বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ছুটির দিন। সকাল নয়টার মতো বাজে। নয়টার মতো বাজে এই কারণে বলা হচ্ছে কারন সময়টা ঠিক করে বলতে পারছেনা তুষার। তার হাতে একটা খয়েরি বেল্টের ঘড়ি দেখা গেলেও সেটা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে আজ সকালেই। রাতেও দিব্যি ছিল সে দেখছে, ঘুমোতে যাবার আগেই বালিশের নিচে রাখা ঘড়িটাতে সময় দেখেছে। সকালে সেই ঘড়ির খবর নেই! এইসব ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের বিশ্বাস নেই। এই আছে তো পরের মুহূর্তে নেই। একদম মানুষের মতো অবস্থা। যে মানুষটা হাসিখুশি ঘুরে বেড়াচ্ছে,সকালে বাসার সবার সাথে নাস্তা খেতে খেতে দেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করল,সেই মানুষটা টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়েই মাথা ঘুড়িয়ে আবার নিচে পড়ে গেল। গেল তো গেলই আর উঠল না। ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ এইরকম একটা গান আছেনা? কার যেন গান? তুষার চোখ বন্ধ করে শিল্পীর নাম মনে করার চেষ্টা করল।ইদানীং তার কিছুই মনে পড়ছেনা। একটা জিনিস এক জায়গায় রেখে পরে অন্য জায়পগায় পাগলের মত খুঁজে।
তুষারের মা এখন এখানে থাকলে গানের প্রথম লাইন শুনেই পুরো গান গেয়ে ফেলতেন। শিল্পীর নামসহ। এই মহিলার ভান্ডারে যে কি পরিমান গান তা মনে হয় তিনিও জানেন না। একটা সময় তার মার গলায় সারাক্ষন গান লেগে থাকতো। তুষারের বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি দেখে তিনি অনেক কথা শোনাতেন। মাথা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে। মা মাথা ঝুলিয়ে, হাত নাড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছেন আর সে সামনে বসে গালে হাত দিয়ে কথা শুনে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটা তুষারের খুব প্রিয়। তিনি অবশ্যই বলতেন বন্ধ ঘড়ি হাতে দিতে হয়না। এতে সময়ের রাস্তায় বাধা দেওয়া হয়। সময়ের রাস্তায় বাধা দিলে সময়ও তোমার জন্য আটকে থাকবে! এই ধরনের উদ্ভট কথা তার মা বলেন। মহিলা সব কিছু নিয়ে নিজে নিজেই কথা তৈরী করতেন। শুধু তৈরী করেই ক্ষান্ত থাকতেন না। নিজে বিশ্বাস করতেন, অন্যকেও বিশ্বাস করানোর জন্য লেগে থাকতেন। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখত তার মা যা বলছেন তাই হয়ে যাচ্ছে! সে বিশ্বাস করে ফেলত তার মায়ের অনেক ‘পাওয়ার’! তখন না বুঝলেও এখন সে ঐ পাওয়ার ব্যাপারটা বোঝে।
রাস্তার পাশের এক চায়ের দোকানে বসে তুষার এসব দুনিয়াদারীর চিন্তা-ভাবনা করে যাচ্ছে। এখন নিশ্চয়ই দশটা বেজে গেছে। সে তো এখানে এসেছে অনেকক্ষন হয়েছে। অনেকক্ষনটা আসলে কতক্ষন?এই দোকানের মামার কাছেই সে সময় দেখতে পারে। মামা তার দোকানের টিনের বেড়ায় লোহা গেঁথে লাল রঙের গোল একটা ঘড়ি ঝুলিয়ে রেখেছেন। এখানে আসার আগে মেসের ম্যানেজারের কাছে সময় জেনে এসেছে, এখন এই দোকানী মামার কাছে শুনতে হবে। ঘড়ি নষ্ট থাকলে যা হয়। এ ওর কাছে জিজ্ঞেস করে বেড়াতে হবে। এমন জিজ্ঞেস করে করে কদিন কাটবে কে জানে! নতুন ঘড়ি কেনার পয়সা তার নেই। এখন দোকানদাররাও হয়েছে খারাপ। আমেরিকার ঘড়ি বলে চাইনিজ মাল গছিয়ে দেবে। তার থেকে বরং এটা সারানোর একটা চেষ্টা নিতে হবে। তুষার আবার তার ঘড়ির দিকে তাকালো। নষ্ট জিনিস সাথে নিয়ে ঘোরার কিছু নেই। কিন্তু এটা নিয়ে সে যে এত যে ভেবে যাচ্ছে তার কারণ ঘড়িটা সে উপহার পেয়েছে। ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় বসার আগে তার বাবা এটা কিনে হাতে পড়িয়ে দিয়েছিলেন। উপহারের মাধ্যমে দোয়া। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে ঘড়িতে ফুঁ দিয়ে দিয়েছিলেন। তুষার বাবাকে বলেছিল, তাকে না দিয়ে কেন ঘড়িটাকে দেওয়া হচ্ছে! পরীক্ষা তো সে দেবে, ঘড়ি তো দেবেনা! ছেলের কথা শুনে তার বাবা খুব হেসেছিলেন। মাকে বললেন, তোমার ছেলের বুদ্ধি দেখ! দেখবে রাবেয়া এই ছেলে একদিন বিরাট ‘আহিম’ হবে। তখন আহিম শব্দটার মানে সে জানত না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দিতেন।সে জিজ্ঞেস করেনি। পরে করবে ভেবে কথাটা তুলে রেখেছিল। কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে করার ব্যাপারটা ক্লাস ফাইভে পড়া বাচ্চার মাথায় ছিলনা। ভুল সময়ের কারণে প্রশ্নটা আর বাবাকে করা হয়নি। কারণ তিনি তার চারদিন পরে মারা গেলেন। তুষারের বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়া হলনা। শুধু বৃত্তি কেন সে বছরের ফাইনাল পরীক্ষাও আর দেওয়া হয়নি। বাবার মৃত্যুর কারণে না, তার প্রতি রাতে হওয়া অল্প অল্প জ্বর আসলে টাইফয়েড ছিল!শরীরে একশ চার ডিগ্রি জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
তুষার অপেক্ষা করছে, দশটা বাজার অপেক্ষা। একজন মানুষের সাথে আজ তার দেখা করার কথা। তারই বাড়ির কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে সে বসে আছে। প্রথম কিছুক্ষন সে এই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাড়ি দেখে তার হতভম্ব ভাব কিছুতেই কাটছিল না। বিশাল লাল রঙের এই বাড়ি দেখে মনে হচ্ছিল তাতে আগুণ ধরেছে। গেটের সামনে উর্দি পড়া মাঝবয়েসী দারোয়ান। এটেনশন ভঙ্গীতে কাঠের টুলের উপর বসে আছে।দেখে মনে হচ্ছে এই বাড়ির ভেতর কারো ঢুকতে হলে তাকে মেরে-টেরে ঢুকতে হবে! তুষারের এই বাড়ির মধ্যে ঢুকতে হবে ঠিকই কিন্তু কাউকে খুন করে নিশ্চয়ই নয়! খুন করার এই আজগুবি কথা তার মাথায় এল কেমন করে? তার কাছে চিঠি আছে, ভেতরে ঢোকার চিঠি। তাদের শহরের কমিশনার সাহেবের চিঠি। তিনি তুষারের বাবার বিশেষ পরিচিত। আচ্ছা,চিঠিতে যদি কাজ না হয়? বাড়ির মালিক বাড়ি আছেন নাকি ছুটি পেয়ে ঘুরতে চলে গেছেন? বড়লোকের বিশ্বাস নেই, ছুটি কি ছুটি ছাড়াও তারা ব্যস্ত। মহা ব্যস্ত। ইউরোপ-আমেরিকা করে বেড়াচ্ছে। তার সেই লোক কি আছে না নেই।দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে দেখবে নাকি? চিঠি দেখাবে? এই দারোয়ান ব্যাটা লেখাপড়া জানে তো।! চোখে দেখি আবার চশমাও আছে। সোনালী ফ্রেমের গোল চশমা। তাকে একদম মানায়নি। চেহারায় একটা বাঁদর ভাব চলে এসেছে! তার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে।