বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ আরিফ আজাদ
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
১৪. যুদ্ধ মানে শত্রু-শত্রু খেলা ।
আমাদের জীবনে আমরা নানা সময়ে নানান অঙ্গীকার করে থাকি। সেই অঙ্গীকারগুলাের কোনােটা আমরা পূরণ করতে পারি, কোনােটা পারি না। কোনােটা পূরণে আমরা উদগ্রীব, আবার কোনােটার বেলায় আমরা চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করি। ধরা যাক আমার কোনাে এক শত্রুর কথা। সে অঙ্গীকার করেছে যে, জীবনে সে আমাকে কখনােই সফল হতে দেবে না। আমার সফলতার পথে সবসময় সে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। যখনই আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইব, তখনই সে আমার পা টেনে ধরবে। আমি দাঁড়াতে চাইলে আমাকে বসিয়ে দেবে। আমি দৌড়াতে চাইলে আমাকে থামিয়ে দেবে। আমি বলতে চাইলে আমাকে চুপ করিয়ে দেবে। মােদ্দাকথা, সে আমার জীবনের সাথে ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে যাবে। আমার ক্ষতি করার জন্য দুনিয়ায় যা যা করতে হয়, তার সবটাই সে করবে। তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই হবে আমার ক্ষতি করা। আমাকে বিপথগামী করা। আমাকে পথভ্রষ্ট করে ফেলা। আমাকে আমার সফলতার রাস্তা থেকে বিচ্যুত করা।
আরও ধরা যাক, সেই শত্রুকে আমি চিনে ফেলেছি। কোনাে-না-কোনােভাবে তার সমস্ত পরিকল্পনা আমি জেনে গেছি। তার চেহারা, তার কাজ, তার গতিবিধি, তার অগ্রপশ্চাৎ—সবকিছুই আমার সামনে দিনের আলাের মতন পরিষ্কার। এমতাবস্থায়, তার ব্যাপারে আমার অবস্থান কী হবে? তাকে ঠেকানাের জন্য আমি কি কোনাে উপায়ান্তর খুজব না? তাকে থামানাের জন্য আমি কি কোনাে পদক্ষেপই নেব না? তার শত্রুতা থেকে বাঁচতে, তার ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা থেকে নিজেকে বাঁচাতে আমি কি মরিয়া হয়ে উঠব না? আমি কি আমার সমস্ত শক্তি, সমস্ত কলা-কৌশল, সমস্ত
বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে তাকে পরাস্ত করতে চাইব না? সচেতন বুদ্ধিমান লােকের জবাব হবে, অবশ্যই! এ রকম প্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াই তাে একজন সত্যিকার সচেতন ও দূরদর্শী মানুষের কাজ।
তাহলে, এবার আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই আপনার জীবনের এমন এক শত্রুর সাথে, যার চাইতে বড় শত্রু আপনার জন্য আর কেউ নেই। যে আপনার জীবনের সফলতার পথে বাধা। অনন্ত জীবনের যে মহাসাফল্যের কথা আপনাকে আপনার রব শুনিয়েছেন, যুগে যুগে নবি-রাসুলগণ যে মহাসাফল্যের কথা আপনাকে শুনিয়ে গেছেন, সেই সফলতার দরজায় আপনার জন্য দুর্গসমান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে শত্রু, তাকে আপনি চিনতে চান না? আপনাকে আপনার রব চিনিয়ে দিচ্ছেন এভাবে-
إنه لكم عدو مبين
নিশ্চয় সে (শয়তান) তােমাদের প্রকাশ্য শত্রু 1]
