বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সদরঘাটে পৌঁছে নিজের বিশাল ব্যাগটার দিকে নিশা হতাশ চোখে তাকাল।
সামনে সারি সারি করে রাখা লঞ্চগুলোর কাঠের পলকা সিড়ির দিকে তাকিয়ে ও চুড়ান্তভাবে হতাশ হয়ে গেল।বিশাল এই ব্যাগ নিয়ে এমন সিড়ি দিয়ে সে কেমন করে উঠবে? এই ব্যাপারটায় তার দারুন ভয় কাজ করে। ইচ্ছে হচ্ছে ফিরে যেতে,তা তো সম্ভব নয়! একটা কুলি কি ডাকবে ও? ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো নিশি।সব বাচ্চাবাচ্চা ছেলেগুলো বিশাল ব্যাগ কাধে,মাথায়, ঘাড়ে নিয়ে লঞ্চে উঠছে। এইটুকু বাচ্চার হাতে সে কিছুতেই ব্যাগটা দিতে পারবেনা। কেন যেন বাচ্চাদের এই কাজটা সে মেনে নিতে পারেনা।এটা ওদের রুজি যোগায়,জানে ও তবুও পারেনা! তার থেকে বরং সাহস করে নিজেই চেষ্টা করা যাক। লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে ব্যাগ হাতে নিল ও। “বিসমিল্লাহ” বলে হাঁটা শুরু করল। লঞ্চের কাঠের সিড়িটা পার করে হাঁপাতে লাগল। নিজের সাহসে নিজেই অবাক হয়ে গেল। এবার কাজ হল তিনতলায় উঠা, এটা আর এক মুসিবত।
নো টেনশন নিশি,এই পর্যন্ত পারলে বাকিটাও হয়ে যাবে। নিজেকে সাহস যোগাল ও।আচ্ছা,লঞ্চের সিড়িগুলো এত সরু কেন হয়? দুজন মানুষ পাশাপাশি উঠতে পারে না। যাক, উঠতে শুরু করলে শেষ হয়েও যাবে। নিশি তার বিশাল সাইজের ব্যাগ হাতে নিয়ে কোনমতে সিড়ি ভাঙতে শুরু করল।
ধাক্কাটা পূর্বনির্ধারিত ছিল এবং সময় বুঝে ঠিকঠাক লেগেও গেল। বাংলা সিনেমার আলমগীর-শাবানা-জসিমের মত তাদের ধাক্কাটা কলেজের সিড়িতে না লেগে বরিশালগামী লঞ্চের এই সরু সিড়িতে লেগে গেল।
নিশি পরে যেতে যেতেও পরলনা, ওই মানুষটাই তাকে ধরে ফেলল। দারুন বিরক্ত হল ও। এই সিড়ি দিয়ে যে পাশাপাশি দুজন উঠতে পারেনা সেটা কি এই মানুষটা জানেন না?
“আমি,আমি সত্যি দুঃখিত”,ভরাট একটা কন্ঠ বলে উঠল।
ব্যাগটা ধরে, নিজেকে ঠিকঠাক করে নিশি তাকে দুঃখিত বলা মানুষটার দিকে তাকালো। লম্বা, একমাথা চুলের এক তরুন। কিছু বলা বা শোনার ইচ্ছা হলনা নিশির। তার আগে কেবিনে যাওয়া দরকার।
লঞ্চ ঘাট থেকে ছেড়ে যাবার আগের মুহুর্তগুলো নিশির খুব ভাল লাগে,ব্যস্ত মানুষগুলো দেখতে।এই সময়টা সে কেবিনের সামনের চেয়ারে বসে থাকে। একা থাকায় এবার ব্যাপারটা অন্যরকম। কিছুটা সাবধান তো তাকে থাকতেই হবে। লঞ্চে থাকা বাড়তি মানুষগুলো নেমে যাক, সে কেবিনে তালা লাগিয়ে ডেকে দাঁড়াবে। নদীর বাতাসে এক দারুন প্রশান্তি অনুভব করে ও,অবশ্যি বুড়িগংগা পার হলে। বুড়িগংগার কুচকুচে কালো বিষাক্ত পানির গন্ধে বাতাসটাও বিষাক্ত হয়ে যায়।
অন্যদের কেবিনে তুলে দিয়ে নিজের কেবিন খুঁজতে বের হল ফাহিম। ছেড়ে দেওয়া লঞ্চের বাতি নিভিয়ে দেওয়ায় কেবিন খুঁজে পেতে একটু কষ্ট হচ্ছে। ব্যাপারটাকে ওর গোলকধাঁধার মত মনে হয় সবসময়, খুঁজে পেতে দারুন ঝামেলা লাগে। লঞ্চের বয়-বাবুর্চি কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে, কিন্তু ফাহিমের সেটাও ইচ্ছে করছেনা। সে নিজেই বের করবে খুঁজে।
নদীর জল কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে লঞ্চ। প্রপেলার ঘুরতে শুরু করেছে,আস্তে আস্তে গতি বাড়িয়ে ঘাট ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
রাতের নদী যেন অপার্থিব,নিশির জন্য এটা নতুন না তবু প্রতিবার তার কেন সব নতুন লাগে। নিশি ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাল্কা গোলাপী শাড়ি হাওয়ায় উড়ছে। উড়ছে তার চুলের পতাকা।কত্তদিন পর ফিরবে সে,নিজের শহরে। প্রচন্ড এক ভাললাগা ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে।
“আপনিও এখানে?”
