বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
গাব্বু (২)
"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)
X
রিফাত হাসান এয়ারপোর্টে নেমে সত্যি সত্যিই একটু বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তিনি মোটেও আশা করেননি এয়ারপোর্টে এতজন সাংবাদিক হাজির হবে। তাদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোতে তাঁর চোখ রীতিমতো ধাঁধিয়ে গেল। তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে মন্ত্রণালয়ের যে জুনিয়র অফিসারটা এসেছে সে অনেক কষ্টে সাংবাদিকদের ঠেলে রিফাত হাসানের কাছে গিয়ে বলল, “স্যার আমি আপনাকে নিতে এসেছি। আপনার সাথে আমার ই-মেইলে যোগাযোগ হয়েছিল।”
রিফাত হাসান মনে হয় একটু ভরসা পেলেন, বললেন, “তুমি ইউসুফ?”
“জি স্যার।”
“থ্যাংক গড।” তারপর গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এত সাংবাদিক কেন এসেছে?”
“আপনি স্যার একজন ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। সাংবাদিকেরা তো আসবেই।”
“আমি আবার সেলিব্রেটি হলাম কবে থেকে?”
“কী বলেন স্যার! সারা পৃথিবী আপনাকে এখন এক নামে চেনে।”
“কে বলেছে? মোটেও সারা পৃথিবী চেনে না। আমি ইউনিভার্সিটির মাস্টার, অন্য মাস্টারদের সাথে যোগাযোগ আছে, সাধারণ পাবলিক আমাকে চিনবে কেন? সাধারণ পাবলিক চেনে ফিল্মস্টারদের। ফুটবল প্লেয়ারদের। তারা হচ্ছে। সেলিব্রেটি।”
ইউসুফ মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের দেশে আপনি হচ্ছেন আসল সেলিব্রেটি। ফেসবুকে আপনাকে নিয়ে কী হইচই হয় আপনি জানেন না?”
“উঁহু, জানি না।” রিফাত হাসান আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই সাংবাদিকেরা তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তেজী চেহারার একটা মেয়ে একেবারে তার মুখের কাছে মাইক্রোফোন ধরে বলল, “আপনি কতদিন পর দেশে এসেছেন?”
রিফাত হাসান কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি যে পার্টিকেল আবিষ্কার করেছেন তার নাম কী?” একই সাথে আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “এই পার্টিকেলটাকে কী রিফাত পার্টিকেল ডাকবে?” তার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখন কী নিয়ে গবেষণা করছেন?” সিরিয়াস ধরনের একজন কঠিন মুখে জিজ্ঞেস করল, “বাংলাদেশে কি বিজ্ঞানচর্চার সত্যিকারের সুযোগ আছে?” কমবয়সী একটা মেয়ে সবার গলাকে ছাপিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশ কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আপনি মনে করেন।”
রিফাত হাসান একেবারে হকচকিয়ে গেলেন, এতজন সাংবাদিকের এতগুলো প্রশ্ন, তিনি কোনটি ছেড়ে কোনটির উত্তর দেবেন? হাত তুলে বললেন, “আস্তে! আস্তে! সবাই একসাথে প্রশ্ন করলে তো আমি কারও প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারব না!”
কম বয়সী মেয়েটি গলা উঁচিয়ে বলল, “আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন–”
তার গলা ছাপিয়ে আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কতদিন পর দেশে এসেছেন?”
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রশ্ন থেকে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সোজা, তাই রিফাত হাসান এই প্রশ্নটার উত্তর দিলেন, বললেন, “আঠার বছর।”
“এতদিন পর দেশে এসে আপনার কেমন লাগছে? আপনি কী কী পরিবর্তন দেখছেন?”
“আমি এখনো এয়ারপোর্ট থেকেই বের হতে পারিনি, তাই এখনো কিছুই দেখতে পারিনি। অনুমান করছি দেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ফর এক্সাম্পল, এই এয়ারপোর্টটাই অনেক বড় আর আধুনিক হয়েছে। নিশ্চয়ই দেশেও এরকম আরো অনেক পরিবর্তন হয়েছে।”
সবাইকে ঠেলে মুশকো জোয়ান টাইপের একজন সাংবাদিক সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কতদিন দেশে থাকবেন?”
