হারিয়ে যাওয়া
X
© Copyright- MD. Ferdous Ibne Abu Bakar
ssc পরিক্ষা শেষে আমি আর আমার কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করেছি যে আমরা এবার সুন্দরবন বেড়াতে যাব। কিন্ত করোনাভাইরাস এর কারণে যাওয়া পিছিয়ে গেল। অবশেষে আমি, রনি, সিয়াম আর জারিক চারজন মিলে গেলাম সুন্দরবন। এর আগে আমি কখনো সুন্দরবন যাইনি। তবে রনির দাদুবাড়ি খুলনায়। তাই সে এখানে অনেকবার এসেছিল।
সুন্দরবন পৌঁছানোর পর আমি এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। সুন্দরবন যে এত সুন্দর, তা আমি কখনো ভাবিনি। সুন্দরবন বনে প্রবেশের সময় রনি আমাদের বলল যে এখানে বন রক্ষীদের জন্য একটি বিশেষ রাস্তা আছে। সেই রাস্তা দিয়ে সে একবার লুকিয়ে লুকিয়ে ঢুকেছিল। সেই যায়গাটি অনেক সুন্দর। তার কথা শুনে আমরাও লুকিয়ে লুকিয়ে সেই রাস্তা দিয়ে বনে ঢুকে পরি।
আমি যখন ভিতরটায় প্রবেশ করলাম, তখন ভিতরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আমার মনে হলো যে আমরা যেন স্বর্গে প্রবেশ করেছি। তাই আমি ভিডিও করতে লাগলাম। আর একটা যায়গাতে আমাদের অনেকগুলো ছবিও তুললাম। দুপুরে আমরা একটা বড় গাছের নিচে বসে কিছু ফলমূল খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। তারপর আবার হাটতে শুরু করি।
যেতে যেতে আমরা বনের আরও গভীরে প্রবেশ করি। এই বনের সৌন্দর্য দেখে এতটাই মুগ্ধ ছিলাম যে আমরা বাড়ি ফেরার কথাই ভুলে যাই। হঠাৎ বাঘের পায়ের ছাপ দেখে আমাদের হুশ ফিরলো।
জারিকঃ সামনে বাঘের পায়ের ছাপ! দেখছিস?
আমিঃ কই?,,,, ও হ্যাঁ ওই তো সামনে।
সিয়ামঃ তাই নাকি দেখি..... জলদি একটা ছবি তুলে নিয়ে আসি।
রনিঃ সিয়াম, ছবি তোলার দরকার নাই। সামনে বাঘ থাকতে পারে। এর চেয়ে ভালো বাড়ি চলে যাই।
আমিঃ হ্যাঁ চল যাই।।
আমরা বাড়ির ফেরার পথ ধরলাম। কিন্তু আধ ঘণ্টা হাটার পর আমরা আবার আগের যায়গাতেই ফিরে আসলাম।
আমিঃ যায়গাটা চেনা চেনা লাগছে..... আরে! আমরাতো আবার ওই একই যায়গাতে আসলাম! দেখ ওই যে বাঘের পায়ের ছাপ!!!
রনিঃ আরে তাইতো,, এখন কি করব??
সিয়ামঃ আমরা কি এই বনে হারায় গেছি??
(জারিক আর সিয়াম কাঁদতে লাগলো)
আমিঃ কেঁদে লাভ হবে না। আমাদের কিছু একটা করতে হবে।.....কিন্তু কি করব।
রনিঃ দেখ তো মোবাইলে নেটওয়ার্ক আসে নাকি??