ঘাড় ঘুড়িয়ে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকালো নিশি। সেই ধাক্কা লাগানো মানুষটা না? উত্তর দেবেনা করেও মাথা ঝাকাল ও।
“হ্যা,আমার কেবিন এখানেই। আপনারটাও,তাইতো?”
“হ্যাঁ, ওই যে পাশেরটাই। খুঁজে পাচ্ছিলাম না”।
“ও”।
আবার জলরাশির দিকে ফিরল ও। বুঝিয়ে দিতে চাইছে খুব বেশি আলাপ জমানোর ইচ্ছা নেই ওর।
মোটাদাগের ইঙ্গিত বুঝতে পেরেও যেন বুঝল না ফাহিম।
“ঈদের ছুটিতে যাচ্ছেন বুঝি”? আবার শুরু করল সে।
“হুম”। মাথা ঝাঁকাল নিশি।
“আমরাও”।
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ফাহিমের দিকে তাকালো নিশি, “আমরাও?”
“হ্যাঁ, কেবিন আলাদা হয়ে গেল। অবশ্য ঈদের সময় কেবিন পাশাপাশি পাওয়া যাবে আশাও করিনি”।
কিছু বললনা নিশি,তার চুপ করে থাকতেই ভাল লাগছে।
রাতের নিস্তব্ধতা বাড়ে, লঞ্চের অধিকাংশ যাত্রী কেবিনে চলে গেছে। নিশি তবু দাঁড়িয়ে থাকে।
ফাহিমকে একটা মেয়ে ডেকে নিয়ে গেছে,খেতে। হয়ত তার স্ত্রী হবেন। নিশি সেসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেনা। অন্যরকম একটা অনুভুতি।একা একা এই প্রথম বাড়ি ফিরছে সে, অদ্ভুত লাগছে তার। আচ্ছা,রাত কত হল? ফোনের দিকে তাকাল ও। মোটে ১১ টা বাজে! অথচ মনে হচ্ছে নিশুতি রাত। আরো কিছুক্ষন থাকা যাক তাহলে, নিরিবিলি রাতের সোন্দর্য উপভোগ করা যাবে।
গিটারের শব্দে নিশির ধ্যান ভাঙল। লঞ্চে! আরে সেই ছেলেটা আবার! ফাহিম নিশির পাশে এসে দাঁড়ালো। হাসিমুখে বলল, “গান জানেন?”
