বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ক্যালাইডোস্কোপ – রে ব্র্যাডবেরি

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আবিরুল ইসলাম আবির(guest) (০ পয়েন্ট)

X (অনুবাদ গল্প) ভাষান্তর - আবিরুল ইসলাম আবির যেন কোনও এক অদৃশ্য দানবের কোপ। তারই প্রথম ঝটকায় উপর থেকে ফর্দাফাঁই হয়ে গেল রকেটটা! আর ভিতরের মানুষগুলো খলবলে রঙিন মাছের ঝাঁকের মতো ছড়িয়ে পড়ল মহাকাশের শূন্যতায়। অন্ধকারের এক নিঃসীম সমুদ্রের গভীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল ওরা। আর ওদের মহাকাশযানের লক্ষ কোটি টুকরো ভেসে যাচ্ছিল এমনভাবে, দেখে মনে হবে নিরুদ্দেশ কোনও সূর্যের সন্ধানে চলেছে উল্কার ঝাঁক। ‘‘বার্কলে, বার্কলে, তুমি কোথায়?’’ শীতের রাতে হারিয়ে যাওয়া কোনও শিশু যেন তার মা’কে খুঁজছে। ‘‘উডি, উডি!’’ ‘‘ক্যাপ্টেন!’’ ‘‘হলিস, হলিস, আমি স্টোন।’’ ‘‘স্টোন, আমি হলিস। তুমি কোথায়?’’ ‘‘জানি না। উপর-নীচ সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কেবল বুঝতে পারছি, আমি পড়ে যাচ্ছি! হে ঈশ্বর!’’ ওরা পড়ে যাচ্ছে। কুয়োর গভীরে যেভাবে তলিয়ে যায় খোলামকুচি। রঙিন মার্বেল যেভাবে ঝাঁক বেঁধে মাটিতে আছড়ে পড়ে ইতিউতি ছিটকে যায়। মানুষগুলো আর গোটা মানুষ রইল না। এখন ওরা কেবলই কণ্ঠস্বর। দেহহীন। অথচ আবেগে ভরপুর। তাতে থরথর আতঙ্কের জলছাপ। ‘‘আমরা পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।’’ কথাটা যে সত্যি তা হলিস বুঝতে পারছিল। এক অস্পষ্ট সঙ্কেত ওর উপলব্ধিতে জেগে উঠছিল। ওরা সকলে ক্রমেই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা আলাদা পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনও ভাবেই আর ওদের এক করা যাবে না। ওদের পরনে আঁটোসাঁটো স্পেসস্যুট। বিবর্ণ মুখে এঁটে রয়েছে গ্লাস টিউব। কিন্তু ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না আবারও নিজেদের ফোর্স ইউনিটকে লক করা। করতে পারলে ওরা মহাকাশে তৈরি করে ফেলত একটা ছোট লাইফবোট। বেঁচে যেত। তাহলেই ওরা সবাই বেঁচে যেত। একটা ইউনিট, মানুষ দিয়ে তৈরি একটা দ্বীপ হয়ে উঠতে পারলেই কোনও না কোনও প্ল্যান ঠিকই করে ফেলা যেত। কিন্তু কাঁধের সঙ্গে লেগে থাকা ফোর্স ইউনিটগুলি জুড়তে না পারায় ওরা এখন এক-একটা উল্কা মাত্র। যে অচেতন উল্কাগুলি ছিটকে যাচ্ছে নিজের নিজের নিয়তি ও গন্তব্যের দিকে। মিনিট দশেক পর প্রাথমিক আতঙ্কের রেশটা মিলিয়ে গেল। তার স্থান নিল একটা ধাতব রিনরিনে শূন্যতা। মহাশূন্যের ভিতরে ভেসে বেড়াতে লাগল ওদের কণ্ঠস্বরগুলি। যেন এক বিরাট অলীক তাঁত অন্ধকার এফোঁড় ওফোঁড় করে বুনে যাচ্ছিল এক চূড়ান্ত নকশা। ‘‘স্টোন টু হলিস, আমরা কতক্ষণ এভাবে ফোনে কথা বলতে পারব?’’ ‘‘সেটা নির্ভর করছে কত দ্রুত তুমি তোমার পথে মিলিয়ে যাবে, আর আমি আমার পথে… তার উপরে…’’ ‘‘আমি হয়তো আর ঘণ্টাখানেকেই…’’ ‘‘হ্যাঁ, তাই লাগা উচিত।’’ শান্ত ও আনমনা স্বরে বলল হলিস। ‘‘এরকম কী করে হলো?’’ মিনিট খানেক বাদে বলল হলিস। ‘‘কী আবার। রকেটটা ফেটে গেল। রকেট তো ফেটে যেতেই পারে।’’ ‘‘তুমি কোন দিকে চলেছ?’’ ‘‘মনে হচ্ছে আমি চাঁদে গিয়ে ধাক্কা দেব।’’ ‘‘আমার ভাগ্যে পড়েছে পৃথিবী। দশ হাজার মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে ছুটে চলেছি সেই আমাদের কবেকার পুরনো মাতৃপ্রতিম গ্রহটার দিকে। এবার কেবল একটা দেশলাইয়ের মতো জ্বলে ওঠার অপেক্ষা।’’ হলিসের মনের মধ্যে একটা উৎকট বিমূর্ত চিন্তা পাক খেয়ে গেল। নিজের শরীরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সে নিজেকেই দেখতে লাগল… ওই তো পাক খেতে খেতে মহাকাশের অসীম শূন্যতার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। বহুদিন আগে এক শীতের মরশুমে এভাবেই সে বরফ পড়তে দেখেছিল। বাকিরা সকলেই নিস্তব্ধতার ভিতরে লীন হয়ে রয়েছে। সকলেই ভাবছে নিজেদের ভাগ্যের কথা, যা তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। এক অনিবার্য পতন এবং কোনও ভাবেই তাকে রুখতে না পারার অসহায়তা। এমনকী ক্যাপ্টেনও নিশ্চুপ। সেও জানে তার আর কোনও নির্দেশ কিংবা পরিকল্পনাই তাদের আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ‘‘ওহ, নীচে কী দীর্ঘ পথ! কী দীর্ঘ পথ নীচে, ওহ! এক দীর্ঘ দীর্ঘ পথ… নীচের দিকে,’’ এক কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘‘আমি মরতে চাই না, আমি মরতে চাই না! ওহ, নীচের পথ কী দীর্ঘ!’’ ‘‘কে তুমি?’’ ‘‘আমি জানি না।’’ ‘‘আমার মনে হচ্ছে তুমি স্টিমসন। স্টিমসন, তুমিই তো?’’ ‘‘কী দীর্ঘ পথ! আমার ভালো লাগছে না। হে ঈশ্বর, আমার ভালো লাগছে না।’’ ‘‘স্টিমসন, আমি হলিস। তুমি শুনতে পাচ্ছ আমার কথা, স্টিমসন?’’ তারা পরস্পরের থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছিল। মুহূর্ত যেন থমকে রইল কিছুক্ষণ। ‘‘স্টিমসন?’’ ‘‘হুঁ?’’ অবশেষে উত্তর এল। ‘‘শান্ত হও স্টিমসন। আমরা সকলেই এই বিপদের মধ্যে পড়েছি।’’ ‘‘আমি এখানে থাকতে চাই না। আমার তো অন্য কোথাও থাকার কথা।’’ ‘‘নিশ্চয়ই আমরা কোনও উপায় খুঁজে পাব।’’ ‘‘অবশ্যই পাব। অবশ্যই। আমি এসব বিশ্বাস করি না।’’ স্টিমসন বলল, ‘‘আমি বিশ্বাস করি না এটা সত্যিই ঘটছে।’’ ‘‘এটা একটা দুঃস্বপ্ন।’’ কেউ একজন বলল। ‘‘চুপ করো।’’ সেই কণ্ঠস্বরকে ধমকে বলল হলিস। ‘‘এসো। পারলে আমার কাছে এসে চুপ করিয়ে যাও আমাকে।’’ সেই কণ্ঠস্বর বলল। এটা অ্যাপলগেটের কণ্ঠস্বর। সহজ গলায় হাসল সে। তারপর আবার বলল, ‘‘এসো না! চুপ করিয়ে যাও আমাকে।’’ এই প্রথম নিজের অবস্থানের অসম্ভাব্যতাকে অনুভব করতে পারল হলিস। একটা আগুনে রাগ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। এই মুহূর্তে সে কেবল চাইছিল অ্যাপলগেটকে একটা শিক্ষা দিতে। বহু বছর ধরেই সে এটা চেয়ে এসেছে। কিন্তু আর যে তা সম্ভব নয়। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন অ্যাপলগেট একটা টেলিফোনিক কণ্ঠস্বর মাত্র। পতন, পতন, পতন… পতনের সেই নিঃসীম আতঙ্ককে আবিষ্কার করতে পেরে দু’জন মানুষ ভয়ে চিৎকার করে উঠল। একটা দুঃস্বপ্নের ভিতরে হলিস দেখতে পাচ্ছিল তাদের একজন চিৎকার করতে করতে ভেসে চলেছে ওর খুব কাছ দিয়ে। ‘‘থামো!’’ মানুষটা ওর একদম সামনে, চিৎকার চলেছে উন্মত্তের মতো। সে কানেও নেয়নি হলিসের নির্দেশ। হলিস বুঝল লোকটা থামবে না। এভাবেই চিৎকার করতে করতে লক্ষ লক্ষ মাইল পেরিয়ে যাবে। আর যতক্ষণ রেডিওর পরিসীমার মধ্যে থাকবে, এভাবেই সকলকে বিরক্ত করে চলবে। কেউ কারও সঙ্গে এখন আর কোনও কথা বলতে পারবে না। হলিস এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। সে বুঝতে পেরেছে আপাতত এটাই তার করণীয়। অনেক চেষ্টাচরিত্রের পরে লোকটাকে কোনও মতে ছুঁতে পারল সে। চেপে ধরল তার গোড়ালি। লোকটার মাথা পর্যন্ত পৌঁছতে চাইছিল হলিস। আর লোকটা পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ওকে