এবার আপনি আপনার প্রকাশ্য, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু, আপনার সফলতার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাকে চিনে ফেলেছেন। শুধু শত্রুকে চিনে ফেললেই তার শত্রুতা থেকে বাঁচা যায় না। তার কলা-কৌশল, তার পরিকল্পনা, তার দুরভিসন্ধি, তার অসৎ অভিপ্রায় সম্পর্কে জানতে না পারলে শত্রু চিহ্নিতকরণের যে সাফল্য, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। আপনার রব আপনাকে এখানেও হতাশ করেনি। তিনি কখনাে তার প্রিয় বান্দাদের হতাশ করেন না। তিনি আপনাকে ভালােবাসেন। তাই, তিনি কেবল আপনাকে শত্রু চিনিয়ে দিয়েই থেমে যাননি।
বলেননি, ‘শত্রুকে চিনিয়ে দিলাম। এবার তার পরিকল্পনা জেনে নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নাও।' তিনি শত্রু চিনিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শত্রুর পরিকল্পনাও আপনার সামনে তুলে ধরেছেন। আপনাকে জানিয়ে দিয়েছেন আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু আপনাকে নিয়ে কী ফন্দি আঁটছে। আপনাকে ঘিরে আপনার শত্রুর মহাপরিকল্পনা তিনি ফাঁস করে দিয়েছেন এজন্যই যে, তিনি আপনাকে ভীষণ ভালােবাসেন। আপনি যাতে নির্বিঘ্নে শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পারেন, শত্রুকে পরাস্ত করতে পারেন, গলুর পরিকল্পনা জেনে তাকে ঠেকানাের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
হ্যাঁ, শয়তান আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রকাশ্য শত্রু। আপনাকে ঘিরে শয়তানের। রয়েছে কয়েকটা নীল নকশা। সেই নীল নকশাগুলাের ফাঁকফোকর জেনে আপনাকে। সামনে আগাতে হবে। আপনাকে মনে রাখতে হবে, সামান্য একটু পা ফসকালেই। আপনি অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারেন। তাই অতি সাবধানে, খুব সতর্কতার সাথে আপনাকে পথ চলতে হবে। আপনাকে আরও মনে রাখতে হবে, শয়তান কখনােই আপনার মহান রবের চেয়ে বড় নয়। শয়তানের শক্তি কখনােই আপনার প্রতিপালকের শক্তির ওপর বিজয়ী হতে পারে না। তবে, এটা নিশ্চিত, শয়তান আপনার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। শয়তানের চক্রান্তের কাছে আপনি নিতান্তই শিশু। শয়তানের পরিকল্পনার সামনে আপনার পরিকল্পনা স্রেফ খড়কুটোর মতন উড়ে চলে যাবে। তাই কখনােই এমন ধারণা করা উচিত নয় যে, আপনি নিজ যােগ্যতায় শয়তানকে পরাস্ত করে ফেলতে পারবেন। এটা একেবারেই অসম্ভব। এমনকি আল্লাহর শক্তিশালী কালাম কুরআন মাজিদ পাঠের সময়ও আমরা বিতাড়িত শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। বলি, আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
আপনাকে ঘিরে আপনার প্রকাশ্য শত্রু, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশমন শয়তানের চার-চারটে মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। কুরআনের সুরা নিসার মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেই চারটে পরিকল্পনা, সেই চারটে মাস্টারপ্ল্যান বিবৃত করেছেন। শয়তান যখন তার দোষে আসমান থেকে বিতাড়িত হলাে, যখন সে অভিশপ্তদের কাতারে নাম লেখাল, তখন সে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সামনে চারটে অঙ্গীকার তথা শপথ করে। সেই চারটে শপথ সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে।
জাহান্নামের লেলিহান শিখা থেকে নিজেকে বাঁচানাের জন্যই আপনাকে জানতে হবে। শয়তানের প্রথম অঙ্গীকার ছিল—
