বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লোকটাকে বাঁধার জন্যে দড়ি নেই, তাই শার্টগুলো খুলে পাকিয়ে দড়ির মতো করে নেয়া হল। শীতের রাত, কিন্তু উত্তেজনায় কেউ শীতটুকু টের পাচ্ছে না। রওনা দেবার আগে সাজ্জাদ সবার বুকে কুলহু আল্লাহ্ পড়ে ফু দিয়ে দিল।
জঙ্গল থেকে ওরা সাবধানে বের হয়ে এল। মিঠু চলে গেল লোকটার সামনে দিকে, অন্যেরা পেছনে। তারপর খুব আস্তে আস্তে লোকটাকে ঘিরে ওরা এগিয়ে আসতে থাকে। দীপুর শুধু ভয় হচ্ছিল মিঠু না আবার বেশি আগে শেয়ালের ডাক দিয়ে দেয়। ওকে অবশ্যি বলে দেয়া হয়েছে, একটু পরে হলেও ক্ষতি নেই, আগে যেন না দেয়।
সবাই লোকটার হাত দুয়েকের ভেতরে পৌঁছে যাবার পর থামল। দীপু মাথা তুলে দেখল সবাই এসে গেছে, গুঁড়ি মেরে বসে অপেক্ষা করছে শেয়ালের ডাকের জন্যে। উত্তেজনায় বুক ধক্ করছে এক একজনের। কখন দূরে শেয়ালের ডাক শুনবে।
ঠিক তক্ষুণি ওরা শুনল কোথায় জানি শেয়াল ডেকে উঠল। মিঠু তার জীবনের সবচেয়ে ভাল ডাকটি দিল এবার। সবাই দেখল। লোকটি চমকে উঠল তারপর আবার ঠান্ডা হয়ে বসে রইল। ওরা মনে মনে গুনল এক দুই তিন—তারপর একসাথে গুলির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নয়টি ছেলে।
যত কঠিন হবে ভেবেছিল তার থেকে অনেক সহজ হল ব্যাপারটা। টান মেরে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল সবাই, হ্যাচকা টানে বন্দুকটা কেড়ে নিল দীপু। মিঠু চিৎকার করে বলল, খবরদার একটু নড়লেই জবাই করে ফেলব!
লোকটি এত ভয় পেয়েছিল যে বলার নয়, এত জোরে চিৎকার করে উঠেছিল যে দীপুর মনে হল হয়তো মরেই গেছে! দীপু বন্দুকটা হাতে নিয়ে বলল, সাবধান! ওকে ভাল করে বেঁধে ফেল; আমি যাচ্ছি।
দীপু ছুটে গেল কালাচিতার গর্তের মুখে। ভেতরে কে কম করছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু চিৎকার শুনে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ বের হয়ে আসবে, তা হলেই বিপদ হয়ে যাবে। দীপু সেজন্যেই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে এখানে। গর্তের মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, হ্যান্ডস আপ সবারই। বের হতে চেষ্টা করলে গুলি করে খুলি ফুটো করে দেব।
ভেতর থেকে তারিকের আনন্দধ্বনি শোনা গেল। শাবাশ দীপু কা বাচ্চা! জিন্দাবাদ!
ঘাবড়াস না তারিক। তোকে এক্ষুণি ছুটিয়ে আনব। পাহারাদারকে বেঁধে ফেলেছি লাটুর মত। ওদের দোনালা বন্দুকটা এখন আমার কাছে, কেউ বের হতে চাইলেই গুলি।
দীপু খুব ভুল বলেনি। লোকটাকে সবাই বেঁধে ফেলেছে তক্তার মত। ধরাধরি করে নিয়ে আসছিল সবাই। কিন্তু ক্রমাগত শাসিয়ে যাচ্ছে, যদি একটু নড়ার চেষ্টা করে তা হলেই নাকি জবাই করে ফেলবে। কী দিয়ে কে জানে?
দীপু চিৎকার করে বলল, নিয়ে আয় বান্দাকে এখানে। ভেতরে ফেলে দিই! সবই এক জায়গায় থাকুক।
সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। কালাচিতার ভেতরে লোকটাকে এভাবে ফেলা খুব সহজ হবে না, কিন্তু সব দিক দিয়ে নিরাপদ। বাঁধন খুলে ফেললেও বের হতে পারবে না।
দীপু চিৎকার করে বলল, গর্তের মুখে থেকে সরে যা তারিক, ভেতরে লাট্টু ফেলব।
ঠিক হায়। ছোড় দো লাটটু কো।
বেশি খুশি হলে তারিক বরাবরই উর্দুতে কথা বলে। ওরা সবাই ধরাধরি করে লোকটাকে গর্তের মুখে এনে ছেড়ে দিল। কীভাবে পড়বে সে নিয়ে মাথা ঘামাল না, এমন কিছু উঁচু নয়, একটু ব্যথা পেতে পারে, হাত পা ভাঙবে না।
এবারে মইটা বের করে আনব, তা হলেই সব শেষ। দীপু হাসিমুখে মইটা। টেনে ধরতেই নিচে থেকে বিদেশীটা ইংরেজিতে কী যেন বলে চেঁচিয়ে উঠল, সাথে সাথে ক্লিক করে একটা শব্দ হল আর তারিকের ভয় পাওয়া চিৎকার শোনা গেল।
দীপু ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তারিক?
