বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আরিফ আজাদ
____বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
----১৭. তুলি দুই হাত করি মােনাজাত ।
[ক]
পৃথিবীটা ভরে উঠছে হতাশাগ্রস্ত মানুষ দ্বারা। জীবনের সর্বপদে আমরা হতাশ। কেউ ভালাে চাকরির জন্য হতাশ, কেউ ক্যারিয়ার, পড়াশােনা আর ভালাে জীবন-জীবিকার জন্য। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দিনে কতবার আমি ভালাে চাকরির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করি? পরীক্ষায় ভালাে রেজাল্ট, ভালাে একটি ক্যারিয়ার, ভালাে জীবন-জীবিকার জন্যে দিনে কতবার আমি আল্লাহর কাছে হাত পাতি? এমন জরিপের ফলাফলও হবে হতাশাজনক। আমাদের জীবন থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বড় যে সুন্নাহটা বিলুপ্ত সেটা হলাে দুআ। আমরা দুআ করতে ভুলে গেছি। অথচ নবি-জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, তার পুরাে জীবনটাই ছিল আগাগােড়া দুআর সমষ্টি। তিনি ঘুম থেকে উঠে দুআ করেছেন। ওযু করার আগে দুআ করেছেন, ওযু শেষ করে দুআ করেছেন। তিনি নতুন জামা গায়ে দিতে গিয়ে দুআ করেছেন। জুতাে পরতে গিয়েও দুআ করেছেন। ঘর থেকে বের হবেন, দুআ করেছেন। ঘরে ঢুকবেন, দুআ করেছেন। আকাশে নতুন চাঁদ দেখে দুআ করেছেন, মােরগের ডাক শুনে দুআ করেছেন। তিনি সুসংবাদ শুনে দুআ করেছেন, দুঃসংবাদ শুনে দুআ করেছেন। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি কদমে তিনি দুআ করতেন। তার জীবনটাই ছিল একটা দুআর ভাণ্ডার। আর আমরা মনে পড়ে আমরা শেষ কবে দুআ করেছি। অন্তত নিজের জন্য?
কুরআনে বর্ণিত নবি-রাসুলদের জীবনের দিকে তাকালেও আমরা দেখি যে, তাদের জীবনেও দুআর ছিল এক আশ্চর্যরকম প্রভাব। ক্ষুদ্র থেকে বিশাল সবকিছুতে তারা আল্লাহর কাছে দুআ করতেন। আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতেন। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও নবি আইয়ুব আলাইহিস সালাম আল্লাহর ওপর থেকে নিরাশ হননি। দুআ করা ছাড়েননি। মাছের পেটে বন্দি হওয়ার পরেও ইউনুস আলাইহিস সালাম ভুলে যাননি দুআ করার কথা। মুসা আলাইহিস সালামের মুখে ছিল জড়তা। সেই জড়তা দূর করার জন্যেও মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন যা আমরা কুরআনে দেখতে পাই। জীবনের কঠিন-সহজ সকল সময়ে আল্লাহ নবি-রাসুলদের সঙ্গী ছিল দুআ। তারা তাদের জীবনের সমস্ত কিছুকে আল্লাহর দিকে সােপর্দ করে দিয়ে দুআ করতেন। দুআই ছিল তাদের প্রধান বর্ম, প্রধান হাতিয়ার।
[খ]
কেন আমরা দুআ করি না? কারণ, আল্লাহর ওপর থেকে আমাদের তাওয়াক্কুল তথা ভরসা কমে গেছে। অথবা, হতে পারে, দুআর যে আশ্চর্যরকম একটা শক্তি আছে, সেটা উপলব্ধি করতে আমরা ব্যর্থ। নবি-রাসুলদের অন্তর তাওয়াক্কুলে টইটম্বর ছিল বলেই তারা হরহামেশা দুআ করতেন। তাদের কাজকর্মের সবকিছুতে থাকত দুআর আবরণ। আর আমাদের অন্তরে পড়ে আছে বিস্মৃতির প্রগাঢ় প্রলেপ। মরে আছে আমাদের অন্তরাত্মা। তাই আমরা দুআ করতে পারি না। মাথা নােয়াতে পারি না। আল্লাহর কাছে হাত তুলতে পারি না।
আমরা ভুলে যাই, কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম যখন মারইয়াম আলাইহাস সালামের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন, তখন তিনি প্রায়ই দেখতেন মারইয়াম আলাইহাস সালামের কাছে নিত্যনতুন ফলফলাদি আসত। গ্রীমের ফল শীতকালে, শীতকালের ফল গ্রীমে। ফলগুলাে কোত্থেকে আসত সেটা যাকারিয়া আলাইহিস সালাম জানতেন না। কৌতুহলবশত একদিন তিনি মারইয়াম আলাইহাস সালামকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, "হে মারইয়াম! তােমার মেহরাবে আমি ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনাে ব্যক্তি এখানে আসে না। কিন্তু আমার বড্ড জানতে। মন চায়, তােমার কাছে যে নিত্যনতুন ফলফলাদি দেখি, সেগুলে তুমি কোথায় পাও?