ولأضلهم
এবং আমি তাদের অবশ্যই পথভ্রষ্ট করব[1]
শয়তান এ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, সে আপনাকে পথভ্রষ্ট করবে। সে আপনাকে। আপনার আসল পথ থেকে বিচ্যুত করবে। সে আপনাকে বিপথগামী করবে। শয়তান কীভাবে আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে, সে ব্যাপারটা বােঝার জন্য আমরা সৃষ্টির। একেবারে শুরুর দিকের একটা ঘটনায় আলােকপাত করতে পারি। আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামকে শয়তান কীভাবে জান্নাত থেকে বিচ্যুত করেছিল সেই ঘটনা আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শয়তান যে জিনিসটা সবচাইতে ভালাে বােঝে সেটা হলাে মানুষের সাইকোলােজি। সে জানে মানুষ কীসে প্রলুব্ধ হয়, কীসে তার আগ্রহ। মানুষের সাইকোলােজি বুঝেই শয়তান টোপ ফেলে। যেমন—আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামকে সৃষ্টি করার পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের জান্নাতে থাকতে দিয়েছিলেন। তবে, সাথে জুড়ে দিয়েছেন একটা শর্ত, একটা নিষেধাজ্ঞা। জান্নাতের সবখানে তারা বিচরণ করতে পারবে, ঘুরে বেড়াতে পারবে, সবকিছুই ভােগ করতে পারবে, তবে নির্দিষ্ট একটা গাছের কাছে তারা যেতে পারবে না। এই নিষেধাজ্ঞা মেনেই আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালাম জান্নাতে থাকতে শুরু করলেন। এই নিষেধাজ্ঞার ভেতর থেকেই শয়তান নিজের চালটা বের করে আনল।
জান্নাতের পরমানন্দে অভিভূত হয়ে যান আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালাম। আহা! স্বপ্নও তাে এত সুন্দর হয় না! সেই অপরূপ নৈসর্গিক স্বর্গোদ্যানে তারা খুব আনন্দের সাথেই দিন কাটাতে লাগলেন। এমনই আনন্দমুখর একটা দিনে, একদিন ইবলিস শয়তান তাদের কাছে এলাে। বলল, আল্লাহ যে তােমাদের ঐ গাছটির নিকটে যেতে বারণ করলেন, তার কারণ জানাে? তার কারণ হলাে—তােমরা যদি ঐ গাছটার কাছে যাও এবং ঐ গাছের ফল খাও, তাহলে তােমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে, নয়তাে তােমরা এখানে চিরঅমর হয়ে যাবে। যাতে তােমরা ফেরেশতা বনে যাওয়া কিংবা চিরঅমর হওয়ার সুযােগ না পাও, সে জন্যেই কিন্তু আল্লাহ তােমাদের ঐ গাছের কাছে ঘেঁষতেও নিষেধ করেছেন। [১]
বলা বাহুল্য, সৃষ্টিগতভাবেই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের রয়েছে দুর্বার আকর্ষণ। তারা হয়তাে ভাবল, ‘এত পরমানন্দের সবখানে যাওয়ার, সবকিছু ছোঁয়ার, সবকিছু করার অনুমতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দিয়েছেন, তাহলে কেবল ওই
গাছটার নিকটেই-বা কেন যেতে বারণ করলেন? কী এমন আছে ঐ গাছটায়।
বুবিতে শয়তান মানুষের চেয়ে আরও কয়েক কাঠি সরেস। সে আরও বলল, আমি কিন্তু তােমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। তােমাদের ভালাে চাই বলেই কিন্তু কথাগুলাে বললাম। ১] শয়তান যার শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে যায়, তার কি আর নতুন করে শত্রুর দরকার পড়ে? আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামেরও নতুন শত্রুর দরকার পড়েনি। শয়তানের এহেন প্ররােচনায় প্রতারিত হয়ে তারা দুজনে শেষ পর্যন্ত ওই গাছের ফল খেয়ে বসেন এবং জান্নাত থেকেই বিচ্যুত হন।