আমিঃ (মোবাইল পকেট থেকে বের করে).... না নাই....চার্জ
ও প্রায় শেষ। মাত্র 19%।
সিয়ামঃ (চিৎকার) বাঁচাও কেউ আমাদের বাঁচা....(রনি মুখ চেপে ধরলো)
রনিঃ শুউউ..... চিল্লাবি না...... নইলে বাঘ আসতে পারে।
আমিঃ আমার মনে হয় এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না, এর চেয়ে অন্যদিকে যাই।
আমরা পিছন দিকে যেতে থাকলাম৷ ভয় আর হতাশার মধ্যেও আমাদের মনে আশার আলো হাবুডুবু খাচ্ছে। যদি কখনো বাড়ি ফেরার পথ পেয়ে যাই!! এই আশা নিয়ে হাটতে লাগলাম। এই সুন্দরবন যেন আমাদের কাছে মুহুর্তের মধ্যেই অসুন্দর হয়ে গেল।
এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতে যাচ্ছে। একটু পরেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই আমরা আশ্রয় খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু খোঁজার মতো সময়ও নেই। শেষ পর্যন্ত আমরা একটা গাছে আশ্রয় নিলাম। আমাদের ব্যাগে কিছু ফলমূল ছিল, সেখান থেকে একটা আপেল বের করে চারভাগ করে সবাই খেলাম। "যদি কেউ আমাদের উদ্ধার করতে আসে" এই আশা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
রাত হয়ে গেল। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। জোনাকি পোকার আলো আকাশের তারার মতো মিটমিট করে জ্বলছে। আর চারপাশ থেকে ঝিঝি পোকার ডাক একসাথে মিশে এক অদ্ভুৎ আবেশ তৈরি করেছে। এত সুন্দর মনোরম পরিবেশেও আমাদের কারো মনে শান্তি নেই। শুধু বাড়ি ফেরার চিন্তা। জীবনের সব সুখের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে আসছে। আর চোখ থেকে ফোটায় ফোটায় পানি পরছে। জীবনের মূল্য যে এত বেশি তা আমিএর আগে কখনো টের পাইনি।
রাতে আমরা চারজন পালাক্রমে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কারো চোখে ঘুম নেই। মাঝরাতে হঠাৎ মেঘ ডাকতে শুরু করল। বৃষ্টি আসতে পারে। সিয়াম কয়েকটা পলিথিন আনছিল সেটাতে সবার একটা করে জামা আর খাবারগুলো ঢুলিয়ে নিলাম। একসময় মুষলধারে বৃষ্টি পরতে থাকে। প্রায় সারা রাতই বৃষ্টি ছিল।
ভোর হয়ে এলো। জারিকের জ্বর আসছে। আর আমদের সবার খুব ঠান্ডা লাগছে। রাতে জংলী মশা আর পোকামাকড়ের কামড় খেয়ে সারা শরীর খুব চুলচ্ছে। আমাদের ব্যাগটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে দেখি তা নিচে পরে আছে। জারিক ব্যাগটা তোলার সময় যে দৃশ্য দেখলাম তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।........
ব্যাগটা তুলতেই দেখলাম ব্যাগের নিচে একটা বড় সাপ।
আমি আর সিয়ামঃ জারিক, সাপ-সাপ!
(জারিক ব্যাগটা ফেলে দিয়ে সটকে পরল)
অল্পের জন্যে জারিক প্রাণে বেঁচে যায়। সাপটা চলে গেলে আমরা শুকনো জামা পরি। আর আপেল খেয়ে বেরিয়ে পরি বন থেকে বের হতে। কিন্তু কোন দিকে যাব কিছুই বুঝছিলাম না। তাই কিছুদূর গিয়ে থেমে যাই।
জারিকঃ আচ্ছা আমরা কি বন থেকে বের হচ্ছি নাকি বনের আরো গভীরে যাচ্ছি?
রনিঃ জানি না।
আমিঃ তাহলে এগিয়ে লাভ কি?
সিয়ামঃ বের তো হতে হবে
আমিঃ কিন্তু গভীরে গেলে সামনে কোনো হিংস্র জানোয়ার আসলে কি করবি? এর চেয়ে এখানেই থাকার মত একটা যায়গা খুঁজে বের করি।
রনিঃ তুই থাক, আমরা যাই। (রাগ হয়ে)
জারিকঃ আমিও থাকব, যাব না
থাকা আর না থাকা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হয়।
আমিঃ রনি, শোন......…এখন ঝগড়া করার সময় না। আমিও তো বের হতেই চাচ্ছি। কিন্তু কোন দিক দিয়ে যাব সেটাতো আগে ঠিক করতে হবে। আর আগের দিনের মত যদি ঘুরেফিরে ওই একই যায়গাতে বারবার আসি তাহলে কি বের হতে পারব? এর চেয়ে আগে সবাই একটু ভাবি যে করা যায় তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হই।
অবশেষে সবাই একটা যায়গায় বসে প্লান করতে বসলাম।
দুপুর হয়ে গেল। কেউ কোনো ভালো বুদ্ধি দিতে পারলো না। শেষে জারিকের বুদ্ধি অনুযায়ী আমরা বের হলাম।
জারিকঃ আমরা এক কাজ করি, যেই যায়গা দিয়ে যাব, সেখানে কনো
চিহ্ন রেখে আগাই। আর ক্যামেরা আর মোবাইলে তোলা ছবি আর ভিডিও গুলার সাথে এলাকাটা মিলিয়ে দেখতে দেখতে আগাবো।
আমিঃ হুম ম-ম, তা করা যায়। কিন্তু মোবাইলটা অফই থাক। নইলে চার্জ শেষ হয়ে যাবে।
জারিকঃ আচ্ছা
সিয়ামঃ ক্যামেরার চার্জ আছে??
আমিঃ অল্প। কিন্তু রনিরও ক্যামেরা আছে, ওটা use করা হয়নি। ওটার ব্যাটারি লাগালেই হবে।
(রনি আমাকে তার ক্যামেরার ব্যাটারি দিল। তারপর আমরা ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম)
রনিঃ সব ঠিক আছে এখন চল যাই
আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আমরা একটু পর পর কোন দিক থেকে এসেছি তা নির্ণয় করতে মাটিতে তীর আঙ্কন করে চিহ্নিত করে রাখলাম। আর ক্যামেরার ছবি আর ভিডিওর সাথে আশপাশ মিলিয়ে এগোতে থাকলাম।
বিকাল হয়ে গেলো আমরা। খুব ক্লান্ত। কিন্তু বিশ্রাম নেবার সময় নেই। বন থেকে বের হতে হবে। আর বের হতে হলে একটু তো কষ্ট করতেই হবে। তাই আমরা কষ্ট সহ্য করেই এগোতে থাকলাম। কিন্তু কোনো কিছুই ছবির সাথে মিলেছে না। আমরা বের হবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। এমন মূহুর্তে হঠাৎ ….... ছবির সাথে একটা অংশের মিল খুঁজে পেলাম।
আমিঃ মিলে গেছে, মিলে গেছে!!
জারিকঃ ছবি মিলে গেছে?
আমিঃ হ্যাঁ, এই জায়গাতেই আমরা হারিয়ে গেছিলাম।
রনিঃ দেখ তো আমরা কোন দিক থেকে এসেছিলাম
আমিঃ ওই দিক থেকে।
সিয়ামঃ চল জলদি যাই
রনিঃ চল, আর তুই (আমাকে) ফোন দেখতো নেটওয়ার্ক আসে নাকি।
আমিঃ না, এখনো নেটওয়ার্ক আসেনি। চল আগাতে আগাতে দেখি নেটওয়ার্ক আসে নাকি
রনিঃ চল
