বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
অলংকরণঃ সৌরভ দে।
পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা।
********************★*******************
১৯ জানুয়ারি, ২০৬৫ কঙ্গোর দুর্গম জঙ্গল
“আর কতক্ষণ? আর তো পারছি না!” প্রায় চিৎকার করে বলে ড্যানিয়েল। পিঠে মাঝারি সাইজের ট্রাভেল ব্যাগটা না থাকলে এক্ষুণি এখানেই একটু গড়িয়ে নিত সে।
“এই তো প্রায় চলে এসেছি। এত অল্পতেই অস্থির হলে চলে?” কিছুটা বিরক্তি মাইকের কণ্ঠে।
“সেই আড়াই ঘণ্টা ধরেই তো বলছিস আর কিছুক্ষণ আর কিছুক্ষণ। সত্যি করে বল তো পথ হারিয়ে ফেলিসনি তো আবার? আমি কিন্তু আর ঘুরতে পারবো না বলে দিচ্ছি! কোন কুক্ষণে যে তোর সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম! এখন তো ইচ্ছে হচ্ছে বাজির টাকাটা তোর হাতে গুঁজে দিয়ে আমি আমার ল্যাবে ফিরে যাই।” বড় বড় নিশ্বাস ছেড়ে বলে ড্যানিয়েল; সে হাঁপাচ্ছে রীতিমতো।
“এত অস্থির হচ্ছিস কেন? বাজির শেষ না দেখে এমনিই এমনিই টাকা নিয়ে নেব ভাবলি কেমন করে? এতটা ছোটলোক এখনও আমি হইনি। আসলে তুই টের পেয়েছিস হেরে যাবি, তাই এত বাহানা”
“থাম তো। যত ফালতু কথা। এইসব জঙ্গলে তোদের চমকে ওঠার মতো ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ থাকতে পারে। আমাদের মতো ফিজিসিস্টদের জন্য কিছুই নেই। দেখিস শেষমেশ আবার গুহাটুহা দেখিয়ে বাজি জেতার ধান্দা করিস না যেন।”
“তোর মতো ফিজিসিস্টকেই চমকাবো। আর সেটাই বাজি। না চমকালে হাতে হাতে টাকা দিয়ে দেব।”
“কিন্তু আর তো পারছি না ভাই।” আসলে ড্যানিয়েলের দোষ নেই, সারাজীবন ল্যাব, এক্সপেরিমেন্ট আর গণিত নিয়েই কাটিয়েছে সে। তাই খানিকটা শারীরিক পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে উঠেছে।
আরে পথ ভুল হচ্ছে না, মাত্র গত বছর ঘুরে গিয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, সঙ্গে এই যে দুইজন স্থানীয় গাইড দেখছিস; বাতাসে গন্ধ শুঁকে শুঁকে পথ খুঁজে বের করতে পারে এরা।” ড্যানিয়েলকে আস্বস্ত করে মাইক।
“তাহলে একটু জিরিয়ে নি? আধা ঘণ্টার জন্যে বসে চা-টা কিছু খেয়ে নিতে পারি তো। কি বলিস?”
কিছুটা লজ্জার আভাস ড্যানিয়েলের কণ্ঠে। নিচু স্বরে বলে, “তোর মতো তো আর বন জঙ্গল পাহাড় সাগরে ঘুরে বেড়াই না! অভ্যাস নেই অতো।”
“আচ্ছা। আধঘণ্টার একটা ব্রেক নিয়ে নিই। তবে তোকে যে জিনিসটা দেখানোর জন্য নিউ জার্সি থেকে ধরে বেঁধে এই আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে নিয়ে এসেছি সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তোর সব কষ্ট, পরিশ্রম লাঘব হয়ে যাবে এটা বলতে পারি।”, মুচকি হেসে বলে মাইক।
“বুঝতেই পারছি আসলে কিছুই পাব না। বাজি জিতব আমিই।” গাল লালচে বর্ণ ধারণ করেছে ড্যানিয়েলের, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের আভা। সে ধপ করে মাইকের পাশেই বসে পড়ল। পুরো ব্যাপারটাই যে মাইকের একটা অতিউৎসাহী ছেলেমানুষি কাণ্ড গোছের কিছু সে ব্যাপারে ড্যানিয়েলের আর সন্দেহ নেই। একটা উষ্ণ প্রস্রবণ কি নতুন কোনও হীরের খনি আবিষ্কার করেছে হয়তো। সেটা দেখিয়ে চমকাতে চাইছে ড্যানিয়েলকে।