শয়তানের প্ররােচনার ব্যাপারটা খেয়াল করুন। সে কিন্তু খুব সাদাসিধে, স্পষ্টভাষী, এবং হিতাকাঙ্ক্ষী সেজেই আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামের কাছে এসেছিল, এবং তাদের সাইকোলােজি বুঝেই তাদের জন্য টোপ ফেলেছিল। একটা নিষিদ্ধ জিনিসকে আকর্ষণের বস্তু বানিয়ে সেটার সাথে এমন দুটো জিনিসকে সে জুড়িয়ে দিয়েছে যা ক্ষণিকের জন্য আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। ফেরেশতা হয়ে যাওয়া কিংবা চিরঅমর হয়ে থাকা। মুহূর্তেই এই দুটোর জন্য প্রলুব্ধ হয়ে ওঠে তাদের মন। ফলে, তারা তাদের কৃত ওয়াদা ভুলে যান এবং ওই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে বসেন।
বাস্তব জীবনে শয়তানের চালগুলাে এমনই। সে মানুষকে এভাবেই বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট করে থাকে। আপনার শত্রু বেশে শয়তান আপনার সামনে হাজির হবে না কখনােই। আপনার চিরহিতৈষী, চিরশুভাকাঙ্ক্ষী সেজেই সে আপনার সামনে উপস্থিত হবে। প্রথমেই সে আপনার মন বুঝে নেবে। আপনি কোন জিনিসের প্রতি আসক্ত, আকর্ষিত সেটা জেনে নিয়ে, সেই মােতাবেক শয়তান আপনার জন্য টোপ ফেলবে। আপনার মনে শয়তান এই ধারণার উদয় করিয়ে দেবে যে, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আপনাকে সে বােঝাবে, দেখ বাপু! হতে পারে দুর্গাপূজা হিন্দুদের উৎসব। সেই উৎসবে গেলে তুমিও যে হিন্দু হয়ে যাবে, এমনটি কিন্তু কোথাও লেখা নেই। তুমি সেখানে গেলেই যে তােমার মুসলমানিত্ব নিয়ে টানাটানি পড়বে, তাও না। এটাকে তুমি হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব হিশেবে না দেখে কেবল একটা সাধারণ উৎসব হিশেবেই দেখাে। তােমার বাড়ির পাশের একটা উৎসবই মনে করাে। মনে করাে সেখানে একটা মেলা হচ্ছে। তােমার সাদা মনে তাে আর কোনাে কাদা নেই, তাই না? ওই
দেবীকে তাে তুমি পূজোও করছ না, তার পায়ে মাথাও ঠেকাচ্ছ না। কেবল একট চিত্তবিনােদনের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছ। আরও কতজনই তাে যায়। এতে কি তাদের জাত যাচ্ছে, না ধর্ম লােপ পাচ্ছে?
অথবা শয়তান আপনাকে ওয়াসওয়াসা দিতে পারে এই বলে যে, পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শােভাযাত্রায় বাঘ-ভাল্লুক আর প্যাঁচার প্রতিমূর্তি মাথায় নিয়ে মিছিল করার মধ্যে খারাপ কিছু নেই; বরং এগুলাে তােমাকে দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শেখাবে। তােমার মতন কত মুসলিমই তাে এসব উৎসবে যায়, তাদের কি ধর্ম চলে গেছে।
নতুবা শয়তান আপনাকে বলবে, ‘একজন পরনারীর সাথে বসে দু-দণ্ড গল্প করলে, একটু সুখ-দুখের কথা বললে, দুজনে কোথাও ঘুরতে গেলে, হাত ধরে পার্কে হাঁটলে পাপ হয় না। তুমি তাে আর তার সাথে অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছ না। তােমার মনে তাে এ রকম কোনাে অসৎ অভিপ্রায় নেই। তুমি তাে তাকে কেবল বন্ধুই ভাবাে। ছােটবােনের মতােই দ্যাখাে। তাহলে, তার সাথে এহেন সম্পর্ক রাখতে দোষ কী?
