বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
২য় বেঞ্চের মাথা নিচু করে বসে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ পড়ল হঠাৎ। পড়ানো থামালাম। ছেলেটাকে দাঁড়াতে বললাম। তার পাশের ছেলেটা তাকে খোঁচা না দিলে বোধয় আমার আওয়াজ তার কানেই যেত না। বন্ধুর খোঁচায় ছেলেটা প্রায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল। একবার চারিদিকে তাকালো৷ দাঁড়াতে দাঁড়াতে চোখ কচলাচ্ছিল হাত দিয়ে। বোধয় ঘুমিয়ে গেছিল। হাতের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম, ছেলেটার ডান হাতে সাদা ব্যান্ডেজ। ব্যান্ডেজের উপর লাল রক্তের দাগ ছড়িয়ে আছে। বোঝা গেল, হাত টা কেটেছে খুব বেশি সময় হয়নি।
চোখ কচলানো শেষ হলে ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলাম " কিরে তোর কি শরীর খারাপ? ঘুম পাচ্ছে? ছুটি লাগবে?"
ছেলেটা এই প্রশ্নের জবাবে সরাসরি কোন উত্তর দিল না৷ কাঁচুমাচু করতে লাগল। বোধয় লজ্জা পেয়ে গেছে। বারবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছে, চোখ বুলাচ্ছে।
আবার প্রশ্ন করলাম " হাতে ব্যান্ডেজ দেখছি। হাত কেটেছিস কিভাবে রে? "
ছেলেটা এই প্রশ্নটার ও কোন উত্তর দেয়না। এইবার আর এদিক সেদিক না তাকিয়ে বরং মাথাটা নিচু করে হাই বেঞ্চের পাটাতনে তাকিয়ে থাকে।
এই প্রশ্নটার উত্তর ছেলেটা না দিলেও, তার পাশে বসে থাকা ছেলেটা ঠিক ই উত্তরটা দিল৷ ক্লাসের সবাই জানে ওরা দুজন খুব ভালো বন্ধু। একেবারে গলায় গলায় ভাব। একজন আরেকজন কে ছাড়া বসতে পর্যন্ত পারেনা৷ কিন্তু ছেলেটা যে উত্তর দিলো, সে উত্তর শুনে দশম শ্রেনীর গোটা ক্লাসরুম হেসে উঠল শব্দ করে৷
ছেলেটে দাঁত কেলাতে কেলাতে বলল -
" স্যার ও কালকে ব্লেড দিয়া হাত কাইটা ফেলছে, কারণ স্যার ও ছ্যাকা খাইসে। হিহিহি! "
গোটা ক্লাসরুম হৈ-চৈ করে হাসছে। শুধুমাত্র সে হাতকাটা ছেলেটা বাদে। সে তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
গোটা ক্লাসরুমের হাসি থামালাম। আবার ছেলেটার কাছে প্রশ্ন করলাম।
"তোর বন্ধু যা বলছে তা কি সত্যি? প্রেমজনিত কিছু?"
কিন্তু কোন উত্তর দিলোনা। অথচ তার বন্ধু আবারো নিজের উত্তরের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলল " আরে স্যার আমি একদম শিওর স্যার। ও একটা মেয়ের জন্যেই হাত কাটছে স্যার।"
আবার ক্লাসরুম হেসে উঠল৷ হো হো করে৷ আবার সবাইকে থামালাম। আরেকবার ছেলেটার দিকে তাকালাম। ছেলেটা এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি এবার ছেলেটার খুব সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলাম। খেয়াল করলাম ছেলেটার চোখ জলে ঘিরে এসেছে ইতিমধ্যেই। আমি এই প্রথম ওর নাম ধরে ডাকলাম। কোন শিক্ষক যখন তার ছাত্রকে নাম ধরে, আদুরে গলায় ডাকেন তখন ছাত্রের কাছে সেই শিক্ষক আর কেবল শিক্ষক থাকেনা৷ খুব চেনা কোন আত্মীয় হয়ে যায়।
বললাম " জয় কি হয়েছে, আমাকে সত্যি করে বলবি?নিশ্চয় আমাকে বলবি। তাই না? হুম?"
