বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সবাই মিলে যখন কাত হয়ে থাকা স্কুলের দিকে তাকিয়ে আছেন তখন ভিড় ঠেলে একজন মানুষ এগিয়ে এলেন। মানুষটিকে দেখলে প্রথমেই যে-কথাটি বলতে হয় সেটা হচ্ছে যে মানুষটা মোটা। কোনো মানুষ যদি কানা খোঁড়া হয় কখনো তাকে কানা খোঁড়া বলতে হয় না। কোনো মানুষ যদি মোটা হয় তাকেও মোটা বলা ঠিক নয়, কিন্তু এই মানুষটিকে মোটা না বলে কোনো উপায় নেই। তাঁর হাত পা মোটা মোটা থামের মতো, তার বিশাল পেট উঁচু হয়ে আছে। তার বিশাল মুখে মোটা মোটা গাল চোখ নাক মুখ মনে হয় অনেক কষ্ট করে কোনোরকমে সেখানে টিকে আছে। মানুষটি একটু হাঁটলেই তার সারা শরীরের মেদ মাংস ভুড়ি থরথর করে কাঁপতে থাকে। মানুষটি ভিড় ঠেলে সামনে এসে হাঁপাতে লাগলেন। মানুষটি এত মোটা যে তার এই বিশাল শরীর নিয়ে একপা হাঁটা শুকনো পাতলা একজন মানুষের দুই মাইল দৌড়ে আসার সমান। খানিকক্ষণ বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে মোটা মানুষটি বললো, “এখানে ফরা ভাই ফারু ভাই আর হারু ভাই কে?”
ফরাসত আলি বললেন, “আমি ফরাসত আলি।”
ফারুখ বখত বললেন, “আম ফারুখ বখত।”
হারুন ইঞ্জিনিয়ার বললেন, “আমি হারুন ইঞ্জিনিয়ার।”
মোটা মানুষটি বড় বড় দুইটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমার নাম মির্জা মাস্টার।” কথাটি বলেই তাঁর নিঃশ্বাস ফুরিয়ে গেল, তিনি মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন।
ফারুখ বখত জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কিসের মাস্টার?”
“বাচ্চাদের। আমি বাচ্চাদের পড়াই।”
“কোথায় পড়ান?”
“স্কুলে।”
”কোথায় স্কুল?”
“স্কুল নেই।”
“স্কুল নেই? ফারুখ বখত অবাক হয়ে বললেন, বুঝতে পারলাম না, আপনি স্কুলে পড়ান, কিন্তু আপনার স্কুল নেই?”
“ছিল। স্কুল ছিল। গতরাতে ঝড়ে উড়ে গেছে।”
ফরাসত আলি বললেন, “গতরাতে তো বেশি বড় ঝড় হয়নি! এই ঝড়ে স্কুল উড়ে গেল?”
মির্জা মাস্টার তখন একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন, “খুব দুর্বল স্কুল ছিল। বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে উপরে একটা ছাউনি। আমি জোরে একটা হাঁচি দিলে স্কুল উড়ে যায় সেরকম অবস্থা।”
একসাথে অনেকগুলি কথা বলে ফেলে মির্জা মাস্টার মুখ বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন।
হারুন ইঞ্জিনিয়ার চশমা খুলে কাঁচটা খুব মনোযোগ দিয়ে খানিকক্ষণ পরিষ্কার করে বললেন, “কীরকম স্কুল আপনার?”
“গরিব বাচ্চাদের। যেসব বাচ্চাকাচ্চা রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়, মিনতি টোকাইয়ের কাজ করে তাদের স্কুল।”
হঠাৎ করে ফারুখ বখত, ফরাসত আলি আর হারুন ইঞ্জিনিয়ার তিনজন একসাথে মির্জা মাস্টারের দিকে ঘুরে তাকালেন। ফারুখ বখত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি গরিব বাচ্চাদের পড়ান?”
“হ্যাঁ।”
“আপনার স্কুলের খরচ কে দেয়?”
“আমার স্কুলের কোনো খরচ নাই, কেউ দেয় না। বাচ্চারা আসে আমি তাদের পড়াই।”
“কী পড়ান?”
“প্রথমে পড়তে শেখাই। তারপরে অঙ্ক। তারপরে যে যেটা পড়তে চায়। কেউ ইংরেজি, কেউ সায়েন্স।”
“আপনার কতজন ছাত্র?”
