বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি ও আমরা ক'জন (১০)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১৮৪ পয়েন্ট)



X যখন আমাদের ক্লাসে ভর্তি হল সম্পূর্ণ অন্যরকম একজন যার কারণে আমাদের পুরো ক্লাসটাই হয়ে গেল একটু অন্যরকম আমরা ক্লাসে বসে আছি, বাংলা স্যার রোল কল শেষ করে বইটা হাতে নিয়েছেন তখন আমরা দেখতে পেলাম করিডোর ধরে নতুন ম্যাডাম হেঁটে আসছেন। তার পিছনে একজন মানুষ আর মানুষটার পিছনে একটা মেয়ে। মেয়েটা নিশ্চয়ই একটু নেকু টাইপের, এতো বড় হয়েছে কিন্তু এখনো তার আব্বুর হাত ধরে হাঁটছে। নতুন ম্যাডাম আমাদের ক্লাসের দরজার পাশে দাঁড়ালেন, বললেন, “আমরা ভেতরে আসতে পারি?” বাংলা স্যার মাথা ঘুরিয়ে নতুন ম্যাডাম, তার সাথে বাবা আর মেয়েকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন, “আসেন। আসেন।” নতুন ম্যাডাম, বাবা আর সেই মেয়েটি ক্লাসে এসে ঢুকল। মেয়েটা এখনো তার বাবার হাত ধরে রেখেছে। খুব সুন্দর কাপড় পরে আছে, দেখে মনে হল একটু অহংকারী। কেউ নতুন জায়গায় এলে চারিদিকে তাকায়, সবাইকে লক্ষ করে–এই মেয়েটা সেরকম কিছুই করল না, কেমন জানি সোজা সামনে তাকিয়ে রইল। নতুন ম্যাডাম আমাদের সবাইকে মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখলেন, তারপর বললেন, “তোমাদের ক্লাসে একজন নতুন ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। আমি তাকে নিজে নিয়ে এসেছি। সাথে তার বাবাও আছেন।” ।বাবা তখন একটু হাত নেড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন। ম্যাডাম বললেন, “ছাত্রীটির নাম মাইশা হাসান। ডাকনাম আঁখি। আঁখি তোমাদের দশজনের থেকে একটু অন্যরকম। আমি ইচ্ছে করলে আগে থেকে তোমাদের সেটা জানাতে পারতাম-ইচ্ছে করে জানাইনি। তোমাদের ক্লাসে তোমরা আঁখিকে ঠিকভাবে গ্রহণ কর।” আমরা ম্যাডামের কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারলাম না। তাকে দেখে মোটও অন্যরকম মনে হচ্ছে না-বাড়তি হাত-পা নেই একেবারে স্বাভাবিক। ক্লাসে ভর্তি হয়েছে সে আর দশজনের মতো ক্লাস করবে–তাকে আবার গ্রহণ করব কেমন করে? তার গলায় কি ফুলের মালা দিতে হবে? না কি তার জন্যে গান গাইতে হবে? নতুন ম্যাডাম মেয়েটার বাবাকে নিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। বাংলা স্যার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, মেয়েটাও ক্লাস রুমের দিকে তাকিয়ে রইল। স্যার গলা খাকারি দিয়ে বললেন, “যাও। বস।” মেয়েটা বলল, “কোথায়?” শান্তা একটু সরে তার পাশে জায়গা করে দিয়ে বলল, “এইখানে।” মেয়েটা তার ব্যাগটা খুলে সাদা মতো কী একটা বের করল, সেটা ছেড়ে দিতেই খুলে একটা সাদা লাঠি হয়ে গেল। মেয়েটা সেই লাঠিটা মেঝেতে লাগিয়ে ডানে-বামে একটু নাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে শান্তার বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল এবং তখন হঠাৎ করে আমরা সবাই বুঝতে পারলাম এই মেয়েটা চোখে দেখতে পায় না। নিজের অজান্তেই আমরা সবাই