রিফাত হাসান বললেন, “তিন দিন। আমি তিন দিনের জন্যে দেশে এসেছি।”
“মাত্র তিন দিন? আঠার বছর পরে এসে আপনি মাত্র তিন দিন থাকবেন?”
রিফাত হাসান একটু থতমত খেয়ে বললেন, “আমি আবার আসব। তখন আমি সময় নিয়ে আসব। আমি কথা দিচ্ছি এর পরের বার আসতে আমার আর আঠার বছর লাগবে না।”
তেজী চেহারার মেয়েটা বলল, “এই তিন দিন আপনার প্রোগ্রাম কী?”
“আমি বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে এসেছি, তাই বেশির ভাগ সময় দেব এই মন্ত্রণালয়ের সাথে। এ ছাড়াও আমি দেশের অধ্যাপক-গবেষকদের সাথে কথা বলব। দুটি ইউনিভার্সিটিতে দুটি টক দিতে হবে–”
মুশকো জোয়ান সাংবাদিকটা কনুই দিয়ে অন্যদের ঠেলে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং গবেষণা নিয়ে আপনার একটা কমেন্ট প্লীজ–”
রিফাত হাসান মাত্র এসেছেন, এ ধরনের বিষয় কিছুই জানেন না, কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না, তখন বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র অফিসার ইউসুফ তাঁকে রক্ষা করল। সে রিফাত হাসানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এখন আপনারা স্যারকে যেতে দিন প্লীজ। স্যার অনেক লম্বা ফ্লাইটে এসেছেন, খুবই টায়ার্ড। হোটেলে গিয়ে স্যার রেস্ট নেবেন। কাল সকালে স্যারের জরুরি মিটিং।”
কম বয়সী মেয়েটি গলা উঁচিয়ে বলল, “একটা প্রশ্ন। খালি একটা প্রশ্ন-”
ইউসুফ মুখ কঠিন করে বলল, “না। কোনো প্রশ্ন না। এখন আর কোনো প্রশ্ন না। স্যার যখন সাংবাদিকদের ব্রিফিং করবেন তখন আপনারা আসবেন, যত খুশি প্রশ্ন করবেন। এখন স্যারকে যেতে দিন, প্লীজ।”
সাংবাদিকেরা রিফাত হাসানকে যেতে দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাল না, তখন ইউসুফ সবাইকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে একটু জায়গা করে রিফাত হাসানকে নিয়ে এগুতে থাকে। সাংবাদিকেরা পেছনে থেকে ছুটতে থাকে, ছবি তুলতে থাকে। তার মাঝে কোনোভাবে রিফাত হাসান এয়ারপোর্টের সামনে রাখা গাড়িটাতে উঠে পড়লেন।
গাড়িটা ছেড়ে দেওয়ার পর রিফাত হাসান একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “বাবারে বাবা! শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেলাম।”
ইউসুফ বলল, “না স্যার। পুরোপুরি ছাড়া পাননি। ওই দেখেন মোটর সাইকেলে করে পিছু পিছু আসছে।”
রিফাত হাসান তাকিয়ে দেখলেন সত্যি সত্যি একটা মোটরসাইকেলে করে দুজন সাংবাদিক গাড়ির পাশাপাশি যেতে যেতে চলন্ত গাড়ির ছবি তোলার চেষ্টা করছে। রিফাত হাসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির সিটে মাথা রাখলেন। সেভাবে খানিকক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থেকে রিফাত হাসান বললেন, “আঠার বছরে দেশের কত পরিবর্তন হয়েছে। আমি কিছুই চিনতে পারছি না!”
