বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
গাব্বু (৫)
"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)
X
টুনি, গাব্বু আর মিঠু একই স্কুলে পড়ে। স্কুলটা বাসা থেকে খুব বেশি দূরে না, তাই প্রতিদিন তিন ভাইবোন হেঁটে হেঁটে স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই অবশ্যি একই ব্যাপার ঘটে। খানিকদূর হেঁটে যেতে যেতেই গাব্বু পিছিয়ে পড়ে, সে যে তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না তা নয়, সে পিছিয়ে পড়ে তার কারণ সবকিছুতেই তার কৌতূহল। সবকিছুই তার দেখতে হয়। আজকেও তাই হচ্ছে। খানিকদূর গিয়ে টুনি আবিষ্কার করল গাব্বু সাথে নেই, পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল সে গভীর মনোযোগ দিয়ে কীভাবে রিকশার চাকা পাম্প করা হচ্ছে সেটা দেখছে। টুনিকে ফিরে গিয়ে রীতিমতো তার হাত ধরে টেনে আনতে হল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর দেখা গেল গাব্বু আবার পিছিয়ে পড়েছে, এবারে সে একটা ওয়ার্কশপে কীভাবে লেদ মেশিনে একটা পাইপকে পালিশ করা হচ্ছে সেটা দেখছে। এবারে মিঠু তাকে ঠেলে সরিয়ে আনল। কিছুক্ষণ পর গাব্বু আবার পিছিয়ে পড়ল, এবারে সে পাখির খাঁচা হাতে একটা মানুষের সাথে আটকা পড়েছে!
স্কুলে পৌঁছানোর পর টুনি আর মিঠু নিজের ক্লাসে চলে গেল, এখন আর তাদেরকে গাল্লুকে নিয়ে টানাটানি আর ধাক্কাধাক্কি করতে হবে না। গাব্বু স্কুলের মাঠ দিয়ে আড়াআড়িভাবে হেঁটে নিজের ক্লাসে গিয়ে জানালার কাছে একটা সিটে নিজের ব্যাগ রেখে ক্লাস থেকে বের হয়ে এল। মাঠে ছেলেমেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে, সে কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। রবিন নামে তার ক্লাসের একজন ডাকল, “গা, খেলবি? আয়।”
গাৱঁ দৌড়াদৌড়ি করে খুব বেশি খেলে না, তাই খেলতে যাবে কী না সেটা চিন্তা করছিল, ঠিক তখন স্কুলঘরের দেয়ালে তার চোখ পড়ল। লাল রঙের একটা পিঁপড়ার সারি দেয়াল ধরে এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যাচ্ছে। মাঠে ছোটাছুটি করার থেকে এই পিঁপড়ার সারিটা কোথা থেকে শুরু করে কোথায় যাচ্ছে সেটা খুঁজে বের করা তার কাছে অনেক বেশি মজার কাজ মনে হল। তাই সে রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা খেল। আমি এখন খেলব না।”
তারপর সে পিপড়ার সারিটা দেখতে শুরু করল। জানালার নিচে দিয়ে সেটা স্কুলঘরের পেছনে গিয়ে মাটির ভেতরে কোথায় জানি ঢুকে গেছে। পিঁপড়ার সারিটা মহাউৎসাহে একটা মরা পোকাকে টেনে আনছে, সেই দৃশ্যটা সে অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। পিঁপড়াগুলোর মাঝে একধরনের উত্তেজনা। সামনে যাচ্ছে পেছনে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ পোকাটাকে টানছে, অন্য একটি পিঁপড়া এসে ধাক্কা দিয়ে একজনকে সরিয়ে ঢুকে যাচ্ছে, মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছে। পিঁপড়ার কথা যদি বুঝতে পারত তা হলে কী মজাই না হত! সে যখন একটা কাঠি দিয়ে পিঁপড়ার সারিটাকে একটু এলোমেলো করে দিয়ে কী হয় দেখছে তখন পেছন থেকে লিটন নামে মোটাসোটা একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল, “গাব্বু, কী করছিস?”
গাব্বু বলল, “দেখছি।”
“কী দেখছিস?”
