বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্কুলের নাম পথচারী (১)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (৩০৫ পয়েন্ট)



X স্কুলের নাম পথচারী – মুহম্মদ জাফর ইকবাল তোমরা মনে করতে পার এই গল্পটা বুঝি বানানো, কিন্তু আমি আগেই বলে দিই এটা বানানো গল্প না। যে-মানুষগুলিকে নিয়ে এই গল্প তাঁরা নিজেরা আমাকে এই গল্পটা বলেছেন-তারা তো খামোখা আমার কাছে গুলপট্টি মারবেন না! আমার অবিশ্যি নিজে থেকে তোমাদের এই কথাটা বলে দেয়ার কোনো দরকার ছিল, না কারণ তোমরা একটু শুনলেই বুঝতে পারবে এর মাঝে কোনো ফাঁকিঝুঁকি নেই। যেই মানুষগুলিকে নিয়ে এই গল্প তার প্রথমজনের নাম ফরাসত আলি। ফরাসত আলি মানুষটার মাঝে কোনো মারপ্যাঁচ নেই। তিনি বেশি মোটাও না আবার তিনি বেশি শুকনোও না। তিনি বেশি লম্বাও না আবার বেশি খাটোও না। তিনি বেশি বোকাও না আবার বেশি চালাকও না। তাকে যদি তোমরা কোনোদিন রাস্তায় দেখ হয়তো বুঝতেই পারবে না যে মানুষটা ফরাসত আলি। কিন্তু যারা তাকে চেনে তাদের বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না, তার এক নম্বর কারণ ফরাসত আলির একটা মজার অভ্যাস আছে। প্রত্যেক বছর যখন খুব গরম পড়ে ফরাসত আলি তখন চুল-দাড়ি কামিয়ে পুরোপুরি ন্যাড়া হয়ে যান, তখন তাকে দেখায় মুসোলিনির মতো। আবার যখন শীত পড়তে শুরু করে তখন তিনি দাড়িগোঁফ কামানো বন্ধ করে দেন আর তখন তাঁকে দেখায় কাল মার্ক্সের মতো। গত বছর শীতের শেষে যখন গরম পড়তে শুরু করেছে তখন একদিন ফরাসত আলির চুল-দাড়ি কুটকুট করতে শুরু করল, তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর চুল-দাড়ি কাটার সময় হয়েছে। তখন-তখনই তিনি তার নাপিতের দোকানে রওনা দিলেন, গিয়ে দেখেন সেখানে লম্বা লাইন। কোনো কারণে সবাই সেদিন চুল কাটাতে এসেছে। কতক্ষণ আর ফরাসত আলি বসে থাকবেন তাই তিনি দোকানে গেলেন একটা রেজর কিনতে। বড় মনোহারী দোকান, খদ্দেরের খুব বেশি ভিড় নেই। ফরাসত আলি দোকানিকে বললেন, “ভাই, ভালো দেখে একটা রেজর দেন দেখি।” দোকানি মানুষটা অবাক হয়ে বলল, “সত্যি?” ফরাসত আলি ঠিক বুঝতে পারলেন না দোকানি এত অবাক হল কেন, তবুও মাথা নেড়ে বললেন, “সত্যি।” দোকানি তার বাক্স খুলে কী-একটা কাগজ বের করে সেখানে কীসব লেখালেখি করতে শুরু করল। ফরাসত আলি ঠিক বুঝতে পারলেন না কী হচ্ছে, তবু তিনি ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। দোকানি অনেকক্ষণ লেখালেখি করে তাঁকে কয়েকটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে নেন, একশোটা।” “একশোটা কী?” “লটারির টিকেট।” ফরাসত আলি অবাক হয়ে বললেন, লটারির টিকেট?” “হ্যাঁ। একটা পাঁচ টাকা করে একশোটার দাম পাঁচশো টাকা।” ফরাসত আলি ঠিক বুঝতে পারলেন না কী হচ্ছে, তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “কিন্তু