একটা চাপা শব্দ করলাম। করলাম এই মেয়েটা খুব শান্ত ভঙ্গিতে এসে শান্তার পাশে বসে পড়ল, তারপর হাতের সাদা লাঠিটা ভাজ করে তার ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো কিছু দেখছে না কিন্তু তাকিয়ে আছে, কী আশ্চর্য! বাংলা স্যারও কেমন যেন অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমরা যেরকম জানি না এই স্যারও জানেন না–তাই খানিকক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করে বললেন, “তু-তু-তুমি অন্ধ?” মেয়েটা বলল, “আমি চোখে দেখতে পাই না।” কথা শুনে মনে হল অন্ধ আর চোখে দেখতে না পাওয়া দুটি পুরোপুরি ভিন্ন জিনিস। উচ্চারণটা খুব সুন্দর মনে হয় কেউ টেলিভিশনে খবর পড়ছে। বাংলা স্যার বললেন, “তুমি যদি চোখে না দেখো তা হলে পড়ালেখা করবে কেমন করে?” “ব্রেইল বই পাওয়া যায়।” “কী বই?” “ব্রেইল। হাত দিয়ে ছুঁয়ে পড়তে হয়।” “পরীক্ষা? পরীক্ষা দিবে কেমন করে?” “আমি বলব আর একজন লিখে দেবে।” স্যারের মুখে বিদঘুটে একটা হাসি ফুটে উঠল, “খ্যাঁক” ধরনের একটা শব্দ করে বললেন, “ধুর। এইভাবে লেখাপড়া হয় না কি! আর তোমার লেখাপড়া করে কী লাভ? তুমি কী ডাক্তার হবে না ইঞ্জিনিয়ার হবে? ভালো মানুষেই চাকরি পায় না কানা ল্যাংড়া লুলা মানুষকে কে চাকরি দিবে?” আমি তখন বুঝতে পারলাম কেন নতুন ম্যাডাম গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন। বাংলা স্যার যেটা করছেন সেটা যেন না হয় সেইটাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। যেটা করার কথা না বাংলা স্যার ঠিক সেইটাই করছেন। তাকে কেমন করে থামানো যায় বুঝতে পারলাম না। স্যার মনে হল আরো নিষ্ঠুর হয়ে গেলেন, হাত-পা নাড়িয়ে বললেন, “চোখ হাত-পা ঠ্যাং আছে এরকম ছেলেমেয়েদের পড়াতেই আমার জান তামা হয়ে যায় এখন যদি চোখ হাত-পা ঠ্যাং নাই কানা ল্যাংড়া আঁতুড়কে পড়াতে হয় তা হলে আমি কেমন করে পড়াব? আমার কি এতো সময় আছে?” আমরা সবাই দেখলাম নতুন মেয়েটার দুই গাল লজ্জায় অপমানে লাল হয়ে উঠল। আমাদেরও মনে হল লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাই। স্যার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “বোবা কালা অন্ধদের স্পেশাল স্কুল আছে না?” মেয়েটা মাথা নাড়ল, “আছে।” “তুমি সেই স্কুলে পড় না কেন?” “আমি সেইরকম স্কুলেই পড়তাম। কিন্তু—” ”কিন্তু কী?” “এখন সারা পৃথিবীতেই সব রকম প্রতিবন্ধীদের সাধারণ স্কুলে পড়ানোর চেষ্টা করা হয়। সেই জন্যে–” বাংলা স্যার কেমন যেন খেপে উঠলেন, বললেন, “সেই জন্যে এইটা আমাদের স্কুলে শুরু করতে হবে? যতরকম পাগলামি-ছাগলামি সব এই স্কুলে? সব ঝামেলা আমাদের উপর? আমাদের আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই?” স্যার একটা নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমি যখন ক্লাসে পড়াব তুমি সেটা কেমন করে ফলো করবে?” “আমি সেটা শুনতে পাই। তা ছাড়া আমি রেকর্ড করি–” “কী কর?” “আমার একটা ক্যাসেট প্লেয়ার আছে, আমি সেটাতে সবকিছু রেকর্ড করি।” বাংলা স্যার এবারে