খামচে ধরতে চাইছিল। ঠিক যেমন ডুবন্ত কোনও মানুষ বাঁচতে চায়। তার বিকট চিৎকারে মহাকাশ পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। মরতে ওকে হবেই। হলিস ভাবল। হয় চাঁদ, নয় পৃথিবী অথবা কোনও উল্কা ওকে মেরে ফেলবেই। তাহলে… তাহলে সেটা এখনই নয় কেন? হলিস নিজের লৌহমুষ্ঠিতে চুরমার করে দিল লোকটির কাচের মুখোশ। থেমে গেল চিৎকার। দেহটা থেকে সরে এল হলিস। এবার নিঃসার দেহটা নিজের মতো পাক খেতে খেতে নীচের দিকে পড়তে থাকবে। ওরা সকলেই পড়ছে। এক দীর্ঘ, অনিঃশেষ পতনের ভিতর দিয়ে চলেছে হলিস ও তার সঙ্গীরা। পাক খাচ্ছে নৈঃশব্দ্যের ঘূর্ণিতে। ‘‘হলিস, তুমি এখনও আছ?’’ হলিস কথা বলল না। সে টের পাচ্ছি‌ল নিজের মুখের উপরে জমা হওয়া একরাশ উত্তাপকে। ‘‘আমি অ্যাপলগেট। হ্যাঁ, আবারও আমি…’’ ‘‘বলো কী বলবে।’’ ‘‘এমনিই… কথা বলো। আমাদের তো আর কিছু করার নেই।’’ অবশেষে ক্যাপ্টেনের গলা শোনা গেল, ‘‘অনেক হয়েছে। আমাদের কিছু একটা করতে হবে এখান থেকে বেরোতে।’’ ‘‘ওহ ক্যাপ্টেন, তুমি চুপ করছ না কেন?’’ খোঁচা দিল অ্যাপলগেট। ‘‘কী!’’ ‘‘নাটক কোরো না। তুমি ঠিকই শুনতে পেয়েছ আমার কথা। শোনো, আমার উপরে আর পদাধিকার ফলাতে এসো না। মনে রেখো, তুমি এখন আমার থেকে দশ হাজার মাইল দূরে। এটা ছেলেমানুষির সময় নয়। স্টিমসন কী বলেছিল ভাবো, নীচে এক দীর্ঘ পথ!’’ ‘‘দেখো অ্যাপলগেট…’’ ‘‘সব দেখতে পাচ্ছি আমি। আমার আর কিস্যু হারানোর নেই। এই শেষ সময়ে তোমাকে জানিয়ে যেতে চাই, তোমার মহাকাশযানটা আসলে একটা জঘন্য যান ছিল। আর তুমিও ছিলে একজন ফালতু ক্যাপ্টেন। মনে মনে কামনা করি চাঁদের মাটিতে গিয়ে সপাটে আছড়ে পড়ো তুমি।’’ ‘‘তুমি…! তোমাকে আমি চুপ করতে নির্দেশ দিচ্ছি।’’ ‘‘হুঃ! যাও যাও! নির্দেশ দাও। যত খুশি দাও।’’ দশ হাজার মাইল দূর থেকে ভেসে এল অ্যাপলগেটের ব্যঙ্গ ভরা হাসি। ক্যাপ্টেন চুপ করে গেছে। অ্যাপলগেট বলে চলেছে, ‘‘আমরা যেন কোথায় ছিলাম হলিস? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। যেটা বলতে যাচ্ছিলাম। শোনো, আমি তোমাকেও ঘৃণা করতাম। আমার ধারণা সেটা তুমি জানতে। অনেক দিন আগে থেকেই জানতে।’’ কথাগুলো শোনার পর নিস্ফল রাগে শূন্যে ঘুষি ছুড়ল হলিস। ‘‘আমি তোমাকে একটা খবর দিতে চাই।’’অ্যাপলগেট বলে চলেছে, ‘‘তোমাকে খুশি করে দিতে চাই একটা সুখবর দিয়ে। পাঁচ বছর আগে তোমাকে রকেট কোম্পানি থেকে সরানোর অন্যতম অভিসন্ধিটা আসলে আমারই ছিল।’’ ঠিক তখনই আকাশে আলো ছড়িয়ে দিল একটা উল্কা। হলিস তাকাতেই বুঝতে পারল তার বাঁ হাতটা আর নেই! রক্ত বেরোতে শুরু করেছে। তক্ষুনি সে এটাও বুঝতে পারল, তার স্যুটের মধ্যে আর বাতাস বইছে না। তবে ফুসফুসে এখনও যথেষ্ট বাতাস আছে। যার সাহায্যে ডান হাত দিয়ে বাঁ কনুইয়ের কাছে একটা নব ঘোরাতে সক্ষম হল হলিস। অবশেষে স্যুটের মধ্যে ফিরে এল আগের স্বাভাবিক বাতাস চলাচল। পুরো ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটল, হলিস একটুও অবাক হওয়ার সময় পেল না। অবশ্য সে কোনও কিছুতেই আর অবাক হচ্ছেও না। ধীরে ধীরে রক্ত চুঁইয়ে বেরোচ্ছে জায়গাটা থেকে। হলিস নবটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরও আঁটোসাঁটো করে দিল যতক্ষণ না সেটা বন্ধ হয়ে যায়। এত কিছু ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও একদম নিঝুম হয়ে ছিল হলিস। বাকিরা অবশ্য কথা বলছিল। এখন লেসপেয়ার নামে