“পিপড়া।”
“পিঁপড়া? তুই আগে কখনো পিঁপড়া দেখিসনি? পিঁপড়া একটা দেখার মতো জিনিস হল?” লিটন হি হি করে দাঁত বের করে হাসল, কাছাকাছি রত্না নামে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে ডেকে বলল, “রত্না, দেখে যা, গাব্বু পিঁপড়া দেখছে।”
ক্লাসের সবারই গাৱঁর কাজকর্ম দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে, আজকাল কেউ আর অবাক হয় না। তাই রত্নাও অবাক হল না, সেও লিটনের মতো হেসে বলল, “মানুষজন যে রকম চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘ-ভালুক দেখে, গাব্বু সেরকম দেখে পিপড়া।”
লিটন আর রত্নার কথা শুনে গাবুর একটু রাগ হল, সে মুখ শক্ত করে বলল, “তোরা কখনো একটা পিঁপড়াকে ঠিক করে দেখেছিস?”
লিটন বলল, “দেখব না কেন!”
“পিঁপড়ার কয়টা পা, বল দেখি।”
“আট দশটা হবে।”
“উঁহু।” গাব্বু বলল, “ছয়টা।”
“একই কথা।”
“কখনোই একই কথা না–আট পা থাকে মাকড়সার। পিঁপড়ার চোখ কী। রকম বল দেখি।”
“চোখ আবার কী রকম, চোখের মতো।”
“উঁহু। পিঁপড়ার চোখ হচ্ছে কম্পাউন্ড আই। অনেকগুলো ছোট ছোট চোখ মিলে একটা চোখ, বাংলায় বলে পুঞ্জাক্ষী।”
“তোকে বলেছে!”
“পিপড়ার শরীরে কী হাড় আছে?”
“হাড়?” রত্না হেসে বলল, “পিঁপড়ার আবার হাড় থাকবে কেমন করে?”
“আছে।” গাব্বু গম্ভীর হয়ে বলল, “পিঁপড়ার শরীরের খোসাটাই হচ্ছে। হাড়।”
লিটন মুখ বাঁকা করে বলল, “গুলপট্টি।”
“মোটেও গুলপট্টি না। বল দেখি, পিঁপড়া কামড় দিলে ব্যথা লাগে কেন?”
লিটন বলল, “এটা আবার কী রকম প্রশ্ন? কামড় দিলে তো ব্যথা লাগবেই।”
“কামড় দিলে ব্যথা লাগে, তার কারণ পিঁপড়ার কামড়ে আছে ফরমিক অ্যাসিড।”
লিটন মুখ শক্ত করে বলল, “কাঁচকলা।”
কাঁচকলা শুনেও গাব্বু থামল না, বলল, “বল দেখি পিঁপড়া কীভাবে লাইন ধরে যায়?”
“যেভাবে যায় সেভাবে যায়।”
“উঁহু।“
রত্না হি হি করে হেসে বলল, “এক পিঁপড়া আরেক পিঁপড়াকে জিজ্ঞেস করে, ভাই কোনদিকে যাব? তখন সেই পিঁপড়া বলে, এদিকে যাও না হলে ওদিকে যাও। তখন পিঁপড়া এদিক-সেদিক যায়।”
গাব্বু বলল, “মোটেও না। পিঁপড়া যেদিকে যায় সেখানে একটা গন্ধ থাকে। পিঁপড়ারা সেই গন্ধ শুকে এঁকে যায়।
লিটন কাছে এসে নাক কুঁচকে একটু গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে বলল, “কই আমি তো কোনো গন্ধ পাচ্ছি না।”
গাব্বু বলল, “তুই তো আর পিঁপড়া না। যদি তুই পিঁপড়া হতিস তা হলে ঠিকই গন্ধ পাবি।”
রত্না হেসে গড়িয়ে পড়ল, লিটন হবে পিঁপড়া? লিটনের ওজন কয় কেজি তুই জানিস? একবারে কয়টা হাম বার্গার খায় তুই জানিস? দশটা!”
