বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তিরিশ লক্ষ টাকার উত্তেজনা কমতে অন্তত তিরিশ দিন লাগার কথা ছিল, কিন্তু ফরাসত আলি আর ফারুখ বখত সপ্তাহখানেকের মাঝে নিজেদের সামলে নিলেন। পরের শনিবারের মাঝে তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হতে লাগল লটারি জেতা বুঝি নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। পরিচিত মানুষজন অবিশ্যি ব্যাপারটা এত সহজে নিতে পারল না, বেশির ভাগই হিংসায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল। আবার অনেকে যারা আগে কোনোদিন ফরাসত আলি আর ফারুখ বখতকে মানুষ হিসেবে গণ্য করেনি হঠাৎ করে তারা ফরাভাই এবং ফারুভাই বলতে অজ্ঞান হয়ে যেতে শুরু করল। ফরাসত আলি এবং ফারুখ বখত একদিন তাঁদের এই পরিচিত মানুষজনকে লুকিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসলেন টাকাটা কীভাবে খরচ করা যায় সেটা ভেবেচিন্তে বের করতে। তাদের সামনে দুই কাপ চা, একটা সোলার পাওয়ার ক্যালকুলেটর, এক রিম কাগজ আর দুইটা বলপয়েন্ট কলম। ফরাসত আলি গোলাপি রঙের একটা চিরুনি দিয়ে তাঁর দাড়ি পাট করতে করতে চিন্তা করতে লাগলেন, যে-দাড়ি কামানোর জন্যে রেজর কিনতে গিয়ে তিনি এতগুলি টাকা পেয়ে গেছেন হঠাৎ করে তাঁর সেই দাড়ির জন্যে একটু মায়া পড়ে গেছে, দিনরাত সেটা কুটকুট করলেও তিনি আর সেটা কেটে ফেলছেন না। খানিকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে করতে হঠাৎ করে বললেন, “আমার বড় রেলগাড়ির শখ। একটা রেলগাড়ি কিনলে কেমন হয়?”
ফারুখ বখত চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেয়ে বললেন, “রেলগাড়ি?”
“হ্যাঁ, মনে কর পার্সোনাল একটা রেললাইন বসানো হল, তার মাঝে একটা ট্রেন। বেশি বড় দরকার নেই, ছোটখাটো একটা ট্রেন। যাবে আর আসবে।”
ফারুক বখত ক্যালকুলেটরে খানিকক্ষণ হিসাব করে বললেন, “তোর যদি সত্যি ট্রেন ভালো লাগে তা হলে তিরিশ লাখ টাকার ট্রেনের টিকেট কিনে টানা কুড়ি বছর ট্রেনে চড়তে পারবি। খামোখা ট্রেন কিনে কী করবি? আর ট্রেন কি কোরবানির খাসি নাকি যে গাবতলি বাজার থেকে কিনে আনবি?”
ধমক খেয়ে ফরাসত আলি একটু দুর্বল হয়ে মিনমিন করে বললেন, “তা হলে একটা হেলিকপ্টার? হেলিকপ্টারের আমার অনেকদিনের শখ, কী সুন্দর আকাশে ওড়ে!”
ফারুখ বখত ভুরু কুঁচকে বললেন, “হেলিকপ্টার?”
ফরাসত আলি মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, তা হলে সেটা মানুষের কাজেও ব্যবহার করা যাবে। মনে কর কোনো গ্রামে কারও অসুখ হল, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে, সাথে সাথে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে
“সেটাই যদি করতে চাস, তা হলে সোজাসুজি একটা হাসপাতাল তৈরি করতে দোষ কি?”
হাসপাতাল’ ফরাসত আলি কেমন যেন একটু ভয় পেয়ে গেলেন, আমতা আমতা করে বললেন, “হাসপাতাল আমার কেমন জানি ভয় ভয় করে। ওষুধ আর ফিনাইলের কী বোটকা গন্ধ! চারিদিকে রাগী-রাগী চেহারার ডাক্তার, তার মাঝে এখানে-সেখানে পা-ভাঙা মাথা-ভাঙা মানুষ চিৎকার করছে!” ফরাসত আলি একটু শিউরে উঠে বললেন, “হাসপাতাল থেকে শিশুপার্ক ভালো! ছোট বাচ্চারা খেলবে, দেখতেও ভালো লাগবে।”
ফারুখ বখত মাথা নাড়লেন, “আইডিয়াটা খারাপ না, তিরিশ লাখ টাকা দিয়ে মনে হয় ভালো একটা শিশুপার্ক তৈরি করা যাবে। একটা-দুইটা রোলার কোস্টার, বড় দেখে একটা নাগর দোলা, কয়েকটা মেরি-গো-রাউন্ড”
ফরাসত আলি দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “কিন্তু বাচ্চাদের বাবা মায়েরা ধরে আমাদের মার লাগাবে না তো? এমনিতেই ছেলেপিলেরা পড়াশোনা
করে না, এখন তার উপর যদি তাদের খেলাধুলার জন্যে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফেলি-আর কি কখনো বই নিয়ে বসবে?”