চা এর কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসে মাইক। সঙ্গের দুইজন গাইড অস্থির হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ভাষায় কিছু একটা বলছে; উত্তেজিত ভাব ভঙ্গি। “এখন সকাল, তারা বলছে আর দুই আড়াই ঘণ্টার ভেতর ঈশ্বরের মুখের কাছে পৌঁছে যাব। সন্ধ্যা হতে হতে গ্রামে ফিরতে হবে। রাতের বেলায় এই গভীর জঙ্গলে থাকা নিরাপদ নয়। দেরি না করে উঠে পড় বন্ধু, আরও ঘণ্টাখানেক হাঁটতে হবে আমাদের।”
চারজনের ছোট্ট দলটা আফ্রিকার গভীর বনের ভেতর দিয়ে ঝোপঝাড় মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আশপাশে বিশ-বাইশ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও জনপদ নেই। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া থেকে এখনও অনেক দূর এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী। এতই দুর্গম এই জঙ্গল যে হেঁটে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে পারতো, তবে এত খরচ করার সামর্থ ড্যানিয়েল বা মাইক কারোরই নেই। আরও দুই ঘণ্টা হাঁটার পর আচমকা একটি বিশাল আকারের গর্তের সামনে হাজির হয় তারা। চারদিকে ঘন বন, এর মাঝে ভুঁইফোড়ের মতো হঠাৎ করেই যেন এই গর্তটার আবির্ভাব হয়েছে। ভীষণ অবাক হয় ড্যানিয়েল। এর কথাই কী বলেছিল মাইক? ঠিক আছে, বেশ অবাক করার বিষয়ই, প্রায় দশ মিটার ব্যাসার্ধের একটি মাঝারি পুকুর আকৃতির গর্ত। কিন্তু এটাই বা তাকে দেখানোর কী আছে? কিছুটা বিরক্তি নিয়ে মাইকের দিকে তাকায় ড্যানিয়েল।
“কী! সুন্দর না গর্তটা?” চোখে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেছ মাইকের।
হতভম্ব হয়ে একবার মাইকের দিকে আরেকবার গর্তটার দিকে তাকায় ড্যানিয়েল। কী করবে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না।
“এই গর্ত দেখানোর জন্যে আমাকে এত কষ্ট করিয়েছিস?” রাগের চোটে লাল হয়ে গেছে ড্যানিয়েলের চোখ, সারা শরীর কাঁপছে মৃদু মৃদু; ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যে কোনও সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইককে এক থাবড়া মেরে দিতে পারে।
আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই ড্যানিয়েলের রাগে জল ঢেলে দেয় মাইক। ছোঁ দিয়ে ড্যানিয়েলের মাথা থেকে টুপিটা তুলে গর্ত লক্ষ করে ছুড়ে মারে।
“কী করলি? আরে কী করলি?” চিৎকার করে উড়ন্ত টুপিটার দিকে তাকিয়ে থাকে ড্যানিয়েল। মুহূর্তক্ষণ মাত্র, তারপরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় তার! কী দেখল সে এটা! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না যেন সে। আমতা আমতা করে বলে, “এটা কী হল? কী হল এটা?”
গর্তের মধ্যে পড়ার আগেই তার টুপিটা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। ঠিক শূন্যের মাঝখানে।
***
আশ্চর্য এই গর্তটাকে স্থানীয়রা বলে মুরুঙ্গুর মুখ। মুরুঙ্গু স্থানীয়দের দেবতার নাম। প্রতি পূর্ণিমায় এই গর্তে জ্যান্ত হরিণ বা গরু উৎসর্গ করে এই দেবতাকে তৃপ্ত রাখে তারা। অন্যথায় এই মুখ ধীরে ধীরে তাদের সমগ্র বনাঞ্চল গ্রাস করে নেবে। আদিবাসীদের বিশ্বাসের কথা জানায় মাইক।
“আস্ত হরিণ…” প্রাথমিক ধাক্কাটা এখনও ঠিকমতো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ড্যানিয়েল, বাক্যটা শেষ করতে পারল না সে; তার গলা কাঁপছে।
“এভাবেই চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়। তা, কী বুঝলি? কী মনে হচ্ছে? পারবি এই রহস্যময় গর্তের আদ্যপান্ত বের করতে?”