চোখে স্পষ্ট সন্দেহ। আজব তো, তার চেহারায় কি সন্দেহ করার মত কিছু আছে? একটা আয়না থাকলে দেখা যেত। ইদানীং অনেকে পকেটে ছোট্ট আয়না, একটা চিরুনী থাকে। তার বন্ধুদের কাছেও দেখেছে তুষার। তার ইচ্ছা করেনি রাখতে। এখন মনে হচ্ছে থাকলে খারাও হত না। বসে বসে নিজের চেহারা দেখে সময় পার করা যেত। নিজের চেহারা সবার কাছেই প্রিয়। দারোয়ান ব্যাটা দেখি চশমার ফাঁকা দিয়ে তাকাচ্ছে, ইস ভাবখানা এমন উনি মহা পন্ডিত এসেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের খালাতো ভাই। আরে গেটের সামনে দাঁড়ালেই কি তুষার ঢুকে পড়বে নাকি? আর ঢুকলেই বা কি? তুষার কি চোর ছ্যাঁচোড় নাকি? নাকি বড়লোকের গেটের সামনে পাবলিকের দাঁড়ানোও নিষেধ!চশমাওয়ালাকে একটু চমকে দিলে কেমন হয় ? বলা, এই যে ব্রাদার যেভাবে তাকাচ্ছেন তাতে চোখ খুলে সামনে রাস্তায় পড়ে যেতে পারে! তখন চশমার কি গতি হবে! আমার চেহারায় কি চোর ভাব আছে নাকি? স্কুল মাস্টারের ছেলে আর যাই হোক চোর না,মশাই। বলে দেখবে নাকি? নাহ থাক, এখনই ঝামেলা করে লাভ নেই।
তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? চেনে না, জানে না একজন বয়ষ্ক সম্পর্কে সে কি সব কথা ভেবে যাচ্ছে। গা চিড়বিড় করা রোদ উঠেছে এই সকালেই।গরমে মাথা টাতা খারাপ হয়ে যাচ্ছেনা তো? মা এসব কথা শুনলে দুঃখী দুঃখী চোখে তাকাতেন। যেন তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না তার ছেলে এমন ধরনের কথা বলতে পারে। কিন্তু তার মা না জানলেও সে পারে, তাকে কঠিন কথাই বলতে হয়। সে রাস্তা পার হয়ে ঝাপড়া চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসল। এখানে একটু ছায়া আছে। তারপর থেকে তুষার এখানেই বসে আছে।
আশফাক উদ্দিনের জন্য ছুটি শব্দটা বেশ দামী। তাঁর প্রতিদিনের ডিকশনারীতে অনেক খুঁজতে থাকলে মাঝে মাঝে দু’একটা ছুটি পেলেও পাওয়া যেতে পারে। পুরো সপ্তাহ তাকে ছোটার উপর থাকতে হয়। এই ফ্যাক্টরি থেকে সেই ফ্যাক্টরি। মাঝে মাঝে ফ্যাক্টরিতে গন্ডগোল বাঁধলে আরেক ঝামেলা। অবশ্যি ঝামেলার তেমন কিছু নেই। তিনি খুব ভালো করে ঝামেলা মেটাতে জানেন। সারাজীবন মিটিয়ে চলেছেন। আজ ছুটির দিনে তিনি কোন কাজ রাখেননি। আজ একটা বিশেষ দিন। তাঁর কন্যার জন্মদিন।এইএকটি মেয়ে তাঁর।মেয়ের বিশেষ দিনে আশফাক উদ্দিনের কোন কাজ থাকেনা। থাকলেও সেগুলো তিনি অন্য কারো হাতে তুলে দেন।তার সব কাছে অফিসে, বাসা তিনি ঝামেলামুক্ত রাখেন। তবুও কেউ কেউ দেন-দরবার নিয়ে বাসায় চলে আসে। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়না। তবে আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো না।আজ সারাদিন তিনি কাটাবেন মেয়ের সাথে। মেয়ে তাকে একদমই কাছে পায় না, কিন্তু এসব নিয়ে অভিযোগও করেনা। বড় শান্ত মেয়ে তারিন।
দিনের বেশিরভাগ সময় তারিন তার ঘরেই কাটায়। তার ঘর দোতলায়। নিচে খুব দরকার না পড়লে নামে না।আগে কলেজে যাওয়ার দরকার পড়ত,এখন সেটাও বন্ধ।