শয়তানের টোপগুলাে এমনই। আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে, আপনাকে আপাত ‘ভালাে বুদ্ধি দিয়ে সে আপনাকে দুর্গাপূজায় নিয়ে ছাড়বে। পহেলা বৈশাখের বাঘ-ভাল্লুক আর প্যাঁচার মূর্তি মাথায় পরিয়ে আপনাকে দিয়ে মঙ্গল শােভাযাত্রা করাবে। আপনাকে সে পরনারীর কাছাকাছি, পাশাপাশি নিয়ে যাবে আপনার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বুঝে। এভাবেই শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করে যার ওয়াদা সে আল্লাহর সাথে করেছিল এবং আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব।
শয়তানের কৃত দ্বিতীয় ওয়াদা হলাে—
আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে কামনা-বাসনা বাড়িয়ে দেবাে
খুবই ভয়ংকর একটা ওয়াদা। শয়তান বলছে সে মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনা বাড়িয়ে দেবে। যদি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে
আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করব যে, দৈনন্দিন জীবনে কোনাে-না-কোনােভাবে শয়তান আমাদের মধ্যে দুনিয়াবি কামনা-বাসনা বাড়িয়ে দিয়ে তার ওয়াদা পূর্ণ করে বসে আছে। কিন্তু শয়তানের প্ররােচনায় আমরা এতটাই বিভাের আর প্ররােচিত যে, তার চক্রান্তগুলোকে বুঝে ওঠার জন্য যথেষ্ট সংবিৎ টুকু হারিয়ে বসে আছি।
আমি এমন অনেককেই চিনি যারা দরকারে ঘুস দিয়ে হলেও চাকরি করতে প্রস্তুত। লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুস দিতে হবে জেনেও সেই চাকরির জন্য তারা হা-হুতাশ করতে থাকে। এই যে, ঘুস দেওয়া-নেওয়ার নামে একপক্ষ প্রতারণা করে আর অন্যপক্ষ প্রতারণার আশ্রয় নেয়, কেন তারা এমনটা করে? জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, এ রকম চাকরি মানেই জীবনের একটা পয়ম নিশ্চয়তা। একজীবনে যে সুখ দরকার, তার সবটাই দিতে পারে এমন চাকরি। অবৈধ পন্থায় জীবিকা নির্বাহের এই যে মােহ, এই যে বাসনা, দুনিয়ার জীবনে কেবল একটু আরাম আয়েশের জন্য এই যে প্রবঞ্চনা—এটাই হলাে শয়তানের চাল। সে বুঝিয়েছে, এই জীবনে ভালাে থাকতে হলে ভালাে চাকরি দরকার। সেই চাকরির জন্য যদি ঘুস দিতে হয়, তাতে কোনাে সমস্যা নেই। জীবনে বড়লােক আর টাকাওয়ালা হওয়াটাই মুখ্য। কীভাবে আর কোন উপায়ে হতে হবে সেটা নিতান্তই গৌণ।
মানুষ যখন শয়তানের ফাঁদে পড়ে আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন তার কাছে দুনিয়াটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। পরকালের জীবনের কথা তার হৃদয়ের মানসপট থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেই স্থান দখল করে নেয় দুনিয়ার চাকচিক্য। সেখানে ভালােমন্দ বিচারের বদলে আরাম-আয়েশ হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচনার বিষয়। এভাবেই শয়তান তার কৃত ওয়াদা পূরণে বিজয়ী হয়।