“বুঝতে পারছি না, এখনও তো ঠিক মতো পরীক্ষাই করতে পারলাম না।” বলতে বলতে নিজের ব্যাগ খুলে যন্ত্রপাতি সেট করা শুরু করে দেয় ড্যানিয়েল। নতুন খেলনা পেয়ে যেন তার চোখ মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। সেই সঙ্গে দ্রুতগতিতে মস্তিষ্কে চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। “যন্ত্রপাতি সব সেট করতে মিনিট তিরিশেকের মতো সময় লাগবে; সময় নষ্ট না করে এর ভেতর এই গর্তের ইতিহাসটা একটু ব্যাখ্যা কর। যদি দয়া হয় আর কি।”
প্রচ্ছন্ন খোঁচাটি আমলে না নিয়ে তীর্যক দৃষ্টি হেনে মাইক বলে, “বাহ! বাহ! একটু আগেই তো পারলে আমার টুঁটি চেপে ধরছিলি।”
“আহ! মাইক, অযথা সময় নষ্ট করিস না তো। জলদি যা জানিস বলে ফেল। এটা… মনে হচ্ছে… খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আবিষ্কার। এতদিন এটা নিয়ে কেন হৈ চৈ হয়নি সেটাই বুঝতে পারছি না।” কণ্ঠে অস্থিরতা ড্যানিয়েলের।
ড্যানিয়েলের কণ্ঠে কিছু একটা ছিল; কথা না বাড়িয়ে তার পাশেই মাটিতে বসতে বসতে মাইক বলে, “যতটুকু জানি অনেক আগে থেকেই রহস্যময় এই গর্তটি এই জঙ্গলে আছে। তবে সেটি কত বছর তা সঠিক বলা সম্ভব নয়। এইদিকটা এতই দুর্গম যে, আশেপাশে কয়েকশো কিলোমিটারের ভেতর কয়েকশো বছরে কোনও বসতি গড়ে উঠেনি।”
একটু দম নেয় মাইক। মাটিতে হাত দিয়ে আনমনে কিছু ঘাস তুলতে তুলতে বলে, “এতদিন এটা কেন আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি সেটাই একটা রহস্য। এমনিতে দিনের বেলায় এই গর্তের আশেপাশেও কেউ আসে না। স্যাটেলাইট দিয়ে শুধু একটা কালো বিন্দুর মতো দেখা যায়। আশপাশে এমন গর্ত আরও আছে কয়েকটা। তাই এতদিন এটাকে দেখেও তেমন গুরুত্ব দেয়নি কোনও পর্যবেক্ষক। বছরখানেকের বেশি হল পূর্ণিমার রাতে এখানকার আদিবাসীরা যজ্ঞ পালন করছে। অবশ্য সেটাও এমনকিছু গুরুতর ব্যাপার নয়। তবে সেদিন এমিলির পাশে বসে স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি দেখার সময় প্রথম একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নজরে আসে আমার। তখন থেকেই এটার ব্যাপারে আমার আগ্রহ জন্মায়।”
মুখে কোনও শব্দ না করে চোখ নাচিয়ে প্রশ্ন করে ড্যানিয়েল।
“আমরা স্যাটেলাইট থেকে দেখছিলাম আদিবাসীগুলো মিছিল করে হরিণ নিয়ে আসে। তারপর গর্ত ঘিরে নাচানাচি করে। শেষে হরিণদুটোকে গর্তে ফেলে দেয়। স্যাটেলাইটের নাইট-ভিশন চালু ছিল। স্ক্রিনে ছোট দুটো জ্বলজ্বলে হলুদ বিন্দুর মতো হরিণ দুটোকে বোঝা যাচ্ছিল। তার মানে গর্তের ভেতরে পড়ে যাওয়ার পরেও বিন্দুর মতো হলেও হরিণ দুটোর হিট-সিগন্যাচার স্যাটেলাইটে ধরা পড়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম গর্তে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই হিট-সিগন্যাচার মিলিয়ে গেছে। এই অস্বাভাবিকতাটাই প্রথম আমার দৃষ্টিগোচর হয়। হরিণ দুটো গর্তে পড়ে ঘাড় ভেঙে মরলেও এত দ্রুত হিট সিগনেচার মেলাতে পারে না। আবার এই কালো বিন্দুর মতো গর্তটাও এমন বিশাল গভীর হতে পারে না যে তক্ষুনি হিট সিগনেচার মিলিয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে গর্তের রংটাই অন্যরকম দেখাতো স্যাটেলাইটে।
আমার মনে হয়, এর আগে কেউ দেখে থাকলেও ব্যাপারটা আমল দেয়নি অথবা ঠিকঠাক ধরতে পারেনি। এমিলি নিজেই তো ধরতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে ছুটি নিয়ে চলে আসলাম এই বনে, সেটাও প্রায় এক বছর হয়ে গেল। তুই তো আসতেই চাচ্ছিলি না। এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছিস কি জিনিসের খোঁজ তোকে পাইয়ে দিলাম?”