কেন জানি একটু থতমত খেয়ে গেলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “বেকর্ড কর?” “হ্যাঁ।” “আমি যখন ক্লাস নেওয়া শুরু করব তখন তুমি রেকর্ড করা শুরু করবে?” “আমি ক্লাসে আসার পরই রেকর্ড করা শুরু করেছি।” বাংলা স্যার এবারে কেমন যেন নার্ভাস হয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, “ইয়ে মানে আমি এতক্ষণ যা যা বলেছি সব রেকর্ড হয়ে গেছে?” “জি স্যার।” মেয়েটা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, তারপর বলল, “আসলে স্যার আমি এই স্কুলে আসতে চাইনি। আমি আমাদের স্কুলেই খুব ভালো ছিলাম। কিন্তু ডক্টর রাইসা জোর করলেন তাই এসেছি। রাইসা ম্যাডাম বলেছেন ছয় মাস দেখতে। যদি ছয় মাসে ঠিকভাবে কাজ না করে তা হলে আমার স্কুলে ফিরে যাব।“ মেয়েটা তার ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা ছোট লাঠিটা বের করল, ছেড়ে দিতেই সেটা লম্বা হয়ে গেল। লাঠিটা মেঝেতে ছুঁইয়ে সে বলল, “স্যার আসলে ছয় মাস লাগবে না, আমি কিছুক্ষণেই বুঝে গেছি এটা কাজ করবে না। আপনি যদি অনুমতি দেন তা হলে আমি যাই।” বাংলা স্যার আমতা আমতা করে বললেন, “আর ইয়ে-মানে রেকর্ডিং-” “সেটা শুনলে কেউ আর আমাকে জোর করবে না।” মেয়েটা তার ব্যাগটা নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আমার আব্বু নিশ্চয়ই এখনো চলে যান নাই।” মেয়েটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সরি যে আমার জন্যে তোমাদের এতো সময় নষ্ট হল। প্লীজ তোমরা কিছু মনে কোরো না।” মেয়েটা যখন ঠিক দরজার কাছে গিয়েছে তখন আমার কী হল কে জানে আমি তড়াক করে লাফ দিয়ে বললাম, “দাঁড়াও।” আর কী আশ্চর্য, পুরো, ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, “দাঁড়াও। দাঁড়াও!” রিতু, শান্তা আর মামুন মেয়েটার দিকে ছুটে গেল। রিতু খপ করে মেয়েটার হাত ধরে বলল, “না তুমি যেতে পারবে না। তুমি আমাদের সাথে পড়বে।” শান্তাও তাকে ধরে ফেলল, বলল, “হ্যাঁ পড়বে। আমাদের সাথে পড়বে। তোমাকে আমরা যেতে দেব না।” ক্লাসের ছেলেমেয়েরা হুড়মুড় করে ছুটে যেতে থাকে, চারিদিক দিয়ে মেয়েটাকে ঘিরে ফেলল, সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করে বলতে লাগল, “যেতে দেব না। যেতে দেব না। আমাদের সাথে পড়তে হবে। পড়তে হবে।” আমি খুব কাছে থেকে মেয়েটার দিকে তাকিয়েছিলাম, মেয়েটার চোখ দুটো কী সুন্দর, একেবারে ঝকঝক করছে, কিন্তু সে এই চোখ দুটো দিয়ে তাকাতে পারে কিন্তু দেখতে পারে না। আমি দেখলাম তার চোখ দুটোতে পানি টলটল করছে, সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংকু। তোমাদের অনেক থ্যাংকু।” মেয়েটা হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু ছেলেমেয়েরা তাকে আটকে রাখল, রিতু বলল, “আমরা তোমাকে যেতে দেব না। তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, আমরা তোমার সবকিছুতে সাহায্য করব। তোমার কোনো সমস্যা হবে না।” শান্তা বলল, “আমরা তোমার পাশে বসব, স্যারেরা বোর্ডে কিছু লিখলে সেটা