বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
পাথর........
"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মফিজুল (০ পয়েন্ট)
X
গল্পঃ পাথর
লেখকঃ মোঃ তালহা মুনতাসির
আজ দিনটা সুন্দর। ঝকঝকে আকাশ। সাদা মেঘ গুলো তুলোর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন দিনে বাসে গাদাগাদি করে অফিসে যেতে ভালো লাগে না। আরিফ হোসেন তাই একটি রিকশা নিলেন।
রিকশা জিনিসটা তার পছন্দের। এর মাঝে মুক্তি মুক্তি ব্যাপার আছে৷ গাড়ি আর বাসে বসলে দম বন্ধ হয়ে আসে। রিকশায় এই সমস্যাটা নেই।
অফিসে ঢুকতেই মাহফুজ সাহেবের সাথে দেখা। তার গায়ে হাল্কা নীল রঙের শার্ট। সাথে সুন্দর একটি টাই। তাকে দেখতে ভাল লাগছে।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন, "আরে আরিফ সাহেব! খবর কি?"
আরিফ বললেন, "এইতো ভাই। ভালোই। "
অফিসের ভেতর আজকে সবাইকেই খুশি খুশি লাগছে। তার পাশের টেবিলের জামান সাহেব এমনিতেই তেলতেলে মানুষ। আজ যেন মুখ দিয়ে মধু বের হচ্ছে।
আরিফ সাহেবকে বসতে দেখে বললেন, "ভাই শুনেছেন?"
আরিফ অবাক হয়ে বললেন, "কি শুনবো?"
"আররে ভাই এমন হলে চলে। আপনি দেখি দুনিয়াদারির কোনো খবর রাখেন না। শুনেন তাইলে। আমাদের ডিপার্টমেন্ট বড় দা মেরেছে এবার। দানা- পানি এর পরিমাণ হুলুস্থুল রকমের। বুঝেনি তো পার্টি মালদার। আজকাল এদের কাচা পয়সা। মাল যাচ্ছে আর আসছে। এদের কি অপেক্ষার সময় আছে?"
আরিফ চুপ করে শুনলেন কথা গুলো। তার কিছু বলার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বললেন না। এদের সাথে না জড়াইলেই হলো। এদের কাজ এরা করুক। তার কি?
হঠাৎ জামান সাহেব তার দিকে ঝুকে এলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন, "ভাই আপনি তো আকাশের চাঁদ পেয়ে গেলেন।"
আরিফ লোকটির কথার কোনো অর্থ খুজে পেলেন না। এই অফিসে বদলি হয়েছে তার বেশিদিন হয়নি। তাই এদের এখনো তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না। হুটহাট করে এরা একটা কথা বলে। যার উত্তর তিনি ভেবে পান না।
"ভাইজান দেখি চিন্তায় পড়ে গেলেন। আরে ভাই ভয় নাই। এই লাইন এ আমরা দীর্ঘদিন ধরে আঁছি। ভয়ের কোনো কারণ নাই। আমরা সবাই আপনার কাজ দেখেছি। আপনি যদি ওই শিপমেন্ট টা আটকে না দিতেন। এতো আয় হতো না।"
আরিফ সাহেব কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
"ওদের কাগজ পত্র ঠিক ছিলো না। তাই আটকে দিয়েছি। এতে অন্য কোনো স্বার্থ ছিলো না।
জামান সাহেব তেলতেলে মুখে হাসি দিয়ে বললেন, " আর থাকলেও তো কোনো সমস্যা নাই। এতো পরিশ্রম করি। একটু দানাপানিতে তো ক্ষতি নাই। আর আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি যে যা আয় হয়েছে। এর বড় ভাগ আপনাকে দেব।"
আরিফ ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
"এই মুহুর্তে ভাই এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।"
জামান সাহেব খুবি যুক্তির কথা, এমন ভাব করে বললেন, "অবশ্যই। কিছু দরকার হলে ডাক দিয়েন। আমরা আমাদের দেখবো না তো কে দেখবে?"
আরিফ সাহেব কথার উত্তর দিলেন না। তার চিন্তা অন্য জায়গায়। তার মেয়েটার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এইতো সবে আট বছরে পা দিলো। কিন্তু শরীর টা এতো দুর্বল। সারাক্ষণই কোনো না কোনো অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে। মেয়েটাকে আজকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। সিরিয়াল কালই করে রেখেছিলেন।
অফিসের পিওন করিম হঠাৎ তার কাছে এসে বলল, "স্যার, সুবহান সাহেব ডাইকা পাঠাইসেন আপনেরে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে।"
সুবহান সাহেব সিনিয়র অফিসার। অফিসের একটা বড় ঘরে তিনি বসেন। যে কেউ এই ঘরে প্রথমবার ঢুকলে ভাববেন এখানে কোনো মেয়ে থাকেন। এতো সাজানো গোছানো ঘর এই অফিসে আর দ্বিতীয়টি নেই।
সুবহান সাহেব কি যেন একটা পড়ছিলেন। আরিফ কে দেখে বললেন, "বসুন। ভালো আছেন?"