“হুম, সেটা ঠিকই বলছিস। এমন ঘটনার মুখোমুখি হব জীবনেও ভাবিনি। সে যাক, তারপর কী হল?”, বলে ড্যানিয়েল।
“তারপর আর কী! এখানে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পেরেছি, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে হয়তো কাছাকাছি কোনও গ্রাম থেকে শিকারী দল পথ হারিয়ে এই গর্তের সন্ধান পায়। তারা হয়তো প্রথম খেয়াল করে এই গর্তে যে কোনও কিছু ফেললে মুহূর্তেই সেটি অদৃশ্য হয়ে যায়। ঐশ্বরিক কিছু একটা ভেবে তারা এটার পূজা শুরু করে ,সেই সঙ্গে শুরু হয় উৎসর্গ করা। এর বেশি কিছু তারাও জানে না।” অদূরে কিছু হায়েনার হাসির তীব্র শব্দ কানে আসে আচমকা। শিউরে ওঠে মাইক। তারপর প্রশ্ন করে, “তো, তোর কী মনে হচ্ছে? এটা কোনও ব্ল্যাকহোল না তো?”
অবাক দৃষ্টিতে মাইকের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ ড্যানিয়েল। ব্ল্যাকহোল! মনে মনে হাসল ড্যানিয়েল, এত কম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটা মানুষ বেঁচে থাকে কী করে? আর এই মূর্খের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বই বা হল কীভাবে? মুখে গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলে, “আরে এটা ব্ল্যাকহোল হলে এর কাছাকাছি আসতে পারতাম? এমন পুকুরের আকারের একটা ব্ল্যাকহোল সমগ্র পৃথিবীকেই গিলে ফেলত।”
“তাহলে কি এটি অন্য জগতে যাওয়ার কোনও পোর্টাল?” গোবেচারা (উত্তেজনায় কথা আটকে আসে মাইকের) একটা ভাব ফুটে উঠেছে মাইকের অঙ্গভঙ্গিতে।
“এখনও কিছু বুঝতে পারছি না।” কথা বলতে বলতে একটি লোহার দন্ড ধীরে ধীরে গর্তের ভেতর প্রবেশ করায় ড্যানিয়েল। দন্ডটি যতটুকু ঢুকছে ততটুকুই গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অর্ধেকের মতো ঢুকিয়ে আবার টেনে বের করে নেয়; অবাক হয়ে দেখে ঐ অংশটি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার হাতে ধরা আছে বাকি অর্ধেক।
বিস্ময়ে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে যায় ড্যানিয়েল। তার মাথায় আপাতত কিছুই ঢুকছে না। চিন্তিত মনে চারদিনের না কামানো চিড়বিড়ে গাল খস খস করে চুলকাতে চুলকাতে আপন মনে বিড়বিড় করে বলে, “মনে হচ্ছে এখানে একটি অদ্ভুত ফিল্ড সক্রিয় আছে। এই ফিল্ডের ভেতর কিছু ঢুকলেই সেটা গায়েব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটি যাচ্ছে কোথায়?”