মারইয়াম আলাইহাস সালাম বললেন, সেগুলাে আমার আল্লাহ পাঠান।[১] শ্রীমকালের ফল শীতকালে, শীতকালের ফল গ্রীমকালে দেওয়ার ক্ষমতা যে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই রাখেন, এই বিশ্বাস যাকারিয়া আলাইহিস সালামের অন্তরে বদ্ধমূল ছিল। মারইয়াম আলাইহাস সালামকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন নিআমত দান করছেন দেখে যাকারিয়া আলাইহিস সালামের মনে একটি আশার ঢেউ খেলে গেল। তিনি ভাবলেন, আল্লাহ যদি মারইয়ামের ওপর এমন অপার দয়া করতে পারেন, আমাকেও তিনি অবশ্যই একটি সন্তান দিতে পারবেন। এরপর তিনি বিনয় চিত্তে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। বললেন, “হে পরওয়ারদিগার! আমার হাড়গুলাে দুর্বল হয়ে গেছে। সাদা হয়ে গেছে আমার মাথার চুল। আপনাকে ডেকে আমি কখনাে ব্যর্থ হইনি। আর আমার পরে আমার স্বগােত্রীয়দের ব্যাপারে আমি আশঙ্কা করছি। পরওয়ারদেগার! আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। (তবুও আমি আপনার কাছে চাইছি) আপনি আমাকে আপনার পক্ষ থেকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন।[২]
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এই দুআর মধ্যে কতটা বিনয়, কতটা অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন দেখুন! তিনি একটি সন্তান চাচ্ছেন তার বংশপরম্পরা জারি রাখতে। কিন্তু তিনি নিজে বয়ােবৃদ্ধ। তার অবস্থার বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বললেন, আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে। আমার কালাে চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। আমরা কি কখনাে আল্লাহর কাছে এভাবে কিছু চেয়েছি? বলেছি, ‘মাবুদ, আমার আর্থিক অবস্থা খুবই শােচনীয়। আমার কাঁধে আমার বাবা-মা, সন্তান এবং স্ত্রীর দায়িত্ব আছে। আমার হাতে কোনাে মূলধন মজুদ নেই যা দিয়ে আমি ব্যবসায়ে নেমে পড়ব। এমন কোনাে উপায়ও নেই যে, যা ব্যবহার করে আমি আমার পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারব। ইয়া রব, এই মুহূর্তে একটা চাকরির সংস্থান না হলে আমাকে আমার পরিবার পরিজন নিয়ে ভিক্ষা করতে হবে। মাবুদ! রিযিকের মালিক তাে আপনি। আপনার কাছ থেকেই আমাদের রিযিক আসে। আপনার ভান্ডারে তাে কোনাে কিছুর অভাব নেই। হে আমার প্রতিপালক, আপনার ওপরে ভরসা করে আছি। আপনি আমাকে একটি উপায় বাতলে দিন। আমার পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার বন্দোবস্ত করে দিন।
যে যুবকের এখন বিয়ের বয়স, কিন্তু নানান প্রতিকূলতায় তার বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে সে কি কখনাে হাত তুলে আল্লাহর কাছে বলেছে, “ইয়া আল্লাহ, আমার শরীরে এখন যৌবনের উন্মত্ত উন্মাদনা। আমার সামনে-পেছনে, ডানে-বায়ে, ওপরে-নিচে সবখানে ফিতনা আর ফিতনা। ফিতনার এই মায়াজাল ভেদ করে নিজের চরিত্রকে শুদ্ধ রাখা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ইয়া রব, যদি আমার কোনাে ভালাে চাকরি না হয়, যদি আমার আর্থিক অবস্থার কোনাে পরিবর্তন হয়, তাহলে বিয়ে করাটা