ফারুখ বখত হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। চোখ বড় বড় করে বললেন, “ঠিক বলেছিস!”
“পড়াশোনা।”
“কী পড়াশোনা?”
“বাচ্চাদের পড়াশোনা। শিশুপার্ক তৈরি না করে তৈরি করতে হবে স্কুল।”
“স্কুল?”
“হ্যাঁ, আজেবাজে স্কুল না, একেবারে একনম্বর স্কুল। খেলতে খেলতে বাচ্চারা পড়বে–কিছু বোঝার আগে একেকজন শিখে যাবে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি ক্যালকুলাস” ফারুখ বখত উৎসাহে হাতে একটা কিল দিলেন।
ফরাসত আলি ভয়ে ভয়ে বললেন, “বাচ্চাদের পড়াবে কে?”
“তুই পড়াবি আমি পড়াব। বেছেবেছে সারাদেশ খুঁজে মাস্টার নিয়ে আসব আমরা। বইপত্র দেখে একেবারে আধুনিক পদ্ধতিতে পড়াশোনা। হাসতে হাসতে পড়াশোনা। খেলতে খেলতে পড়াশোনা!” ফারুখ বখত উৎসাহে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁটতে শুরু করেন।
ফরাসত আলি মাথা চুলকে বললেন, “বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা আমাদের স্কুলে দেবে তাদের বাচ্চাদের?”
“কেন দেবে না? একশোবার দেবে! কোথায় পাবে এরকম স্কুল? ক্লাস ওয়ানে আমরা শেখাব ক্যালকুলাস। ক্লাস টুতে ফিজিক্স কেমেস্ট্রি। ক্লাস থ্রি থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। ক্লাস ফোরে ইলেক্ট্রনিক্স, বিপ্লব শুরু করে দেব আমরা। সবার চোখ খুলে যাবে একেবারে। আমাদের দেখাদেখি সবাই শুরু করবে–দেশের চেহারা পালটে যাবে দেখতে দেখতে–”
ফরাসত আলি কোন কথা না বলে তার দাড়ি এবং চুল চুলকাতে লাগলেন। ফারুখ বখত বললেন, “তুই কোন কথা বলছিস না কেন? পছন্দ হয়নি আইডিয়াটা?”
ফরাসত আলি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লেন, “হয়েছে হয়েছে। পছন্দ হয়েছে।”
“পছন্দ না হলে এখনই বল। এটা তো আর কাপড়ের দোকান তৈরি করছি, তৈরি করছি স্কুল, যেখানে বাচ্চাদের মন নিয়ে কাজ করা হবে। হেলাখেলা করার কোনো ব্যাপারই না।”
ফরাসত আলি মাথা নেড়ে বললেন, “আমি হেলাখেলা করছি না, মোটেও হেলাখেলা করছি না।”
“ভেরি গুড! স্কুলের জন্যে জমি কিনতে হবে, বিল্ডিং তুলতে হবে, মাস্টারদের জন্যে বিজ্ঞাপন দিতে হবে, তাদের ট্রেনিং দিতে হবে, বাচ্চাদের ভর্তি করতে হবে–অনেক কাজ।”
ফরাসত আলি মাথা নেড়ে বললেন, “অনেক কাজ।
.
যখন কাউকে অল্পকিছু কাজ করতে হয় সেটি শুরু করতে বেশি অসুবিধে হয় না, কিন্তু যখন অনেক কাজ করা বাকি থাকে তখন কোনখান থেকে শুরু করা হবে সেটা ঠিক করতেই সবার মাথা-খারাপ হয়ে যায়। ফরাসত আলি ও ফারুখ বখতের বেলাতেও তা-ই হল, তারা প্রত্যেকদিন সকালে দুপুরে এবং বিকালে এক রিম কাগজ আর দুইটা বলপয়েন্ট কলম নিয়ে বসতে লাগলেন আর কাগজে লম্বা লম্বা লিস্ট করতে লাগলেন, কিন্তু এর বেশি আর কাজ এগুল না। ব্যাপারটা হয়তো এভাবেই চলতে থাকত কিন্তু তার মাঝে একটা ছোট ঘটনা ঘটে গেল।
ফরাসত আলি ভোরবেলা ঘুম থেকে দেরি করে উঠে তার চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছেন ঠিক তখন দরজায় শব্দ হল। লটারিতে তিরিশ লক্ষ টাকা জিতে যাওয়ার পর নানাধরনের মানুষ তাঁকে দিনরাত উৎপাত করে তাই তিনি একটু খোঁজখবর না নিয়ে দরজা খোলেন না। ফরাসত আলি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেন, মাথায় এলোমেলো চুল, চোখে ভারী চশমা একজন মানুষ হাতে একটা কাপড়ের ঝোলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরকম চেহারার মানুষেরা সাধারণত সাহায্যের জন্যে আসে-ফরাসত আলি একবার ভাবলেন দরজা খুলবেন না, কিন্তু চোখের ভারী চশমাটা দেখে তার কী মনে হল তিনি দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চান?”