একজন কথা বলে চলেছে অনর্গল। নিজের মঙ্গলগ্রহের স্ত্রী, বৃহস্পতির স্ত্রী, শুক্রগ্রহের স্ত্রী-দের সম্পর্কে বলছিল সে। সেই সঙ্গে তার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, তার বিস্ময়কর জীবন, তার নেশাড়ু জীবন, তার জুয়া খেলা, তার সুখ… কত কী নিয়ে নাগাড়ে বলেই চলেছে লেসপেয়ার। সবাই যখন ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, লেসপেয়ার তখন তার অতীত, তার সুখের ভিতরে ক্রমশই ডুবে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত। মহাশূন্য, হাজার হাজার মাইলের মহাশূন্যতার ভিতরে ওদের কণ্ঠস্বরগুলি ভেসে বেড়াচ্ছিল। কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না, কেবল রেডিও তরঙ্গগুলি কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত মানুষগুলির আবেগকে পৌঁছে দিতে চাইছিল একে অপরের কাছে। ‘‘হলিস, তুমি রাগ করেছ?’’ ‘‘না।’’ সত্যিই রাগ করেনি হলিস। তার মনের মধ্যে সেই ঘোরটা আবার ফিরে এসেছে। হলিস বুঝতে পারছে সে এখন এক চেতনাহীন জমাট বাঁধা পদার্থ। যে অনন্তকালের জন্য এক পতনের সম্মুখীন। নির্বিকার। ‘‘তুমি সারা জীবন কেবলই শীর্ষে থাকতে চেয়েছ হলিস। তাই সেবার যা ঘটেছিল ভেবে ভেবেও তার কুলকিনারা পাওনি তুমি। আসলে নিজেকে উপরে তুলে ধরতে আমিই তোমার গায়ে কালির ছিটে দিয়েছিলাম। তুমি বুঝতেও পারোনি।’’ ‘‘এসব কথার আর কোনও গুরুত্ব নেই।’’ হলিস বলল। সত্যিই তো নেই। ওসব এখন অতীত। জীবন ফুরিয়ে এলে তা কেবল একটা উজ্জ্বল ফিল্মের মতো কোন অজানা পর্দায় ফুটে ওঠে। ক্ষণিকের জন্য জীবনের সব রং ঘনীভূত হয়ে ফুটে থাকে মহাশূন্যে। কিন্তু তুমি যেই চেঁচিয়ে উঠতে যাবে, ‘‘ওই তো আমার সুখের দিন! সবচেয়ে খারাপ দিন! ওই মুখটা ছি্ল শয়তানি ভরা, এই মুখটা নিষ্পাপ!’’ ব্যাস, কোথায় কী, ফিল্মটা তখনই পুড়ে ছাই হয়ে পর্দা জুড়ে নেমে আসবে নিকষ আঁধার। জীবনের এই প্রান্তসীমায় পৌঁছে পিছন ফিরে তাকালে কেবল একটাই আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে। সেই আক্ষেপ আর কিছুই নয়, কেবল আরও বেশি করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে। সমস্ত মরণাপন্ন মানুষই কি এভাবে ভাবে? যেন, তারা এতদিন বেঁচেই ছিল না? প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জীবনকে তাদের আরও সংক্ষিপ্ত ও সম্পন্ন মনে হতে থাকে। সকলের কাছেই কি ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক ও অসম্ভব লাগে, নাকি এটা কেবল তারই মনে হচ্ছে? হলিস ভাবে। আর তো মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা বড়জোর। ততক্ষণই এইসব চিন্তাভাবনার মেয়াদ। এতক্ষণ পরে আবারও কথা বলে উঠল লেসপেয়ার, ‘‘আমি একটা ভালো জীবন কাটিয়েছি। মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শুক্রে আমার স্ত্রীরা প্রত্যেকেই ছিল ধনী। আর তারা আমাকে সত্যিই ভালোবাসত। আমি একবার মদ্যপ অবস্থায় জুয়ো খেলতে গিয়ে কুড়ি হাজার ডলার হারিয়েছিলাম।’’ যাই হয়ে থাকুক ‌লেসপেয়ার, আজ তুমি এখানে। ভাবল হলিস। আমি এসব কিস্যু পাইনি। যখন জীবন্ত ছিলাম, আমি তোমাকে ভীষণ হিংসে করতাম লেসপেয়ার। তোমার স্ত্রীদের, তোমার সব সৌভাগ্যকে আমি বরাবর হিংসে করে এসেছি। মেয়েরা আমাকে ভয় পেত। তাই আমি মহাকাশে পালিয়ে আসাই স্থির করেছিলাম। এই মহাশূন্য থেকেই মনে মনে মেয়েদের কামনা করতাম। আর সেই সঙ্গে তোমাকে হিংসে করতাম, তোমার চরম নারীসঙ্গের কথা ভেবে। আর তোমার টাকা… কিংবা আর যা কিছু সুখ তুমি তোমার এই উদ্দাম জীবন থেকে আদায় করেছ… সব কিছুকে হিংসে করতাম আমি। কিন্তু এখন, এই ভাবে পড়ে যেতে যেতে, যখন সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, আমি আর তোমাকে হিংসা করি না। এখন তুমিও যা, আমিও তা। এখন মনে হচ্ছে এসব কখনও ছিলই না। হলিস তার মাথাটা টেলিফোনের দিকে ঝুঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘‘ওসব ভেবে আর লাভ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে, লেসপেয়ার!’’ নীরবতা। ‘‘এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ভাবতে গেলে বুঝতে পারবে ওসব কখনওই ছিল না।’’ ‘‘কে তুমি?’’ কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল লেসপেয়ার। ‘‘আমি হলিস।’’ নিজেকে খুব নীচ মনে হচ্ছিল হলিসের। জীবনের নীচতাকে অনুভব করছিল সে। অ্যাপলগেট তাকে আঘাত করেছে। আর তাই হলিস চাইছে পাল্টা কাউকে আঘাত করতে। এই মহাশূন্য আর অ্যাপলগেট তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এবার সে লেসপেয়ারকে বেছে নিয়েছে। ‘‘তুমি এখন এখানে, লেসপেয়ার। তাকিয়ে দেখো, সব শেষ হয়ে গেছে। ফুরিয়ে গেছে। তাই না?’’ ‘‘না-আ-আ।’’ ‘‘যখন কোনও কিছু শেষ হয়ে যায়, তখন মনে হতে থাকে সেটা কখনও ঘটেইনি। এখন তোমার জীবনকে কি কোনও দিক থেকে আমার চেয়ে ভালো বলা যায়? বলতে পারো? কোনও দিক দিয়েই কি…?’’ ‘‘হ্যাঁ, বলা যায়, আমার জীবনটা তোমার জীবনের চেয়ে ঢের ভালো… এখনও।’’ ‘‘মানে? কী করে?’’ ‘‘কেননা আমার সঙ্গে আমার স্মৃতি রয়েছে। সেগুলো আমি চাইলেই মনে করতে পারি।’’ চেঁচিয়ে উঠল লেসপেয়ার। বহু দূরে, রুষ্ট চিত্তে তার সমস্ত স্মৃতিকে সে দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছিল বুকের মধ্যে। হলিস বুঝতে পারল। ঠিকই বলছে লেসপেয়ার। তাদের স্বপ্ন ও স্মৃতিগুলির মধ্যে ফারাক রয়েই গিয়েছে। হলিসের মনে রয়েছে স্বপ্ন। সে কী কী পেতে চেয়েছিল, সেই সব স্বপ্ন। আর লেসপেয়ারের মনের ভিতরে রয়েছে স্মৃতি। সে যা যা পেয়েছে, সেই সব স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির জোরেই একেবারে অব্যর্থ ভাবে হলিসকে হারিয়ে দিচ্ছে সে। ‘‘ধুর! ওই স্মৃতি দিয়ে কী হবে?’’ চেঁচিয়ে লেসপেয়ারকে বলল হলিস, ‘‘এখন, এই মুহূর্তে? কোনও কিছু শেষ হয়ে গেলে সেটা আর থাকে না। এখন আর তুমি আমার চেয়ে ভালো নেই মোটেই।’’ ‘‘তোমার কথার আমি কোনও জবাব দেব না।’’ লেসপেয়ার বলল, ‘‘হয়তো এবার আমার পালা ছিল তোমাকে পাল্টা দেওয়ার। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি এই শেষবেলায় এসে নীচ হতে চাই না তোমার মতো।’’ ‘‘নীচ?’’ লেসপেয়ার তাকে নীচ বলেছে। শব্দটাকে জিভের ডগায় নিয়ে নাড়াচাড়া করল হলিস। যত দূর মনে পড়ে, এই জীবনে সে কখনও নীচতার কাজ করেনি। আসলে নীচ হওয়ার মতো সাহসই হয়নি তার। কিংবা হয়তো এই সময়টার জন্যই সে সারা জীবন ধরে ব্যাপারটা জমিয়ে রেখেছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তের এই নীচতার জন্য। ‘‘নীচ।’’ শব্দটাকে মনের ভিতরে নাড়াচাড়া করছে হলিস। সে বুঝতে পারল তার চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে এসে মুখের উপরে গড়িয়ে নামছে। তার মুমূর্ষু কণ্ঠস্বরটা কেউ শুনতে পেয়ে গেল। ‘‘মন খারাপ কোরো না হলিস।’’ লেসপেয়ার বলল। চমকে উঠল হলিস। ব্যাপারটা অদ্ভুত হাস্যকর! মিনিটখানেক আগে সে-ই অন্যদের জ্ঞান দিচ্ছিল। স্টিমসনকে। আসলে এতক্ষণ নিজের মনের মধ্যে যে সাহসিকতাকে সে অনুভব করছিল, সেটাই তার কাছে সত্যি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে ব্যাপারটা তা নয়। সবটাই ঘটেছে একটা ধাক্কা ও তার অভিঘাতে। সারা জীবনের জমিয়ে রাখা সমস্ত আবেগ এই এক মিনিটে তার ভিতর থেকে ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ‘‘তোমার মনের মধ্যে কী হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি হলিস।’’ কুড়ি হাজার মাইল দূর থেকে বলল লেসপেয়ার। ক্রমে তার কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হয়ে এল। ‘‘আমি কিছু মনে করিনি।’’ কিন্তু আমরা কি সত্যিই এখন সমান সমান নই? আবারও ভাবনাটা পাক খেল হলিসের মনে। এই মুহূর্তে, এখন? কোনও কিছু শেষ হওয়ার অর্থই তো সেটা ফুরিয়ে যাওয়া। সারা জীবনে যা-ই করে থাকো, তাতে কী লাভ হল? তুমিও তো মরে যাবে। আমরা সবাই… আসলে হলিস জানে, এসব তার অনর্থক যুক্তি সাজানোর চেষ্টা। একজন জীবন্ত মানুষ আর একটা শবদেহের মধ্যে ফারাক খুঁজে চলেছে সে। যার একজনের মধ্যে স্ফুলিঙ্গ রয়েছে। আর অন্যজনের মধ্যে রয়েছে জ্যোতি, চির রহস্যে ভরা দ্যুতি। আসলে তার আর লেসপেয়ারের মধ্যে বিচার করলে লেসপেয়ার একটা পরিপূর্ণ সুন্দর জীবন কাটিয়েছে। আর তার ফলে সে এখন একটি ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠেছে। আর হলিস যেন বহু বছরের পুরনো এক লাশ! দু’টো ভিন্ন পথ বেয়ে তারা মৃত্যুর কাছে এসে পৌঁছেছে। যদি সত্যিই মৃত্যুর দেশ থেকে থাকে তবে সেখানে তাদের অবস্থানের পার্থক্য দিন আর রাতের মতো। তাদের জীবনের মতো তাদের মৃত্যুর মধ্যেও এক অসীম ভিন্নতা রয়ে যাবে। তবে একবার মারা গেলে কেউ আর এই সব ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামাবে কি, যেমনটা সে এখন ঘামাচ্ছে? এই সময় হঠাৎই সে বুঝতে পারল তার ডান পায়ের পাতাটাও উড়ে গিয়েছে! তার স্যুট থেকে আবারও বেরিয়ে যাচ্ছে বাতাস। দ্রুত ঝুঁকল হলিস। অনর্গল রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। উ‌ল্কাটা তার গোড়ালি থেকে মাংস ছিড়ে নিয়ে গেছে। ওহ! এই মহাশূন্যে মৃত্যু কী হাস্যকর! হলিস ভাবল, যেন এক অদৃশ্য কসাই তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে। সে হাঁটুর ভালভটা টাইট করে দিল। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। জেগে থাকার চেষ্টা করছে সে। ভালভ টাইট করে দেওয়ায় রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে। বাতাস চলাচল করছে। আপাতত আর কিছুই করার নেই। দ্রুত মহাশূন্যের পথে এভাবে ছিটকে যাওয়া ছাড়া। ‘‘হলিস?’’ ঘুমে আচ্ছন্নের মতো মাথা নাড়ল হলিস। মৃত্যুর অপেক্ষায় ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল সে। ‘‘আমি অ্যাপলগেট।’’ ‘‘হ্যাঁ, বলো।’’ ‘‘এতক্ষণ তোমার কথাগুলো শুনতে শুনতে কয়েকটা কথা মনে হল। এটা ঠিক হল না, বুঝলে। আমাদের সঙ্গে যা হয়েছে তা অত্যন্ত খারাপ। এভাবে মরে যাওয়াটা সত্যিই জঘন্য। আর তার ফলেই আমাদের ভিতরকার সমস্ত তিতকুটে অনুভূতিগুলো বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তুমি… তুমি কি শুনছ হলিস?’’ ‘‘হুম।’’ ‘‘আমি তোমাকে একটু আগে মিথ্যে বলেছি হলিস। আমি তোমার বিরুদ্ধে কখনও কোনও চক্রান্ত করিনি। জানি না কেন তখন কথাগুলো বলে ফেললাম। বোধহয় তোমাকে আঘাত করার জন্যই। আসলে সেই সময় তোমাকে আঘাত করতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। আমরা তো ঝগড়াই করে এসেছি বরাবর। বুঝতেই পারছ, আমি দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। আর তত বেশি করে অনুতাপ জাগছে। তোমাকে ওভাবে নীচ হতে দেখে আমি লজ্জিত। যাই হোক, আমি তোমাকে জানাতে চাই আমিও একটা মূর্খ। তোমায় যা বলেছি তাতে একবিন্দুও সত্যি নেই।’’ হলিসের মনে হল তার থমকে থাকা হৃৎপিণ্ডটা আবার কাজ করতে শুরু করেছে। মনে হল, যেন পাঁচ মিনিট স্তব্ধ থাকার পর ওটা আবার চালু হয়েছে। তার প্রতিটি অঙ্গ আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ধাক্কাটা সে সামলে নিয়েছে। এই একটানা রাগ, আতঙ্ক আর একাকিত্বের পর্বটা বুঝি শেষ হয়েছে। নিজেকে সাত সকালে ঠান্ডা জলে স্নান করা শুদ্ধ এক মানুষ বলে মনে হচ্ছিল তার। যেন প্রাতঃরাশের টেবিলের সামনে একটা দিন শুরু করার অপেক্ষায় সে। ‘‘ধন্যবাদ অ্যাপলগেট।’’ ‘‘ছাড়ো, সে সবের আর দরকার নেই। বিরক্ত কোরো না আমায়।’’ ‘‘এই!’’ ঠিক এই সময় ভেসে এল স্টোনের কণ্ঠস্বর। ‘‘কী হয়েছে?’’ জানতে চাইল হলিস। স্টোন তাদের সকলেরই ভালো বন্ধু। ‘‘আমি একটা উল্কার ঝাঁকের মধ্যে পড়েছি। কী ছোট ছোট সব গ্রহাণু!’’ ‘‘উল্কা?’’ ‘‘মনে হচ্ছে মঙ্গল পেরিয়ে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর যে ঝাঁকটা পৃথিবীতে আসে এটা সেটাই। আমি এটার ঠিক মধ্যিখানে রয়েছি। এটা একটা বিশাল ক্যালাইডোস্কোপের মতো। বিচিত্র সব রং আর আকৃতির খেলা যেন এখানে জড়ো হয়েছে। ওহ ঈশ্বর! কী সুন্দর!’’ নীরবতা। ‘‘আমি ওদের সঙ্গে চললাম।’’ স্টোন বলল, ‘‘বলা ভাল, ওরা আমাকে ওদের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। ওহ, এমন সঙ্গও জোটে কারও কপালে…’’ হলিস দেখতে চাইল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। কেবল মহাশূন্যে জেগে রয়েছে অতিকায় সব হিরের টুকরো। সঙ্গে আরও দামি সব রত্নখণ্ড। মহাশূন্যের মখমল কুয়াশায় মিশে রয়েছে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বরের মতো জাগ্রত স্ফটিকের থমথমে অগ্নিশিখা। সে অবাক হয়ে কল্পনা করছিল স্টোন একরাশ উল্কার ঝলকানির মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে হারাচ্ছে না। আগামী লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মঙ্গলের পথ পেরিয়ে সে ফিরে আসবে পৃথিবীর কাছে। ওই উল্কাদের মতোই স্টোনও এখন চিরকালীন এবং অসীম। ছোটবেলায় সূর্যের দিকে মুখ করে ক্যালাইডোস্কোপে চোখ রাখলে যেভাবে রং আর আকার বদলে বদলে যেত সেভাবেই সেও পরিবর্তিত হতে থাকবে। হয়েই চলবে। ‘‘আমি এখন অনেক দূরে হলিস!’’ স্টোনের কণ্ঠস্বর আরও ম্লান হয়ে এল, ‘‘অনেক দূরে…’’ ‘‘শুভ কামনা!’’ তিরিশ হাজার মাইল দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল হলিস। ‘‘মজা কোরো না।’’ স্টোন বলল। আর তারপর সব মিলিয়ে গেল। নক্ষত্রেরা নিভে গেল যেন। সমস্ত কণ্ঠস্বর মিলিয়ে যেতে লাগল। সবাই যে যার নিজস্ব কক্ষপথে। কেউ মঙ্গলের দিকে। কেউ আরও দূরে মহাকাশের সুদূর কোণে। আর হলিস… সে নীচের দিকে ন‌ামছিল। তাদের দলের মধ্যে একমাত্র সে-ই ফিরে আসছিল পৃথিবীতে। ‘‘অনেক দূর!’’ ‘‘মন শক্ত করো।’’ ‘‘অনেক দূরে, হলিস!’’ অ্যাপলগেট বলল। কত রকমের বিদায় সম্ভাষণ! শেষ বিদায়ের বহুবর্ণ অস্তরাগ পেরিয়ে মেধাবী মস্তিষ্কগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। রকেটের ভিতরে ওই মস্তিষ্কগুলিই এক হয়ে কী চমৎকার দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছি‌ল। রকেটের বিস্ফোরণের পর এবার একে একে তারা সকলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তাদের সকলের জীবন একসঙ্গে ফুরিয়ে আসছে। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করলে দেহও মরে যায়। তাই মহাকাশযানের ভিতরে একসঙ্গে কাটানোর ফলে তৈরি হওয়া তাদের যে যৌথ আবেগ, তাও এখন মৃত। অ্যাপলগেট সেই পিতৃ-শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া একটা আঙুল ছাড়া আর কিছু নয়। তার মনে আর কোনও ঘৃণা নেই, কোনও বিরুদ্ধাচরণ নেই। মস্তিষ্কটাই বুঝি ফেটে চৌচির। এখন কেবল অচেতন, অসার টুকরোগুলির চারপাশে ছড়িয়ে পড়া। সমস্ত কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গিয়ে এখন মহাশূন্য জুড়ে নিবিড় এক নিস্তব্ধতা। কেবল হলিস একা, এক নিয়তি নির্দিষ্ট সুদীর্ঘ পতনের মুখোমুখি। ওরা সবাই এখন একা। ওদের কণ্ঠস্বরগুলি হারিয়ে গেছে। যেন ঈশ্বর উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে গেছে তারার গভীরে। চাঁদের দিকে গেছে ক্যাপ্টেন। স্টোন গিয়েছে সেই উল্কার ঝাঁকের সঙ্গে। ওই যে স্টিমসন! ওই যে অ্যাপলগেট চলেছে প্লুটোর দিকে। ওই তো স্মিথ, টার্নার, আন্ডারউড আর বাকি সকলে। টুকরো টুকরো কাচ মিলে নিরবিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার যে ক্যালাইডোস্কোপটি গড়ে উঠেছিল, তা চুরমার হয়ে গেছে। আর আমি? ভাবল হলিস। আমি কী করব? আমার কি এখন আর কিচ্ছু করার আছে এই ভয়াবহ রিক্ত জীবনে? এই এতগুলো বছর ধরে নিজেরই অজান্তে যে নীচতা আমি তিল তিল করে গড়ে তুলেছি, যদি তাকে মিথ্যে করে দেওয়া যেত একটা মাত্র ভালো কাজ করে! কিন্তু এখন তো আর কেউ নেই। আমি একা! একা একা কি কোনও ভালো কাজ করা যায়? নাহ, সে পারবে না। আজ রাতেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গিয়ে ধাক্কা দেবে হলিস। আর তারপর… আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাব। সে ভাবল। আর তারপর আমার ছাই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে মাটিতে। সামান্য হলেও একটা অবদান রাখতে পারব আমি। হ্যাঁ, ছাই তো ছাই-ই। কিন্তু তাও মাটির যৎসামান্য অংশ হয়ে ওঠে। সে দ্রুতগতিতে পড়ছিল। একটা বুলেটের মতো। একটা নুড়ির মতো। একটা ভারী লৌহখণ্ডের মতো। এখন সে একটা বস্তু, কেবলই একটা বস্তু। দুঃখ, সুখ বা অন্য কোনও আবেগ আর তার মধ্যে কাজ করছে না। তবে সবার বিদায়ের পর কেবল একটাই ইচ্ছে জেগে রয়েছে তার মনের ভিতরে। একটা… যদি একটাও ভালো কাজ সে করে যেতে পারে… যা কেবল সে-ই জানতে পারবে। আমি যখন বায়ুমণ্ডলকে স্পর্শ করব, তখন একটা উল্কার মতো জ্বলে উঠব আমি। উল্কা… উল্কাই তো। ‘‘ভাবলেই অবাক লাগছে।’’ সে বলল, ‘‘কেউ কি আমাকে দেখতে পাবে তখন?’’ ছোট্ট ছেলেটা শহরতলির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘মা, দেখো! তারাখসা!’’ জ্বলন্ত সাদা তারাটি ইলিনয়ের সন্ধ্যাকাশের পথে মিলিয়ে গেল। ‘‘লোকে বলে তারাখসা দেখলে মনে মনে কিছু চাইলে সেটা সত্যি হয়। তুই কী চাইলি? কোন ইচ্ছের কথা জানালি?’’ ছেলেটির মা সদ্য মিলিয়ে যাওয়া আলোর রেখাটির দিকে তাকিয়ে বলল। মূল গল্প: ক্যালাইডোস্কোপ কাহিনি: রে ব্র্যাডবেরি


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now