আমার জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে। মাবুদ, আমি ফিতনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাই। আমি চাই একটি হালাল সম্পর্ক যেখানে আমার চোখ শীতল হবে, আমার হৃদয় তৃপ্ত হবে, আমার অন্তর প্রশান্ত হবে। আপনি তাে সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক। আপনিই পথের ভিখারিকে রাজা বানান, আবার রাজাকে বানান পথের ভিখারি। মাবুদ, আপনার অঢেল, অফুরন্ত ঐশ্বর্য থেকে আমার জন্য কিছু রিযিক নির্ধারণ করুন। আমার জন্য বিয়েটাকে সহজ করে দিন।
যে লােকটার শরীরে বাসা বেঁধেছে দুরারােগ্য ব্যাধি, জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আশঙ্কায় যে অস্থির-চঞ্চল, সে কি কখনাে বলেছে, “ইয়া আল্লাহ, জীবনের কতগুলাে বসন্ত পার করে এসেছি। কত ভালাে ভালাে সময়ে তােমার স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়েছি। তােমার দেওয়া আলাে-বাতাস, তােমার দেওয়া রিযিক ভক্ষণ করে বড় হলেও কখনাে তােমার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করিনি। আজ আমার জীবনের ক্রান্তিলগ্ন! দুনিয়ার সমস্ত আয়ােজন আমার শরীরের বসন্ত ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা আমাকে জানিয়েছে, আমার চোখ বুজবার দিন অতি সন্নিকটে। কোথাও আর কোনাে আশা নেই। কিন্তু তারা হয়তাে জানে না, তাদের আশা যেখানে গিয়ে শেষ হয়, তােমার ভরসার বুদবুদ সেখান থেকে যাত্রা করে। মাবুদ, আমি তাে জানি, তুমিই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধানদাতা। তুমি তাে আশ-শাফী। আরােগ্যদাতা। আমি তােমার দিকে মুখ ফেরালাম। আমি অসহায়, দুর্বল, ছিন্নবত্র এক। তারা বলছে আমার সকল আশা ফুরিয়ে গেছে, অথচ আমার সামনে আশার এক জ্বলজ্বলে প্রদীপ। তুমিই কি আইয়ুব আলাইহিস সালামকে দুরারােগ্য ব্যাধি থেকে আরােগ্য দাওনি? তুমিই কি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য আগুনকে শান্ত-শীতল করে দাওনি? তােমার নির্দেশেই কি দরিয়া ফুড়ে পথ তৈরি হয়নি নবি মুসা আলাইহিস সালামের জন্য? তুমি যার রব, তার কি হতাশ হওয়ার কারণ থাকতে পারে? আমিও হতাশ হচ্ছি না ইয়া রব, আমার শরীরে তুমি আরােগ্য দান। করাে। আমাকে নতুন করে তোমায় ডাকতে দাও, চিনতে দাও।
[গ]
আমরা যে দুআ করি না তার পেছনে অন্যতম আরেকটি কারণ হলাে আমাদের মজ্জাগত স্বভাব। আমরা নগদে বিশ্বাসী। তৎক্ষণাৎ যা পাই তাতেই আমাদের অগাধ বিশ্বাস, অঢেল আস্থা। আমরা বােঝার চেষ্টা করি না যে, শৃঙ্খলা হলাে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একটা পদ্ধতি। তিনি ‘কুন’ বললেই সবকিছু সৃষ্টি হয়ে যায়, তথাপি তিনি পৃথিবী এবং আসমান-জমিন সৃষ্টি করতে আট দিন সময় নিয়েছেন। তিনি ‘কুন’ বললেই যেকোনাে কিছু অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসতে বাধ্য। অথচ মাতৃগর্ভে তিনি আমাদের দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বড় করে তােলেন। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পদ্ধতি। নিয়ম। কিন্তু আমরা এই পদ্ধতি, এই নিয়মের তােয়াক্কা করি না মােটেও। আমরা চাই, আমাদের দুআগুলাে করামাত্র কবুল হােক। যখন দেখি, আমাদের দুআগুলাে আমাদের প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে কবুল হচ্ছে না, দুআর আপাত কোনাে ফল পাওয়া যাচ্ছে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। আস্তে আস্তে দুআ করা ছেড়ে দিই। এই যে আমাদের মজ্জাগত স্বভাব, আমাদের অস্থির চিত্ত, এটার উল্লেখ করেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে বলেছেন, ‘মানুষ বড়ই তাড়াহুড়ােপ্রবণ।[১]
আল্লাহর কাছে আমরা যে দুআ করি, সেই দুআ কবুলের ব্যাপার নিয়ে ড. বিলাল ফিলিপসের খুব চমৎকার একটি কথা আছে। তিনি বলেছেন, আপনি যখন দুআ করেন, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তিনভাবে আপনার দুআর উত্তর দেন।
এক, আপনার দুআর বিপরীতে তিনি বলেন, হ্যাঁ। অর্থাৎ, তৎক্ষণাৎ আপনার দুআ তিনি কবুল করে নেন।
দুই. আপনার দুআর বিপরীতে তিনি বলেন, হ্যাঁ, কিন্তু এখনই নয়। অর্থাৎ আপনার দুআ তিনি কবুল করবেন, তবে সেটা তৎক্ষণাৎ নয়। আপনার দুআ পূরণের জন্য উপযুক্ত সময় কোনটি সেটা আপনি জানেন না। কোন সময়ে কবুল করলে তা আপনার জন্য বেশিই উপকারী, সেই জ্ঞান আপনার নেই, আল্লাহর আছে। তাই তিনি আপনার পছন্দমাফিক সময়ে দুআটা কবুল করেন না। উপযুক্ত সময়ের জন্য আপনাকে অপেক্ষা করান।
তিন. তােমাকে নিয়ে আমার আরও উত্তম পরিকল্পনা আছে। অর্থাৎ দুআর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর কাছে যা চাইছেন, তা হয়তাে আপনার জন্য অকল্যাণকরও হতে পারে। অথবা আপনি যা চাইছেন তাতে আপনার জন্য যে কল্যাণ, তারচেয়ে অধিক কল্যাণকর কিছু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই আপনি দুআ করে যা চান, ঠিক তা-ই অনেক সময় আল্লাহ আপনাকে দেন না। আপনাকে আরও কল্যাণকর, আরও উপকারী বিষয়ের দিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ধাবিত করান।
অস্থির চিত্ত না হয়ে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনাে রকম অবিশ্বাস, সন্দেহ কিংবা সংশয় পােষণ না করে তাঁর কাছে চান। আপনার যেটুকু দায়িত্ব সেটুকু পালন করে বাকি ফলাফলের জন্য তাঁর ওপর ভরসা করুন, ঠিক যে রকম আমাদের নবি মুসা আলাইহিস সালাম করেছিলেন। ফিরাউনের রাজ্য থেকে পালিয়ে তিনি মাদইয়ানে এসেছিলেন। ছিন্নমূল অবস্থায়। সেখানে দুটো অসহায় রমণীর তৃষার্ত বকরিকে পানি পান করিয়ে তিনি কেবল আল্লাহর কাছেই প্রতিদান আশা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে আমার রব, নিশ্চয় আপনি আমার জন্য যে অনুগ্রহ প্রেরণ করবেন, আমি তারই মুখেপাক্ষী।[১] নবি মুসা আলাইহিস সালাম নির্দিষ্ট করে আল্লাহর কাছে কিছুই চাননি। তার কী দরকার—এই ভারটা তিনি আল্লাহর ওপরে ন্যস্ত করে দিয়ে বললেন, আপনি আমাকে যা দেবেন তাতেই আমি খুশি। আমাদের দুআগুলােও হতে হবে এমন। দুআর মধ্যে থাকতে হবে আল্লাহর ওপর পরম নির্ভরতার ছাপ।