ছেলেটা এবার নিচু মাথা উঁচু করল। আমার দিকে তাকালো।
তাকে অভয় দিয়ে বললাম - "বল হাতে কি হয়েছে। আমি জানি তোর হাতে এমন কিছু হয়েছে যেটা কাউকে বলা যায়না। সেখানে গোটা ক্লাসরুমের সামনে আমার জিজ্ঞাসা করাটা অন্যায়। আমি চাইলে এটা ক্লাসরুমের বাইরে তোর কাছে জেনে নিতে পারতাম। কিন্তু সেটা এখন আর সম্ভব না। কারণ তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ইতিমধ্যে তোকে পঁচিয়েছে। গোটা ক্লাসরুম তোকে নিয়ে হেসেছে। তাই তোকে কারণটা এখানে, সবার সামনে বলতে হবে। "
ছেলেটা ইতস্তত করছিল বেশ অনেকক্ষণ। আমিও সময় দিলাম। ওর সংকোচ দেখে ভাবলাম, হয়ত ছেলেটা বলবেনা। কারণ এই পৃথিবীতে সবাই বলতে পারেনা। কেউ কেউ থাকে এমন,যারা গোটা এক জীবন শুধু শুনে এবং কিছু বলতে চাওয়ার চরম ইচ্ছা নিয়ে কাটিয়ে দেয়।
আমি আবার পড়ানোতে ফিরে যাচ্ছিলাম। হোয়াইট বোর্ডের দিকে ফিরলাম। পুরা ক্লাসরুম নীরব, থমথমে।
ছেলেটা আমাকে পেছন থেকে ডেকে বলল " স্যার আমি বলব।"
আমি আনন্দিত হয়ে গেলাম। পুরা ক্লাসরুমে আমার আনন্দের এই মাত্রা ছড়িয়ে গেল। ক্লাসরুমের সবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। বুঝলাম ওরাও আমার মতন শুনতে ইচ্ছুক।
ছেলেটা তখনো মাথা নিচু করে রাখল। বলতে যাচ্ছিল। তার আগে বললাম " আগে মাথা উঁচু কর। সত্য সবসময় উঁচু মাথা করে বলতে হয়।"
ছেলেটা মাথা উঁচু করল৷ বলতে আরম্ভ করল
" স্যার আসলে আমার হাতটা কোন মেয়ের কাছে ছ্যাকা খাওয়ার জন্যে কাটেনি৷ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ভুল বলেছে। স্যার গতরাতে আমার... আব্বু... আর আমার আম্মুর.... মধ্যে স্যার খুব ঝগড়া হয়েছিল। স্যার ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমার আব্বু আমার পড়ার টেবিল থেকে আমার স্কেল টা নিয়ে আম্মুকে........ মা...র..তে যাচ্ছিলো... আমি আব্বুকে থামাতে গেলে..স্যার.....।
ছেলেটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। পুরা ক্লাস এর সকল উৎসুক চোখ এখন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তখনো বলছে
"স্যার আমি কোন মেয়ের জন্যে আমার হাত কাটিনি স্যার। আমার বন্ধু ভুল বলেছে স্যার।"
সেই বন্ধুটার দিকে এবার আমরা সবাই তাকালাম৷ যে ছেলেটা এই একটু আগে, বন্ধুর হাত কাটা নিয়ে মিথ্যা আনন্দ উদযাপন করছিল। পুরা ক্লাসরুমের সামনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে ক্লাউন বানাতে চাইছিল। সে এখন মাথা নিচু করে বসে আছে।
আমি এবার তার কাছে গেলাম। তার নাম ধরে ডাকলাম। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করলাম " দ্বীপ, তোর বন্ধু জয় এর সাথে কি গতরাতে তোর কথা হয়েছিল?"
সে মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল " জ্বি স্যার।"
এবার জয়কে প্রশ্ন করলাম" জয় ফোনটা কে করেছিল? তুই নাকি দ্বীপ?
স্যার ফোনটা আমি দ্বীপকে করেছিলাম।
কেন?
স্যার আব্বু-আম্মুর ঝগড়া দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। তাই শেয়ার করতে ইচ্ছে করছিল ওর সাথে।
তুই কি শেয়ার করতে পেরেছিলি?
না স্যার।
কেন?
স্যার ফোন করতেই দ্বীপ অন্য কিছু নিয়ে এত ব্যস্ততা দেখালো৷ আমার একটা জরুরী কথা আছে, বলার পরেও দ্বীপ শুনতে চাইলোনা। ও ওর কথাই বলতে থাকল।
এবার দ্বীপকে বললাম " দ্বীপ তুই কি কিছু বলবি?"
দ্বীপ আর কিছু বলতে পারল না৷ পারার তো কথাও না।
আমি জয়কে বললাম-
জয় তুই হয়ত চাইলেই তোর বাবাকে বদলাতে পারবিনা। কিন্তু তুই চাইলে কিন্তু তোর বেস্ট ফ্রেন্ডকে বদলাতে পারিস।
জয় চুপ করে রইলো। দ্বীপের দিকে তাকালো।
আবার বললাম - জয়, শোন। এবার এমন একটা বেস্ট ফ্রেন্ড বানাবি যে মাঝরাতে তোর ঘুমের মধ্যে রেকর্ড করে রাখা দুইঘন্টার ঘুমের প্রলাপটাও মন দিয়ে শোনে। একটা সেন্টেন্স ও যেন মিস না করে।
পুরা ক্লাসের দিকে মাথা ঘুরিয়ে বললাম-
এই একই কথা পুরা ক্লাসরুমের জন্যে আবারো জোরালো গলায় বলছি। যে তোমার মন খারাপের গল্প শোনেনা, তাকে এক্ষুণি বদলে নাও। কেউ না কেউ আছে তোমাকে শোনার জন্যে। তাকে খুঁজে নাও।
দ্বীপ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
দ্বীপকে বললাম-
"স্যরি দ্বীপ ইউ এন্ড জয় আর নট মেইড ফর ইচ আদার। " বন্ধুত্বেও মেইড ফর ইচ আদার টার্ম টা খুব জরুরী৷
দ্বীপ আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে জয়কে জড়িয়ে ধরে ফেলল। আমরা সবাই মুগ্ধ চোখে সেটা দেখলাম।
দ্বীপ জয়কে বলল-
"স্যরি বন্ধু, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দে৷ আজ থেকে আমি তোর সব কথা শুনব। না শুনলে তুই আমাকে লাত্থি মারিস। এই গোটা ক্লাসের সামনে প্রমিস করলাম "
জয় হেসে দিল। আমরাও সবাই হেসে উঠলাম। হাততালি দিলাম।
এই হাসি বিদ্রুপের না।
এই হাসি আনন্দের।
বেস্ট ফ্রেন্ড
লেখকঃ ওমেদ হাসান
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now