আরিফ বসতে বসতে বললেন, "জ্বী ভালো। আমাকে ডেকেছিলেন?"
সুবহান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তার দিকে খানিকটা ঝুকে এসে বললেন, "শুনেছেনই তো আমাদের ডিপার্টমেন্ট বড় একটা দাউ মেরেছে।"
"জ্বী, স্যার। শুনেছি।"
"এটাও নিশ্চয়ই শুনেছেন কাজটা আপনার জন্য সম্ভব হয়েছে।"
আরিফ এই কথার জবাব দিলেন না।
সুবহান সাহেব বললেন, "আপনাকে আমরা সবচেয়ে বড় অংশ টা দেব। এই নিয়েই কথা। হক টাকা বহুদিন ধরে জমা থাকে। হাতে আসে না। আর অসৎ টাকা অনেক তাড়াতাড়ি চলে যায়। তো তাই বলছি টাকা টা আজকে কালকের মধ্যে নিয়ে যান।"
আরিফ সাহেব আজ অফিস থেকে একটু আগে আগে বের হলেন। মেয়েটাকে ডাক্তার এর কাছে না নিলেই নয়।
তিনি থাকেন ছোট একটি ভাড়া বাসায়। দুই রুম। তাও বেশ ভালোভাবেই দিন যায় তার। কিন্তু তার স্ত্রী নিপা প্রায়ই তাকে এই নিয়ে খোটা দেন। মাঝেমধ্যেই তাকে বলেন,
"তুমি এই জীবনে আর শোধরাবে না। আমার বোনের স্বামী পিওন আর দেখ বাড়ি বানিয়ে ফেলসে। আর আমার স্বামী অফিসার। সে কিনা দুইরুমের এই গুহায় থাকে। ছি ছি..আমার লজ্জায় মাথা কাটা যায়। "
আরিফ সাহেব তখন সবসময়ের মতো চুপ করে যান। তিনি অসৎ কাজ করতে পারবেন না কখনোই। তার বাবা নূরপুর হাইস্কুলের শিক্ষক মৃত্যু সজ্জায় আরিফ কে কাছে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, "বাবা, তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু আমার এই শেষ আদেশ টা তুমি পালন করবে।"
"জ্বী, বলুন বাবা।"
"তুমি কখনো অসৎ টাকা নিবে না।"
"অবশ্যই নিব না বাবা। আপনি নিশ্চিত থাকুন।"
কতো বছর আগের কথা এসব। হঠাৎ মনে হওয়ার কারনেই হয়তো চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কে জানে কি!
"তুমি এতোক্ষনে আসলে! মেয়েটা অপেক্ষা করে বসে আছে সেই কবে থেকে। এবার একটা ভালো ডাক্তার এর কাছে নিচ্ছো তো? নাকি টাকা নেই।"
নিপার কথা আরিফ গায়ে মাখলেন না।
"টাকা আছে। চিন্তা করো না। আমার মেয়েটার জন্য পারলে নিজে ভাত খাবো না।"
"হ্যা তাই তো পারো!" নিপা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলেন, "জীবনে একটা বাড়তি পয়সা করতে পারলে না। আবার কথা।"
আরিফ প্রতিবারের মতো একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নীলুর আজ খুব আনন্দ। সে এখন আছে বাবা'র সাথে। তার বাবা তার হাত ধরে হাটছেন। তার যে মাঝে মধ্যে খুব অসুখ হয় বাবা কি জানে? কিন্তু বাবাকে দেখলে তার সব অসুখ সেরে যায়। মাও ভালো। কিন্তু একটু বোকা। শুধু শুধু বাবাকে বকা দেয়।
ক্রমেই সন্ধ্যা হয়ে আসে। ওপাশে বসে থাকা অদ্ভুত কেউ রঙ-তুলি দিয়ে বার বার এই আকাশের রঙ পালটে দেন। নীলু প্রাণ ভরে সেই আকাশ দেখে। কি সুন্দর! কি সুন্দর!
ডাক্তার সাদিক এর আজ তেমন ব্যস্ততা নেই। মাঝে মধ্যে এরকম দিন তার ভালো লাগে। আরিফ কে ঢুকতে দেখে বললেন, "বসুন।"
"বলুন কি সাহায্য করতে পারি। মেয়েটিকে নিশ্চয়ই দেখাতে নিয়ে এসেছেন। নাম টা বলো তো মা?"
নীলু হাসিমুখে উত্তর দেয়, "নীলু।"
"বাহ! সুন্দর নাম তো!"
নীলু বলল, "বাবা রেখেছে!"
ডাক্তার সাদিক হাসি হাসি মুখে বললেন, "তাই নাকি!"