“ঠিক নাই। ধান কাটার মৌসুমে কমে যায়। বৃষ্টি-বাদলার দিনে একটু বেশি হয়। অনেক রকম ছাত্র আমার, কেউ বাসায় কাজ করে, কেউ মিনতি, কেউ মুটে, কেউ টোকাই। কেউ রেলস্টেশনে কুলি। দুইজন আছে পকেটমার।”
“পকেটমার?”
“জি। এইখানে পকেটমারদের একটা কলেজ আছে, দুইজন এখনই চান্স পেয়ে গেছে। চমৎকার হাতের কাজ। আপনার পকেট খালি করে দেবে আপনি টের পর্যন্ত পাবেন না। কলেজের প্রিন্সিপাল বলেছে এই দুইজন নাকি বড় হয়ে কলেজের সুনাম রাখবে।”
“আপনি পকেটমার কলেজের প্রিন্সিপালকে চেনেন?”
“না, ব্যক্তিগত পরিচয় নাই। তারা পরিচয় গোপন রাখে। আমি লোকমুখে খবর পাই।”
ফরাসত আলি খানিকক্ষণ অবাক হয়ে মির্জা মাস্টারের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “এখন আপনার স্কুল উড়ে গেল, ছাত্রদের কী অবস্থা?”
“ছাত্ররা মহাখুশি। একেবারে পড়ায় মনোযোগ নাই। এরা গরিব মানুষের পোলাপান, বাসায় পড়াশোনার আবহাওয়া নেই–পুরো ব্যাপারটা মনে করে একটা ঠাট্টা-তামাশা।”
“ঠাট্টা তামাশা?”
“জি। কখনো ধমক দিয়ে কখনো আদর করে পড়াতে হয়। অনেক যন্ত্রণা।”
ফারুখ বখত জিজ্ঞেস করলেন, “এখন আপনার ছাত্ররা কোথায়?”
“এইখানেই আছে নিশ্চয়। দিনরাত সবগুলি টোটো করে ঘোরাঘুরি করে। যেখানে একটু হৈচৈয়ের খোঁজ পায় সেখানে হাজির হয়।”
মির্জা মাস্টার মাথা ঘুরিয়ে মানুষের ভিড়ের দিকে তাকালেন, ছোট ছোট বাচ্চারা যারা ছোটাছুটি করছে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে এরা সব আমার ছাত্র। ঐ যে বাদাম বিক্রি করছে ছেলেটা আমার একেবারে একনম্বর ছাত্র। অ্যালজেবরা শুরু করেছে। ঐ যে দূরে দুইজন কুস্তি করছে ঐ দুজনও আমার ছাত্র। স্কুল উড়ে গেছে আর পড়তে হবে না, তাদের মনে বড় আনন্দ!”
মির্জা মাস্টার মুখ হা করে খানিকক্ষণ নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমি খোঁজ পেয়েছি যে আপনারা একটা স্কুল তৈরি করছেন। তাই ভাবছিলাম আমার ছাত্রদের জন্যে যদি একটা ঘর পাওয়া যায়। কিন্তু এখন তো দেখি স্কুলঘর আপনারা দাঁড়া করেছেন উলটো। স্কুলের মেঝে আকাশে উঠে গেছে, দরজা-জানালা আড়াআড়ি, এই স্কুলে ছাত্র ঢুকবে কোন দিক দিয়ে আর মাস্টার ঢুকবে কোন দিক দিয়ে?”
হারুন ইঞ্জিনিয়ার গলা উঁচিয়ে বললেন, “ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কিসের?”
“ছোটখাটো?” মির্জা মাস্টার তার ছোট ছোট চোখ দুটিকে যথাসাধ্য বড় করার চেষ্টা করে বললেন, “ছোটখাটো একটা আস্ত স্কুল উলটা করে দাঁড় করেছেন সেটা ছোটখাটো?”
“অবশ্যি ছোটখাটো। একরাত্রে স্কুল উলটো করে দাঁড় করানো হয়েছে, আরেক রাত্রে স্কুল খুলে সোজা করা হবে।”
মির্জা মাস্টার খানিকক্ষণ হারুন ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “এক রাত্রে?”
অবশ্যি এক রাত্রে! ভাবছেন কী আপনি? এটা আমার আবিষ্কার করা প্রসেস। আমেরিকা জার্মানি আর জাপানে এটার পেটেন্ট আছে! স্কুলঘরের দায়িত্ব আমি নিয়েছি, আমি ঠিক করে দেব-আপনি আপনার ছাত্রছাত্রী নিয়ে মাথা ঘামান।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now