খাবার তারিন নিজের ঘরেই খায়। খালেকের মা নামের একজন মহিলা তারিনের দেখাশোনা করেন। তিনি তারিনের জন্মের অনেক আগে থেকেই এই বাড়িতে আছেন। শ্যামলা দেখতে, শক্তপোক্ত গড়নের মহিলাটির বয়সটা ঠিক আন্দাজ করা যায় না। খালেকের মা কতবছর ধরে এই বাড়িতে আছেন, নিজেও হিসাবটা সঠিক করে বলতে পারেন না। তার প্রধান কাজ তারিনের যত্ন করা। যদিও সে সুযোগ তিনি খুব একটা পান না। বেশিরভাগ সময় তারিন তার নিজের কাজ নিজেই করে। মাঝে মাঝে বাবার টুকটাক কাজ সে করে দেয়, বাবা না করেন। কিন্তু ওর ভালো লাগে বাবার জন্য কিছু করতে। রাতের খাবার খাওয়ার আগে তারিন প্রতিদিন বাবাকে ফোন করে। যদি একদিন তিনি তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে পারেন, একসাথে রাতের খাবার খেতে পারেন। বেশিরভাগ সময়ই আশফাক উদ্দিন তা পারেননা। তাঁকে ফিরতে হয় গভীর রাতে।
অন্যদিন সকালে ঘুম থেকে দেরি করে ওঠেন আশফাক উদ্দিন। আজ ব্যতিক্রম হল। ভোরেই বিছানা ছাড়লেন তিনি। দিনের সামান্য অংশও নষ্ট করতে চাননা। হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকে নিজের হাতে দু’কাপ কফি বানিয়ে নিলেন। সকালের প্রথম কফি হাতে মেয়ের ঘুম ভাঙ্গানো যাক। বাবার হাতের কফি তারিনের খুব পছন্দ। তার থেকেও পছন্দ কফির গন্ধ। সে কাপটা দু’হাতে ধরে চোখ বন্ধ করে নাকের কাছে ধরে। ঘ্রান নেয়।কালো কফির ঘ্রান পেলেই তারিনের মাঝে একটা চনমনে ভাব ফুটে ওঠে। আশফাক সাহেব কিছুদিন ধরেই মেয়েকে মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াতে দেখছেন, সারাদিন একা থাকে মেয়েটা। তিনি নিজেও সময় দিতে পারেননা। খালেকের মা আছে, সে পারলে তারিনের জন্য জান দিয়ে দেয়। খালেকের মা তারিনের কোন অসুবিধাই হতে দেবেনা। তবু আশফাক উদ্দিনের চিন্তা দূর হয়না।
তারিন জেগেই ছিল, তার ঘুম ভাঙ্গানোর দরকার পরলো না। সে তো ঘুমায়নি, তাকে জাগানোরও কিছু নেই। সারারাত জেগে চুপচাপ বসে ছিল। প্রথম কিছুক্ষন গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করেছে, কিছুদূর পড়লেই হাই ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে বই বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে। কি অদ্ভুত, চোখ বন্ধ তো ঘুম উধাও। তারপর চালিয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত চিকিতসা। লো নোটের গান ঘুম এনে দেয়। কত গান বেজে গেল, ঘুম তো দূরের কথা এবার হাই পর্যন্ত উঠলো না। এই কান্ড আজ নতুন না। গত চার দিনে তার সর্বোচ্চ চার ঘন্টাও ঘুম হয়েছে কিনা কে জানে। সেটা সমস্যা না। না ঘুমিয়ে আরো অনেক বেশি রাত কাটানোর রের্কড তার আরো আছে। সমস্যা হচ্ছে যখন না ঘুমিয়ে সারারাত বসে বসে সে কিসব যেন দেখছে। আগে ভেবেছে স্বপ্ন দেখছে কিন্তু না ঘুমোলে স্বপ্নটাই বা আসবে কোত্থেকে। ও কি জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে? নাকি এসব হেলুসিনেশন? তারিন কোথায় যেন পড়েছিল, কয়েক রাত টানা না ঘুমোলে মানুষ আজগুবি সব জিনিস দেখে। অচেনা সব মানুষ দেখে, যাদের তারিন আগে কখনো দেখেনি। কিন্তু মানুষ তো স্বপ্নে দেখে তাদেরই যাদের সাথে কোন কোন সময় দেখা হয়েছে। অবশ্যি তারিনের ব্যাপারটা তো ঠিক স্বপ্নও না। তাই বলে এমন! তারিনের মারাত্মক ভয় করে। মায়ের কথা খুব মনে পড়ে, মা কাছে থাকলে তারিন মায়ের কাছে শুয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে থাকতো। তখন নিশ্চয়ই আর ভয় করতো না তার।