষ্ট বুঝা যেতো। যখন একটু আধটু বোধ আসে তখন অনুভব হয় একটি অভদ্র উশৃঙ্খল পিঁপড়ার দল তার গোটা শরীরের উপর উঠে আনন্দে নাচানাচি শুরু করে। তাদের নতুন প্রজন্ম যারা এখনও মনুষ্যদেহের লোভনীয় স্বাদযুক্ত অঙ্গ চোক্ষু, কর্ণ, ঠোঁট এখনও ভক্ষণের সুযোগ পায় নাই, তাদের খবর দিয়ে নিয়ে আসা হয় সে সুযোগ গ্রহণ করার জন্য। আমি পিঁপড়েদের নতুন প্রজন্মের প্রতি কৃতজ্ঞ এ কারণে যে, মৃত লাস ভেবে পুলিশ যখন আমাকে ময়লার স্তুপে ফেলে দিয়ে যায়, আমি যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি, তারাই আমার স্পর্শকাঁতর অঙ্গে কামড় দিয়ে সজ্ঞান করে তোলে। পুলিশের লাঠির আঘাতে যে দেহের ভেতর রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যে ব্যথার সুষ্টি হয়, পিঁপড়ে, সাপ, বিচ্চু কামড়ে সেই ব্যথাগুলোকে চুষে নেয়। ফলে আমার জ্ঞান ফিরে আসে।
অভাবনীয়ভাবেই আমি লোকচক্ষুর অন্তরালে মরলাম। আমার মৃত্যুটা কিভাবে হলো কেউ কোন দিন জানতেই পারবেনা। কি দুর্ভাগ্য মুত্যু আমার! আমার শয্যাশয়ী মা, আদরে ছোট বোন কোন দিন হুদিশও পাবে না আমি মরে গেছি নাকি বেঁচে আছি। মাত্র কয়েকটি ঘন্টার ব্যবধান আমার দেহের স্পন্দনে সজীব কোষগুলো নেচেনেচে পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনার নীরব স্বাক্ষী হিসেবে জানান দিত আর এখন রাত্রির আঁধারে ভ’তের ন্যায় দুর্লভ অমানিসায় মৃত্যুকে বরণ করে।
যে পথের ভিক্ষারিনীকে আমি কোন দিন দেখিনি, আপন করে ভালো বাসিনি, সে আমার নিথর দেহটাকে তুলে নিয়ে, পুলিশের ভয়ে স্নেহের আঁচলের তলে সেবা শ্বশ্রুষা করে মৃতপুরীর সেই ভয়ঙ্কর জমদূতের হাত থেকে ছিনিয়ে আনে। আহা কি মাতৃ স্নেহ, মায়ের কি উদার ভালোবাসা, মৃতপুরীর সেই ভয়ঙ্কর জমদূত যখন আমাকে নিয়ে ভীষণ টানা-হ্যাচড়া করে ভিক্ষারিনী মা আমার পাশে বসে অঝোরে কাঁদে।
একদিকে ভিক্ষারিনী মা অন্যদিকে মৃতপুরীর জমদূত হাসপাতালের বিছানায় পুলিশের তল্লাশি। সেদিন সন্ধ্যার আজান কানে আসছিলো, হঠাৎ কালো গাড়ির ভেতর থেকে পুলিশ নামক হায়েনারা হাসপাতালের চারিদিকে ঘিরে ফেলে তারপর কি ঘটে যার বর্ণনা কোন মানবজাতিকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ সেগুলো কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাজ হতে পারে না। আমি আমার নিথর দেহটাকে নিয়ে বাথরুমে পড়ে আছি। প্র¯্রাব পায়খানার গন্ধও যে মাঝে মধ্যে আগর বাতির সুবাস ছড়ায় সেটা আমি ছাড়া বোধয় আর কেউ জানে না। এভাবে বাথরুমে কতক্ষণ পড়েছিলাম জানি না, জেগে উঠে দেখি আমি আমার ভিক্ষারিনী মায়ের বস্তিতে সেই স্বর্গীয় ঝুপড়ির তলে।
এখন আমার হাত পা অবস হয়ে থাকরেও অন্যান্য অঙ্গগুলো বেশ সবল।
সকাল দুপুর যদিও বোঝা আমার সাধ্যেও বাইরে তবুও রাতের আঁধার কেটে যাওয়ার ঠিক কতক্ষণ হলো এতোটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়না। আমার ধারণা সেদিন দুপুরের আগেই হবে হঠাৎ মা আমার মাথাটা কোলে নিয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠে। আমার নাকের কাছে হাত দিয়ে কি যেন বোঝার চেষ্টা করে। বাহিরে আমি প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছিলাম, তার সাথে অসংখ্য নারী ও শিশুর কান্নার আওয়াজ যেন এক বিভিশিকাময় অবস্থার সুষ্টি হয়। মা আমাকে শুইয়ে দিয়ে আবার দৌড়ে বাহিওে যায়। আমিতো মরেই গেছি, আর যেন কেউ না মরে মা হয়তো তাদেও বাঁচাতে গেছে। সত্যি আমি মরে গেলাম, চোখ খুলেই মরে গেলাম। আমার মায়ের ঝুপড়ির চারিদিকে খড়ের বেড়া তার ফাঁক দিয়েই দিনে সূর্যের আলো আর রাতে চাঁদের জোৎস্না আসে।
আমি সেই সূর্য আর চাঁদের আলো দেখে দেখে মরলাম। আঃ কি ভয়ঙ্কও সুন্দর সে মৃত্যু। মৃত্যুর মাঝেও একটা চন্দময় সুর থাকে আমি সেই সুর শুনতে পাচ্ছি।
আমার সেই পরমাত্মীয় নতুন প্রজন্মের পিঁপড়ারা চুপটি করে বসে নেই। তারা স্বজাতি-বিজাতি কাউকেও আমার মৃত দেহের খবর দিতে বাদ রাখেনি। কুকুর-শিয়াল-শকুন সবাই পরস্পরের শত্রতা ভুলে আমার দেহের পাশে এসে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আমার ভিক্ষারিনী বৃদ্ধা মা তার স্নেহের আঁচল তলে আমাকে লুকিয়ে রাখলো। অবশেষে চারিদিকে ভোরের আলো ফুটিলো, পাখিরা তাদের অন্ধকার বাসা ছেড়ে আলোয় ফিরে ডাকাডাকি শুরু করে দিলো। মৃতপুরীর জমদূত আমাকে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়ে চরম ধিক্কার জানিয়ে বিদায় নিল।
আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলাম। কিন্তু হাত পায়ে কোন বল নেই। তবুও মনের জোরে শরীরের সমস্ত শক্তিকে এক জায়গায় জরো করে হাত দুটোকে নড়ানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছি। তারপর একদিন শুনলাম স্বৈরাচার সরকার পতনের আন্দলনে আমার মতো আরোও পনেরো-ষোল শত নিরিহ তরুণ-যুবক প্রাণ দিয়েছে। হয়তো মৃতপুরীতে জায়গা কম থাকায় জমদূত আমার মতো ভাগ্যহতকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now