আমাদের জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ক্যারিয়ার ভাবনাকে সামনে নিয়ে ভাবতে বসলেই বােঝা যাবে যে, আমাদের জীবনের প্রতিটা কর্মই দুনিয়ামুখী। আমরা এমনভাবে বাঁচি যেন মৃত্যু কখনােই আমাদের স্পর্শ করবে না। আমাদের সন্তানদের আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানানাের স্বপ্ন দেখি। সুপ্ন দেখি তাদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, একটি সুন্দর আগামীর। সেই সুন্দর আগামীর রূপরেখাটা কেমন? তারা। অনেক বড় হবে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। উঁচু দালান আর আলিশান বাসায় থাকবে। এমন স্বপ্নের হাত ধরে, আমাদের সন্তানদের আমরা দুনিয়ার জীবনে প্রতিষ্ঠিত করি ঠিকই, কিন্তু আমরা টেরই পাই না যে, দুনিয়ার অভিলাষ পূরণ করতে গিয়ে তাদের আমরা আখিরাতের জীবন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি।
শহুরে জীবনের যে মা তার সন্তানকে ভােরবেলায় ঘুম থেকে তুলে হারমােনিয়াম- সমেত গান শিখতে বসায়, যে বাবা সন্তানকে স্পাের্টস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। তারা কি কখনাে ভাবে যে, এই ক্ষণিকের দুনিয়ার পরে তাদের সামনে পড়ে রয়েছে এক অনন্তকালের জীবন? তারা কি কখনাে উপলদ্ধি করতে পারেন, এই সন্তানের জন্য একদিন আল্লাহর কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতে হবে, জবাবদিহি করতে হবে। সম্ভবত পারেন না। পারেন না কারণ, শয়তান দুনিয়ার এক রঙিন চশমা তাদের চক্ষুযুগলে পরিয়ে দিয়েছে। সেই রঙিন চশমায় দুনিয়াটা বড় উপভােগের। সেই উপভােগের দুনিয়ায় হৃদয় থেকে আখিরাতের ভাবনা বিস্মৃত করে দিয়ে শয়তান তাতে দুনিয়ার কামনা-বাসনা প্রতিস্থাপন করে রাখে। এভাবেই জিতে যায় শয়তান। হেরে যায় মানুষ। হেরে যাই আমরা।
শয়তানের তৃতীয় ওয়াদা ছিল—
وأمرهم قلبت آذان الأنعام
এবং আমি তাদের নির্দেশ দেবাে, ফলে তারা জন্তু-জানােয়ারদের কান ছেদন করবে (1)
এই আয়াতটির ব্যাপারে তাফসিরগুলােতে বেশ সুন্দর ব্যাখ্যা এসেছে। তাফসিরে বলা হয়েছে, প্রাক-ইসলামি যুগে প্যাগানদের মধ্যে একটি ভারি অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু ছিল। প্যাগানরা জন্তু-জানােয়ারদের ধরে, তাদের কান কেটে, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে সেগুলােকে বেঢপ বানিয়ে ফেলত এবং পরে সেগুলাের পূজো করত। সেগুলােকে স্রষ্টার দূত, বিভিন্ন দেবদেবীর দূত বলে প্রচার করত। মূলত, ধর্মের বিকৃতিসাধন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। শয়তান এমন ব্যাপারকেই উদ্দেশ্য করে বলছে, সে মানুষকে দিয়ে ধর্মের বিকৃতি ঘটিয়ে ছাড়বে।
আজ কি আমরা ধর্মকে বিকৃত করছি না? ‘সেকুলারিজম’-এর নামে আমরা কি বলছি না, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার? অসাম্প্রদায়িকতার নাম ভাঙিয়ে আমরা কি অমুসলিমদের পূজোপার্বণে যােগ দিচ্ছি না, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে আমাদের জন্য হারাম করেছেন? পহেলা বৈশাখে
[১]সুরা নিসা, আয়াত: ১১৯
মঙ্গল শােভাযাত্রার মতন ব্যাপারগুলােকে ধর্মের সাথে অসাংঘর্ষিক ভাবছি। নিজেদের যা ভালাে লাগছে, নিজেদের খেয়ালখুশিকে ইচ্ছেমতাে ব্যবহার করে দিনশেষে আমরাই আবার ফাতওয়া তালাশ করছি, অমুক জিনিস করা যাবে না, তা কুরআনের কোথায় বলা আছে?