নিশিও হাসল, “জানিতো,বাথরুম সিঙ্গার” ।আপনি নিশ্চয়ই জানেন”।
ফাহিম শব্দ করে হেসে উঠল, “ গীটারই এখনও প্রাকটিসে আছে, গান বহুদূরের পথ”।
খানিক চুপ করে থেকে নিশি মুখ খুলল, “তবু শুনি”।
আসল শিল্পীদের গান গাওয়ার কথা বললে তারা হাজার বাহানা খুঁজে বের করে। গলা ব্যথা নাহলে মন ভালো না, এমন কিছু। ফাহিম শিল্পী নয় বলেই বোধহয় নখরা করলনা। তাকে বলতেই গিটারের সাথে হালকা গলায় গান ধরল।
ফাহিম ভুল বলেনি, সে খুব ভাল গায় না, তবু কেন যেন নক্ষত্রখচিত রাতে এই গানেও সুর ফিরে এল। এত চমৎকার লাগল নিশির। মনে হল বহুদিনের জমানো কিছু বিষাদ উড়ে গেল সুরের হাওয়ায়।
ফোন দেখার ভানে আড়চোখে দুজনের দিকে তাকানো হল, ক্ষীন হাসি বিনিময় হলেও হতে পারে। লঞ্চের হালকা নীলচে আলোতে অনেক কিছু বুঝেও বোঝা গেলনা।
নক্ষত্রভরা আকাশের নিচে পুরো রাতে তাদের মাঝে তেমন কোন কথা না হয়েও অনেক কথা হয়ে গেল।
একজন ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলল,অন্যজন না ঘুমিয়ে মাইগ্রেন বাধিয়ে ফেলল।
ভোর রাতের দিকে দুজনেই উঠে দাঁড়াল। এবার হয়ত কিছু নিজেদের কথা হবে। কিছু কি বলবেনা তারা? নদীর জলরাশির মত অজস্র কথা কি এখনো জমা পরেনি? অন্তত নামটা তো জানা যেতে পারে।
কিন্তু প্রকৃতির ইচ্ছা বোধহয় ভিন্ন। হালকা পায়ে তারা দুজন নিজেদের কেবিনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। হয়ত মাথায় বালিশ চেপে ঘুমিয়েও পড়ল অথবা হৃদয়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা নিয়ে জেগে থাকল।
নিশির ঘুম ভেঙ্গেছে। লঞ্চ ঘাটে এসে ভিড়েছে আগেই। ব্যাগটা গুছিয়ে ও বেড়িয়ে এল কেবিন আটকে। এবার একজন কুলি দরকার,গতকালের ঝামেলা আজ আর পোহাতে ইচ্ছা করছেনা। কি ভেবে পাশের কেবিনের দিকে তাকালো। তালা! লঞ্চ থেমেছে অনেক আগেই,নিশ্চয়ই ছেলেটি নেমে গেছে। যাবারই তো কথা। সব বুঝেও কেন যেন দারুন মন খারাপ হল ওর।
কুলির জন্য অপেক্ষা না করে বেড়িয়ে পড়ল নিশি, ভারী ব্যাগটা টানতে টানতে। এতদিন পর নিজের শহরে ফেরার খুশি কেন নেই ওর মাঝে? কেমন যেন অস্থির লাগছে। এর কারণ কি? ব্যাখ্যা নেই নিশির নিজের কাছেও।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগোল ও।
এই শহরের লঞ্চঘাটটা খুব নিরিবিলি। সদরঘাটের মত লোক গিজগিজ করছেনা। অবশ্য শুধু লঞ্চঘাট না এখানে পুরো শহর জুড়েই এমন। কেমন একটা শান্ত ভাব। নিশি চুপচাপ একটা রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
একটা রিকশার জন্য এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে ও, রিকশা তো আছে কিন্তু খালি নেই। সবাই তাদের সকালের যাত্রী পেয়ে গেছে।
হঠাৎ নিশির বুকটা ধ্বক করে উঠল, সেই মানুষটা না? তার সাথে আরো একজন পুরুষ আর সে মেয়েটি, যে রাতে খেতে ডেকে নিয়ে গেছে! নিশ্চয়ই ভাই-ভাবী হবেন অথবা বোন দুলাভাই।
নিশি অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে যেন সে দেখতে না পায়। তার কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে।
অন্যদিকে তাকিয়ে ঘুরে গেলেও নিশির গোলাপী শাড়ি ফাহিম ঠিকই দেখতে পেয়েছে,এতক্ষন ধরে অনেক গোলাপী দেখা হয়েছে। আর তো তাকে হারাতে দেওয়া যাবেনা।
ফাহিমই এগিয়ে এল ,হাল্কা গলায় বলল- “ আমার নাম ফাহিম”।
নিশি হেসে ফেলল, তার হাসি বলছে শুধু নাম নয় তার আরো অনেক কিছুই বলার আছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now