লোকটি মাথা চুলকে বলল, “সেটা তো ঠিক জানি না।”
“তাহলে দরজায় ধাক্কা দিলেন যে–”
”ইয়ে মানে যাকে খুঁজছি সেই মানুষটার নাম-”
“কী নাম?”
ভারী চশমা চোখের মানুষটা আবার খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলল, “মনে হয় নাম ওরাফত।”
“ওরাফত? ওরাফত আবার কোন দেশি নাম?”
“জানি না কোন দেশি। তবে মানুষটা মনে হয় মেয়েমানুষ।”
“মেয়েমানুষ?” ফরাসত আলি তখন মাথা নেড়ে বললেন, “না ভাই, এই বাসায় কোনো মেয়েমানুষ থাকে না।”
ভারী চশমা চোখের মানুষটার তখন খুব আশাভঙ্গ হল বলে মনে হল, খানিকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আপনি হয়তো বলতে পারবেন কোথায় থাকে সেই মহিলা।
ফরাসত আলি মাথা চুলকে বললেন, “আমি আসলে খুব বেশি মহিলাকে চিনি।”
“এই মহিলাকে হয়তো চিনবেন। মনে হয় খুব দজ্জাল মহিলা।”
“দজ্জাল মহিলা?”
“হ্যাঁ। কারণ–” ভারী চশমা চোখের মানুষটি মাথা চুলকে বলল, “সবাই দেখি মহিলাটিকে একটা গালি না দিয়ে কথা বলে না।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। মহিলার নাম ওরাফত, সবাই ডাকে ওরাফত শালী।”
ফরাসত আলি খুব অবাক হলেন, একজন মহিলা সে যত দজ্জালই হোক তাকে লোকজন শালী বলে ডাকবে তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “মহিলা দেখতে কেমন?”
মানুষটি আবার তার মাথা চুলকে বলল, “সেটাও খুব অবাক ব্যাপার। তার মুখে নাকি দাড়ি-গোঁফ?”
“মহিলার মুখে দাড়ি-গোঁফ?”
”হ্যাঁ। লটারিতে কয়েকদিন আগে তিরিশ লক্ষ টাকা পেয়েছে।”
ফরাসত আলি চমকে উঠলেন, “লটারিতে তিরিশ লক্ষ টাকা পেয়েছে, মুখে দাড়ি-গোঁফ, নাম ওরাফত শালী?”
“হ্যাঁ।”
ফরাসত আলি হঠাৎ করে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “বুঝেছি।”
“কি বুঝেছেন?”
“নাম বলেছেন ওরাফত শালী–আসলে সেটা ফরাসত আলি। ফরাসত আলি মোটেও দজ্জাল মহিলা না, পুরুষ মানুষ।”
“চেনেন আপনি?”
“চিনি। আমিই ফরাসত আলি।”
শুনে ভারী চশমা চোখের মানুষটি দাঁত বের করে আনন্দে হেসে ফেলল, হাত বের করে তার সাথে কয়েকবার জোরে জোরে হাত মিলিয়ে বলল, “আমার নাম হারুন ইঞ্জিনিয়ার। আমি আপনাকে কয়েকদিন থেকে খুঁজছি।”
“কেন?”
“আপনি যে স্কুল তৈরি করবেন তার বিল্ডিং তৈরি করার জন্য।”
ফরাসত আলি অবাক হয়ে হারুন ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকালেন, “আপনি কেমন করে জানেন আমি স্কুল তৈরি করব? কাউকে তো বলিনি আমরা!”
হারুন ইঞ্জিনিয়ার আবার দাঁত বের করে হাসলেন।”কাউকে বলতে হয় নাকি, সবাই তো জানে।”
“সবাই জানে?”
“না জানার কী আছে? বড়লোকেরা লটারি জিতলে টাকাগুলি যক্ষের মতো আগলে রাখে। আর আমার আপনার মতো মানুষেরা লটারি জিতলে টাকাটা ভালো কাজে খরচ করে। স্কুল-কলেজ হাসপাতাল দেয়। গরিব আত্মীয়স্বজনের ছেলেপুলের পড়ার খরচ দেয়। দেয় না?”
ফরাসত আলি একটু হতচকিত হয়ে মাথা নাড়লেন। হারুন ইঞ্জিনিয়ার তার ভারী চশমাটা খুলে ভালো করে মুছে বললেন, “আপনি কী দেবেন? স্কুল-কলেজ হাসপাতাল?”
“স্কুল।”
“স্কুলটাই ভালো। দেশের কাজ হয়। বাচ্চাদের না বড়দের?”
“বাচ্চাদের।”
“সেটা আরও ভালো। হারুন ইঞ্জিনিয়ার এবারে ঘরের ভিতরে ঢুকে নিজেই একটা চেয়ারে আরাম করে বসে বললেন, “এবারে আমি বলি আমি কী জন্যে এসেছি।”
ফরাসত আলি কাছাকাছি আরেকটা চেয়ারে বসে নিজের চায়ের কাপটা টেনে নিয়ে বললেন, “বলেন।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now