লটারির টিকেট কেন?” দোকানি অবাক হয়ে বলল, “এই যে আপনি চাইলেন!” “আমি চাইলাম?” “হ্যাঁ–” ”কখন?” “এই তো এক্ষুনি। বললেন একশোটা লটারির টিকেট।” “মোটেই না! আমি বলেছি রেজর। দাড়ি কামানোর রেজর।” দোকানি চোখ কপালে তুলে বলল, “রেজর? আপনি মোটেও রেজর বলেননি। বলেছেন একশোটা লটারির টিকেট।” ফরাসত আলি মুখ শক্ত করে বললেন, “আমি বলি নাই।” “বলেছেন।” দোকানি তখন আশেপাশে দাঁড়ানো লোকজনকে সাক্ষী মানতে শুরু করল, “ইনি বলেছেন না?” উপস্থিত লোকজন তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগ বলল, বলেছেন, এক ভাগ বলল বলেন নাই, অন্য আরেক ভাগ বলল, তিনি হয়তো বলেছেন ‘রেজর’ কিন্তু তার মুখে এত দাড়ি-গোঁফ থাকায় সেটা শোনা গেছে লটারির টিকেট’। সেটা কীভাবে সম্ভব ফরাসত আলি ঠিক বুঝতে পারলেন না, কিন্তু তিনি সেটা নিয়ে মাথা-ঘামালেন না। খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, আমি কী বলেছি আর আপনি কী শুনেছেন সেটা নিয়ে তর্ক করে লাভ নেই। আমি লটারি খেলি না, আমার লটারির টিকেটের দরকার নেই। আমাকে আমার রেজর দেন, আমি যাই।” দোকানি মুখ কালো করে বলল, “কিন্তু লটারির টিকেট সাইন হয়ে গেলে ফেরত নেওয়ার নিয়ম নেই। এখন এইগুলি আপনাকে নিতেই হবে।” “কিন্তু আমি লটারি খেলি না।” “একবার খেলে দেখেন। ভাগ্যের ব্যাপার, লেগে গেলে এক ধাক্কায় তিরিশ লাখ টাকা। তা ছাড়া টিকেট সাইন হয়ে গেছে, এখন তো নিতেই হবে।” ফরাসত আলি একবার ভাবলেন রেগে যাবেন, কিন্তু তিনি কখনোই বেশি রেগে যান না, তাই এবারেও বেশি রাগলেন না, মেঘস্বরে বললেন, “যদি না নিই?” দোকানি তখন খুব মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “তা হলে সবগুলি আমার নিজের কিনতে হবে। আমি গরিব মানুষ, খামোখা এতগুলি লটারির টিকেট কিনে কী করব?” ফরাসত আলি কী ভেবে লটারির টিকেটগুলি নিলেন। মানিব্যাগে সেদিন পাঁচশো টাকা ছিল, দুদিন আগেই বেতন পেয়েছেন। পাঁচশো টাকা এভাবে বের হয়ে যাবার পর তার সারা মাসে টাকার টানাটানি হয়ে যাবে, কিন্তু এখন কিছু করার নেই। টাকা গুনে ফরাসত আলি যখন বের হয়ে আসছিলেন দোকানি জিজ্ঞেস করল, “রেজর নিবেন না?” ফরাসত আলি কোনো কথা না বলে মাথা নাড়লেন, তার এখন আর রেজর কেনার ইচ্ছা নেই। তা ছাড়া তাঁর ভয় হচ্ছিল তিনি যদি মুখ ফুটে কিছু-একটা বলেন দোকানি সেটাকে অন্যকিছু একটা শুনে ফেলে আবার তাঁকে কিছু-একটা গছিয়ে দেবে। তিনি যখন বের হয়ে আসছিলেন দোকানি নরম গলায় বলল, “স্যার, রাগ হবেন না আমার উপর। এই লটারির টাকায় ঘূর্ণিঝড়ের আশ্রয় কেন্দ্র বানানো হবে। যদি লটারি না জেতেন মনে করবেন সকাজে দান করলেন। তা ছাড়া লটারির টিকেট সবাই কিনতে চায়-আপনি যদি নিজে একশোটা রাখতে না চান বন্ধুবান্ধবের কাছে বিক্রি করতে পারেন, দেখবেন একেবারে ইলিশ মাছের মতো বিক্রি হয়ে যাবে।” ফরাসত আলি প্রথম