সেটা চাইলেও সম্ভব না। তারিনের মা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে কেপ টাউন নামের একটা শহরে থাকেন। একদম অন্য একটা মহাদেশে থাকেন। সেখান থেকে তারিনকে চিঠি পাঠান, উপহার পাঠান। কিন্তু এসব থেকেও যেটা তারিনের চাই তা হল মায়ের গন্ধ, মাকে। একা ঘরে তার ইচ্ছা করে কাউকে ডেকে আনতে, এই ঘরে ঘুমোতে বলে।খালেকের মা খালাকে বললেই মাটিতে চট করে বিছানা করে ফেলে বলবে, ‘আম্মাজান ডর ভয় নাই, লিশ্চিন্তে ঘুমান।আমি জাগনা আছি’। আগে ভয় পেলে তারিন তার মাকে ডাকত, মা আসতেন না। কিন্তু খালেকের মা আসতেন। এই মহিলার ঋণ শোধের ক্ষমতা তারিনের মতো সাধারন একটা মেয়ের নেই। কিন্তু যদি কখনো তাকে খালার দরকার হয় তারিন তার সাধ্যমত করবে। কিন্তু এখন আর সে কাউকে ডাকে না। গুটিশুটি মেরে বিছানায় পড়ে থাকে।
আশফাক সাহেব মেয়ের ঘরের দরজায় টুকটুক করে দুটো টোকা দিলেন। এটা তাঁর কোড। মেয়ে বুঝবে তার বাবা এসেছে। তিনি দরজা ধাক্কা দিলেন,খোলা ই ছিল। মেয়ে ঘুম থেকে উঠানোর প্লান বানচাল হয়ে গেল। তারিন খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। মুখ-চোখ ফোলা ফোলা। ঘুম থেকে কেবল উঠেছে সে? যাক ভালোই হল, বাপ-বেটিতে মিলে বেড-কফি খাওয়া যাবে।
তুষার অনেকক্ষন ধরে শান্ত ভঙ্গিতে চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চে বসে আসে।ঘড়িতে দশটা আগেই বেজে গেছে। দোকানের কটকটে লাল ঘড়ি জানান দিচ্ছে সময় দশটা বেজে বিশ মিনিট। এখন তাকে উঠতে হবে। ‘মায়াবিলাস’ নামের বিশাল টাইপের বাড়িটাতে ঢুকতে হবে। তাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেটা ঠিকঠাক পালন করতে হবে। বাড়ির ভেতর প্রবেশ নিয়ে সে সামান্য চিন্তায় আছে। তুষার উঠে রাস্তা পার হল, আস্তে আস্তে হেটে বাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়ালো। চশমাওয়ালা দারোয়ান টুলে বসে ঝিমাচ্ছে। এরা এত সহজে ঝিমুতে ঝিমুতে ঘুমিয়ে পড়তে পারে! তুষার শার্টের বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করল। হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল দারোয়ানের দিকে।
মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আশফাক সাহেব যখন নিচে নামিয়ে এনেছেন তখন বেলা চড়ে গেছে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঝলমল করছে সব। তারিনের হাত ধরে আশফাক উদ্দিন বাগানের দিকে নিয়ে এলেন।এই বাগান তাঁর খুব শখের। সময় পেলেই এখানে চলে আসেন তিনি। অনেকদিন ধরে সময়ও হচ্ছেনা। বাগানে আসাও হয়নি। আজ তিনি আর মেয়ে মিলে অনেকক্ষন বেড়াবেন। তারিনের মুখ হাসিহাসি। তাকে দেখে কেউ বলবেনা কতগুলো রাত সে না ঘুমিয়ে,ভয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। বাবার বাহু ধরে আছে সে। অনেক ভালো লাগছে ওর।
ফুল ছেঁড়া আশফাক সাহেবের পছন্দ না। তবুও মেয়ের বিশেষ দিনে তিনি তাঁর বাগানের সব থেকে বড় আর সুন্দর গোলাপটি ছিঁড়লেন ।
মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ দিস ইস ফর মাই প্রিন্সেস’
তারিন হাসল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ বাবা, কিন্তু তুমি তো কখনো ফুল ছেড়ো না। আজ যে...’