লিটন রেগে উঠে বলল, “আমি মোটেও একবারে দশটা হাম বার্গার খাই না।”
“খাস।” রত্না বলল, “মিলির জন্মদিনের পার্টিতে আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
“মোটেও দশটা খাইনি। ছোট ছোট হাম বার্গার–”
“মোটেও ছোট ছোট না। এতো বড় বড়।”
লিটন আর রত্না হাম বার্গারের সাইজ নিয়ে ঝগড়া করতে করতে অন্যদিকে চলে গেল, গাব্বু তখন আবার পিঁপড়ার সারি দেখতে শুরু করে। মাটির নিচে যেখানে ঢুকে গেছে সেখানে খুঁড়ে দেখতে পারলে হত, পিঁপড়ার রানীটাকে নিশ্চয়ই সেখানে পাওয়া যাবে। সে হাঁটু গেড়ে বসে একটা কাঠি দিয়ে মাঠি খুঁড়তে শুরু করে।
“এই ছেলে, তুমি কী করছ এখানে?” প্রচণ্ড ধমক শুনে গাব্বু পেছন ফিরে তাকাল। তাদের প্রিন্সিপাল কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রিন্সিপালের গলা নেই, ঘাড়ের ওপর সরাসরি মাথা লাগানো, ঠোঁটের ওপর সরু গোঁফ এবং লাল চোখ। চুল মিলিটারিদের মতো ছোট ছোট করে ছাঁটা। তিনি যখন রাগেন তখন মুখের দুই পাশের দুটি দাঁত বের হয়ে আসে, গাব্বু জানে মাংশাসী প্রাণীর মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার জন্যে এরকম ধারালো দুটি দাঁত থাকে। এগুলোকে বলে কেনাইন দাঁত।
প্রিন্সিপাল আবার ধমক দিলেন, “কী করছ এখানে?”
“রানী খুঁজছিলাম স্যার।”
প্রিন্সিপাল গাব্বুর কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, চিৎকার করে বললেন, “আমার সাথে ইয়ার্কি করছ? তুমি রানী খুঁজছ? স্কুলে এসেছ রাজকন্যা রানী খোঁজার জন্যে? কোন দেশের রানী তোমার জন্যে এইখানে অপেক্ষা করছে?”
“কোনো দেশের রানী না স্যার–”
”চাবকে তোমাকে সোজা করে দেব। পিঠের ছাল তুলে দেব।”
“শারীরিক শাস্তি দেওয়া উঠে গেছে স্যার। শারীরিক শাস্তি এখন আইনত বেআইনি। হাইকোর্ট বলেছে–”
প্রিন্সিপাল পারলে তখন তখনই বাঘের মতো গাব্বুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ধারালো দাঁত দুটি দিয়ে গলার রগ ছিঁড়ে ফেলেন, অনেক কষ্ট করে নিজেকে স্থির রেখে দুই হাত দিয়ে গাব্বুর মাথা ধড় থেকে ছিঁড়ে ফেলার ভান করে বললেন, “তোমার এত বড় সাহস? আমাকে তুমি হাইকোর্ট দেখাও? তুমি আমার সাথে টিটকারি মারবে, বলবে একজন রানী খুঁজে বেড়াচ্ছ, আর আমি তোমাকে ছেড়ে দেব? রাজা রানী রাজকন্যা তোমার জন্যে এখানে বসে আছে-মশকরা করার জায়গা পাও না?”
গাব্বু বুঝল যতই সময় যাচ্ছে ততই সে আরো বেশি বিপদের মাঝে পড়ে যাচ্ছে, রানী বলতে সে মোটেও গল্পের রাজা-রানী বলেনি সেইটা পরিষ্কার করতে হবে, তাই গলা উঁচিয়ে বলল, “স্যার, আমি পিঁপড়াদের রানীর কথা বলছিলাম। এই পিঁপড়াগুলো শ্রমিক পিঁপড়া, তাদের একটা রানী আছে, আমি সেই রানীর কথা বলছিলাম।”
প্রিন্সিপাল স্যার হঠাৎ করে বিষয়টা বুঝতে পারলেন। কিন্তু তাতে তার রাগ কমল না। তার চিৎকার শুনে আশেপাশে ছেলেমেয়েদের একটা ভিড় জমে গেছে। তাদের ভেতর থেকে একটা ছোট হাসির আওয়াজ শুরু হয়ে প্রায় সাথে সাথে থেমে গেল। প্রিন্সিপাল স্যারের গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, সেটা রাগে বেগুনি হয়ে গেল। নাক দিয়ে ফোঁস করে একটা শব্দ করে বললেন, “বেয়াদব ছেলে, তোমাকে আমি সিধে করে ছাড়ব।”
কথা শেষ করে গট গট করে হেঁটে চলে গেলেন। ছেলেমেয়েরা তখন। গাব্বুকে ঘিরে দাঁড়াল, লিটন বলল, “প্রিন্সিপাল স্যার এখন তোকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।”
রত্না বলল, “তুই হচ্ছিস এক নম্বর গাধা।”
গাব্বু মুখ শক্ত করে বলল, “কেন? আমি গাধা কেন হব?”
“গাধা না হলে কেউ প্রিন্সিপাল স্যারকে হাইকোর্টের ভয় দেখায়?”