দ্রুত সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্য মাথার ওপর এসে এখন কিছুটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে একের পর এক কাজ করে যাচ্ছে ড্যানিয়েল। গর্তটার পরিধি বরাবর কম করে হলেও দশবার ঘুরে এসেছে সে। মাঝেমাঝে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে চোখমুখ কুঁচকে কিছু পরীক্ষা করেছে। এখন আবার কিছুক্ষণ পরপর ছোট ছোট পাথর তুলে উপরের দিকে ছুঁড়ে মারছে আর কিছু একটা স্কেচ আঁকছে হাতের কাগজে। দূর থেকে অবাক হয়ে ড্যানিয়েলকে লক্ষ করছে মাইক। সদ্য পাওয়া এই রহস্যময় অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপারটা নিয়ে তার বন্ধু যে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সে বিষয়ে কোনও অনিশ্চয়তা নেই মাইকের মনে।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডির থিসিস পেপার লেখা শেষ করে হাতে আপাতত কোনও কাজ না থাকায় পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিল ড্যানিয়েল। কাজ পাগল এই ছেলেটা জীবনে নিজের শহর ছেড়ে বের হয়নি। তার স্বপ্ন সারাজীবন একটা ল্যাবে কাটিয়ে দেওয়া। মজা করে প্রায়ই বলে “যদি স্টিফেন হকিং এর ন্যায় এমিওট্রোফিক ল্যাটারাল স্ক্যালোরিস এর মতো কোনও অসুখে পড়তাম, তবে বেশ হত। তাহলে সারাজীবন হুইলচেয়ারে বসে বসে পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এই রাজকীয় রোগ হওয়ার মতো সৌভাগ্য তো আমার নেই। আমার হবে গিয়ে পেটখারাপ, আর সব কাজ ফেলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টয়লেটে দৌড়াতে হবে। যত্তসব।”
‘ব্যাপার কী?’ বন্ধুকে উদ্বিগ্ন মুখে গর্তটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাইক জিগ্যেস করে।
মুখ গম্ভীর করে মাইকের পাশে এসে বসে ড্যানিয়েল। “ ব্যাপারটা বেশ জটিল! মারাত্মকও হতে পারে। আরও যন্ত্রপাতি আর সময় নিয়ে আসতে হবে।”
“কিছু বুঝতে পারলি না?” তার অস্থিরতা দেখে মাইকও গম্ভীর হয়ে উঠছে।
“গর্তটার ব্যাসার্ধ দশ মিটার, গভীরতাও দশ মিটার। ভালো করে তাকিয়ে দেখ, গর্তের মধ্যের মাটি পাথর গাছের শিকড় সবই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা। যেন লেজার দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে। আমি পাথর ছুড়ে ছুড়ে পরীক্ষা করেছি, ওই লাঠি খাওয়া অঞ্চলটার উচ্চতাও দশ মিটার। এর উপর দিয়ে কিছু ছুড়ে মারলে অপরপাশে গিয়ে পড়ছে, কিন্তু তার কমে হলে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এসবের মানে বুঝতে পারছিস?”
“নাহ, একটু সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা কর তো।”
“এই স্বচ্ছ ফিল্ডটা বিশ মিটার ব্যাসের একটা গোলক। এখন এটা অনেক কিছুই হতে পারে। প্রথমত এটা কোনও ব্ল্যাক-হোল নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এটা যদি ব্ল্যাক-হোল হত, তবে সমগ্র পৃথিবীকেই আস্ত গিলে ফেলত। তাই এই সম্ভাবনা বাদ।
ওয়ার্ম-হোল হতে পারে। সেক্ষেত্রে এর ভেতর যত কিছুই প্রবেশ করুক না কেন তা হয়তো অন্যপাশে চলে যাচ্ছে। এই ধারণা সত্য হলে এর ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব, যদি তাই হয় তাহলে অন্যপাশ থেকেও এই পাশে কিছু না কিছু আসবে। রেডিয়ো তরঙ্গ, আলোক বিচ্ছুরণ। কিন্তু পরীক্ষা করে আপাতত যা পেয়েছি তা হচ্ছে এর ভেতর থেকে কিছুই নিঃসৃত হচ্ছে না। না কোনও আলোক বিচ্ছুরণ, না কোনও রেডিয়ো তরঙ্গ। তাই আপাতত ওয়ার্মহোলের তত্ত্ব বাদ দিতে হচ্ছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা না করে এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না। তবে একটা প্রাথমিক ব্যাপার বলতেই পারি ওয়ার্ম-হোল হলেও এর ভেতর যখন কোনও বস্তুর অর্ধেক প্রবেশ করানো হচ্ছে তখন আপাতভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেও, লাঠিটা টেনে বের করে আনলে তখন সেটি যথারীতি আগের মতোই ফিরে আসার কথা।”