আমরা এগোতে থাকলাম। পথিমধ্যে অনেকগুলো হরিণ দেখতে পেলাম। সেগুলো ঘাস খাচ্ছিলো। আর আসেপাশের প্রায় সবগুলো গাছেই বানর দেখলাম। সেগুলো আমাদের দেখলেই ডেকে উঠতো। মনে হয় এরা এর আগে কখনো মানুষ দেখেনি। পথ খুঁজে পেতে আমরা একটা বড় গাছের বেশ উঁচুতে উঠলাম। কিন্তু সবদিকেই ঘন বন। দূরে একটা যায়গায় দেখলাম সেখানে গাছ কিছুটা কম। তাই আমরা সেদিকেই যাব বলে ভাবছি।
কিন্তু হঠাৎ বানরগুলো উদ্ভুতভাবে ডেকে উঠলো। আগে থেকেই ডাকছিল কিন্তু এখনকার ডাকটা আগের থেকে আলাদা। আমরা ভাবলাম গাছে উঠেছি দেখে রেগে গেছে। তাই গাছ থেকে নামতে শুরু করলাম। এমন সময় দেখি হরিণগুলোও ছুটাছুটি শুরু করলো। কিছুক্ষণ পরে দেখি একটা বাঘ হরিণগুলার পিছু লেগেছে। তা দেঝে আমরা ঘাবড়ে গেলাম। তখন আমরা সাথে গাছের মগডালে উঠি। তারপর সেখানেই ঘণ্টা খানিক বসে থাকি।
প্রায় এক ঘন্টা পরে আমরা গাছ থেকে নামি। একটু পরেই সুর্য ডুববে। বাঘের ভয় মন থেকে তখনো কাটেনি। কিন্তু তবুও আমরা এগিয়ে চললাম।
সুর্য ডুবে গেছে আর ক্যামেরার ব্যাটারিও প্রায় শেষ ১০-১৫ মিনিট চলতে পারে। আমরা ক্যামেরার লাইট দিয়ে কিছুদূর এগুলাম। একসময় সেটার পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল। চারদিকে অন্ধকার। কিন্তু পূর্নিমা চাঁদের আলোয় কিছুটা দেখা যাচ্ছিলো। আমি মোবাইলটা অন করতেই দেখি নেটওয়ার্ক সামান্য আসছে আর যাচ্ছে।
আমিঃ নেটওয়ার্ক আসছে!!
সিয়ামঃ সত্যি?
আমিঃ হ্যাঁ সত্যি।
জারিকঃ তাহলে কি আমরা বাড়ি ফিরতে পারব
আমিঃ হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ
রনিঃ জলদি 999 এ কল কর
তারপর আমরা 999 এ কল দিয়ে সাহায্য চাইলাম এবং একটা গাছে উঠলাম। কিন্তু এই বিশাল বনে আমাদের খোঁজা আর ফুটবল মাঠে সুই খোঁজা একই কথা।
999 এ কল করার পর আমাদের উদ্ধার করতে উদ্ধারকারি দল সুন্দরবনে ছুটে আসে। এরপর তারা আকাশে হেলিকপ্টার পাঠায় আর আমাদের কল করে বলল যে যখনই কনো হেলিকপ্টারের শব্দ শুনবো তখনই তাদের কল করতে। কিন্তু 15-20 মিনিট পর আমাদের মোবাইলটি অফ হয়ে যায়। একসময় উদ্ধারকারি দল আমাদের কল করে বুঝতে পারে যে আমাদের ফোন বন্ধ।
একসময় তারা অন্য পন্থা অবলম্বন করে। তারা হেলিকপ্টার থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী আলো প্রেরণ করে যেটা 10 কিমি দূরে থেকেও দেখা যায়।
আমরা আকাশে হালকা আলো দেখতে পেলাম। আমরা গাছ থেকে নেমে আলো যেদিক থেকে আসছে সেদিকে হাঁটতে শুরু করি। পূর্নিমার চাঁদের হালকা আলো থাকায় হাঁটা যাচ্ছিল। কিন্তু আধা ঘণ্টা পর তারা আলো বন্ধ করে দেয়। কারণ তারা ভেবেছিল যে আমরা আলো আনেক দূরে আছি তাই আলো দেখতে পাইনি। তবুও আমরা আন্দাজ করে সোজা সামনে কিছুদূর এগুলাম। তারপর আবার আমারা একটা গাছে উঠলাম।
এরপর প্রায় 4 ঘণ্টা পর উদ্ধারকারি দলের হেলিকপ্টার আমদের উদ্ভার করল আর আমরা সুন্দরবন থেকে বেঁচে ফিরতে পারলাম।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now