বনি ইসরাইল যুগের তিন লােক, যারা আটকা পড়েছিল গুহার মধ্যে, তারাও দুআর মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছিল। বিশাল পাথর এসে যখন আটকে দিয়েছিল গুহার দ্বার, তখন তারা আল্লাহর কাছে আকুল চিত্তে দুআ করেছিল। সেই দুআগুলাে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছিলেন এবং তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন বন্দিদশা থেকে। আসহাবে কাহাফের সেই যুবকেরা, তারা চারপাশের ফিতনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে দুআ করেছিল, আল্লাহ তাদের দুআও কবুল করেছেন। সুদীর্ঘ একটা সময়ের জন্য তাদের তিনি ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। হিফাযত করলেন তাদের ঈমানের। এই কথাটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, আল্লাহ আমাদের দুআগুলাে শােনেন। শুধু আমাদের নয়, যদি কোনাে কাফিরও হৃদয়ের গভীর থেকে আকুলচিত্তে কোনাে
কিছু চায়, দুনিয়াবি কোনাে বস্তু, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার দুআও শুনে থাকেন। একজন কাফির, যে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে কিংবা একজন মুশরিক, যে বহু ইলাহতে বিশ্বাস করে বসে আছে, গভীর বিপদের সময় কিংবা অতীব প্রয়ােজনের তাগিদে সে যখন হৃদয়ের গভীর বন্দর থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য ডাক হাকে, আল্লাহ তার ডাকটিও শােনেন এবং তার প্রয়ােজন পূরণ করেন। আল্লাহ যদি একজন কাফিরের, একজন মুশরিকের দুআ কবুল করেন, আপনার-আমার দুআ কেন তিনি কবুল করবেন না? আমরা তাে আল্লাহতে ঈমান রাখি। তাঁর ইবাদত করি। তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আপনার-আমার চাইতে বেশি হকদার তাে একজন কাফির কিংবা একজন মুশরিক হতে পারে না। তাদের দুআ যদি কবুল হতে পারে, তাহলে নিশ্চিত আমাদের দুআ কবুল হবে।[১] তবে কোনাে কিছু হওয়ার আগের শর্ত হলাে সেটা শুরু করা। আমরা যদি দুআই না করি, আল্লাহর কাছে -ই চাই, তাহলে কবুলের আশা করব কীভাবে? ফসল পেতে হলে তাে মাঠে বীজ বুনতে হবে। বীজ না বুনলে খেত থেকে যেমন আগাছা ব্যতীত কিছু পাওয়া যাবে না, দুআ না করলে জীবনে হতাশা ব্যতীত আর কিছু লাভ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
আমাদের উচিত নয় দুআ করা থামিয়ে দেওয়া। আমাদের এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অবশ্যই আমার দুআ কবুল করবেন। আজ, নয়তাে কাল। আমার দুআ কবুল হতে হয়তাে একটু সময় লেগে যেতে পারে, তবে এই সময় লেগে যাওয়া যেন কোনােভাবেই আমাকে অধৈর্য, অস্থির এবং দুআ বিমুখ না করে ফেলে। আমার দুআ আল্লাহ কেন কবুল করবেন না যেখানে তিনি অভিশপ্ত ইবলিস শয়তানের দুআ পর্যন্ত কবুল করেছেন? ইবলিস আল্লাহকে বলেছে, আর যদি আপনি আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দেন, তাহলে অতি অল্পসংখ্যক ছাড়া তার (আদমের) বংশধরদের অবশ্যই আমি পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।
ইবলিসের এই দুআ, এই চাওয়া আল্লাহ পূরণ করেছিলেন। তিনি বললেন, যাও তােমাকে অবকাশ দেওয়া হলাে।[২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইবলিসকেও ফিরিয়ে দেননি। আমরা কেন ভাবছি যে, তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেবেন? নিরাশ করবেন?