শুধু কি তা-ই? নতুন নতুন বিদআত চালু করেও ধর্মকে আমরা বিকৃত করে চলছি রােজ। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য নির্ধারণ করেননি, এমনসব কাজ আমরা করি যা প্রকারান্তরে ধর্মকে বিকৃত করা। শয়তান তার চতুর্থ এবং শেষ ওয়াদায় বলেছে
ولآمرنهم فليغيرن خلق الله
এবং আমি অবশ্যই তাদের নির্দেশ দেবাে, ফলে তারা সৃষ্টির বিকৃতিসাধন ঘটাবে। [১]
শয়তানের এই ওয়াদার বাস্তবায়ন আজ আমরা অহরহ দেখতে পাই আমাদের সমাজে। বেশ কিছুদিন আগে, কোনাে এক দরকারে টিএসসি গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি অতিক্রম করার সময় আমি লম্বা চুল এবং সেই চুলে ঝুটি বাঁধা একজনকে দেখতে পেলাম। পরনে জিন্স আর টি-শার্ট। ঢাকা শহরের আল্টামডার্ন আধুনিক মেয়েরা এ ধরনের পােশাক পরে বিধায় আমি তাকে সে রকম কোনাে এক মেয়ে ভেবেছিলাম। পরে দেখা গেল, ওটা আসলে কোনাে মেয়ে ছিল না। দাড়ি-গোঁফওয়ালা একজন পুরুষ!
নারীর মতাে বেশভূষা ধরা শুরু করেছে আমাদের পুরুষেরা। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিমা বিশ্বে এখন খুব হট্টোগােলের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রান্সজেন্ডার কাহিনি। ছেলেদের যদি নারী হতে মন চায়, তাহলে তারা সার্জারী করে নারী হয়ে যাচ্ছে। নারীদের যদি পুরুষ হতে মন চায়, তাহলে তারাও একই কায়দায় পুরুষ বনে যাচ্ছে। আল্লাহর সৃষ্টির সাথে কত জঘন্য এই মশকরা, ভাবতে পারেন?
নারীরা চুল ছেটে ছােট করে ফেলছে, পুরুষরা মাথার চুল নারীর মতন লম্বা করছে। নারীরা শার্ট-প্যান্ট গায়ে তুলছে, পুরুষ হাতে-কানে তুলছে বালা আর দুল। মেয়েরা ভ্রু প্লাগ-সহ নানানভাবে আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি ঘটিয়ে চলছে হরহামেশাই।
শয়তান তার মিশনে সর্বৈব বিজয়ী। আমাদের দাবার গুটি বানিয়ে সে নিজের কৃত ওয়াদা পূরণে বদ্ধপরিকর। সে নিজে তাে ধ্বংসপ্রাপ্ত আর অভিশপ্ত, তবে সে একা ধ্বংস হতে চায় না, একাই অভিশপ্ত থাকতে চায় না। সে চায় আল্লাহর বান্দাকে তাঁর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে তাদেরও অভিশপ্ত আর ধ্বংসপ্রাপ্ত করে ছাড়তে। তাই আল্লাহ বলেছেন-
ومن يتخذ الشيطان وليا من دون الله فقد ځیر رانا مبينا
আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে যে শয়তানকে বন্ধু হিশেবে গ্রহণ করে, সে স্পষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত [1]
শয়তান আমাদের শত্রু, প্রকাশ্য শত্রু। সে আমাদের সাথে এক মহাযুদ্ধে অবতীর্ণ। আর যুদ্ধ মানেই হলাে শত্ৰু-শত্রু খেলা। সেই খেলায় আমাদের জিততে হবে। হারাতে হবে শত্রুকে। পর্যদস্ত করতে হবে শয়তানের সমস্ত চক্রান্ত। আমাদের বাঁচানাের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা শত্রুর পরিকল্পনা আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। বলে দিয়েছেন কোন কোন উপায়ে, কোন কোন কৌশলে, কোন কোন রঙে, ঢঙে শত্রু আমাদের সামনে আসতে পারে। এবার আমাদের পালা! শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে আমাদের হতে হবে সংকল্পবদ্ধ। সর্বোতভাবে পরাজিত করতে হবে তাকে। নয়তাে আমরা হারিয়ে যাব, এক নিকষকালাে অন্ধকারের মাঝে।
চলবে ইনশাআল্লাহ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now