‘তুমি খুশি হয়েছ ফুল পেয়ে’
‘ এটা আবার বলতে হবে বাবা’
তারিন আবার বাবার বাহু আঁকড়ে ধরল, তারা দুজন মিলে গল্প করছে। চমৎকার দৃশ্যটা সহজে তারা দেখেনা। তারিনকে তারা খুব বেশি দেখেই না। আজ কি ভালোই না দেখাচ্ছে বাপ-মেয়েকে।দুজন মালী হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
গেটের বাইরে দারোয়ান ঝগড়া জুড়ে দিয়েছে তুষারের সাথে। সে কোন ভাবেই গেটের ভেতর তুষারকে ঢুকতে দেবেনা।
‘ কইলাম তো আপনে ঢোকতে পারবেননা, নিয়ম নাই। সাহেবরে দরকার হইলে আপিসে যান’ কড়া গলায় বলল দারোয়ান।
তুষার তার হাতে ধরা চিঠি দেখালো। দারোয়ান আরো জোরে জোরে মাথা নাড়লো।
‘ ভাই এইসব চিঠি ফিটি আমি বুঝিনা। সাহেব বাড়ি নাই, যান গা ভাই। বিরক্ত কইরেন না দেখি’।
তুষারের মেজাজ গরম হয়ে গেল। সে দারোয়ানের দিকে ঝুঁকে এসে হিসহিসিয়ে বলল, তোমার সাহেব যে বাড়ি আছেন সে খবর নিয়েই এসেছি,মিথ্যা বল কেন! নিজের ভালো আর তোমার সাহেবের ভালোর চাও না? কি চাও না? হ্যাঁ, এই তো। আমি জানতাম চাও। তাহলে গেট খুলে দিতে হবে। নয়ত আমি অন্য ব্যবস্থা করব’।
বাইরের চেঁচামেচির শব্দ ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে। আশফাক উদ্দিন মালীকে বললেন ঘটনা দেখে আসতে। মালীকে গেট পর্যন্ত যেতে হলনা। দারোয়ান গেট ভেতর থেকে বন্ধ করে নিজেই আশফাক উদ্দিনের কাছে চলে এল। গড়গড় করে ঘটনা বলে গেল। আশফাক উদ্দিনের তেমন ভাবান্তর হল না। এমন প্রায়ই হয়। অনেকেই বাসায় এসে ঝামেলা পাকাতে চায়। এদের পাত্তা দিতে নেই। পাত্তা দিলেই মাথায় চড়ে বসবে। হাজার চেষ্টা করেও মাথা থেকে নামানো যাবেনা। তিনি দারোয়ানকে বললেন গেট বন্ধ করে রাখতে। এসব পাগল গেটের বাইরেই থাকুক।
তুষার সমান তালে গেটে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। তার প্রচন্ড জেদ হচ্ছে। তাকে যেভাবেই হোক ভেতরে ঢুকতেই হবে। খুব জরুরী কাজটা করে ফেলতে হবে।
ঘটনা দেখে মজা পেয়ে গেল তারিন। তার উনিশ বছরের জীবনে খুব কমই মজার জিনিস দেখছে। আজ এই ঘটনায় সে যথেষ্ঠ উত্তেজনা বোধ করল। বাবার হাত ধরে বলল, ‘ বাপি আসতে দাও না তাকে ভেতরে, হয়ত তার কাজটা জরুরী।
আশফাক মেয়ের হাত ধরলেন, ‘হতে পারে মা, কিন্তু আজ সারাদিন শুধু তোর। বাইরের লোক নট এলাউড প্রিন্সেস’।
তারিনের হাসিটা দপ করে নিভে গেল, সেটা খেয়াল করলেন বাবা। তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘ গেট খুলে দাও’। আশফাক খুব ভালো করে জানেন এটা ঠিক হচ্ছে না। ব্যাপারটা রিস্কি। সাথে তারিন আছে। মেয়েকে তিনি কোন ভাবেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন না। তবু জন্মদিনের দিন মেয়ে মুখ কালো করে ঘুরবে এটাও তিনি মানতে পারছেন না।
তুষার শান্ত মুখে হেটে এসে আশফাক উদ্দিনের সামনে দাঁড়ালো। তার চেহারায় অস্থিরতার কোন ছাপ নেই। কে বলবে এই ছেলেটি এতক্ষন ধরে গেটের ওপাশে এত ঝামেলা করছিল! তুষার তার পকেট থেকে চিঠিটা বের করে সামনে বাড়িয়ে ধরল। এ চিঠি অন্য চিঠি।
বাবার ছাইবর্ন হয়ে যাওয়া মুখ দেখে তারিন চমকে উঠলো। কি আছে চিঠিতে এমন? পড়তে পড়তে বাবার কপাল ঘামছে কেন! সে তার বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো , আঁচল দিয়ে কপাল মুছিয়ে দিল। কিন্তু কিছু বলল না।
আশফাক উদ্দিনের উনিশ বছর আগের একটা দিনের কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা, তারিখটা কত ছিল? চব্বিশে মে? সেটা তো আজকের দিন! তিনি ভুলে গেলেন কেমন করে? তাঁর শরীর ঘেমে গেল, বুকের পাশটায় একটু ব্যথা ব্যথা করছে নাকি?