“কিন্তু? এক্ষেত্রে তো তা হচ্ছে না! একটি লাঠির অর্ধেক ভেতরে ঢুকিয়ে আবার বের করে নিয়ে আসলে, ভিতরের অর্ধেক শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।” উত্তেজিত স্বরে বলে ওঠে ড্যানিয়েল
“তার মানে এটি ওয়ার্মহোল নয়। যদিও আমি নিশ্চিত নই…” বিড় বিড় করে শেষ শব্দক’টা যোগ করে ড্যানিয়েল।
কিন্তু তেমন কিছু আপাতত দেখছি না। যদি অন্য জগতের যাওয়ার কোনও পোর্টালও হয়, তবুও অর্ধেক ঢোকানো বস্তু বের করলে আগের অবস্থানে চলে আসার কথা। কিন্তু তেমনও হচ্ছে না।
“আচ্ছা, যদি এটা সমান্তরাল মহাবিশ্বের কোনও প্রবেশপথ হয়?” জ্বল জ্বল করছে মাইকের মুখ। সে কল্পচক্ষে দেখতে পাচ্ছে অন্য জগতের দ্বার খুঁজে পাওয়ার জন্য তার নামটা ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে। মাইক গড় গড় করে বলে চলল, “হতে পারে এটা ভিনগ্রহী কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীর খোলা পোর্টাল। হয়তো এর ভেতর আমরা যা প্রবেশ করাচ্ছি সব কিছু মহাবিশ্বের অন্য কোথাও গিয়ে পড়ছে আর ভীণগ্রহী প্রাণীরা সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছে।”
“খুব বেশি সায়েন্স ফিকশন মুভি দেখছিস না কি ইদানিং?” বন্ধুর কথায় আশার ফানুসটা চুপসে গেল মাইকের। ড্যানিয়েল বলল, “বললাম না, এটা অন্য জগতের প্রবেশপথ হলেও অর্ধেক বস্তু গায়েব হয়ে যেত না। ঠিকঠাক ফিরে আসত।” ভাবভঙ্গিতে রাগ ফুটে উঠলেও বন্ধুর বোকামিপূর্ণ কথাবার্তায় বেশ মজাই পাচ্ছে ড্যানিয়েল।
“কিন্তু যদি সমান্তরাল বিশ্ব প্রতিপদার্থ দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে? সেক্ষেত্রে যতটুকু ভেতরে প্রবেশ করবে ততটুকু পদার্থ-প্রতিপদার্থ একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে। মানে লাঠির বাকি অংশটুকুকে গায়েব করে দেবে। এমনটা কি হতে পারে না?” কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুটা বিজ্ঞের মতো বলে মাইক।
ড্যানিয়েল চোখ বড় বড় করে তাকায় মাইকের দিকে, “ইয়ার্কি পেয়েছ? এ তোমার কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। পদার্থ-প্রতিপদার্থ মিলিত হলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে একে অপরকে নিস্ক্রিয় করে দেবে ঠিকই; সেক্ষেত্রে পিউর এনার্জি নির্গত হবে আর তার পরিমাণ হবে অকল্পনীয়।” হাতের কাঠিটার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, “এটা সম্পূর্ণ প্রতিপদার্থ দিয়ে এনার্জিতে রূপান্তরিত করলে যে শক্তি নির্গত হবে তাতে আশপাশের প্রায় বিশ কিলোমিটার জঙ্গল স্রেফ ছাই হয়ে যাওয়ার কথা। বুঝেছিস?”
মাইক চুপ করে গেল। ব্ল্যাকহোল নয়, ওয়ার্ম হোল নয়, অন্যজগতের প্রবেশদ্বার নয়। তার বুদ্ধিতে আর কিছুই আসছে না। সে ড্যানিয়েলের দিকে তাকাল কৌতুহল নিরসনের আশায়, কিন্তু ড্যানিয়েল চুপ করে এক দৃষ্টিতে লাঠির নিপুনভাবে কাটা অংশটার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু একটা বলতে গিয়েও যেন চুপ করে আছে ড্যানিয়েল।
“তুই কি বিশেষ কিছু ভাবছিস?”
“হ্যাঁ। এগুলো ছাড়াও আরেকটা সম্ভাবনার কথা মাথায় আসছে আমার।” কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে, নিজের উপরেই ড্যানিয়েল ভীষণ বিরক্ত এমন উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসার জন্যে।
“কি সম্ভাবনা? ভয়ানক কোনও কিছু নাকি?” মাইকের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ধরা পড়ে।
বলা ঠিক হবে কী না বুঝতে পারছে না ড্যানিয়েল। অস্থির হয়ে উঠে পড়ে মাইকের পাশ ছেড়ে। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হাঁটে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরে বলে, “হতে পারে এটা একটা শূন্যস্থান।” বলেই চুপ হয়ে যায় সে।
“মানে?”
“মানে প্রকৃত শূন্যস্থান।”
“কিছুই বুঝতে পারছি না কী বলছিস তুই!” মাইক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করে। প্রকৃত শূন্যস্থান আবার কী বস্তু!?
ড্যানিয়েল ফিরে এসে বসে বন্ধুর পাশে, বলে “শূন্যস্থান বলতে তুই কি বুঝিস?”