কয়েকদিন তাঁর লটারির টিকেট বিক্রি করার চেষ্টা করলেন কিন্তু সেগুলি ইলিশ মাছের মতো বিক্রি হল না। রইসউদ্দিন নামে তাঁর একজন প্রফেসর-বন্ধু আছে, তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভুল করে আমি একশোটা লটারির টিকেট কিনে ফেলেছি। তুমি কি কয়টা কিনতে চাও? তাঁর প্রফেসর-বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, “নাম্বার কত?” “নাম্বার?” “হ্যাঁ।” “কিসের নাম্বার?” “লটারির টিকেটে সবসময় নাম্বার থাকে জান না?” ফরাসত আলি তখন টিকেটগুলি বের করে নাম্বার দেখলেন। প্রথমটার নাম্বার চ-১১১১১১১১। তার বন্ধু রইসউদ্দিন নাম্বারটা দেখে গম্ভীর হয়ে বললেন, “জাল টিকেট।” “জাল?” “হ্যাঁ।” “কেন?” “কখনো লটারির টিকেটের নাম্বার এরকম হয় না। চ-এর পরে আটটা এক এটা অসম্ভব ব্যাপার। আমি অঙ্কের প্রফেসর, আমি এসব জানি। পোভাবিলিটি বলে একটা কথা আছে তার নিয়ম অনুযায়ী এটা অসম্ভব।” ফরাসত আলি সেটা নিয়ে বেশি তর্ক করলেন না। তিনি অঙ্ক ভালো বোঝেন না। পরদিন তাঁর দেখা হল এমাজউদ্দিনের সাথে, এমাজউদ্দিন তার বেশ অনেকদিনের বন্ধু, কাস্টমসে চাকরি করে। ফরাসত আলি বললেন, “আমার কাছে কিছু লটারির টিকেট আছে, ভুল করে কিছু কিনে ফেলেছি। তুমি কি কয়েকটা কিনতে চাও?” “কত টাকার লটারি?” ফরাসত আলি মাথা চুলকে বললেন, “মনে হয় তিরিশ লাখ টাকার।” এমাজউদ্দিন তার বিদেশি সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, “মাত্র তিরিশ লাখ? বেশি টাকা না হলে আমি লটারি খেলি না।” ফরাসত আলি ভয়ে ভয়ে বললেন, “তিরিশ লাখ টাকা বেশি হল না?” ধুর! তিরিশ লাখ একটা টাকা হল নাকি? এক দুই লাখ টাকা তো আমার হাতের ময়লা।” ফরাসত আলির কাস্টমসের বন্ধু এমাজউদ্দিন একটু পরে বললেন, “আর তুমি কেমন করে জান এটা তিরিশ লাখ টাকার লটারি? হয়তো আরও কম।” ফরাসত আলি মাথা চুলকে বললেন, “কম হওয়ার তো কথা না। একটা টিকেটের নাম্বার চ, তার পরে আটটা এক। এত বড় যদি নাম্বার হয় তার মানে অনেক বড় লটারি–” এমাজউদ্দিন সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “এগুলি লোক-ঠকানোর বুদ্ধি-মনে হয় সস্তা লটারি। হাজার দুই হাজার টাকার! হা হা হা–” ফরাসত আলি তবু হাল ছাড়লেন না। তাঁর একজন ডাক্তার-বন্ধু আছেন, তাঁকেও একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কাছে কিছু বাড়তি লটারির টিকেট আছে, তুমি কি কিনতে চাও?” তাঁর ডাক্তার-বন্ধুর নাম তালেব আলি, তিনি হেহে করে হেসে বললেন, “রইসউদ্দিন আমাকে বলেছে, তুমি নাকি অনেকগুলি জাল টিকেট নিয়ে ফেঁসে গেছ! টিকিটের নাম্বার নাকি চ, তার পরে আটটা এক! রইসউদ্দিন অঙ্কের প্রফেসর–আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে জাল টিকেটে সবসময় এরকম নাম্বার হয়। সত্যিকার টিকেটে নাম্বারগুলি হয় সব সংখ্যা দিয়ে!” ফরাসত আলি শেষ চেষ্টা করলেন তাঁর অ্যাডভোকেট-বন্ধু আব্বুল করিমের কাছে। আব্বুল করিম মাথা নেড়ে বললেন, “আমার সাথে এমাজউদ্দিনের দেখা হয়েছিল। এমাজউদ্দিন বলেছে এটা নাকি কম পয়সার লটারি, এই টিকেট কেনা মানে মাছি মেরে হাত কালো করা।” ফরাসত আলি তখন হাল ছেড়ে দিলেন। একবার ভাবলেন রেগেমেগে টিকেটগুলি নর্দমায় ফেলে দেবেন, কিন্তু কী ভেবে শেষ পর্যন্ত ফেললেন না, তোশকের নিচে রেখে দিলেন। সেদিন রাতে তাঁর বন্ধু ফারুখ বখতের সাথে দেখা হল। ফারুখ বখত তার ছেলেবেলার বন্ধু, ভবিষ্যতে কী করবেন সেটা নিয়ে সবসময় চিন্তাভাবনা করেন বলে এমনিতে বিশেষ কাজকর্ম করার সময় পান না। তিনি অসম্ভব শুকনো, মাথার চুলগুলি ঝোড়োকাকের মতে, মুখে বেমানান অনেক বড় বড় গোঁফ। এমনিতে তাকে দেখলে মনে হয় বুঝি অনেক রাগী কিন্তু ফারুখ বখত খুব ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। ফারুখ বখত আর ফরাসত আলি একেবারে ছেলেবেলার বন্ধু বলে একজন আরেকজনকে তুই তুই করে বলেন। ফরাসত আলিকে দেখে তিনি একগাল হেসে বললেন, “ফরাসত, তুই নাকি অনেকগুলি লটারির টিকে কিনে ফেঁসে গেছিস?” “তুই কেমন করে জানিস?” “সবাই জানে! রইসউদ্দিন বলেছে। এমাজউদ্দিন বলেছে। একটা টিকেটের নাম্বার নাকি চ ১১১১১১১১?” ফরাসত আলী মাথা নাড়লেন, বললেন, “হ্যাঁ!” “একশোটা টিকেট তুই কেন কিনলি?” ফরাসত আলি তখন তাঁকে সবকিছু খুলে বললেন-কেমন করে তাঁকে লটারির টিকেট কিনতে হল তার পুরো বৃত্তান্ত। সব শুনে ফারুখ বখত বললেন, “মন খারাপ করিস না। ধরে নে টাকাটা দান করেছিস। লটারির টাকা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের আশ্রয় কেন্দ্র বানানো হবে, অনেক বড় সৎকাজ।” “তবুও এতগুলি টাকা খামোখা” “ঠিক আছে পঞ্চাশটা আমাকে দিস।” “পঞ্চাশটা?” “হ্যাঁ। বাকিতে। এখন পকেটে টাকা নেই, যখন হবে দিয়ে দেব।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৫৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ স্কুলের নাম পথচারী (৩২) (শেষ)
→ স্কুলের নাম পথচারী (৩১)
→ স্কুলের নাম পথচারী (৩০)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৯)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৮)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৭)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৬)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৫)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৪)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২৩)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২২)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২১)
→ স্কুলের নাম পথচারী (২০)
→ স্কুলের নাম পথচারী (১৯)
→ স্কুলের নাম পথচারী (১৮)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...