তোমাকে পড়ে শোনাব।” সুজন বলল, “পরীক্ষার সময় তুমি বলবে আমি লিখে দিব।” মেয়েটা বলল, “কিন্তু আমি তো এখানে থাকতে পারি না।” সবাই একসাথে চিৎকার করে বলল, “কেন? কেন পার না?” “তোমরা তো জান কেন পারি না। তোমরা তো দেখেছ, শুনেছ। তোমরাই বল, এরপর আমি কি এখানে থাকতে পারি? থাকা উচিত?” আমরা কী বলব বুঝতে পারলাম না। আমাদের মাঝে রিতু সবচেয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারে সবাই তার দিকে তাকালাম, তখন রিতু মেয়েটার হাত ধরে বলল, “কিন্তু তুমি আমাদের কথাটা একটু ভাববে না? তুমি যদি আজকে চলে যাও সারাটা জীবন আমাদের মনে কষ্ট থাকবে যে তোমার মতোন একটা সুইট মেয়েকে আমরা আমাদের ক্লাসে রাখতে পারিনি। বল, তুমি কি একজনের জন্যে আমাদের সবার মনে সারা জীবন কষ্ট দিবে? বল?” মেয়েটা কোনো কথা বলল না। আমার মনে হল রিতুর পা ধরে সালাম করে ফেলি, রিতুর মতোন পুঁচকে একটা মেয়ে এতো সুন্দর করে কথা বলা শিখল কেমন করে? সুজন গলা নামিয়ে বলল, “দরকার হলে তুমি থাকবে। আমরা ঐ স্যারকে বিদায় করে দিব।” অনেকেই সুজনের কথা শুনে মাথা নাড়ল, মাসুম বলল, “আমার কানের পর্দা ফাটিয়েছিলেন মনে নাই? এতোদিন কিছু বলি নাই, এখন দরকার হলে হাইকোর্টে মামলা করে দিব।” বাংলা স্যার একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না, ঠিক কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। আমতা আমতা করে বললেন, “ইয়ে মানে তোমরা সবাই নিজের জায়গায় গিয়ে বস–” আমরা নিজের জায়গায় বসার কোনো আগ্রহ দেখালাম না, মেয়েটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমাদের ক্লাসের হট্টগোল শুনে পাশের ক্লাস থেকে স্যার আর ম্যাডামরা বের হয়ে এলেন, ছাত্রছাত্রীরা উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল। তখন রিতু আর শান্তা মেয়েটাকে দুই পাশ থেকে ধরে রীতিমতো টেনে ক্লাসের ভেতর ফিরিয়ে আনল। বাংলা স্যার তার শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বললেন, “ব্যস অনেক হয়েছে। এখন সবাই চুপ কর। চুপ।” আমরা চুপ করলাম না, ক্লাসের ভেতরে নিজেদের ভিতরে গুনগুন করে কথা বলতে লাগলাম। স্যার আবার দুর্বল গলায় বললেন, “চুপ।” কিন্তু কেউ চুপ করল না। তখন রিতু উঠে দাঁড়াল, বলল, “স্যার।” সাথে সাথে সারা ক্লাস চুপ করে গেল। স্যার একবার ঢোক গিলে বললেন, “কী হয়েছে?” “আজকে আমাদের সাথে একজন নতুন ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। স্যার সে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছিল। আমরা অনেক কষ্ট করে তাকে ফিরিয়ে এনেছি।” “তাতে কী হয়েছে?” “আমরা চাই না সে মন খারাপ করে থাকুক।” ক্লাসের অনেকেই মাথা নাড়ল। বলল, “জি স্যার, চাই না।” “তা হলে কী করতে হবে?” “আমরা স্যার নিরিবিলি তার সাথে কথা বলতে চাই।” স্যার একবার ঢোক গিললেন, “নিরিবিলি?” রিতু মাথা নাড়ল, বলল, “জি স্যার। আমরা আমরা নিজেরা। আপনি স্যার এই পিরিয়ডটা ছুটি দিয়ে দেন।” “ছুটি?” স্যার চোখ কপালে তুলে বললেন, “ছুটি?” আমরা সবাই বললাম, “জি