“ওয়েল্ল! যদিও আমার পড়াশোনার বিষয় আর্কিওলজি… তবুও পদার্থবিজ্ঞানের যতটুকু জানি তাই বলছি।” মাইক মাথা চুলকে নেয় একটু। “এই যেমন, যেমন, আমাদের চারপাশে প্রায় বেশির ভাগই শূন্যস্থান।”
ড্যানিয়েল ভুরু কোঁচকাতেই মাইক হাত তুলে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি জানি। পৃথিবীতে শতভাগ শূন্যস্থান বলে কিছু নেই, সবই বাতাসে পূর্ণ। এখানে শূন্যস্থান তৈরি করতে হয় কৃত্রিমভাবে। কিন্তু মহাকাশ? সেখানে তো বায়ুও নেই। আমাদের মহাকাশটা শূন্য। এই হিসাবে বলা যায়, এই গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি প্রভৃতিগুলো বাদ দিলে, মহাবিশ্বের বেশির ভাগ শূন্যস্থান। তাই না?” বক্তব্য শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য অনিশ্চিয়তা নেমে এল মাইকের কণ্ঠে। এই কথাগুলোতো স্কুলের বাচ্চারাও জানে, তাকে ড্যানি কেন এমন প্রশ্ন করছে?
“একদম ভুল।” হেসে জবাব দেয় ড্যানিয়েল। লেকচার দেওয়ার সুযোগ পেয়ে চোখে-মুখে খুশির ঝলক দেখা দেয় তার। “আসলে স্পেস বা স্থান একক কোনও বিষয় নয়। তিনটি মাত্রার স্থান ও একটি মাত্রার সময়কে নিয়ে স্থান-কালের চাদরে মোড়া আমাদের এই মহাবিশ্ব…”
“সেই রিলেটিভিটির থিয়োরি তো? আইনস্টাইনের?” মাইক উচ্ছে খাওয়া মুখ করে ড্যানিয়েলের লেকচারে বাধা দিল। “সেটা তো বড্ড জটিল।”
“যতটা পারি সোজা করে বোঝাচ্ছি তোকে। দেখ, আইনস্টাইনের মতে এই মহাবিশ্ব স্থান কালের অদৃশ্য চাদরে মোড়া। একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনও একটি বস্তু ত্রিমাত্রিক একটা স্থানকে দখল করে রাখে।
যেমন ধর, এই গ্লাসটা এই মুহূর্তে এই জায়গায় আছে, আমি এটাকে সরিয়ে এই ফাঁকা স্থানে এনে রাখলাম”, বলতে বলতে সামনের গ্লাসটা কিছুটা সরিয়ে রাখে ড্যানিয়েল। “এখন এই জায়গায় আগে বাতাস ছিল, সেগুলোকে সরিয়ে এই গ্লাসটা তার স্থান দখল করে নিয়েছে। তার মানে দুটো বস্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ে একই স্থানে অবস্থান করতে পারে না। এই যে বাতাস সরিয়ে গ্লাসটা জায়গা দখল করল, সেক্ষেত্রে বাতাসের আগে এখনে কী ছিল? বুঝতে পারছিস?”
অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়ে মাইক। আড়চোখে সঙ্গের দু’জন স্থানীয় গাইডকে দেখে নেয় একবার। তারা অস্থির হয়ে উঠছে ফেরার জন্যে। “চেষ্টা করছি, বলে যা।”
“এখন যদি কোনও স্থানের বাতাসকেও সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটাকে কি শূন্যস্থান বলা সম্ভব? নাহ, বড়জোর তাকে বায়ুশূন্য স্থান বলা যেতে পারে। তারপরেও এখানে আলোক তরঙ্গ বা ফোটনের অস্তিত্ব থাকবে। যেমন মহাকাশ বেয়ে বেয়ে সূর্যের আলোকতরঙ্গ আমাদের ছুঁয়ে আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ে।”
“তার মানে বলছিস মহাকাশ শূন্য নয় কারণ আলোকতরঙ্গ ওখানে থাকে…” একটু অনিশ্চিত স্বরে বলল মাইক। একটু থেমে যোগ করল, “কোনও একটা সময়ে।”
“এক্স্যাক্টলি। এবার অন্ধকার একটা আপাত শূন্য চেম্বারের কথা চিন্তা কর। যেখানে হয়তো বায়ু নেই, আলোক তরঙ্গ নেই, কোনও অণু-পরমাণু বা পার্টিকেল নেই, অন্যান্য বিবিধ জিনিসের কিছুই নেই; কিন্তু X, Y, Z এই তিনটি স্থানিক মাত্রা ও t এর সময় মাত্রাসহ স্থান-কালের অদৃশ্য চাদর তবুও বিদ্যমান। এই চাদরের উপরে কোনও একটা সময় কোনও বস্তু অবস্থান করতে পারে। চাইলেই ওটার মধ্যে দিয়ে তরঙ্গ যেতে পারে, অথবা ওর মধ্যে কোনও বস্তু রেখে দিতে পারিস। কিন্তু, এমন একটা ব্যাপার কি ভাবতে পারবি যেখানে কোনও কিছু অবস্থান করতে পারবে না?” বলে নিজেই চোখ বন্ধ করে মৃদু মৃদু মাথা নাড়তে থাকে ড্যানিয়েল।
“অবস্থান করতে পারবে না!? সে আবার কি?”