তুষার আশফাক উদ্দিনের মুখে দিকে তাকিয়ে রইল। এত ক্ষমতাবান একজন মানুষ একটা চিঠি পড়ে ভয় পেয়ে গেলেন? তার না অনেক ক্ষমতা? অনেক টাকা, যে টাকা দিয়ে তিনি মানুষ খুন করেও পার পেয়ে যেতে পারেন! তুষার সাবধানে বুকের ভেতর থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দিল।
তারিন অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে, তাকে এত চেনা লাগছে কেন? আগে কি কখনো দেখা হয়েছে? নাহ, সে তো বাইরেও তেমন যায় না। তাহলে কোথায় দেখেছে একে? যার হাতে চিঠি ছিল? কোথায় দেখেছে সে?
তুষার জানে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার আজ জন্মদিন। সে তাকে নিয়ে যেতে এসেছে। চিঠিটা পাঠিয়েছেন তুষারের মা। এই মহিলা তার ছেলেকে পাঠিয়েছেন আশফাক নামের মানুষটাকে শেষ করে আসতে। আজ তুষারের বাবার মৃত্যুদিন। মহিলাটি তার স্বামী আর মেয়ে দুজনকে একই দিনে, একজন মানুষের কারণেই হারিয়েছেন। মানুষটি আশফাক উদ্দিন। যে এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কই তুষারের তো তাকে ভয়ংকর ক্ষমতাশালী মনে হচ্ছেনা। মনে হচ্ছেনা তিনি অন্যের মেয়ে জোর করে কেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। বরং তুষারের মনে হচ্ছে তার সামনে ভীতু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। খুব ভীতু। তুষার কি তাকে আরো ভয় পাইয়ে দেবে। নাহ, সে এসেছে তারিনকে নিয়ে যেতে। তার কাজ এই পর্যন্তই। সেটাই এই মানুষটার শাস্তি।
তুষার ধীর পায়ে তারিনের দিকে এগিয়ে গেল, ঝট করে তারিনের মনে পড়ে গেল এই মানুষটাকে সে স্বপ্নে দেখেছে। অবিকল তেমনই দেখতে। সে এত অবাক হয়ে গেল বলার মতো না। ওদিকে বাবা বুক চেপে বসে আছেন। তাঁর কি হার্ট এটাক হচ্ছে। এমন ছটফট করছেন কেন তিনি? এত ঘামছেন কেন বাবা। ডাক্তারকে এখনই ফোন করা উচিত।তারিন শক্ত করে তার বাবার হাত ধরল।
আশফাক উদ্দিনের ঘেমে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তুষার। তারিন শক্ত করে তাঁর হাত ধরে আছে। প্যান্টের পকেটে থাকা রিভালবারটাকে একবার স্পর্শ করে হাত বের করে আনল ও। তারিনের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে সে তার মাথায় হাত রেখে একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ শুভ জন্মদিন বোন’।
তারিনও ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আমি কি তোমাকে চিনি?’
তুষার জবাব দিল না, সে হাঁটতে শুরু করেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now