স্যার ছুটি।” স্যার এবারে কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন, তখন সুজন দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার আপনি যদি চান তা হলে আমরা হেড ম্যাডামের কাছ থেকে পারমিশান আনতে পারি। ক্লাসে কী হয়েছে সেটা বললেই ম্যাডাম নিশ্চয়ই রাজি হবেন–” স্যার এবারে কেমন যেন খাবি খাওয়ার মতো ভান করলেন, বললেন, “না-না তার দরকার নাই। আ-আমি ছুটি দিচ্ছি। কিন্তু তোরা ক্লাসে কোনো গোলমাল করতে পারবি না।” আমরা সবাই একসাথে চিৎকার করে প্রচণ্ড গোলমাল করে বললাম, “করব স্যার। গোলমাল করব না।” স্যার হাত তুলে বললেন, “আস্তে আস্তে!” তারপর টেবিল থেকে রেজিস্টার খাতা, বই, চক আর ডাস্টার নিয়ে বের হয়ে গেলেন। আমরা তখন আরো একবার আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম। স্যার ক্লাস থেকে বের হওয়া মাত্রই রিতু ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “সবাই চুপ। কোনো গোলমাল করবি না।” আমরা এবারে চুপ করে বসে পড়লাম, রিতু তখন মেয়েটার কাছে গিয়ে তার হাত ধরে সামনে নিয়ে আসে। তারপর বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলল, “প্রিয় ভাই ও বোনেরা। আজকে আমাদের সাথে একজন নতুন ছাত্রী পড়তে এসেছে। আরেকটু হলে সে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছিল। আমরা অনেক কষ্ট করে তাকে ফিরিয়ে এনেছি। আমরা এখন আমাদের এই নতুন বন্ধুকে আমাদের উদ্দেশে কিছু বলতে বলব।” মেয়েটা কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল, বলল, “বলব? আমি?” ‘“হ্যাঁ।” “কী বলব?” “তোমার যেটা ইচ্ছা।” “আমি কখনো এভাবে কিছু বলি নাই। আমি কিছু বলতে পারব না।” “পারবে। পারবে।” আমরা টেবিলে থাবা দিয়ে বললাম, “শুরু কর।” মেয়েটা একটু ইতস্তত করে তখন শুরু করল, “ইয়ে মানে আমার নাম হচ্ছে–মাইশা হাসান। আমার ডাকনাম হচ্ছে আঁখি।” মেয়েটা একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, “আঁখি মানে হচ্ছে চোখ। আমার আব্লু-আম্মু যদি আগে জানত তা হলে আমার মনে হয় কখনোই আমার নাম আঁখি রাখত না। অন্য কিছু রাখত।” সুমি সাধারণত কথা বলে না, হঠাৎ করে সে বলল, “তোমার চোখগুলো দেখতে খুব সুন্দর। আঁখি নামটা মনে হয় ঠিকই আছে।” সুজন বলল, “তোমার চোখ তো এক্কেবারে ঠিক আছে। তুমি সত্যি দেখতে পাও না?” “না।” “একটুও না? হালকা হালকা?” “না।” “খুব দামি চশমা কিনে দিলে-” আঁখি হেসে ফেলল, বলল, “আমার চোখের সবকিছু ঠিক আছে। যেটা নষ্ট হয়েছে সেটা হচ্ছে অপটিক নার্ভ। রেটিনা থেকে কোনো সিগন্যাল ব্রেন পর্যন্ত যায় না। সেই জন্যে আমি কিছু দেখি না।” “কোনো চিকিৎসা নাই?” “যেটুকু ছিল করা হয়েছে। লাভ হয়নি।” ক্লাসের সবাই জিব দিয়ে চুকচুক শব্দ করল, কেউ নিশ্বাস ফেলল, যাদের মায়া বেশি, তারা বলল, “আহারে।” আঁখি হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে ওঠে, সে মুখ তুলে বলল, “তোমরা আমার জন্যে কিছু একটা করতে চাইছ?” আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ।” “আমি কী