নীলু পা নাড়াতে নাড়াতে বলে, "হ্যা।"
ডাক্তার সাদিক সময় নিয়ে মেয়েটির সমস্যা সম্পর্কে শুনলেন। তার কপালে একটি সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন, "আপনি ভাই এক কাজ করেন। এই যে এসব টেস্ট লিখে দিলাম এগুলো এক্ষুনি করে নিয়ে আমার কাছে আসেন। নাহলে কিছু বলতে পারছি না।"
নীলু বাবার সাথে সাথে হাটছে। সে বুঝতে পারছে না বাবার হঠাৎ এতো মন খারাপ কেন।
আসল ঘটনাটা মন খারাপ হওয়ার মতোই। ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট দেখে থমথমে গলায় বলেছেন, "মেয়েটির খারাপ ধরনের লিউকোমিয়া
হয়েছে। এই রোগের চিকিৎসা যে এদেশে নেই তা বলবো না। কিন্তু বাইরে চিকিৎসা না করালে কোনো লাভ হবে না মনে হয়। ফোন নম্বর লিখে দিচ্ছি। আমার স্যার এর নাম্বার। উনিই সব ব্যবস্থা করে দিবেন। ভাই কষ্ট পাবেন না। আল্লাহ আছেন। "
আরিফ সাহেব নিঃশব্দে হাটতে থাকেন। তার সারাজীবন এর সঞ্চয় মাত্র ৪ লাখ টাকা। আরো ছিলো কিছু। গ্রামের বাড়ির ঘরটা ঠিক করতে তা চলে গেছে। মেয়েটাকে চিকিৎসা কিভাবে করাবেন? আরিফ ভেবে পান না।
নিপা খবরটা শুনেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, "আমার ভাগ্যটাই ছাতার ভাগ্য। জীবনে আর সুখ পেলাম না। এখন মেয়েটার কি হবে বলোতো!! বাইরে নিয়ে যেতে হবে তো শীঘ্রই! টাকা আছে তো? নাকি বাবা কে বলব!!"
আরিফ সাহেব স্ত্রী কে শান্ত থাকতে ইশারা করলেন। বললেন, "আমার টাকা নেই নিপা। যা আছে এই টাকায় কিছুই হবে না। প্রয়োজনে সব বিক্রি করে দিব। কিন্তু ভিক্ষা নেব না।"
নিপা থান্ডা চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলেন স্বামীর দিকে। বললেন, "তাহলে তোমার আফিস তো এবার তোমাকে ভালো টাকা দিচ্ছে। কি জানি করেছিলে। মাহফুজ সাহেব কালকে ফোন দিয়ে বললেন।"
আরিফ বললেন, "নাহ নিপা। ঘুষ যে আমি নিতে পারবো না। ঘুষের টাকায় মেয়ের চিকিৎসা আমি করাবো না। বললামি তো আমার যা আছে সব বিক্রি করে ফেলবো। কিন্তু অন্যায় কাজ যে করতে পারব না। বাবাকে যে কথা দিয়েছি।"
নিপা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "তুমি একটা পাথর।"
এক বছর পরের কথা। আরিফ সাহেবের জীবন অনেকটা পালটে গেছে। নীলুর মৃত্যুর পর নিপা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আজকাল শুনছেন নিপার আবার বিয়ের আলাপ চলছে। সময় থেমে থাকে না। এই তো সেইদিন ই নীলুর জন্ম হলো। দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল মেয়েটা। একদিন ওপাশের রহস্যময় কারো হাত ধরে চলেও গেলো। যেন নীলু বলে কেউ কোনোদিন কেউ ছিলো না। সব এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নের মায়া আছে। তাই ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়।
আরিফ সাহেব ফুটপাতে হাটছিলেন। চারপাশে ব্যস্ত সব মানুষজন। এমন সময় কোথা থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে কিছু ফুল নিয়ে তার সামনে এসে দাড়ালো। মেয়েটির বয়স ৮-৯ হবে। সে বলল, "ছার, ফুল লইবেন?"
আরিফ সাহেব ভাবলেন ফুল কার জন্য নেবেন।
নীলুটা খুব ফুল ভালোবাসত। মাঝেমধ্যেই ফুল কেনার বায়না করতো। বলতো, "বাবা! দেখেছ! কি সুন্দর ফুল! আমাকে একটা কিনে দাও না।"
নাহ নীলু আর নেই। এই ফুল ধরারও কেউ নেই।
তিনি মেয়েটিকে বললেন, "ফুল নিয়ে কি করবো রে।"
"কেনো! আপনার পরিবার রে দিবেন!"
আরিফ সাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, "তোর নাম কি রে?"
মেয়েটি মুখটিপে হেসে উত্তর দিলো, "আমার নাম নীলু।"
প্রতিদিনের মতো আজও সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশের লাল সুর্যটাকে আজকে কি সুন্দরই না লাগছে। বাতাসে ফুলের সুবাস। আরিফ সাহেবের মনে হলো নীলু হাসছে। দূর কোথাও হতে বলছে, "বাবা এই যে আমি! আমার জন্য ফুল আনবে না?"
আরিফ সাহেবের চোখে পানি এসে যায়। তিনি মুছেন না। এই ব্যস্ত নগরীতে কেউ কাউকে দেখে না। তার মতো পাথর মানুষদের তো একদমই না!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now