“আমি কি মিথ্যা কথা বলেছি? আসলেই তো হাইকোর্ট রায় দিয়েছে কেউ কোনো ছাত্রকে পেটাতে পারবে না।”
মিলি ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী, সেই জন্যে অহংকারে মাটিতে তার পা পড়ে না, সে মুখ সুঁচালো করে বলল, “তোর কী দরকার পড়েছিল মাটি খুঁড়ে পিঁপড়ার রানী বের করার? এর থেকে বিজ্ঞান বইয়ের দুই পৃষ্ঠা মুখস্থ করিস না কেন? আমাদের বিজ্ঞান বইয়ে পিঁপড়ার কোনো চ্যাপ্টার পর্যন্ত নাই–”
গাব্বু কী বলবে বুঝতে পারল না। ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সে ভালো করে কখনো বুঝতে পারে না।
.
বাংলা, গণিত আর ইংরেজি ক্লাস পর্যন্ত গাব্বু সহ্য করল, সমাজপাঠ ক্লাস সে আর সহ্য করতে পারল না, তার মনে হল ক্লাস থেকে বের হয়ে স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। রওশন ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছেন, তার গলার শব্দ এত একঘেয়ে যে গাব্বুর মনে হতে লাগল যে সে পাগল হয়ে যাবে। কাজেই সময় কাটানোর জন্যে সে তার স্কুলের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল, বইয়ের নাম ”বিজ্ঞানের শত প্রশ্ন”।
গাব্বু সাবধানে বইটা খুলে পড়তে থাকে, এই বইয়ে লেখা বেশির ভাগ জিনিস সে জানে। একটা প্রশ্নের উত্তর ভুল, তবে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে অংশটা বেশ মজার। কাতুকুতু কেন লাগে, কী করলে কাতুকুতুর অনুভূতি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়–এই অংশটা সে আগে জানতো না। বিষয়টা তখন তখনই সে পরীক্ষা করে দেখল, নিজেকে সে নানাভাবে কাতুকুতু দিতে লাগল এবং সত্যি সত্যি তার কাতুকুতু পেল না। পাশে মিলি বসেছিল, সে ভুরু কুঁচকে গাব্বুর দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী করছিস?”
গাব্বুও গলা নামিয়ে বলল, “কাতুকুতু দিচ্ছি।”
“কাতুকুতু দিচ্ছিস? কেন?”
“নিজেকে দেওয়া যায় কি না পরীক্ষা করছি। দেওয়া যায় না।”
“নিজেকে মানুষ আবার কেমন করে কাতুকুতু দেবে?”
“দিতে পারে না। অন্যকে পারে। তোকে একটু কাতুকুতু দিই?”
“না।” মিলি চোখ পাকিয়ে বলল, “খবরদার।”
“একটু, প্লীজ।”
“না।”
“প্লীজ!” গাব্বু নরম গলায় বলল, “বেশি দেব না।” বলে সে মিলিকে কাতুকুতু দেওয়ার চেষ্টা করল, আর মিলি তড়াক করে লাফ দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ম্যাডাম! গাব্বু আমাকে জ্বালাচ্ছে।”
ম্যাডাম পড়ানো বন্ধ করে চশমার ওপর দিয়ে গাব্বুর দিকে তাকালেন, রাগী গলায় বললেন, “গাব্বু!”
গাব্বু বলল, “জি ম্যাডাম।”
“কী করছ তুমি?”
“কিছু করছি না।”
মিলি বলল, “করছে ম্যাডাম, আমাকে কাতুকুতু দিচ্ছে।”
মিলির কথা শুনে সারা ক্লাস হেসে উঠল। ম্যাডামের মুখ তখন আরও শক্ত হয়ে উঠল, শীতল গলায় বললেন, “তুমি ক্লাসে একজনকে কাতুকুতু দিচ্ছ? তোমার এত বড় সাহস?”
গাব্বু অপরাধীর মতো বলল, “না ম্যাডাম, আমি আসলে কাতুকুতু দিচ্ছি না, আমি আসলে দেখাচ্ছিলাম কীভাবে কাতুকুতু দিলে কাতুকুতু লাগে না।”
ম্যাডাম চোখ কপালে তুলে বললেন, “তুমি শিখাচ্ছিলে কীভাবে কাতুকুতু দিলে কাতুকুতু লাগে না?”
“জি ম্যাডাম।”
“কীভাবে শুনতে পারি?”