পিস্তল। কাছে আসিস না খবরদার, গুলি করে দেবে।
দীপু টের পেল ভয়ে তার মেরুদন্ড দিয়ে ঠান্ডা কী একটা যেন বয়ে গেল। এটা সে চিন্তা করেনি। ভয়ে ওর সব চিন্তা গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। জোর করে নিজেকে শান্ত রাখল। এখন মাথা ঠান্ডা না রাখলে বিপদ হয়ে যাবে। ওদের পক্ষে ব্যাপারটা সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে, বড় মানুষ দরকার, থানায় খবর দিতে হবে।
ফিসফিস করে বলল, বিলু, এক দৌড়ে তুই থানায় যা, সর্বনাশ হয়ে যাবে এছাড়া।
বিলু মাথা নেড়ে বলল, থানার লোকজন যদি আমার কথা না শোনে?
শুনবে না মানে? শুনতে হবে। না হয় আমার আব্বাকে ডেকে নিয়ে যাস।
আচ্ছা। দীপুর আব্বাকে ওদের ক্লাসের সবাই চেনে, অনেকের সাথে খুব ভাল খাতির পর্যন্ত আছে। তিন-চার বার ওর আব্বার সাথে ওরা মাছ ধরতে গিয়েছিল মংলা বিলে।
আর কে যাবে বিলুর সাথে?
আরও কারও যেতে হবে না, দেরি হয়ে যাবে তা হলে। ঘাবড়াস না তোরা, আমি যাব আর আসব, বলে বিলু চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সত্যি সত্যি বিলুর সাথে আর কেউ গেলে দেরি হয়ে যেত। বিলু এত দৌড়াতে পারে যে বিশ্বাস করা যায় না। গত স্বাধীনতা দিবসে কুড়ি মাইল ম্যারাথন দৌড়ে বিলু নাম দিয়েছিল কাউকে না বলে। স্টেডিয়ামে যখন ওরা দেখল ঘেমে টেমে লাল হয়ে খালি পায়ে কুড়ি মাইল দৌড়ে হাজির হয়ে গেছে বিলু, ওরা এত অবাক হয়েছিল যে বলার নয়। এসেছিল অবশ্যি সবার শেষে, কিন্তু কুড়ি মাইল তো আর ঠাট্টা নয়! ডেপুটি কমিশনার নিজে তাকে একটা গোল্ড মেডেল দিলেন।
নিচে খুব উত্তেজিত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ওরা কিছু বুঝতে পারছিল না। তারিকও কিছু বলছে না, কী হচ্ছে না হচ্ছে কে জানে। দীপুর গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল ভয়ে।
নিচের হৈচৈ হঠাৎ থেমে গেল। পরিষ্কার বাংলায় একজন কথা বলে উঠল, উপরে যারা আছো শোনো। এই সাহেব খুব খেপে গেছে, দশ পর্যন্ত গোনার আগে বন্দুকটা নিচে ফেলে দাও, নইলে তোমাদের এই বন্ধুটিকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।
মুহূর্তে সবার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। দীপু কিছু চিন্তা করতে পারছিল না, সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। শুধু মনে হচ্ছিল ওর জন্যেই বুঝি তারিক মারা পড়তে যাচ্ছে। নিজেকে নিজে বোঝাল, মাথা ঠান্ডা রাখো, মাথা ঠান্ডা রাখো।
ওয়ান–
নিচে থেকে সাহেবের ভারী গলা শুনে ওপরের ওরা সবাই চমকে উঠল। বাবু। ভাঙা গলায় বলল, দীপু বন্দুকটা ফেলে দে। তাড়াতাড়ি।
টু—
তাড়াতাড়ি ফেল দীপু-বাবু এবারে একেবারে কেঁদে দিল।
দীপু তাড়াতাড়ি চিন্তা করার চেষ্টা করল, বন্দুকটা ফেলে দিলেই ওদের সব ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দশ পর্যন্ত গোনার আগেই বন্দুকটা ফেলে দিতেই হবে। হয়তো তারিককে মারবে না, শুধু ভয় দেখাচ্ছে, কিন্তু জানের ঝুঁকি কখনও নেয়া যাবে না।
তবু একটা চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?
থ্রী!
দীপু গলা পরিষ্কার কর বলল, শোনো! তোমরা আসলে আমাদের ভয় দেখাচ্ছ। তারিককে মারলে পালাতে পারবে কোনোদিন এখান থেকে? পুলিশ এসে কাঁক করে ধরবে, তারপর একেবারে ফাঁসি।
সাহেবটি ইংরেজিতে কী বলল, বোধকরি জানতে চাইল দীপু কী বলছে। সাথের লোকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতেই সাহেবটি আবার রেগেমেগে কি যেন বলল। লোকটি তখন বাংলায় বলল, সাহেব জিজ্ঞেস করছে, তোমরা কি দেখতে চাও খামোকা ভয় দেখাচ্ছে না সত্যি বলছে?
দীপু তাড়াতাড়ি বলল, না।
তা হলে বন্দুকটা ফেলে দাও।
ফেলছি, তার আগে আমাদের কথা শোনো।
কোনো কথা শুনব না, বন্দুকটা ফেলো।
শুনতে হবে।
শুনতে হবে, শুনতে হবে, শুনতে হবে, দীপু চিৎকার করে বলল, শুনতে হবে, এছাড়া বন্দুক ফেলব না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now