ইউসুফ বলল, “আঠার বছর অনেক লম্বা সময় স্যার, এই সময়ে আসলেই অনেক পরিবর্তন হতে পারে।”
“তাই তো দেখছি। কত চওড়া রাস্তা, হাজার হাজার গাড়ি, বড় বড় বিল্ডিং, পুরো শহরটাকেই অচেনা লাগছে।”
“আমাদেরই অচেনা লাগে! আপনার তো লাগতেই পারে–কতদিন পরে এসেছেন।”
রিফাত হাসান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমার আরও আগে আসা উচিত ছিল। এতদিন পরে দেশে এলে দেশ মনে হয় অভিমান করে দূরে দূরে থাকে। অপরিচিতের মতো ভান করে।”
রিফাত হাসানের গলার স্বরে একটু দুঃখ দুঃখ ভাব ছিল, ইউসুফ তাঁর দিকে একবার তাকাল, কিছু বলল না। রিফাত হাসান অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বললেন, “আসলে খুব ছেলেবেলায় আমার বাবা-মা মারা গেছেন–আমি বিদেশে চলে গেছি। আমার দুই ভাইবোন, তারাও বিদেশে, এখানে সে রকম ক্লোজ আত্মীয়স্বজনও নেই। তাই দেশের সাথে সে রকম সম্পর্ক ছিল না। কাজকর্মের এত চাপ, দেশে আসার সময়ও পাইনি।”
ইউসুফ বলল, “এতদিন পর দেশে এসেছেন–আপনার নিজের জন্যে কোনো সময়ই তো দেখছি না, মিটিংয়ের পর মিটিং।”
“হ্যাঁ। একটার পর একটা মিটিং, না হয় সেমিনার।”
“আলাদা কোনো কিছু করার প্ল্যান কি আছে স্যার?”
রিফাত হাসান মাথা নাড়লেন, বললেন, “নাহ্ সেরকম কোনো প্ল্যান নেই! শুধু ছেলেবেলায় যেখানে ছিলাম সময় পেলে সেই জায়গাটা একটু হয়তো দেখে আসতাম।”
“আপনাকে নিয়ে যাব স্যার।”
“তোমাকে নিতে হবে না। আমি নিজেই খুঁজে বের করে নেব।”
ইউসুফ হাসল, বলল, “পারবেন না স্যার। আপনি নিজে নিজে যেতে পারবেন না।”
“কেন পারব না?”
“সাংবাদিকদের উৎপাতে। আগামী তিন দিন সাংবাদিকেরা আপনাকে এক সেকেন্ডও একা থাকতে দেবে না। সারাক্ষণ আপনার পিছু পিছু লেগে থাকবে। এই দেখেন পেছনে একটা টিভি চ্যানেলের গাড়ি, সামনে আরেকটা। একটা মোটরসাইকেল তো আগেই দেখেছেন-এখন দেখেন দুই নম্বর মোটরসাইকেলও চলে এসেছে। আমি লিখে দিতে পারি এর মাঝে হোটেলে অনেকে পৌঁছে গেছে।”
রিফাত হাসানকে কেমন জানি আতঙ্কিত দেখায়। শুকনো গলায় বললেন, “কেন? আমার পেছনে কেন?”
ইউসুফ বলল, “কারণ আপনি শুধু সেলিব্রেটি না, আপনি হচ্ছেন ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটি। এই দেশে তো রোল মডেলের খুব অভাব, তাই যদি কোনোভাবে একজনকে পেয়ে যায়, তার আর ছাড়াছাড়ি নেই। এই দেশের সব মানুষ আপনার কাজকর্ম ফলো করছে। ফেসবুকে আপনার বিশাল বিশাল ফ্যান ক্লাব, পত্রিকায় প্রত্যেকদিন আপনার ওপর আর্টিকেল বের হচ্ছে!”
“কী বলছ তুমি?”
“আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না স্যার। আগামী তিন দিন আপনি এক সেকেন্ডও একা থাকতে পারবেন না। আমার মনে হচ্ছে পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া আপনার বের হওয়া যাবে না।”
রিফাত হাসান শুকনো মুখে বললেন, “কী সর্বনাশ!”
ইউসুফ বলল, “আই অ্যাম সরি স্যার।”
.
হোটেলে পৌঁছানোর পর দেখা গেল ইউসুফের কথা সত্যি-বেশ কয়েকজন সাংবাদিক হোটেলের সামনে ভিড় করে আছে। গাড়ি থামতেই তারা ছুটে এল, কয়েকজন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করে, কিন্তু ইউসুফ কাউকে কোনো সুযোগ দিল না। রিফাত হাসানকে রীতিমতো টেনে হোটেলের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলল। হোটেলের গেটে দারোয়ান কোনো সাংবাদিককে ভেতরে ঢুকতে দিল না, রিফাত হাসান নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now