“সেটাই। তুই চাইলেই মহকাশে একটা রকেট পাঠাতে পারিস। অথবা স্যাটেলাইট স্থাপন করতে পারিস। তো মহাকাশ যাকে শূন্যস্থান বলে কল্পনা করছিস সেখানে কখনো না কখনো তুই কিছু একটা বস্তুকে রাখতে পারিস। কিন্তু প্রকৃত শূন্যস্থান হল এমন এক অবস্থা যেখানে কোনও সময়েই কিছুই অবস্থান করতে পারে না। একবার চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে চিন্তা কর তো, আমাদের মহাবিশ্বে আসলেই শূন্যস্থান বলে কিছু কি আছে?
“কিন্তু পরমাণুর ভেতর? সেখানেও কি শূন্যস্থান নেই? আমি যতটুকু শুনেছি একটা পরমাণুর ভেতর শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগই নাকি ফাঁকা?”
“নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিস্তরে ইলেকট্রন অবস্থান করে, এটা ঠিক। তাই পরমাণুর আয়তনের প্রায় ৯৯.৯৯ ভাগই ফাঁকা। কিন্তু এই ফাঁকা স্থান শূন্যস্থান নয়। এখানেও ইলেকট্রন অবস্থান করতে পারে। ইলেকট্রন নিজের কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায় প্রোটনকে কেন্দ্র করে। প্রয়োজন মতো আমরা ইলেকট্রনকে সরিয়ে আনতে পারি; নতুন ইলেকট্রনও ঢোকাতে পারি পরমাণুর মধ্যে। কারণ, আপাত এই ফাঁকা স্থানও X, Y ও Z অক্ষ এবং t এর ভিত্তিতে গঠিত স্থান। তাই আমরা তার ব্যবহার করতে পারি। সত্যি বলতে আমাদের মস্তিষ্ক শূন্যস্থানকে ধারণ করার মতো গঠিত নয়, শূন্যস্থান নিয়ে আমরা চিন্তাও করতে পারি না।”
“সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের এই গর্তের কি সংযোগ? তোর কেন মনে হচ্ছে এটা একটা প্রকৃত শূন্যস্থান?”
“সবকিছু যেন সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। দশ মিটার ব্যাসের একটা শূন্য গোলক। এটার কোনও অস্থিত্ব এই মহাবিশ্বে নেই। এই যে গর্তটা দেখছিস, আসলে এটা গর্ত না। এটা আসলে কিছুই না। পার্ফেক্ট নাথিং। তাই এটার ভেতরে কিছু ঢোকালে সেটাও অস্থিত্বহীন হয়ে পড়ে।” উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকায় ড্যানিয়েল। “এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা এখানে তৈরি হল কী করে? কবে থেকে এটা এখানে আছে? কারা তৈরি করেছে? কেন করেছে?” একযোগে অনেকগুলো প্রশ্ন খেলে যায় ড্যানিয়েলের মাথায়।
তার মানে স্বীকার করে নিচ্ছিস এই রহস্যের কিছুই তুই বুঝতে পারছিস না? ঠিক?” উত্তরের অপেক্ষা না করে চোখ টিপে বলে মাইক, পদার্থবিজ্ঞানের গোলকধাঁধা পেরিয়ে সে আবার নিজের হাসিখুশি চরিত্রে ফিরে গেছে। “তাহলে এখন বাজির এক হাজার ডলার ফেল, জলদি।”
বিড়বিড় করতে করতে কাধের ব্যাগ হাতড়ে কয়েকটা নোট বের করে মাইকের দিকে এগিয়ে দেয় ড্যানিয়েল। এসবে একেবারেই মনোযোগ নেই, তার সমগ্র চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আছে সদ্য আবিষ্কৃত রহস্যময় গর্তসদৃশ শূন্যস্থানটিতে। একটা প্রকৃত শূন্যস্থান! বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ বিস্ময়!
********************★*******************
তথ্যসূত্রঃ কল্পবিশ্ব।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now