[ঘ]
‘আল্লাহ দুআ কবুল করেন’–এই আশার আনন্দে আমাদের মন হয়তাে এখন দুলে উঠেছে। ভাবছি, আজ থেকে আর দুআ করা ছাড়বই না, তাই না? দুআ করার জন্য যে বিশেষ কিছু মুহূর্ত আছে, তা কি আমরা জানি? এমন কিছু মুহূর্ত আমরা হেলায় পার করে দিই যেগুলাে দুআ কবুলের কার্যকরী সময়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সময়গুলােতে আমাদের বেশি বেশি দুআ করতে বলেছেন। এই সময়ের দুআগুলাে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দ্রুত কবুল করে নেন। আমরা কি জানব না সেই মুহূর্তগুলাের কথা? চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক—
আযান এবং ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়টুকু : মসজিদ থেকে আযান শােনার পরেও আমরা ফোন-কম্পিউটার ছেড়ে উঠি না। ভাবি, ফরয সালাত তাে আরও আধা ঘন্টা পরে। আরও কিছুক্ষণ ফেইসবুকিং করি। অথচ আযানের পর থেকে ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়ের মাঝে এমন একটি মুহূর্ত বিদ্যমান, যে মুহূর্তে কোনাে ব্যক্তি দুআ করলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার দুআ কবুল করে নেন।[২]
বৃষ্টি হলে : কবি জসীম উদ্দীন লিখেছিলেন—বৃষ্টি হলে তার প্রিয় মানুষের কথা মনে পড়ে। আমাদের কাছে সবচাইতে প্রিয় কে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাই বৃষ্টি হলে আল্লাহকে মনে পড়ুক এটাই কাম্য। বৃষ্টির সময় যদি কেউ দুআ করে, তার সেই দুআ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কবুল করেন।[২] আজ থেকে যখনই বৃষ্টি দেখব, দুআ করতে আর ভুল করব না।
রাতের শেষ তৃতীয়াংশে : সুবহে সাদিকের ঠিক আগের মুহূর্তটাই রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে এসে বলতে থাকেন, কে আছ এখন আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে
দেবাে। কে আছ আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দিয়ে দেবাে...।'[১] ফজরের কি বিশ মিনিট আগেও ঘুম থেকে জেগে উঠে আমরা যদি তাহাজ্জুদ সালাতে আল্লাহর কাছে কিছু চাই, নবিজি বলছেন আল্লাহ তা আমাদের অবশ্যই দেবেন।
কোনাে সফরে থাকলে : জীবনের অধিকাংশ সফর তথা ভ্রমণ করেছেন গান শুনতে শুনতে, তাই না? অথচ দুআ কবুলের জন্য সফর সময়টাও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থা।২] এমন একটি সুযােগ আমরা গান শুনে, অহেতুক কথা বলে, মােবাইলে মুভি-নাটক কিংবা ফেইসবুক স্ক্রল করতে করতে কাটিয়ে দিই।
কোন অসুস্থকে দেখতে গেলে : অসুস্থকে দেখতে যাওয়াটা আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ। এতে করে মানুষের সাথে আমাদের হৃদ্যতা বাড়ে। সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সাথে, এই সময়টা দুআ কবুলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় কোনাে দুআ করলে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কবুল করে নেন।৩]
[ঙ]
আমার খুব প্রিয় একটি দুআ আছে। দুআটি খুব ছোেট, কিন্তু তার বিস্তৃতি বিশাল। সংক্ষিপ্ত এই দুআ ধারণ করে দুনিয়া ও আখিরাতের অনেক বিষয়। আমাদের দুনিয়ার চাহিদা, আখিরাতের দরকার, সবকিছুই যেন এই ছােট্ট দুআতেই চেয়ে ফেলা যায়। তাই দুআটি আমি সর্বদা আওড়াই। যখনই আমার দুআ করার কথা মনে আসে, আমার মনে পড়ে যায় এই দুআর কথা। সালাতে, সিজদায়, হাঁটতে, চলতে এই দুআ যেন আমার নিত্যসঙ্গীর মতাে।
আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাকে একটি দুআ শিখিয়ে দিন।
নবিজি বললেন, ‘চাচা, বলুন— 36ji Li 3 4U (আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ)
মানে হলাে, ও আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আফিয়াহ চাচ্ছি।”[1]