চাই, তোমাদেরকে বলব?” “বল।” “আমি চাই তোমরা সবাই ভুলে যাও যে আমি চোখে দেখতে পাই না। আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা অন্ধ অথবা রাইড। আমি চাই তোমরা আমাকে অন্য আরেকজনের মতো নাও! আমি চাই তোমরা কেউ আমার জন্যে আলাদা করে কিছু না কর–” শান্তা জিজ্ঞেস করল, “তা হলে তোমার ঝামেলা হবে না?” “হবে। অনেক ঝামেলা হবে। অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু যখন কেউ আমাকে মায়া করে, আমাকে দেখে দুঃখ পায়, আহা উঁহু করে তখন আমার আরো অনেক বেশি কষ্ট হয়।” আমরা সবাই চুপ করে বসে রইলাম, এরকম একটা ব্যাপার থাকতে পারে আমরা কখনোই চিন্তা করিনি। কেন জানি ধরেই নিয়েছিলাম সবসময়ই বুঝি সবাইকে গায়ে পড়ে সাহায্য করতে হয়। কখনো কখনো কাউকে সাহায্য না করাটাই হচ্ছে তাকে সাহায্য করা। কী আশ্চর্য! রিতু বলল, “ঠিক আছে আঁখি, আমরা সবাই ভুলে যাব যে তুমি চোখে দেখতে পাও না! আমরা সবাই সবসময় তোমার সাথে এমন ব্যবহার করব যেন তুমি আমাদের মতো একজন!” “ভেরি গুড। থ্যাংকু।” “ঠিক আছে।” রিতু সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা সবাই ভুলে যা। ওয়ান টু থ্রি!” আমরা সবাই বললাম, “ওয়ান টু থ্রি।” তারপর ভান করলাম আমরা ভুলে গেছি। রিতু তখন আঁখির দিকে তাকিয়ে বলল, “আঁখি, তুমি আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছ এখন তোমার এই ক্লাসের ছেলেমেয়ের সাথে পরিচয় হওয়া দরকার। সবার আগে আমার সাথে পরিচয় হোক। আমাকে দেখছ?” আঁখি বলল, “দেখছি।” “বল দেখি আমি দেখতে কী রকম?” “তুমি কালো এবং মোটা এবং তোমার নাকের নিচে ছোট ছোট গোঁফ।” আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম, রিতু হাসল সবচেয়ে বেশি এবং হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। সুজন দাঁড়িয়ে বলল, “আমি কী রকম?” “তোমার মাথা ন্যাড়া। তোমার গলায় সোনার চেন।” সুজনের সাথে সাথে আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম। শান্তা বলল, “আমি?” “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার নাকের উপর দিয়ে একটা ট্রাক চলে গিয়েছে–তাই নাকটা চ্যাপ্টা।” আমরা সবাই হি হি করে হাসতে লাগলাম তখন রিতু আবার আমাদের থামাল, বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। আঁখি যে খুবই ভালো দেখতে পায় সেটা নিয়ে এখন আমাদের কারো কোনো সন্দেহ নেই। এখন তোমার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এই যে আমি, কালো মোটা এবং নাকের নিচে গোঁফ আমার নাম হচ্ছে রিতু। মনে থাকবে? রি-তু।” “মনে থাকবে।” শান্তা বলল, “আমার নাম শান্তা।” সুমি বলল, “আমার নাম সুমি।” সুজন বলল, “আমার নাম সুজন।” এভাবে সবাই তার নাম বলল আঁখি খুব মনোযোগ দিয়ে নামগুলো শুনল। আমি যখন বললাম, “আমার নাম তিতু।” তখন সবাই চিৎকার করে বলতে লাগল, “তিতা তিতা।” আঁখি তাদের চিৎকারে কান দিল না, বলল, “তিতু।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫৯ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...