গাব্বু উৎসাহ নিয়ে বলল, “খুব সোজা। এই দেখুন আমি নিজেকে কাতুকুতু দিচ্ছি” বলে গাব্বু নিজেকে নানাভাবে কাতুকুতু দেয় এবং সেই দৃশ্য দেখে ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আনন্দে হাসতে থাকে। গাব্বু তখন কাতুকুতু দেওয়া থামিয়ে বলল, “আমার একটুও কাতুকুতু পায়নি। ম্যাডাম আপনি নিজেকে কাতুকুতু দেওয়ার চেষ্টা করেন, দেখবেন কাতুকুতু পাবে না। দেখেন চেষ্টা করে–”
ম্যাডাম মুখ শক্ত করে বললেন, “আমার চেষ্টা করতে হবে না। আমি জানি মানুষ নিজেকে কাতুকুতু দিতে পারে না।”
গাব্বু এবারে বক্তৃতা দেওয়ার মতো করে বলল, “আমরা নিজেকে কাতুকুতু দিলে সবসময় জানি কোথায় কাতুকুতু দেওয়া হবে, সেই জন্যে কাতুকুতু লাগে না। তাই আমি যদি আপনাকে কাতুকুতু দিই আর আপনি যদি আগে থেকে জানেন কোথায় কাতুকুতু দেব তা হলে আপনারও কাতুকুতু পাবে না।”
ম্যাডাম কোনো কথা না বলে একধরনের বিস্ময় নিয়ে গাব্বুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। গাব্বু আবার বক্তৃতার মতো করে বলতে লাগল, “আপনাকে করে দেখাব ম্যাডাম? আপনি আপনার হাতটা আমার হাতের ওপর রাখবেন। আমি সেই হাত দিয়ে আপনাকে কাতুকুতু দেব। আপনি তা হলে আগে থেকে জানবেন আমার হাতটা কোনদিকে যাচ্ছে, কোথায় কাতুকুতু দিচ্ছে। আপনার তা হলে আর কাতুকুতু পাবে না। আমি মিলিকে এইটাই দেখাতে চাচ্ছিলাম, মিলি তখন নালিশ করেছে। আপনাকে করে দেখাব ম্যাডাম?”
ম্যাডামের চোখ কেমন যেন বিস্ফারিত হয়ে গেল, তিনি অবিশ্বাসের গলায় বললেন, “তুমি আ-মা-কে কাতুকুতু দেবে?”
“জি ম্যাডাম, আপনি যদি চান।”
“না, আমি চাই না। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা যদি তাদের স্যার-ম্যাডামদের কাতুকুতু দেওয়া শুরু করে তা হলে তাতে স্কুলের ডিসিপ্লিনের খুব বড় সমস্যা হতে পারে। বাইরে সেই খবর গেলে স্কুলের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যাবে, বুঝেছ?”
গাব্বু নিশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝেছি।”
ম্যাডাম বললেন, “মনে হয় বোঝো নাই। ক্লাসে তোমার কোনো মনোযোগ নেই। আমি কী পড়াই তুমি সেটা শোনো না। আজব আজব বিষয় নিয়ে কথা বল। ক্লাসে ডিস্টার্ব করো। তুমি খুব বড় সমস্যা।”
গাব্বু অবাক হয়ে বলল, “সমস্যা? আমি?”
ম্যাডাম মুখ শক্ত করে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি। আমরা অনেক সহ্য করেছি, আর সহ্য করা হবে না। তুমি যদি ক্লাসের ডিসিপ্লিন নষ্ট করো এখন সেটা প্রিন্সিপালকে রিপোর্ট করা হবে। তোমার বাবা-মাকে জানানো হবে। বুঝেছ?”
গাব্বু নিচু গলায় বলল, “বুঝেছি।”
ম্যাডাম কঠিন গলায় বললেন, “এখন থেকে ক্লাসে আমি আর কোনো থিওরি শুনতে চাই না। চুপ করে ক্লাসে বসে থাকো। মনোযোগটা অন্য কোনোদিকে না দিয়ে আমি কী পড়াচ্ছি সেদিকে দাও, বুঝেছ?”
গাব্বু দুর্বল গলায় বলল, “জি ম্যাডাম, বুঝেছি।”
. স্কুল ছুটির পর যখন টুনি, গাব্বু আর মিঠু বাসায় আসছিল তখন গাব্বুকে কেমন জানি অন্যমনস্ক দেখাতে লাগল। অন্যদিনের মতো সে পিছিয়ে পড়ল না, এদিক সেদিক কোনোকিছু দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে পড়ল না, আজ তার মনটা ভালো নেই। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না, চারপাশের মানুষেরা এরকম কেন? কেউ তাকে বুঝতে পারে না কেন?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now