প্রশ্ন হলাে, ‘আফিয়াহ’ কী জিনিস? যখন আপনি বিপদ-আপদ থেকে বেঁচে যান, তখন আপনি মূলত আফিয়াহ পেয়ে গেলেন। রােগমুক্তি এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে? তাহলে আপনি আফিয়াহতে আছেন। আপনার কাজে বারাকাহ আসছে? সময়ে বারাকাহ আসছে? আয়-উপার্জনে বারাকাহ আসছে? আপনি আফিয়াহ পাচ্ছেন। আপনার সন্তানদের ওপর থেকে বিপদ সরে যাচ্ছে? আপনি আফিয়াহ পাচ্ছেন। এমনকি, আখিরাতে আপনাকে ক্ষমা করা হলে, সেটাও আসলে আফিয়াহ।
এত ছােট্ট দুআতে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন ভরল না। তিনি ভাবলেন, এই দুআ তাে খুবই ছােট! আমার তাে অনেক বড় দুআ চাই। অনেক কিছু যেখানে একসাথে চাওয়া যাবে। তিনি নবিজির কাছে ফিরে এসে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এটা তাে খুব ছােট দুআ! আসলে আমি আরও বড় দুআ চাচ্ছিলাম।
তার কথা শুনে নবিজি হাসলেন। বললেন, ‘প্রিয় চাচা! আপনি আল্লাহর কাছে আফিয়াহই চান। আল্লাহর শপথ! এরচেয়ে ভালাে আপনার জন্য আর কিছুই হতে পারে না!
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ’–খুব ছােট্ট দুআ। অথচ ধারণ করে আছে কত বিশাল জিনিস! কত বিস্তৃত বিষয় এই দুআর মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে! আমরা যারা দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচতে চাই, আমরা আল্লাহকে বলতে পারি, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ। সন্তানসন্ততির ভালাে চেয়ে আল্লাহর কাছে বলতে পারি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ। রােগ থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহকে বলতে পারি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ। আয়-উপার্জনে বারাকাহ পেতে আল্লাহকে বলতে পারি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে, অনিন্দ্য সুন্দর, মনােরম মনােহর জান্নাতলাভের জন্য বলতে পারি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াহ।
[চ]
এখন আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটার অনুপস্থিতি তা হলাে দুআ। হলাে সকল নবি-রাসুলের সুন্নাত। দুআ মানে আল্লাহর কাছে চাওয়া। হাত
তুলে নিজের প্রয়ােজন আল্লাহকে খুলে বলা। নীরবে, নিভৃতে গুনগুন করে আল্লাহর কাছে নিজের সকল চাহিদা, আশা, আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা। জীবনের সকল মুহূর্তে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে। এমনকি, জীবন যখন অঢেল সুখে ভরে উঠবে, তাতে যখন থাকবে না কোনাে দুঃখ-দুর্দশা, হতাশা-গ্লানি, তখনাে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে। বলতে হবে, ‘ইয়া আল্লাহ, আমার এই সুখকে আপনি দীর্ঘায়িত করুন। এটাকে আমার জন্য পরীক্ষা বানাবেন না। নিশ্চয়, আমি খুব দুর্বল এক বান্দা। আপনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
দুনিয়ায় আমাদের অনেক কিছু দরকার। চলুন সেই দরকারগুলাের একটি তালিকা করে ফেলি। আল্লাহর কাছে দুনিয়ায় কী কী চাই, আখিরাতে কী কী চাই, আমার বাবা-মায়ের জন্য কী চাই, আমার ভাই-বােন, স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কী চাই তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করি। তালিকা ধরে ধরে আল্লাহর কাছে চাই। আল্লাহকে বলি, ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন, আপনারই ইবাদত করি আর আপনার কাছেই সাহায্য চাই। আপনি ছাড়া আমাদের আর কোনাে গত্যন্তর নেই। কেউ নেই যার কাছে কিছু চাওয়া যায়। কেউ নেই যে আমাদের কিছু দিতে পারে। তাই আপনার কাছেই হাত পেতেছি, মালিক। আপনি আমাদের চাওয়াগুলাে পূরণ করুন।
চলবে ইনশাআল্লাহ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now